ইউক্রেনে অভিযান শুরুর পর থেকে রাশিয়ার হাজারো প্রযুক্তি কর্মী দেশ ছাড়তে শুরু করেন। চলমান অনিশ্চয়তার মধ্যে তারা জীবন ও ক্যারিয়ারকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে বিদেশমুখী হচ্ছেন।
ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান শুরু এবং স্বদেশে বিরোধী মত দমনে ক্রেমলিনের কঠোর নীতি গ্রহণের পর পরই বিদেশগামীদের ঢেউ শুরু হয়। মার্চের প্রথম দিকে রাশিয়ায় দুটি চার্টার বিমান পাঠান লাটভিয়ার রিগাভিত্তিক ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট কনস্ট্যান্টিন সিনিউশিন। দুটি বিমানই মস্কোসহ সেন্ট পিটার্সবার্গ, পার্ম, একাটেরিনবার্গ ও অন্যান্য শহরের প্রযুক্তি কর্মীদের বহন করে নিয়ে আনে। উভয় বিমানে ছিলেন প্রায় ৩০০ সফটওয়্যার ডেভেলপার, উদ্যোক্তা এবং অন্যান্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ। এর মধ্যে ছিলেন সিনিউশিনের স্টার্টআপ কোম্পানির ৩০ জন রাশিয়ান কর্মীও। বিমান দুটি কৃষ্ণ সাগরের তীরে আর্মেনিয়ার রাজধানী ইউরেভানে উড়ে আসে, যেখানে আগ্রাসন শুরুর সপ্তাহখানেক পর হাজারখানেক প্রযুক্তি কর্মী জড়ো হন। সহস্রাধিক প্রযুক্তি কর্মী পালিয়ে যান জর্জিয়া, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অন্য দেশে; যেখানে ভিসা ছাড়াই রাশিয়ার নাগরিকদের যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
রাশিয়ার প্রযুক্তি শিল্প গ্রুপের প্রাক্কলন, মার্চের ২২ তারিখ নাগাদ ৫০ হাজার থেকে ৭০ হাজার প্রযুক্তি কর্মী দেশ ছাড়েন এবং পরবর্তী সময়ে আরো ৭০ হাজার থেকে এক লাখ তাদের অনুসরণ করতে পারেন বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশত্যাগকারীসহ বিশ্বের প্রযুক্তি জগতে কর্মরত দুই ডজনের বেশি রাশিয়ান কর্মীর সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই দেশত্যাগ স্থায়ীভাবে রাশিয়ার প্রযুক্তি জগেক বদলে দেবে। রাশিয়ার অর্থনীতিতে যে শিল্পটি ক্রমবর্ধমান শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছিল, সেটি এখন ব্যাপকভাবে কর্মী হারাচ্ছে। ভবিষ্যতের কোম্পানি বিনির্মাণে অনেক উজ্জ্বল যুবক হারাচ্ছে যুদ্ধরত দেশটি।
একজন দোভাষীর মাধ্যমে রিগায় অবস্থিত অফিস থেকে স্টার্টআপ উদ্যোক্তা সিনিউশিন বলেন, বেশির ভাগ রাশিয়ান প্রযুক্তি কর্মী বিশ্ববাজারের অংশ। হয় তারা বিশ্বব্যাপী কোম্পানির জন্য কাজ করেন অথবা তারা প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, যারা বিশ্ববাজারের জন্য নতুন কোম্পানি প্রতিষ্ঠায় কাজ করছেন। ফলে তারা দেশ ছাড়ছেন।
রাশিয়া থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসিত শিকাগোর হ্যারিস স্কুল অব পাবলিক পলিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ কনস্ট্যান্টিন সোনিন বলেছেন, সাম্প্রতিক দেশত্যাগ রাশিয়ার প্রযুক্তি খাতের গতি ১০ থেকে ১৫ বছর কমিয়ে দিয়েছে। পরিস্থিতি অনেকটা নব্বই দশকের মতো, তখন যারা যেতে পেরেছেন তারাই দেশত্যাগ করেছেন। জ্বালানি ও ধাতব শিল্পের তুলনায় রাশিয়ার অর্থনীতির একটি ছোট অংশ প্রযুক্তি খাত। তবু এটি খুব দ্রুত বর্ধনশীল খাতের একটি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, তরুণ, শিক্ষিত ও দূরদর্শী মানুষগুলোকে হারিয়ে ফেলা দেশটির জন্য আসছে বছরগুলোয় অর্থনৈতিকভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।
পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ব্যারি আইকস বলছেন, স্বল্পমেয়াদি প্রভাবের তুলনায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বেশি তাত্পর্যপূর্ণ হতে পারে। একপর্যায়ে আপনাকে তো তেল ও গ্যাসের বাইরে অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যপূর্ণ করার চেষ্টা এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে হবে। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই সহজ বিকল্প হিসেবে হাজির প্রযুক্তি খাত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব প্রযুক্তিকর্মী দেশ ছেড়েছিলেন। কারণ তারা ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তারা পুতিন শাসনের অধীনে থাকতে চান না এবং আশঙ্কা ছিল যে তারা থাকলে তাদের মনের কথা বলতে পারবেন না। প্রযুক্তিতে কাজ করেন, তাই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তাদের কাছে দেশ থেকে পালানোর অর্থ ছিল এবং বিশ্বব্যাপী অন্যান্য কারিগরি কর্মীর মতো তারা একটি ল্যাপটপ ও একটি ইন্টারনেট সংযোগ পেলে বিশ্বের যেকোনো জায়গা থেকে কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। অন্যদের চলে যাওয়ার কারণ, কোম্পানিগুলো তাদের বের করে দিয়েছে।










