পুঠিয়া রাজদরবারে চলছে পূজার আয়োজন। পুষ্প সংগ্রহের ভার পড়েছে রঘুনন্দনের ওপর। একদিন ক্লান্ত হয়ে তিনি বাগানে শুয়ে আছেন। প্রখর রোদ। সে সময় একটি সাপ ফণা বিস্তার করে তাকে সূর্যের আলো থেকে ছায়া দিচ্ছিল।

বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে এমন একটি গল্প প্রচলিত আছে রঘুনন্দনের নামে। এ ধরনের ঘটনা সাধারণত রাজচিহ্ন বলে বিবেচিত হয়। ঘটনাটি প্রকৃতপক্ষে রঘুনন্দনের জীবনে ঘটেছিল, নাকি তা স্রেফ গল্প, এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে। তবে পুঠিয়া রাজবংশের অধীন লস্করপুর পরগনার অন্তর্গত বারইহাটী গ্রামের তহশিলদার কামদেব মৈত্রর মেজো পুত্র রঘুনন্দন মৈত্র যে রাজা হয়েছিলেন, এতে কোনো ফাঁক নেই।

উত্তর ভারতের কনৌজ থেকে পঞ্চ গোত্রীয় পাঁচজন ব্রাহ্মণ বাংলায় এসেছিলেন। কাশ্যপ গোত্রীয় সুষেণমণি তাদের অন্যতম। সুষেণমণির উত্তর প্রজন্ম বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে ১০০টি গ্রামে বাস করত। এ বংশের মতু নামক এক ব্যক্তি মৈত্র উপাধি লাভ করেন। কামদেব মৈত্র এ বংশেরই উত্তরাধিকারী। কামদেবের তিন পুত্র—রামজীবন, রঘুনন্দন ও বিষ্ণুরাম। তিন ভাই পুঠিয়া রাজদরবারে থেকে অধ্যয়নে নিয়োজিত ছিলেন। তিনজনের মধ্যে রঘুনন্দন অধিকতর বুদ্ধিমান ও মেধাবী ছিলেন। সে সময় দিল্লির মসনদে ছিলেন পরাক্রমশালী মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব। আর বাংলা, বিহার ও ওড়িশার নবাব ছিলেন মুর্শিদকুলী খাঁ।

রাজা দর্পনারায়ণ রায়। পুঠিয়ার রাজা। রঘুনন্দনের বুদ্ধি ও কার্যদক্ষতা তার নজরে আসতে সময় লাগেনি। তিনি রঘুনন্দনকে ঢাকার নবাব দরবারে নিজের মোক্তার বা উকিল নিযুক্ত করেন। তৎকালে একটি প্রথা ছিল—নবাবের দরবারে কোনো রাজা বা জমিদারের পক্ষে মোক্তার বা উকিল না থাকলে তার রাজ্য রক্ষা হতো না। পুঠিয়া রাজার পক্ষে উকিল মনোনীত হওয়াই ছিল রঘুনন্দনের উন্নতির প্রথম ধাপ।

পুঠিয়া রাজার উকিল হয়ে রঘুনন্দন মৈত্র নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর তৎকালীন রাজধানী জাহাঙ্গীরনগরে আগমন করেন। মুসলমান রাজ্যের আইনকানুনে তিনি অতি দ্রুত ব্যুত্পত্তি অর্জন করেন। নবাবের কর্মচারীদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে তাদের বিশেষ অনুগ্রহ লাভে ধন্য হন। সে সময় প্রধান কানুনগো ছিলেন দর্পনারায়ণ।  রঘুনন্দনের জ্ঞান ও প্রত্যুত্পন্নমতিত্বে দর্পনারায়ণ অতিশয় প্রীত হন। তিনি তাকে ‘নায়েব কানুনগো’ পদে নিযুক্ত করেন। কানুনগো সমগ্র সুবার ভূসম্পত্তির রেজিস্ট্রার। বছরের শেষে যাবতীয় রাজস্বের হিসাব প্রস্তুত করে প্রথমে নবাব, অতঃপর দিল্লির সম্রাট সমীপে প্রেরণ করা ছিল কানুনগোদের দায়িত্ব। এ সময় এমন একটি ঘটনা ঘটে, যা রঘুনন্দনকে নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর সুনজরে নিয়ে আসে। সুবা বাংলায় সম্রাট আওরঙ্গজেবের প্রতিনিধি ছিলেন তদীয় পুত্র কুতুবউদ্দিন মুহাম্মদ আজম শাহ। রাজস্ব বিষয়ে নবাবের সঙ্গে তার মনোমালিন্য দেখা দেয়। নবাব তখন কানুনগোদের দস্তখত সমেত হিসাবপত্র নিয়ে সরাসরি সম্রাটের দরবারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আজম শাহ প্রমাদ গুনলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, নবাব এ কাজে সফল হলে তার গোমর ফাঁস হয়ে যাবে। তিনি কানুনগোদের শাসালেন, তারা যেন নবাবকে সহায়তা না করেন। কানুনগোদের স্বাক্ষর না পেয়ে নিরুপায় নবাব রঘুনন্দনের শরণাপন্ন হন। রঘুনন্দন একজন কানুনগোকে বুঝিয়ে স্বাক্ষর করাতে সক্ষম হন। একজন কানুনগোর দস্তখতযুক্ত হিসাব ও উপঢৌকন নিয়ে নবাব সম্রাটের দরবারে গমন করেন। দাক্ষিণাত্যে তখন যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহে হিমশিম খাচ্ছেন সম্রাট আওরঙ্গজেব। এমন সময়ে প্রচুর অর্থ নিয়ে হাজির মুর্শিদকুলী খাঁ। মাত্র একজন কানুনগোর স্বাক্ষরের ব্যাপারটি চাপা পড়ে যায়। নবাবের প্রীতিভাজন হন রঘুনন্দন। তিনি তাকে নিজের দেওয়ান বানিয়ে নেন। রঘুনন্দন ‘রায় রায়ান’ (রাজাধিরাজ) উপাধিতে ভূষিত হন। কালক্রমে হয়ে ওঠেন নবাবের উপযুক্ত সহযোগী। তার পরামর্শে নবাব জাহাঙ্গীরনগর থেকে মুর্শিদাবাদে রাজধানী স্থানান্তর করেন।

সৈয়দ রেজা খাঁ। তিনি নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর দৌহিত্রীপতি। বাংলা মুলুকের রাজস্ব আদায়ের ভার তার ওপর অর্পিত হয়। এ কার্য সম্পাদনে তিনি জমিদারদের প্রতি একপ্রকার খড়্গহস্ত হয়ে ওঠেন। রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থতার কারণে বহু জমিদারের জমিদারি চলে গেল। পরিবর্তে তৈরি হতে লাগল নতুন জমিদার। জমিদারি আমলের এ ক্রান্তিকালে দেওয়ান রঘুনন্দন নির্ধারিত রাজস্ব যথাসময়ে আদায়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রামজীবনের নামে কয়েকটি জমিদারি আদায় করে নিলেন। এর মধ্যে বাণগাছী, ভাতুড়িয়া, নালদহ, ভূষণা, ইব্রাহিমপুর, মাহমুদপুর, জালালপুর প্রভৃতি পরগনার নাম উল্লেখযোগ্য। রামজীবনও বাহুবলে প্রবল প্রতাপে রাজস্ব সংগ্রহ করতে লাগলেন। এ কারণে নবাব ও সম্রাট তার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন। এভাবে প্রতিষ্ঠা পায় নাটোর রাজবংশ। ঐতিহাসিকদের মতে, বর্তমান সমগ্র রাজশাহী, পাবনা ও বগুড়া অঞ্চলজুড়ে ছিল এর বিস্তার। তাছাড়া ফরিদপুর, ঢাকা, যশোর, সাঁওতাল পরগনা, ভাগলপুর, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, দিনাজপুর, মালদহ এবং রংপুরের কিছু অঞ্চল নাটোর রাজবংশের অধিকারে ছিল। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র মতে, এতে মোট ১৩৯টি পরগনা ছিল। তৎকালে এর রাজস্বের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮ লাখ টাকা।  

‘রঘুনন্দনী বাড়’ বলে বাংলায় একটি প্রবাদ আছে। সাধারণ এক তহশিলদার পুত্র থেকে ক্রমাগত উন্নতির মাধ্যমে রঘুনন্দন মৈত্র নাটোর রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তা থেকে প্রবাদটির উত্পত্তি। অদ্যাবধি কোনো ব্যক্তি অত্যধিক সমৃদ্ধি অর্জন করলে তার ক্ষেত্রে প্রবাদটি ব্যবহূত হয়।

নাটোর রাজবংশের পত্তনের নেপথ্যে মূল কারিগর রঘুনন্দন হলেও প্রথম রাজা হিসেবে খ্যাতি পান তার বড় ভাই রামজীবন। রামজীবনের দেওয়ান ছিলেন দয়ারাম রায়। পরবর্তী সময়ে তিনি দিঘাপতিয়া রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। কথিত আছে, একদা রাজা রামজীবন জলবিহার উপলক্ষে চলনবিলে যান। কলম নামক স্থানে তিনি যাত্রাবিরতি করেন। তখন দুই বালক নৌকার কাছে আসে। তন্মধ্যে একজন দয়ারাম। বাল্যকালেই দয়ারামের মধ্যে বুদ্ধি ও প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে। রামজীবন তাকে সঙ্গে করে নাটোরে নিয়ে আসেন। বিষয়বুদ্ধিতে দয়ারাম ছিলেন তুখোড়। নাটোর রাজের সামান্য একজন কর্মচারী থেকে কালক্রমে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদে উন্নীত হন। এ সময় যশোরের অধীন মাহমুদপুরের জমিদার সীতারাম মজুমদার নবাবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। নবাবের অনুমতি অনুসারে রাজা রামজীবন দয়ারামকে সেনাপতি করে বিদ্রোহ দমনে প্রেরণ করেন। যুদ্ধে পরাজিত সীতারামকে বন্দি করে নাটোরে নিয়ে আসেন দয়ারাম। তার এ বীরত্বে সন্তুষ্ট হয়ে নবাব তাকে ‘রায় রায়ান’ উপাধিতে ভূষিত করেন। নবাবের পক্ষ থেকে প্রীতি নিদর্শনস্বরূপ কয়েকটি জমিদারি লাভ করেন দয়ারাম। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিঘাপতিয়া রাজবংশের যাত্রা। রাজশাহী, যশোর, পাবনা, বগুড়া ও ময়মনসিংহের কিয়দংশজুড়ে বিস্তৃত ছিল এ রাজ্য। নাটোর শহর থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে ‘দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি’ অবস্থিত। বর্তমানে তা ‘উত্তরা গণভবন’ নামে সুপরিচিত।

দুবলহাটী রাজবংশ। বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলের প্রাচীনতম রাজবংশ। পাল শাসনামলে কিংবা তারও আগে এ বংশের গোড়াপত্তন হয় বলে ঐতিহাসিকদের অনুমান। এর উত্পত্তি সম্পর্কে একটি জনশ্রুতি আছে। পদ্মা নদীর পূর্ব তীরে বর্তমান মুর্শিদাবাদ জেলার অন্তর্গত যজ্ঞেশ্বরপুর গ্রামে এক ধনী বণিক বাস করতেন। তার নাম জগত্রাম রায়। একদা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে পণ্য বোঝাই নৌকা নিয়ে তিনি উত্তর দিকে রওয়ানা হন। এক রাতে তিনি দুবলহাটীর দুই মাইল উত্তরে কসবা নামক গ্রামে যাত্রাবিরতি করেন। সে রাতে স্বপ্নে দেবী ‘রাজরাজেশ্বরী’ তাকে দেখা দেন। দেবী সে স্থানে তাকে একটি মন্দির নির্মাণ করে সেখানে তার বিগ্রহ স্থাপনের আদেশ দেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে জগত্রাম দেখলেন, যে স্থানে তার বাণিজ্যতরী বাঁধা আছে, তার চারদিকের গ্রামগুলো জঙ্গলময়। স্থানে স্থানে কয়েক ঘর ইতর লোকের বাস। জগত্রাম জানতে পারেন, এ গ্রামবাসীরা স্বাধীন। তারা কাউকে কোনো কর দেয় না। জগত্রামের যথেষ্ট অর্থ সম্পদ ছিল। দেবীর আজ্ঞা অনুসারে তিনি গ্রামগুলো দখল করে নিলেন। জঙ্গল পরিষ্কার করলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, বাণিজ্য অপেক্ষা নতুন রাজ্য স্থাপনই অধিকতর লাভজনক হবে। সুতরাং, তিনি বাণিজ্য পরিত্যাগ করে রাজ্য বিস্তারে পূর্ণ মনোনিবেশ করলেন। কালক্রমে তিনি ১২ ক্রোশ সীমার মধ্যে অবস্থিত গ্রামগুলোতে তার অধিকার স্থাপন করে গ্রামবাসীর কাছ থেকে কর আদায় করতে লাগলেন। নিরঙ্কুশ আধিপত্য অর্জিত হলে জগত্রাম কসবা গ্রামে নিজের বাসভবন প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর গৃহমন্দিরে দেবী ‘রাজরাজেশ্বরী’র বিগ্রহ স্থাপন করেন। জগত্রাম থেকে রাজা হরনাথ রায় বাহাদুর পর্যন্ত মোট ৫৩ জন দুবলহাটী রাজ্য শাসন করেন। ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে রাজা হরনাথের মৃত্যু হয়। বর্তমান নওগাঁ শহর থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে এ রাজবংশের নিদর্শন দুবলহাটী রাজবাড়ি অদ্যাবধি বিদ্যমান।

রাজশাহী অঞ্চলের আরেকটি প্রাচীন রাজবংশ হলো পুঠিয়া রাজবংশ। পদ্মার উভয় তীরে মুর্শিদাবাদ ও রাজশাহী জেলায় এ জমিদারি বিস্তৃত ছিল। এর রাজধানী ছিল পুঠিয়ায়। এ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা হলেন বৎসরাচার্য। মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে এ রাজ্যের গোড়াপত্তন হয়।

বাংলায় নবাবি আমলের শেষের দিকে এবং ইংরেজ আমলজুড়ে কয়েকজন নারী জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে নাটোরের রানী ভবানী অন্যতম। নাটোর রাজবংশের প্রথম রাজা রামজীবনের পুত্রবধূ ছিলেন তিনি। রামজীবনের দত্তক পুত্র ছিলেন রামকান্ত মৈত্র। তিনি এ বংশের দ্বিতীয় রাজা। বগুড়া জেলার ছাতিমগ্রামে আত্মারাম চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি বাস করতেন। রানী ভবানী ছিলেন তার কন্যা। রাজা রামজীবন নিজ পুত্রের সাথে ভবানীর বিয়ে দেন। ১৭৮৪ সালে রাজা রামকান্ত স্ত্রী ভবানী ও একমাত্র কন্যা তারাকে রেখে পরলোকগমন করেন। তখন বিশাল নাটোর রাজ্য পরিচালনার ভার রানী ভবানী স্বহস্তে তুলে নেন। জমিদারি পরিচালনায় তিনি অসামান্য প্রতিভা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন। ইংরেজ ঐতিহাসিক হলওয়েলের মতে, রানী ভবানীর শাসনামলে সমগ্র নাটোর রাজ্য প্রদক্ষিণ করতে ৩৫ দিন লাগত। বার্ষিক রাজস্ব নির্ধারিত ছিল ৭০ লাখ টাকা। তবে প্রকৃত আদায় ছিল দেড় কোটি টাকা। তিনি ছিলেন প্রজাদরদি। তার সময়ে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়। ইতিহাসে তা ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে খ্যাত। এ সময় তিনি প্রজাদের জন্য তার রাজকোষ উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। নবাব আলিবর্দি খানের সময়ে বাংলায় বর্গিদের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এ বর্গিদের আক্রমণ থেকে রানী ভবানী তার প্রজাদের সযত্নে আগলে রেখেছিলেন। নিজের জমিদারি অঞ্চলের বাইরেও বিস্তৃত ছিল তার কর্মসীমা। সনাতন ধর্মের অন্যতম তীর্থস্থান কাশীতে তিনি অসংখ্য ধর্মশালা, অতিথিশালা এবং ঠাকুরবাড়ি স্থাপন করেন। বিশ্বেশ্বরের মন্দির থেকে সুরনাথের মন্দির পর্যন্ত তিনি এক সুবিস্তৃত রাজপথ নির্মাণ করেছিলেন। প্রজাদের প্রতি তার অপরিসীম দরদের কারণে ফকির আন্দোলনের বিখ্যাত নেতা মজনু শাহ তাকে অপরিসীম শ্রদ্ধা করতেন। প্রজাহিতৈষী নানা কর্মকাণ্ড তাকে সমগ্র বাংলা অঞ্চলে কিংবদন্তিতে পরিণত করে। তিনি ‘অর্ধবঙ্গেশ্বরী’, ‘নাটোরের রানী’ প্রভৃতি বিশেষণে বিশেষিত হয়ে অদ্যাবধি স্বমহিমায় বিরাজমান আপামর জনমানসে।

পুঠিয়া রাজবংশের ইতিহাসে বেশ কয়েকজন নারী জমিদারের উল্লেখ পাওয়া যায়। লর্ড কর্নওয়ালিসের শাসনামলে এ বংশের জমিদার ছিলেন ‘রাজা বাহাদুর’ রাজেন্দ্র নারায়ণ। তার স্ত্রীর নাম ছিল সূর্য্যমণি। বিয়ের অল্পকাল পরেই রাজা মৃত্যুবরণ করেন। বিধবা সূর্য্যমণি তখন জমিদারির ভার গ্রহণ করেন। জমিদারি পরিচালনায় তিনি বিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছিলেন। ইতিহাস সাক্ষী, তিনি নারী হয়ে যেরূপ সুচারুরূপে রাজকার্য নির্বাহ করেছেন, তা পুঠিয়া রাজবংশের অনেক রাজার চেয়ে উত্তম ছিল। আরেকজন ছিলেন রানী ভুবনময়ী দেবী। তিনি ‘রাজা বাহাদুর’ জগন্নারায়ণের স্ত্রী ছিলেন। জগন্নারায়ণ ১৮১৬ সালে পরলোকগমন করেন। তখন ভুবনময়ী দেবী রাজ্য পরিচালনা করেন। দান-ধ্যান এবং উদারতায় ইতিহাসে তিনি একটি প্রশংসনীয় স্থান অধিকার করে আছেন। তবে এ রাজপরিবারের সবচেয়ে বিখ্যাত নারীর নাম হলো শরত্সুন্দরী দেবী। ১৮৫৫ সালে রাজা যোগেন্দ্রনারায়ণের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের অল্পকাল পরেই বৈধব্য বরণ করতে হয় তাকে। তবে যোগেন্দ্রনারায়ণ মৃত্যুর আগে তার হাতে যাবতীয় সম্পত্তির ভার অর্পণ করেন। রাজশাহীর তৎকালীন কালেক্টর রয়েলস সাহেবের রিপোর্ট অনুসারে, বাংলা ১২৭২ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে শরত্সুন্দরী কোর্ট অব ওয়ার্ডস থেকে যাবতীয় সম্পত্তির ভার গ্রহণ করেন। দানশীলতা ও পরোপকারিতায় তিনি অতুলনীয় খ্যাতি অর্জন করেন। দরিদ্র প্রজাদের চিকিৎসার জন্য তিনি অসংখ্য দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন। নিয়মিত দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলায় প্রজাদের অন্নকষ্ট নিবারণে তিনি সতত যত্নবান ছিলেন। বিধবাদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করেন। ১৮৭৭ সালে দিল্লির দরবার থেকে তিনি ‘মহারানী’ খেতাবে ভূষিত হন।

বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে মুসলমান জমিদারের সংখ্যা ছিল খুবই কম। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বাঘার জমিদার মাওলানা শেখ আবদুল ওয়াহেব। তিনি মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে ৪২টি গ্রাম ‘জায়গির’ বা ‘মদদ-এ-মাআশ’ হিসেবে লাভ করেন। বর্তমান রাজশাহী জেলার অন্তর্গত শাহাগোলা গ্রামে গোল মুহাম্মদ নামে এক মুসলমান বাস করতেন। তার এক পুত্রের নাম শেখ মকবুল। তিনি চিশতিয়া তরিকার সাধক ছিলেন। তিনি সম্রাট শাহজাহানের সমসাময়িক ছিলেন। সাধক শেখ মকবুল চিশতি তারাটিয়ার জমিদার হিসেবে পরিচিতি পান।

রাজশাহীতে এখন আর রাজা-রানী নেই। নেই কোনো জমিদার। তবে তাদের স্থাপত্যকীর্তি আছে। যা বয়ে চলেছে তাদের স্মৃতি। হয়েছে পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।

 

নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক