সমস্ত জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে একদিন সত্যি সত্যি রাজশাহীর পথে রওনা হলাম। সবাইকে জানিয়ে দিলাম যে ঢাকা থেকে ট্রেনে যাব। কিন্তু নাটোরের এসডিওকে খবর পাঠালাম, আমি ঈশ্বরদী পর্যন্ত প্লেনে গিয়ে তারপর সড়কপথে রাজশাহী যাব। মনে হয়েছিল, যেহেতু আমাকে নিয়ে নানা প্রকার জল্পনাকল্পনা চলছে সেই হেতু আমার আগমন মুহূর্তে আমাকে তুষ্ট করার জন্য বাড়তি কিছু একটা হতে পারে। আমি চাই না, এ রকম একটা কিছু হোক। আমি নীরবে-নিভৃতে আমার কর্মস্থলে হাজির হতে চাই। কিন্তু আমার এ পরিকল্পনাটা নেহাতই মাঠে মারা গেল বলতে হয়। যেটা ভয় করেছিলাম, তাই আংশিক হলেও ঘটে গেল।
সার্কিট হাউজে উঠলাম। ডিসি মুজিবুল হক এবং অনেকেই সৌজন্য সাক্ষাতে এলেন। স্বল্প পরে জানিয়ে দিলাম, কাল সকালে দেখা-সাক্ষাৎ করব, আজ আর নয়।
রাতে কমিশনার সাহেবের বাড়িতে প্রাক্তন ডিসির বিদায় এবং নতুন ডিসির আগমন উপলক্ষে বেশ জমকাল খানার ব্যবস্থা হলো। আমি উপস্থিত হতেই কমিশনার সাহেব আমাকে আন্তরিকভাবে জড়িয়ে ধরে বললেন, তুমি এখনো সেই এসডিওই রয়ে গেছ, একটুও মোটা হওনি!
প্রথম সন্ধ্যাটা বেশ ভালোই কাটল। মুজিবুল হককে বললাম, কবে যাবি? ও বলল, আগামীকাল। আগামীকালই চার্জ দেব এবং ‘কানকথা’ বলব। ‘কানকথা’ অর্থ উত্তরসূরিকে মৌখিক পরামর্শ বা বিশেষ কোনো বিষয় সম্পর্কে অবহিত করা যা নথিভুক্ত করা হয় না।
পরের দিন পূর্বসূরি জানালেন, এখানে তোমার বস হবেন তিনজন। প্রথম বস—কমিশনার, দ্বিতীয় বস—ভাইস চ্যান্সেলর এবং তৃতীয় বস—ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার। পান থেকে চুন খসলেই লঙ্কাকাণ্ড বেঁধে যায়। এটা তোমার জানা জায়গা। আর কিছু বলে তোমার দৃষ্টিকে আড়ষ্ট করতে চাই না। কেবল ভাইস চ্যান্সেলর সাহেবের কাছে তোমাকে নিজে নিয়ে গিয়ে পরিচয় করিয়ে দেব।—আরে তিনি তো তোমার খালুশ্বশুর—তবু মনে হয় সম্পর্ক খুব একটা উষ্ণ হতে পারেনি। আসলে ঢাকায় মাহবুবুজ্জামান আমাকে জানিয়ে দিয়েছিল যে রাজশাহীতে ডিসি আর ভিসির মধ্যে একটা টানাপড়েন চলছে। আগামী সমাবর্তন উৎসবে ডিসি-এসপি মঞ্চে বসবেন কি বসবেন না সেই নিয়ে।
মুজিবুল হক তার কথা মোতাবেক সন্ধ্যার গাড়িতে রাজশাহী ত্যাগ করল। আমি আমার নির্ধারিত বাসায় গিয়ে উঠলাম। বিভাগীয় সদর। সুতরাং জেলা এবং বিভাগীয় পদের অনেক অফিসার। সকলেই একে একে নতুন ডিসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যাচ্ছেন। ভাবলাম, ভিসির সঙ্গে তো পূর্বসূরির সাথে গিয়ে দেখা করে এলাম, কমিশনার সাহেবের বাসায় প্রথম সন্ধ্যায় খানা খেয়েছি। বাকি থাকে মুজিবুল হক বর্ণিত তৃতীয় বস, ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার। কমিশনার সাহেব জিজ্ঞেস করলেন তাঁর সাথে দেখা করেছি কি না। বললাম না, করিনি এবং সে রকম ইচ্ছেও আমার নেই। ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার প্রথমে আমার সঙ্গে দেখা করবেন আর তারপর আমি তাঁর সঙ্গে পাল্টা সাক্ষাৎ করব—এটা ঠিক করেছি। শুরুতেই প্রোটোকল ঠিক করে নেওয়া ভালো। আমি এই জেলার প্রধান কর্মকর্তা। সুতরাং দেশী-বিদেশী যেই হোক, প্রথমে তাঁকেই আসতে হবে পরিচিত হতে—এটাই আমার হিসাব।
তিনদিন অপেক্ষার পর ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার আমাকে ফোন করলেন সাক্ষাতের সময় চেয়ে। সমস্যা মিটে গেল। এই ভেবে স্বস্তি পেলাম যে এ নিয়ে ভবিষ্যতে আমাকে আর কোনো ঝামেলা পোহাতে হবে না।
পুরান হলেও রাজশাহীকে অনুন্নত শহর বলা চলে। অবশ্য টমটমের সংখ্যা ধীর গতিতে হলেও কমে যাচ্ছিল। এ শূন্যস্থান পূরণ করছিল রিকশা। রাজশাহীতে সমস্যা হলো খাবার পানির। পানিতে এত চুন থাকে যে পনের দিনের মধ্যে কাচের জগ আর গ্লাসে সাদা একটা আস্তরণ পড়ে যায়।
ডাক্তার আজিজ প্রায়ই কোনো না কোনো বাহানায় আমার সাথে দেখা করতে আসতেন। আর এক ভদ্রলোক, ধরনী মৈত্রী, নিয়মিতভাবে প্রতিদিন আমার অফিসে আসতেন সাক্ষাৎ করতে। তাঁর নাকি দৈনন্দিন কাজের মধ্যে এটাও একটা যে প্রতিদিন ডিসির সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে। জেলার বিভিন্ন কমিটিতেও ডিসিরা তাঁকে সদস্য বানিয়ে থাকেন। ওদিকে জেলা কাউন্সিলের সহসভাপতি জনাব সামাদও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অফিসে প্রায়ই যাতায়াত করতেন। একদিন একজন বিচিত্র ধরনের লোক আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেন মি. পিএন বিশি। সাহিত্যিক প্রমথ নাথ বিশির ছোট ভাই। তিনি রাজশাহী ইউনিভার্সিটির এস্টেট অফিসার হিসেবে কাজ করতেন এবং জেলার একজন প্রথম শ্রেণীর অনারারি ম্যাজিস্ট্রেটও ছিলেন। তাঁর শরীরে চামড়া এবং হাড় অবশ্যই ছিল, কিন্তু গোশতের ভাগ ছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়। খুব হাসাতে পারতেন তিনি।
একদিন ভাইস চ্যান্সেলর সাহেব সাক্ষাৎ করতে এলেন এবং তাঁদের একটি অনুষ্ঠানে যাবার জন্য দাওয়াত করলেন। বললেন, ছেলেদের ফাংশান। আপনি গেলে ওরা খুশি হবে এবং আমাদেরও ভালো লাগবে। দাওয়াত কবুল করলাম। ভাবলাম, আমার পূর্বসূরির সঙ্গে সম্পর্কের যে টানাপড়েন ছিল সেটা মিটিয়ে ফেলবার একটু সুযোগ হয়তো পেতে পারি।
দুদিন পরের কথা। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান। ভিসি কয়েকবার ফোন করেছেন রওয়ানা দিয়েছি কি না জানতে। আমি একটা জিপ নিয়ে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে ড্রাইভারকে বললাম জিপটাকে একটু দূরে কোনো অন্ধকার স্থানে রাখতে। পেছন দরজা দিয়ে আমি হলে প্রবেশ করলাম এবং শেষ সারির আমারই মতো এক হালকা-পাতলা ছেলের চেয়ারে ভাগাভাগি করে বসে পড়লাম। ছেলেটি কিছুই টের পেল না। সে বিনা দ্বিধায় তারই এক সহপাঠী মনে করে আমাকে বসতে দিল।
মঞ্চের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম নতুন ডিসির আগমন অপেক্ষায় সবাই ব্যস্ত। মিনিট পনের পর আমি কিছু বুঝবার আগেই হঠাৎ দুজন অধ্যাপক ও দুজন ছাত্র এসে আমাকে প্রায় শূন্যে তুলে ডায়াসে নিয়ে বসিয়ে দিল।
তাঁদের মুখেই শুনলাম, প্রায় আধা ঘণ্টা যাবৎ তাঁরা সারা এলাকায় ডিসিকে খুঁজছেন। কারণ তাঁরা বাসায় ফোন করে জেনেছেন ডিসি সাহেব ইউনিভার্সিটির উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে গেছেন এবং মাঝপথের পুলিশ আউটপোস্টও একই বক্তব্য দিয়েছে। অবশেষে তারা অন্ধকারে আত্মগোপনকারী ডিসির জিপটি আবিষ্কার করতে সক্ষম হন এবং সেই সূত্র ধরেই তাঁরা ডিসির সন্ধান পান।
মঞ্চের মাঝখানে বসিয়ে ভিসি সাহেব আমার ওপর বহু বিশেষণ প্রয়োগ করলেন। ছাত্ররা দাঁড়িয়ে হাততালি দিল। আমি মনে মনে খুশি হলাম এই ভেবে যে আমাদের ভেতরকার শীতল সম্পর্কটার অবসান হলো। এরপর আর কখনো সম্পর্ক খারাপ হয়নি। আমার ঘটনাবহুল দু বছরের বেশি রাজশাহীর জীবনে সর্বদাই ইউনিভার্সিটির সঙ্গে একটা উষ্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। অথচ মঞ্চে বসার মতো একটা মামুলি ব্যাপার নিয়ে আমার পূর্বসূরির সঙ্গে ইউনিভার্সিটির সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
পরে সমাবর্তনের ব্যবস্থাদি আলোচনা প্রসঙ্গে আমি ভিসিকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছি যে প্রেসিডেন্ট এবং গভর্নর-এর নিরাপত্তার জন্য জিম্মাদার হচ্ছেন ডিসি ও এসপি। তার অর্থ তাঁদেরকে মঞ্চেই বসতে হবে—এ রকম আবদার আমি সমর্থন করি না। সমাবর্তন উৎসবে জ্ঞানী-গুণী-বিদগ্ধজনের সমাবেশ ঘটে সেখানে ডিসি- এসপির কোনো কিছু করার আছে বলে আমি মনে করি না। বরং মঞ্চে তাঁদের সদম্ভ অবস্থান দৃষ্টিকটু ঠেকবে বলেই আমার বিশ্বাস। তাঁদের মঞ্চের নিচে যথাযোগ্য স্থানে বসতে দিলেই চলবে।
ঢাকা থেকে খবর পেলাম প্রেসিডেন্ট আইয়ুব ইউনিভার্সিটির সমাবর্তন উৎসবে যোগদানের জন্য রাজশাহী সফরে আসবেন। প্রেসিডেন্ট ঢাকা থেকে রাজশাহী এবং রাজশাহী থেকে সিলেট যাবেন। খোঁজখবর নিয়ে এবং পুলিশ সুপারের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করে বুঝলাম প্রেসিডেন্টের সফরের সময় ঝামেলা হতে পারে। কমিশনার সাহেবের সাথেও কথা বললাম। তিনি ঝামেলার আশঙ্কার কথা স্বীকার করেও প্রেসিডেন্টের সফর বাতিলের প্রস্তাবে রাজি হলেন না। মনে হলো তিনি ভাবছেন এ সফর বাতিল হলে স্থানীয় প্রশাসনের অক্ষমতা প্রকাশ পাবে। সুতরাং যেভাবেই হোক সফল সফরের ব্যবস্থা করতেই হবে।
আমি ঢাকায় লিখিতভাবে জানালাম যে আমি এখানে সামান্য কয়েক সপ্তাহ মাত্র এসেছি, এরই মধ্যে এত বড় ঝুঁকি নিতে পারব না। তবে কমিশনার সাহেব এবং পুলিশ সুপার যদি দায়িত্ব নেন, আমার কোনো আপত্তি নেই। মজা হলো এদের কেউই চিফ সেক্রেটারির সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলতে রাজি নন। অথচ সফরের আর মাত্র চারদিন বাকি। এদিকে ভিসি সাহেব তাঁর সমাবর্তন অনুষ্ঠানের সব ব্যবস্থা চূড়ান্ত করে ফেলেছেন প্রায়।
এর মধ্যে একদিন পুলিশ সুপারকে পাশে বসিয়ে নিজে চিফ সেক্রেটারির সঙ্গে আলাপ করলাম ফোনে। কাজী আনওয়ারুল হক সাহেব বুঝলেন বিষয়টা। শেষবারের মতো জানতে চাইলেন এটাই আমার চূড়ান্ত মতামত কিনা। বললাম, হ্যাঁ স্যার, এর মধ্যে কোনো ‘যদি’ বা ‘কিন্তু’ নেই।
এরপর তিনি এসপির সাথে কথা বললেন। প্রেসিডেন্টের রাজশাহী সফর আপাতত স্থগিত হলো। হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।






