প্রকাশনা শিল্পের সংকটের ফলে রাজশাহীতে মুদ্রণ ব্যবস্থা পশ্চাত্পদ। ফলে এখান থেকে নিয়মিত পত্রপত্রিকা প্রকাশ করা কঠিন ব্যাপার। নানা সমস্যায় জর্জরিত এখানকার মুদ্রণ শিল্পগুলো। তাই অনেক আশা-ভরসা নিয়ে শুরু হয়েও আশানুরূপ শেষ হয় না। এ প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই অনেক দিন থেকে এখানকার পত্রপত্রিকাগুলো বেরিয়েছে। আবার বন্ধ হয়েছে, আবার বেরিয়েছে। সমাচার দর্পণ (১৮১৮) প্রকাশের ৪৮ বছর পর রাজশাহী থেকে ‘হিন্দু রঞ্জিকা’ প্রথম প্রকাশ হয়ে অনেক দিন চলেছিল। আর এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে দেশে অনেক পরিবর্তন এসেছে, চেতনার উন্মেষ ঘটেছে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার জন্ম হয়েছে। এসব পত্রিকা নিয়ে এখানে সংক্ষেপে আলোচনা করা হচ্ছে:
হিন্দু রঞ্জিকা: প্রথম প্রকাশ ফাল্গুন, ১২৭২ বঙ্গাব্দে। ইংরেজি ১৯৩৬, ১ মার্চ। সম্পাদনায় শ্রীনাথ সিংহ রায়। পত্রিকাটি ১৯৫২ সাল পর্যন্ত চলেছিল। দীর্ঘকালের সাক্ষী হিসেবে অনেক স্মৃতিই পত্রিকার পাতায় বিধৃত হয়ে আছে। পত্রিকাটি যাদের সম্পাদনায় পরপর প্রকাশ হয়েছিল তারা হলেন চন্দ্র মিত্র, শ্রীপ্রমদা সান্যাল, শ্রীদ্বিজেশ গোবিন্দ সেন এবং সবশেষে শ্রীশক্তি ভূতি চৌধুরী। এটি প্রথম মাসিক পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও পরে ১২৭৫-এর বৈশাখ থেকে সাপ্তাহিক হিসেবে প্রকাশিত হতে থাকে।
হিন্দু জাতির জাগরণের উদ্দেশ্যে ‘বোয়ালিয়া ধর্মসভা’ (১২৬৭ বঙ্গাব্দ) প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই সভার মুখপত্র সাপ্তাহিক হিন্দু রঞ্জিকা। প্রথমত, ঢাকার সুলভ প্রেস থেকে মুদ্রিত হতো। পরবর্তী সময়ে দুবলহাটির জমিদারের অর্থানুকূল্যে প্রেস কিনে পত্রিকা ছাপা হতে থাকে। এটিই রাজশাহীর প্রথম মুদ্রণযন্ত্র—তমোঘ্ন যন্ত্রালয়। ওই প্রেস এখনো রাজশাহী ধর্মসভার মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে।
পত্রিকায় সাম্প্রদায়িক মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়।
রাজশাহী সংবাদ: সাপ্তাহিক রাজশাহী সংবাদ প্রথম প্রকাশ ১২৭৭ বঙ্গাব্দে। ব্রাহ্ম সমাজের খেদমত করে ১২৮২ বঙ্গাব্দে বন্ধ হয়ে যায়। সম্পাদক শ্রীযুক্ত জগদ্বন্ধু সরকার।
জ্ঞানাঙ্কুর: মাসিক জ্ঞানাঙ্কুর ১২৮২ বঙ্গাব্দে প্রকাশ হয়। পাঁচ বছর চলার পর পত্রিকাটি সাপ্তাহিক হয়ে বের হয়। জ্ঞানাঙ্কুরের সম্পাদক শ্রীকৃষ্ণ দাস। এ সময়ের প্রকাশিত শ্রীরাম সর্বস্ব বিদ্যাভূষণ সম্পাদিত প্রতিবিম্ব পত্রিকাটি জ্ঞানাঙ্কুরের সঙ্গে একত্র হয়ে জ্ঞানাঙ্কুর ও প্রতিবিম্ব নামে প্রকাশ হতে থাকে। এটি ১৫-১৬ বছর পর্যন্ত চলেছে। এ পত্রিকায় তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ও রঙ্গলালের মতো শক্তিমান লেখকরা লিখেছিলেন।
নূর-অল-ইমান: ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে নূর-অল-ইমান সমাজ গঠিত হয়। ওই সমাজের মুখপত্র নূর-অল-ইমান পত্রিকা। যদিও এ পত্রিকা মাত্র তিন মাস চালু ছিল, তবু এ পত্রিকার প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। বৈশাখ ১৩২৬ বঙ্গাব্দে আবার নূর-অল-ইমান সমাজের অন্যতম সদস্য মির্জা মোহাম্মদ ইউসফ আলীর সহযোগিতায় ‘মুসলমান শিক্ষা সমবায়’ নামে পত্রিকা প্রকাশিত হয়। বছরে তিনবার করে পত্রিকা প্রকাশের ওয়াদা করলেও তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
প্রথম সংখ্যা আষাঢ় ১৩০৭ বঙ্গাব্দ। নূর-অল-ইমান সমিতি কর্তৃক সম্পাদিত কতিপয় মৌলভি সাহেবের লিখিত ও অনুমোদিত বিষয় মির্জা মোহাম্মদ ইউসফ আলী কর্তৃক শৃঙ্খলাবদ্ধ ও মঞ্জুরীকৃত। নূর-অল-ইমান সমাজের অন্যতম সভ্য মোহাম্মদ রেয়াজউদ্দীন আহমদ কর্তৃক প্রকাশিত। কলিকাতা ৪ নম্বর কড়েয়া গোরস্থান রোড, রেয়াজ উল ইসলাম প্রেসে মোহাম্মদ রেয়াজউদ্দীন আহম্মদ দ্বারা মুদ্রিত।
মনোগ্রাফ: বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত ইতিহাস, শিল্প, সংস্কৃতি ও প্রত্নতত্ত্বমূলক গবেষণা পত্রিকা। প্রথম সংখ্যা এপ্রিল ১৯২৬ সালে এনজি মজুমদার এমএ কিউরেটার বরেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটি কর্তৃক সম্পাদিত।
মার্কাবুল এসলাম: বাগমারা থানার অন্তর্গত তাহেরপুর থেকে প্রকাশিত মারকাবুল এসলাম বা মোসলেম তরণী মাসিক পত্রিকা। ১৩৩০ পৌষ থেকে ১৩৪৩ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত চলেছিল। সম্পাদক এম মোবারক হোসেন। প্রথমত, আরএল প্রেস নাটোর থেকে মুদ্রিত। পরে হেমায়েত এসলাম সিপি প্রেস রাজশাহী থেকে মুদ্রিত। পত্রিকার পরিচালক ও প্রতিষ্ঠাতা কেয়ামতুল্লা খোন্দকার নিজস্ব হাতমেশিন সংগ্রহ করার পর থেকে নিজস্ব প্রেসে মুদ্রিত হতে থাকে। মাসিক ধর্ম ও সাহিত্য পত্রিকা। প্রথম বছরের পর অর্থনৈতিক কারণে পত্রিকাটি অনিয়মিতভাবে ১৩৪৩ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত চলেছে।
ঐতিহাসিক চিত্র: ত্রৈমাসিক সাহিত্য ও ইতিহাসসংক্রান্ত গবেষণা পত্রিকা, প্রথম প্রকাশ ১৩১১ বঙ্গাব্দ। রাজশাহী শহর থেকে প্রকাশিত। সম্পাদনায় অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়। এক বছর চালু ছিল। দিঘাপতিয়া রাজকুমার শরৎ কুমার রায়ের উপন্যাস মোহনলালের দুই অধ্যায় এ পত্রিকায় ছাপা হয়।
[লেখাটি বরেন্দ্র একাডেমি, রাজশাহী কর্তৃক ১৯৮১ সালে প্রকাশিত ‘রাজশাহী পরিচিতি’ সংকলন গ্রন্থ থেকে সংক্ষেপিত রূপে এখানে সংকলিত হয়েছে]
খন্দকার আমিনুল হক: ১৯৩৬ সালে পাবনার তাড়াশে জন্ম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৬ সালে বাংলায় এমএ পাস করেন। এরপর বেশ কয়েকটি কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: নরক গুলজার, সন্ধি, রূপকথার মায়াপুরী প্রভৃতি





