প্রায় বছর দেড়েক চেষ্টার পর বহুল প্রত্যাশিত যুক্তরাষ্ট্রের চিপস অ্যাক্ট অবশেষে পাস হয়েছে। সম্প্রতি হোয়াইট হাউজের রোজ গার্ডেনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এতে চূড়ান্ত সই করেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন শীর্ষস্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শীর্ষস্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও শিল্পপতিরা। কাঙ্ক্ষিত আইন পাস হলেও রাতারাতি সেমিকন্ডাক্টর খাতে যুক্তরাষ্ট্রকে নেতৃত্বের আসনে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে অনুমোদনের পর বাইডেনের স্বাক্ষরে বিলটি আইনে পরিণত হয়। এর ফলে সেমিকন্ডাক্টর খাতে গবেষণা ও ভর্তুকির জন্য ৫ হাজার ২০০ কোটি ডলার ও অন্যান্য সুবিধা উন্মুক্ত হয়েছে।

সিএনবিসির প্রতিবেদনে জানা যায়, চিপস অ্যান্ড সায়েন্স অ্যাক্টে স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাইডেন বলেন, ভবিষ্যৎ হচ্ছে ‘মেড ইন আমেরিকা’র। সেমিকন্ডাক্টর আবিষ্কারক দেশ যুক্তরাষ্ট্র এবং এ আইনের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে আসছে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প। তিনি আরো বলেন, প্রাপ্ত ভর্তুকি শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে বা শেয়ার বাইব্যাক করায় ব্যয় করা যাবে না।

সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের বরাতে জানা গিয়েছে, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বৈশ্বিক চিপ বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার হিস্যা ছিল ৩৭ শতাংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তা ১২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বৈশ্বিক চিপ উৎপাদনের ৭৫ শতাংশ হিস্যা এখন পূর্ব এশিয়ার। সবচেয়ে অগ্রসর চিপের ৯০ শতাংশ তৈরি হচ্ছে তাইওয়ানে। করোনা পরিস্থিতিতে সরবরাহ চেইন সংকট এবং তাইওয়ান নিয়ে চীনের পলিসি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই চিপ নির্মাণে সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছেন।

স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মাইক্রন, ইন্টেল, লকহিড মার্টিন, এইচপি ও এএমডির শীর্ষ নির্বাহীরা। চিপস অ্যাক্ট পাসের ফলে বড় অংকের বিনিয়োগের ঘোষণা দিচ্ছে মার্কিন চিপ নির্মাতা কোম্পানিগুলো। ২০২৮ নাগাদ ৭৪০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে কোয়ালকম। এদিকে মেমরি চিপ নির্মাতা কোম্পানি মাইক্রন বলছে, অভ্যন্তরীণ উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে ৪ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে তারা। মাইক্রনের এ বিনিয়োগের ফলে মেমরি চিপ সেগমেন্টে যুক্তরাষ্ট্রের হিস্যা ২ থেকে বেড়ে ১০ শতাংশে দাঁড়াবে। এছাড়া নিউইয়র্কে একটি চিপ কারখানা স্থাপনে যৌথভাবে ৪২০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে কোয়ালকম ও গ্লোবালফাউন্ড্রিজ। দ্য সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন বলছে, নতুন আইন পাসের ফলে হাজারো কর্মসংস্থান হবে এবং প্রসেসরনির্ভর শিল্প ও সামরিক গ্রাহকদের জন্য সরবরাহ চেইন সবল হবে।

বাইডেন প্রশাসনের চিপস অ্যাক্ট পাসের ফলে সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলো আশায় বুক বাঁধলেও অনেক বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টরা ততটা আশাবাদী নন।

সম্প্রতি বিশ্বের শীর্ষ চিপ নির্মাতা কোম্পানি টিএসএমসির বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্তে সতর্ক অবস্থানের প্রমাণ পাওয়া যায়। শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে বার্ষিক এক সভায় টিএসএমসি চেয়ারম্যান মার্ক লিয়ু বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনায় নির্মাণ হতে যাওয়া বিদেশে তাদের প্রথম কারখানার নির্মাণ ব্যয় প্রত্যাশার চেয়ে বেশি। তবে ব্যয় ঠিক কী পরিমাণ বেশি হচ্ছে, এ তথ্য শেয়ার করেননি তিনি। স্থানীয় কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি বিদেশী চিপ নির্মাতা কোম্পানিগুলোকেও প্রতিশ্রুতি মোতাবেক ওয়াশিংটনের সহায়তা করা উচিত বলে মনে করেন লিয়ু।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন ফ্যাব নির্মাণে কয়েক বছর লেগে যায়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের চিপ নির্মাণ সক্ষমতা রাতারাতি পাল্টে যাবে না। অনেকগুলো ফ্যাব তৈরি হলে হয়তো যুক্তরাষ্ট্রে চিপের দাম কমবে। কিন্তু অত্যাধুনিক চিপ তৈরিতে যে প্রযুক্তি ও অর্থ ব্যয় দরকার সেক্ষেত্রে এশীয় কোম্পানিগুলোর থেকে পিছিয়ে রয়েছে মার্কিন কোম্পানিগুলো। হোয়াইট হাউজের বিবৃতিতেই এশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ফারাক স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে সেমিকন্ডাক্টর সামগ্রীর মাত্র ১০ শতাংশ উৎপাদন করে সেখানে পূর্ব এশিয়ায় উৎপাদন হয় ৭৫ শতাংশ সেমিকন্ডাক্টর পণ্য।