কভিড-১৯ মহামারীর কারণে সৃষ্ট সরবরাহ চেইন সংকট ও প্রযুক্তি পণ্য ক্রয়ে চীনের ওপর বৈশ্বিক আস্থার ঘাটতির মধ্যে চিপ উৎপাদনে ভারত সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। সম্প্রতি দেশটির অন্যতম তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এইচসিএলের সহপ্রতিষ্ঠাতা অজয় চৌধুরী এ কথা জানিয়েছেন। খবর পিটিআই।
চিপ উৎপাদন কার্যক্রমে সরকারি বিভিন্ন সহায়তা প্রকল্প দেশটিকে ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বৈশ্বিক পরিচিতি পেতে সাহায্য করছে। সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ তৈরিতে ভারতের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় উপদেষ্টা প্যানেল গঠন করেছে। প্যানেলটি উৎপাদন কাজ পরিচালনায় নির্দেশনা দেয়ার পাশাপাশি লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করবে। হার্ডওয়্যার ও চিপ উৎপাদনে ভারত বিশ্বের অন্যতম নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেছে উপদেষ্টা প্যানেল।
চিপ উৎপাদনে সরকার গৃহীত পদক্ষেপ এবং সহায়তা ইলেকট্রনিকস পণ্য ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে ভারতকে বিশ্বের অন্যতম পাওয়ারহাউজে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এ বিষয়ে অজয় বলেন, সব মিলিয়ে আমি মনে করি, এটি একটি চমত্কার নীতি এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। পিটিআইকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, প্রযুক্তি পণ্য ক্রয়ে চীনের ওপর বৈশ্বিক আস্থা কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে ভারতে তৈরি চিপের পাশাপাশি হার্ডওয়্যার পণ্য বিক্রির সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সুযোগ কাজে লাগিয়ে সেমিকন্ডাক্টর ও হার্ডওয়্যার উৎপাদনের মাধ্যমে ভারতকে চীনের বিকল্প অবস্থান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে বলেও জানান তিনি। তথ্য প্রযুক্তি পণ্য ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য পাচারের সন্দেহে চীনের বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর অনেক প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক কার্যক্রম প্রভাবিত হয়।
সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতাদের আকৃষ্ট করতে এর আগে ১ হাজার ২০ কোটি ডলারের রূপরেখা উন্মোচন করেছে ভারত। আঞ্চলিক অফিস স্থাপনের পাশাপাশি ভারতকে চিপ উপাদনের অন্যতম কেন্দ্রে রূপান্তরিত করতেই এ পরিকল্পনা নিয়েছে দেশটির সরকার।
কভিড-১৯-এর সংক্রমণের কারণে বিশ্বজুড়ে যখন সেমিকন্ডাক্টরের তীব্র সংকট চলছে, তখন ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী আশ্বিনী বৈষ্ণব নতুন এ পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেন। দেশটির রাষ্ট্রীয় ও ব্যবসায়িক পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান বাণিজ্য বিরোধের কারণে দেশটি আগ্রহী উৎপাদনকারীদের আনতে কাজ করছে। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে টেলিযোগাযোগমন্ত্রী আশ্বিনী বৈষ্ণব জানান, এ পরিকল্পনার মাধ্যমে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে বিভিন্ন খাতের সঙ্গে জড়িতদের আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে। ডিসপ্লে ইউনিট ও সেমিকন্ডাক্টর উপাদনে সক্ষম প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকল্প পরিচালন ব্যয়ের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সহায়তা দেবে ভারত সরকার।
ভারতে সেমিকন্ডাক্টর ও ডিসপ্লে উৎপাদন ইকোসিস্টেমের উন্নয়নে সরকার ৭৬ হাজার কোটি রুপির উচ্চাভিলাষী প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান দেশটিতে সেমিকন্ডাক্টর, ডিসপ্লে তৈরি ও ডিজাইন ইকোসিস্টেমের উন্নয়নে কাজ করছে, তাদের সহায়তায় এ প্রকল্প। প্রোগ্রামে চারটি ভাগ রয়েছে। এগুলো ভারতে সেমিকন্ডাক্টর ফ্যাব, ডিসপ্লে ফ্যাব, কম্পাউন্ড সেমিকন্ডাক্টর বা সিলিকন ফটোনিকস অথবা সেন্সর ফ্যাব স্থাপন এবং সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বল, পরীক্ষণ, মার্কিং ও প্যাকেটজাত কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করবে।
কভিড-১৯ মহামারী সময় থেকে বিশ্ব সরবরাহ চেইনে সমস্যার কারণে সেমিকন্ডাক্টর সংকটের মুখে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, সংকটের সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এর তীব্রতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। কেননা চিপ উৎপাদনে ব্যবহূত নিয়ন ও হেক্সাফ্লুরোবুটাডিয়েন গ্যাসগুলো এসব অঞ্চল থেকে সরবরাহ করা হয়।
অন্যদিকে ভারতের তিনটি প্রদেশে সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলি ও টেস্ট ইউনিট স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা করেছিল টাটা গ্রুপ। ৩০ কোটি ডলার ব্যয়ে এ ইউনিটগুলো স্থাপন করা হবে বলে জানা গিয়েছিল। আধুনিক প্রযুক্তি পণ্য উৎপাদনে প্রাতিষ্ঠানিক চাপের মুখে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে দুটি অবগত সূত্রে জানা গেছে। ভারতের দক্ষিণে অবস্থিত তামিলনাড়ু, কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানা প্রদেশে অ্যাসেম্বলি ও টেস্ট ইউনিট স্থাপনে প্রয়োজনীয় জমির সন্ধানে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে টাটা আলোচনা করছে বলে সূত্রে জানা গেছে। সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন শিল্পে প্রবেশের বিষয়ে টাটা অনেক আগে থেকেই তাদের ইচ্ছার কথা প্রকাশ করে আসছিল। এ খাতে গ্রুপটির প্রথম পদক্ষেপ এটি।










