চীন যাতে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে না পারে সেজন্য আরেক দফা কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে জো বাইডেন প্রশাসন। বেইজিংয়ের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও সামরিক বাহিনীতে ব্যবহার ঠেকাতে সম্প্রতি বেশকিছু নীতিমালা ঘোষণা করেছে ওয়াশিংটন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
চীনা মালিকানাধীন কারখানাগুলোতে উন্নত লজিক চিপের চালান বন্ধে চলতি বছরের শুরুতে কয়েকটি মার্কিন কোম্পানির কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কেএলএ করপোরেশন, লাম রিসার্চ করপোরেশন ও অ্যাপ্লায়েড ম্যাটেরিয়ালস ইনকরপোরেশন। বেইজিংয়ের সামরিক বাহিনীর কাজে আসতে পারে বা সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানির হাতে প্রযুক্তি বেহাতের সম্ভাবনা রয়েছে এমন পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিপণ্য রফতানি অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে বাইডেন প্রশাসন।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক আরোপিত বিধিনিষেধে সুপারকম্পিউটারে ব্যবহূত চিপ রফতানিও বাধাগ্রস্ত হবে। এর আগে ড্রোন নির্মাতা ডিজেআই ও নজরদারি প্রতিষ্ঠান ঝেজিয়াং ডাহুয়া টেকনোলজিসহ চীনের সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ ১৩টির মতো চীনা কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করেছিল পেন্টাগন।
ওয়াশিংটনের এ কড়া অবস্থান চীনের সঙ্গে ৯০ দশক-পরবর্তী পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এতে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে চীনের স্বনির্ভরতার স্বপ্ন অনেক পিছিয়ে যাবে। ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জিম লুইস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তে কয়েক বছর পিছিয়ে যাবে চীন। চীন হয়তো চিপ নির্মাণ থেকে পিছু হটবে না। তবে তারা পরিকল্পনামাফিক সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে না।
গত শুক্রবার চীনের শীর্ষ মেমরি চিপ নির্মাতা ওয়াইএমটিসি ও অন্য ৩০টি চীনা কোম্পানির বিরুদ্ধে বিধিনিষেধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। তালিকাভুক্ত এ কোম্পানিগুলো পরিদর্শন করতে পারবেন না মার্কিন কর্মকর্তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এ বিধিনিষেধের কড়া সমালোচনা করেছে চীন। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে ওয়াশিংটন তাদের পেশিশক্তি প্রদর্শন করছে বলে অভিযোগ করেন চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে নিং বলেন, এ ধরনের রক্ষণশীল পদক্ষেপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কেবল নিজেদেরই ক্ষতি ডেকে আনবে।
যুক্তরাষ্ট্রের নয়া বিধিনিষেধ আরোপের ফলে এশিয়ার অন্যান্য সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতা কোম্পানির জন্যও নেতিবাচক হিসেবে দেখা দিতে পারে। অবশ্য প্রকাশ্যে তা স্বীকার করছে না স্যামসাংয়ের মতো মেমরি চিপ নির্মাতা জায়ান্ট। গতকাল এক বিবৃতিতে দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্প মন্ত্রণালয় জানায়, চীনে স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের যে উৎপাদন কার্যক্রম চলছে নতুন বিধিনিষেধে যন্ত্রাংশ সরবরাহে তেমন বাধার মুখে পড়বে না তারা। তবে এ খাতে চলমান অনিশ্চয়তা নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালাতে হবে।
গত কয়েক বছরে চীনের প্রতি একের পর এক বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে হুয়াওয়ের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টের ব্যবসা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্মার্টফোন, পিসি, গেমিং কনসোল থেকে শুরু করে গাড়ি ও গৃহস্থালি পণ্যে ব্যবহূত সেমিকন্ডাক্টরে স্বনির্ভরতা চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ খাতে স্বনির্ভরতায় বৃহৎ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞায় ব্যাহত হচ্ছে তাদের কার্যক্রম।
গত আগস্টে চীনের সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন রেকর্ড সর্বোচ্চ কমেছে। দেশটির জিরো কভিড পলিসি, অর্থনীতিতে শ্লথগতিতে ভোক্তা ব্যয় হ্রাসে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে প্রভাব পড়েছে।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো (এনবিএস) জানায়, আগস্টে চীনের ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট (আইসি) উৎপাদন ২৪ দশমিক ৭ শতাংশ কমে ২ হাজার ৪৭০ কোটি ইউনিটে দাঁড়িয়েছে, ১৯৯৭ সালে উপাত্ত রাখা শুরুর পর যা সর্বনিম্ন। গত জুলাইয়েও চীনের সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ২ হাজার ৭২০ কোটি ইউনিটে দাঁড়িয়েছিল। এ নিয়ে টানা দুই মাসে দেশটির সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন কমল।










