প্রচার শিল্পের মধ্যে অন্যতম পোস্টার।  মতাদর্শ, তথ্য, ঘটনা প্রচারের জন্য ভাষা, ছবি, চিহ্ন ব্যবহার করে সহজে, স্বল্প সময়ে পাঠক-দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে যে প্রচারপত্র তাই পোস্টার। বহুল ব্যবহূত মাধ্যমটির ব্যবহারের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। সব পোস্টারকে শিল্প বলা যাবে না, বিশেষ হয়ে উঠলে ‘শিল্প’।

শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমগুলো যে যে কারণে রূপ পাল্টায়, ভঙ্গি বদলায়, যে তাগিদে, তাড়নায় বারবার নতুনভাবে তৈরি হয়, পোস্টার শিল্পের ইতিহাস একই কারণে বিবর্তনশীল, গুরুত্বপূর্ণ। পোস্টার শিল্প একটি সৃজনশীলকর্ম, প্রতিষ্ঠিত শিল্প মাধ্যম।

পোস্টার শিল্প ব্যবহূত শিল্প, যা বিশেষ উদ্দেশে নির্মিত।  প্রচার, বাজার, দৃষ্টি আকর্ষণ, তথ্য প্রদান ইত্যাদি।

ইংরেজ উপনিবেশিক শাসন সময়ে, স্বদেশীরা গোপনে পোস্টার দেয়ালে ঝুলাতেন তাদের মতাদর্শ জানানোর জন্য। এসব ছিল হাতে আঁকা।  পরবর্তী সময়ে লেটার প্রেসের বদৌলতে পণ্য প্রচারকারীরা পোস্টারে বাহারি পরিবর্তন আনেন। আমাদের দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক, সামাজিক আন্দোলনে পোস্টারের ব্যাপক ব্যবহার, প্রভাব দেখা যায়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রচারের জন্য আঁকা কিছু পোস্টার, যা আমাদের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে চিহ্নিত।

বিষয় ভাবনার উপস্থাপন, নকশার নান্দনিকতা, সৃজনশীল পোস্টারগুলো প্রচার উদ্দেশ সফল করেছিল। আসলে পোস্টার শিল্প যেকোনো সমাজের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, নান্দনিক ভাবনার দলিল।


‘পণ্য’-এর প্রচারের জন্য পোস্টার উত্তম মাধ্যম। এর মধ্যে বাংলা জনপ্রিয় চলচিত্রের পোস্টার বিশেষ বৈচিত্র্যের কারণে গুরুত্বপূর্ণ, যা কিনা অনেক ক্ষেত্রে অন্যান্য শিল্প মাধ্যমকে প্রভাবিত করেছে-করছে।

জনপ্রয় রুচিকে পুঁজি করে পোস্টার রূপ পাল্টায়, তবে পোস্টারও রূচি পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রচারের জন্য, নির্মিত পোস্টারগুলোয় জনপ্রিয়-নান্দনিক চর্চার চেয়ে শিল্পীর সৃজনশীল ভাবনার প্রকাশ বেশি চোখে পড়ে।

এক সময়ে শিল্পীরা হাতে এঁকে পোস্টার নকশা করতেন। জেরস্ক, ফটোকপি বাজারে আসলে তা ব্যবহূত হয়েছে। লেটারপ্রেস, অফসেট বহু সংখ্যা ছাপানো ও প্রচার সহজ করেছে। অক্ষরের ভিন্ন ভিন্ন টাইপ বা স্টাইলের উদ্ভাবন, ফটোগ্রাফি, বিভিন্ন সফটওয়্যার, প্রোগ্রাম ডিজাইনকে প্রভাবান্বিত করেছে। ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধা পোস্টারের নকশা ও প্রচার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করছে।

অন্যদিকে প্রচারের মাধ্যম, যোগাযোগের অভ্যাস ও পোস্টারের ব্যবহারে পরিবর্তন এনেছে। ওয়েবপেজ, সামাজিক মাধ্যম, টেলিভিশন, টেলিফোন ইত্যাদি পোস্টারের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন ঘটিয়েছে। আমি বলব ছাপা পোস্টারের ব্যবহার কমিয়েছে। তবে পোস্টার আছে।

লিফলেট, বিলবোর্ড, টেলি বিজ্ঞাপন পোস্টারের বৈশিষ্ট্যগুলো রেখেই নির্মিত। পোস্টারের জন্য দেয়ালের স্বল্পতা, দেয়ালের বাণিজ্যকরণ, ছাপানো পোস্টার জায়গা পাচ্ছে না, অন্যদিকে ‘কাগজ ও পরিবেশ ভাবনা’ ছাপাতে নিরুৎসাহিত করছে। আমার মনে হয়, এখানে নস্টালজিক হওয়ার সুযোগ নেই। নিত্যনতুন উপাদান, মাধ্যম, ভাবনা, বাজারে আসছে আমাদের অভ্যাসকে চ্যালেঞ্জ করে— আমরা নতুন যুক্তিবোধ, নান্দনিকতায়, অভ্যস্ত হয়ে উঠি, উঠব।

ভোগবাদী সভ্যতায় নিত্যনতুন পণ্য উদযাপনের বাজারে প্রচার নির্ভরতা বাড়বে। বাড়বে পোস্টারের প্রয়োজনীয়তা। হয়তো আগের মতো নয়, অন্য ধাঁচে, অন্য রূপে।

 

ওয়াকিলুর রহমান: শিল্পী, কিউরেটর