আমি আর পার্ল সাধারণত বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে পূর্ব গেট দিয়ে ঢুকি। ওদিকটার নাম আমরা দিয়েছি আইইবি গেট। প্রথম দিন যখন সেই গেট দিয়ে যখন সূর্য কপালে করে (কারণ সূর্য তখন পশ্চিমে হেলতে শুরু করেছে) ঢুকছি, তোরণের ডানে-বামে বইয়ের কিছু পোস্টার চোখে পড়ল। আমার প্রিয় গায়কদের একজন প্রবর রিপনের লেখা বেরিয়েছে। তখন মনে এসেছিল এতটুকুই। তৃতীয় দিন হঠাৎ গেট পেরিয়ে যাওয়ার সময় মনে হলো আমি তো একটা স্যুভেনিয়র পেরিয়ে যাচ্ছি। বইয়ের পোস্টার।

প্রায় এক কী দেড় দশক আগের কথা। ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগ এলাকায় এলে দেখতাম, অনিয়মিত বিরতিতে দেয়ালগুলো অগণিত লেখকের, অসংখ্য বইয়ের পোস্টারে ছেয়ে গেছে। জাতীয় জাদুঘর থেকে টিএসসি হয়ে শাপলা চত্বর, জগন্নাথ হল থেকে পলাশীর দেয়াল। ওটা পোস্টারের একটা তুরীয় সময় গেছে। লিফলেটও বের হতো। কেউ কেউ আরো সরস উদ্যোগ নিয়ে নিজ বইয়ের প্রচারণামূলক পকেট ক্যালেন্ডার বের করতেন।

তারও আগে, নব্বইয়ের দশকের প্রায় মাঝামাঝি যখন বাবা-মায়ের সঙ্গে মেলায় আসতাম, তখন বিকালের আলোয় কিছু পোস্টার দেয়ালে সোনালি হয়ে থাকতে দেখতাম। বেশি নয় সংখ্যায়। তাদের ভেতর তখন ছাপা পোস্টার যেমন ছিল, তেমনই ছিল হাতে লেখা। সাদা বা হলুদ পোস্টার পেপারের ওপর মার্কার দিয়ে লেখা বইয়ের নাম, স্টল নম্বর, আহ্বান। কিছু ছিল দেয়াললিখন। খুব কৌতূহল হতো। মনে হতো রহস্যময় সেসব স্টলে বসে আছেন স্পর্শের বাইরের সব মানুষ।

আর আজকের দিনে দেখি পোস্টারের দৃশ্যটা ছোট হতে হতে প্রায় অদৃশ্য হতে চলেছে। একটা দুটো দেয়ালে পোস্টার অল্পস্বল্প চোখে পড়ে। এসেছে সুদৃশ্য ব্যানার। তবে বইমেলায় তার যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত। সমাধানে বা সৌন্দর্য বিধানে পোস্টারসদৃশ দ্বিমাত্রিক-ত্রিমাত্রিক কিছু কাঠামো স্থান পেয়েছে স্টলের অঙ্গসজ্জায়।

প্রবর রিপনের বইয়ের পোস্টারের সামনে ফিরে আসি। এমন পোস্টারের একটা স্মারকমূল্য আছে আমার কাছে। পেলেই আমি অভ্যাস অনুযায়ী মন দিয়ে দেখি। কিন্তু দেখার জন্যে তারা যথেষ্ট পরিমাণে নেই। কোথায় গেছে? একসময় লিফলেটে বইয়ের নাম, স্টল নম্বর দেখে তা দিয়ে কত বিমান বানিয়ে উড়িয়েছি। কোথায় লিফলেট?

বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটা বিপ্লব ঘটে গেছে। মানুষ যে সমাজ বাইরে যাপন করতেন, তেমন একটা ছায়াসমাজ এখন ইন্টারনেটে যাপন করেন। এমনটা যে হতে পারে তা সাধারণের কল্পনার বাইরে ছিল প্রায়। যাপনটাও এখন হূদয়ের কাছে এত খাঁটি যে এখানে ক্রমেই নিখাদ প্রেম জন্ম নিতে পারে। আবার তৈরি হতে পারে নিরেট জিঘাংসা। প্রেমের প্রমাণ আমার আর পার্লিয়ার ক্রমেই এক হওয়া। জিঘাংসার প্রমাণ অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ড।

এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্টার, লিফলেটগুলোর ফটোশপড সংস্করণ প্রকাশ পাচ্ছে। ফন্টের প্রকরণ আর রঙের ধরনে এসেছে তুলনাহীন উত্কর্ষ। সে উত্কর্ষে ক্রমেই উত্কৃষ্ট হচ্ছে ভার্চুয়াল পোস্টার। অগণিত মাধ্যমে চেনা অচেনা বলয়ে সেই বৈদ্যুতিক পোস্টার লিফলেট ছড়িয়ে পড়ছে। ক্রমেই মুছে যাচ্ছে বইয়ের ধ্রুপদী পোস্টার যুগ।

কোনো যুগ কখনো পুরো মুছে যায় না। পাপুয়া নিউগিনিতে ২০২২ সালেও বিমান দেখলে তীর ছোড়ে এমন মানুষ টিকে আছে। দুয়েকটা ব্যতিক্রম হয়ে বইয়ের কাগজ-পোস্টারও হয়তো টিকে থাকবে। থাকতেই হবে তাকে, আমার এমন দাবি নেই। তবে দেখতে পেলে আমি মধুচোখ করে তার সামনে দাঁড়াব, এটুক বলতে পারি।

 

হামিম কামাল: কথাসাহিত্যিক