একটা সময়
জ্ঞানচর্চার বাতিঘর
ছিল বরেন্দ্র
অঞ্চল। বিশেষ
করে ধর্মীয়
শিক্ষার প্রসারে
এ অঞ্চলে
বেশকিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
গড়ে ওঠে।
কিন্তু এসব
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই
এখন ধ্বংসস্তূপ,
কালের সাক্ষী।
তবে সুপ্রাচীন
বেশকিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
এখনো বিলিয়ে
যাচ্ছে জ্ঞানের
আলো। ইতিহাস
খুঁজলে জানা
যায়, নওগাঁর
বদলগাছী উপজেলার
পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার
বা সোমপুর
বিহার বা
সোমপুর মহাবিহার
আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়
হিসেবে স্বীকৃত
ছিল। পাল
বংশের দ্বিতীয়
রাজা ধর্মপাল
দেব (৭৮১-৮২১)
অষ্টম শতাব্দীর
শেষের দিকে
বা নবম
শতাব্দীতে এ
বিহার তৈরি
করেন। প্রায়
৩০০ বছর
ধরে উপমহাদেশের
বৌদ্ধদের অতি
বিখ্যাত ধর্ম
শিক্ষাদান কেন্দ্র
ছিল এটি।
কালের আবর্তে
হারিয়ে গেছে
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার
শিবগঞ্জ উপজেলার
সোনামসজিদ এলাকায়
গড়ে ওঠা
দরসবাড়ী মাদ্রাসা।
১৬০০ শতাব্দীতে
গড়ে ওঠা
মাদ্রাসাটি বরেন্দ্র
অঞ্চলের অন্যতম
প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র
হয়ে উঠেছিল।
বলা হয়ে
থাকে, দেশের
সবচেয়ে প্রাচীন
ইসলামী বিদ্যাচর্চা
কেন্দ্র এটি।
১৬০০ শতাব্দীর
শেষ দিকে
রাজশাহীর বাঘা
উপজেলাতেও আরেকটি
মাদ্রাসা গড়ে
ওঠে। সেটিও
একসময় উপমহাদেশের
অন্যতম প্রধান
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত
হয়।
ব্রিটিশ শাসনামলেও
এ অঞ্চলে
বেশকিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
গড়ে ওঠেছে।
এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
যুগ যুগ
ধরে জ্ঞানের
আলো ছড়িয়েছে
যাচ্ছে বরেন্দ্রজুড়ে।
এর মধ্যে
রাজশাহী কলেজিয়েট
স্কুল অন্যতম।
১৮২৮ সালে
বাউলিয়া ইংলিশ
স্কুল নামে
যাত্রা করে
বিদ্যালয়টি। মূলত
ইংরেজি শিক্ষা
বিস্তারে তৎকালীন
উইলিয়াম বেন্টিংক
এ বিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ
দেন।
প্রথমদিকে এটি
অবৈতনিক ব্যক্তিগত
বিদ্যালয় ছিল।
স্থানীয় ইংরেজ
কর্মকর্তা, আইনজীবী
এবং নাটোর
দিঘাপতিয়া, দুবলহাটি,
পুঠিয়া ও
বলিহারের জমিদারদের
সাহায্য ও
সহযোগিতায় বিদ্যালয়টি
চলছিল। ১৮৩৬
সালে বিদ্যালয়টি
সরকারীকরণ হয়।
১৯৫৮ সালে
বিদ্যালয়টি কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন
পায়।
১৮৭৩ সালে
বাউলিয়া সরকারি
ইংলিশ স্কুলের
সঙ্গে মহাবিদ্যালয়ের
দুটি শ্রেণী
যুক্ত হয়।
তখন থেকেই
এর নামকরণ
রাজশাহী কলেজিয়েট
স্কুল। ১৮৮৪
সালে কলেজের
শ্রেণী দুটি
আলাদা হয়ে
রাজশাহী কলেজ
নামে যাত্রা
করে। প্রতিষ্ঠার
তিন বছরের
মাথায় ১৮৭৮
সালে প্রথম
গ্রেড মর্যাদা
পায় কলেজটি।
রাজশাহী কলেজ
নামকরণ তখনকারই।
উত্তরবঙ্গের প্রথম
কলেজ হিসেবে
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের
অধিভুক্তির পরের
বছরই চালু
হয় বিএ
কোর্স। এরপর
১৮৮১ সালে
স্নাতকোত্তর এবং
১৮৮৩ সালে
যোগ হয়
বিএল কোর্স।
যদিও ১৯০৯
সালে মাস্টার্স
কোর্স ও
বিএল কোর্সের
অধিভুক্তি বাতিল
করে কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়। এরপর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
এবং পরে
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও
অধিভুক্ত হয়।
এখন জাতীয়
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে
মাস্টার্স ও
সম্মান ডিগ্রি
প্রদান করছে
রাজশাহী কলেজ।
চালু রয়েছে
উচ্চ মাধ্যমিক
পাঠক্রমও। ছাত্র
নথিভুক্তি বন্ধ
হওয়ায় ১৯৯৬
থেকে ২০০৯
পর্যন্ত বন্ধ
ছিল এ
কার্যক্রম। মাত্র
ছয়জন ছাত্র
নিয়ে যাত্রা
করা রাজশাহী
কলেজ এখন
পরিণত হয়েছে
উত্তরের সর্বোচ্চ
বিদ্যাপীঠে। বৃহৎ
বঙ্গের ঐতিহ্যবাহী
এ কলেজ
এখন দেশের
একমাত্র মডেল
কলেজ।
বাঙালি ও
বাংলাদেশের ইতিহাসের
অংশ রাজশাহী
কলেজ। বিশেষ
করে ভবনগুলো
এনে দিয়েছে
ঐতিহাসিক গুরুত্ব।
কলেজের ঐতিহাসিক
ভবনের কথা
উঠতেই চলে
আসে প্রশাসনিক
ভবনের নাম।
১৮৮৪ সালে
ব্রিটিশ স্থাপত্য
শৈলীতে নির্মিত
হয় এ
ভবন। এটি
ব্রিটিশ ভারতীয়
ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের
অন্যতম নির্দশন।
কালের সাক্ষী
হয়ে দাঁড়িয়ে
আছে দ্বিতল
এ ভবন।
ঐতিহ্যের এ
ভবনের চূড়ায়
একসময় ছিল
রোমান পুরাণের
জ্ঞান ও
চারুশিল্পের ভাস্কর্য
প্যালাস-অ্যাথিনি।
পরে একই
আদলে আরো
দুটো ভাস্কর্য
হেমন্ত কুমারী
ছাত্রাবাসে স্থাপিত
হয়। এ
চার ভাস্কর্যই
মহান মুক্তিযুদ্ধের
সময় দখলদার
পাকবাহিনীর দোসরদের
চাপে অপসারিত
হয়।
প্রশাসনিক ভবনটি
কলেজের প্রথম
নিজস্ব স্থাপত্যের
নিদর্শন। এর
জন্য ব্যয়
হয় ৬০
হাজার ৭০৩
টাকা। পুঠিয়ার
মহারানী শরত্সুন্দরী
দেবী ১০
হাজার টাকা
অনুদান দিয়েছিলেন
এ সুদৃশ্য
ইমারত নির্মাণে।
মহারানী কলেজের
সীমানাপ্রাচীর ও
রেলিং নির্মাণেও
অর্থ প্রদান
করেছিলেন। তবে
১৯৩৩-৩৪
শিক্ষাবর্ষের প্রসপেকটাসে
ভবন নির্মাণ
ব্যয় মোট
৬১ হাজার
৭০৩ টাকার
কথা উল্লেখ
আছে। নির্মাণ
শেষে বাউলিয়া
হাইস্কুল থেকে
রাজশাহী কলেজের
ক্লাসগুলো এ
নবনির্মিত ভবনে
স্থানান্তরিত হয়।
অনেকে ধারণা
করেন, এ
নতুন ভবনে
ক্লাস শুরু
হলে বিভিন্ন
বিষয়ে উচ্চতর
ক্লাসগুলো চালুর
বিষয় অনুমোদিত
হয়।
১৮৭৪ সালে
রাজশাহী কলেজের
অভ্যন্তরে যাত্রা
শুরু করে
স্বতন্ত্র রাজশাহী
মোহসিনীয়া সিনিয়র
মাদ্রাসা। উপমহাদেশের
অন্যতম প্রাচীন
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত
ছিল। প্রখ্যাত
দানবীর হাজী
মুহম্মদ মুহসীনের
মুহসীন ফান্ডের
অর্থায়নে চলছিল
মাদ্রাসাটি।
১৯৫৯ সালে
মাদ্রাসাটি সরকারীকরণ
হয়। ওই
সময় এটি
মাদ্রাসার বদলে
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে
পরিণত হয়।
তখন প্রতিষ্ঠানটির
নতুন নাম
হয় রাজশাহী
সরকারি মাদ্রাসা।
২০০৯ সালে
মাদ্রাসাটির নাম
পাল্টানোর দাবি
ওঠে। ২০১৯
সালে এটির
নতুন নামকরণ
হয় হাজী
মুহম্মদ মুহসীন
সরকারি উচ্চ
বিদ্যালয়।
রাজশাহীর আরেকটি
প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
সরকারি প্রমথনাথ
বালিকা উচ্চ
বিদ্যালয়। ১৮৬৮
সালে নাটোরের
দিঘাপতিয়ার রাজা
প্রমথনাথ রায়
এ বিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠা করেন।
তার নামানুসারে
এ স্কুলের
নাম করণ
হয়। এটি
বাংলাদেশের সেরা
বিদ্যালয়গুলোর একটি।
রাজশাহী ভোলানাথ
বিশ্বেশ্বর হিন্দু
একাডেমি বিবি
হিন্দু একাডেমির
ইতিহাসও বহু
পুরনো। ১৮৯৮
সালে রাজশাহী
গ্রন্থাগার প্রাঙ্গণের
একটি কক্ষে
বিদ্যালয়টি যাত্রা
করে। ১৯০০
সালে একাডেমিটি
জমিদার রায়
বাহাদুর কুঞ্জ
মোহন মৈত্রের
ঘোড়মারার বাড়ির
একটি অংশে
স্থানান্তর হয়।
ওই বছরই
এটি কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন
পায়।
পাবনা জেলা
স্কুল পাবনা
জেলার সবচেয়ে
পুরনো উচ্চ
বিদ্যালয় এবং
বাংলাদেশের অন্যতম
পুরনো বিদ্যালয়।
পাবনা জিলা
স্কুল অ্যাংলো-ভার্নিকুলার
টাইপের স্কুল
হিসেবে প্রতিষ্ঠিত
হয়েছিল ১৮৩৬-৪০
সালের মধ্যে।
স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা
ছিলেন বাবু
দিগম্বর সাহা
এবং তার
সহায়ক ছিলেন
বাবু রাধাগোবিন্দ
মিত্রা। ১৮৫৩
সালের ১
নভেম্বর এটিকে
সরকারি স্কুল
ঘোষণা করা
হয় এবং
পাবনা জিলা
স্কুল নামকরণ
করা হয়।
নাটোরের প্রাচীনতম
বিদ্যাপীঠ দিঘাপতিয়া
পিএন উচ্চ
বিদ্যালয়। ১৮৫২
সালে বিদ্যোৎসাহী
রাজা প্রসন্ন
নাথ রায়
বাহাদুর প্রথমে
‘প্রসন্ন
নাথ একাডেমি’
নামে একটি
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু
করেন। পরবর্তী
সময়ে ১৮৫২
সালে ১
জানুয়ারি তার
নামের আদ্যাক্ষর
নিয়ে স্কুলের
নামকরণ হয়
‘দিঘাপতিয়া
পিএন হাইস্কুল’।
৫ দশমিক
৭৯ একর
জমির ওপর
নির্মিত একটি
প্রশাসনিক ও
দুটি একাডেমি
ভবন নিয়ে
এ স্কুলের
গোড়াপত্তন হয়।
বিদ্যালয়ের পশ্চিম
পাশেই দাঁড়িয়ে
রয়েছে ২০০
বছরের ঐতিহ্যপূর্ণ
বিশাল বৃক্ষ
মানিক নামে
একটি বটগাছ।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি প্রায়
১৫ যুগ
ধরে মনোরম
পরিবেশে শিক্ষা
বিস্তারে ব্যাপক
ভূমিকা পালন
করে চলেছে।
১৮৫৫ সালে
নাটোরের জনসাধারণের
প্রচেষ্টায় স্থাপিত
হয়েছিল বঙ্গভাষা
বিদ্যালয়। ১৮৬২
সালে নাটোর
চৌধুরী পরিবারের
মোহাম্মদ আলী
খানের বড়
ছেলে খান
বাহাদুর রশিদ
আলী খান
চৌধুরীর প্রচেষ্টায়
স্থাপিত হয়
একটি অ্যাংলো-পারশিয়ান
স্কুল। ১৮৮১
সালে বিভাগীয়
বিদ্যালয়গুলোর পরিদর্শক
বেলেলটের প্রচেষ্টায়
এবং খান
বাহাদুর রশিদ
আলী খানের
আগ্রহে দুটি
বিদ্যালয় একত্র
হয়ে একটি
মাধ্যমিক ইংরেজি
বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত
হয়।
সে সময়
প্রতিষ্ঠান দুটিতে
ইংরেজি পড়ানো
হতো না।
১৮৮৪ সালে
দুটি স্কুলকে
একত্র করে
মিউনিসিপ্যাল হাই
স্কুল প্রতিষ্ঠা
করা হয়।
পরে এটাই
নাটোর মহারাজা
জগদিন্দ্র নাথ
উচ্চ বিদ্যালয়
হিসেবে কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি
লাভ করে।
নওগাঁ কেডি
সরকারি উচ্চ
বিদ্যালয় দেশের
অন্যতম পুরনো
বিদ্যালয়। জনসাধারণের
মাঝে শিক্ষা
বিস্তারে ১৮৮৪
সালে নওগাঁ
মহকুমায় প্রথম
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা
করেন তদানীন্তন
ডেপুটি কালেক্টর
ও গাঁজা
সোসাইটির সুপারভাইজার
বাবু কৃষ্ণধন
বাগচী। বিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠার পর
এর নামকরণ
নিয়ে বিতণ্ডা
দেখা দেয়।
কিন্তু পরবর্তী
সময়ে এর
নামকরণ হয়
বাবু কৃষ্ণধন
বাগচীর নামেই।
১৯৭০ সালে
কেডি স্কুল
সরকারি প্রতিষ্ঠানের
মর্যাদা লাভ
করে।
ফেরদৌস সিদ্দিকী: সাংবাদিক






