আনু কুমার। অনুবাদ: উম্মে সালমা

‘টেলস অব উইজডম’ বা ‘জ্ঞানের উপাখ্যান’ এ সংকলনের কিছু কিছু গল্প অল্পসংখ্যক গ্রন্থে বর্ণনাকারে, লিখিত, পুনরায় লিখিত, অনূদিত ও সংগৃহীত আকারে লিপিবদ্ধ আছে

৫৭০ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের একজন চিকিৎসক বোরজাভি অথবা বোরজাভা (আরবিতে বোরজাভায়া) বাস করতেন পারস্যের সাসানিদ রাজ্যে। তিনি ভারত ভ্রমণে গেলেন জ্ঞানের পুস্তক খোঁজার উদ্দেশ্যে: এ বইটি ব্যাপকভাবে চেয়েছিলেন পারস্যের তত্কালীন রাজা খুসরভ প্রথম (আনুশেরওয়ান অথবা ‘অবিনশ্বর’) যিনি ৫৩১-৫৭৯ খ্রিস্টাব্দ রাজত্ব করেছিলেন। বোরজাভি প্রথম প্রচেষ্টায় সফলতার সঙ্গে তার অর্জিত জ্ঞানের ভাণ্ডার নিয়ে পারস্যে ফিরে আসেন। তার এ সংগৃহীত বইটি রাজার প্রধান পরামর্শদাতা বুজুর্গমিহির কর্তৃক পরিমার্জিত ভাষায় লিখিত হয় এবং বোরজাভির একান্ত অনুরোধে তার ভারত ভ্রমণের গল্পটিও অন্তর্ভুক্ত হয়।

 

তার খোঁজার উদ্দেশ্য

পঞ্চতন্ত্র (সংস্কৃতের পাঁচ নীতি) ও এর সংস্করণগুলোর অস্তিত্ব একসময় বিদ্যমান ছিল (প্রথম সহস্রাব্দের গোড়ার দিকের শতকে) এবং যা এখন বিলুপ্তপ্রায়। কেননা বোরজাভি বইয়ের নামকরণ করা হয় কারিরাক উদ দামানাক ও লিখিত হয়েছিল মধ্য পারসিয়ান ভাষায় (পাহলাভি, ইন্দো-ইরানিয়ান ভাষা পরিবারের অন্তর্গত)। এ গ্রন্থের নামকরণ করা হয় দুটি শৃগালের নামে এবং পঞ্চতন্ত্রের প্রথম অনুচ্ছেদে এদের চিত্র দেয়া আছে।

গল্পগুলোয় বর্ণিত ছিল কীভাবে উন্নত, বিজ্ঞের মতো জীবন যাপন করা যায় এবং বিশেষ করে রাজকুমারদের শৃঙ্খলাবদ্ধ নিয়মকানুন, যা প্রাণিজগতের উপকথার চেয়েও বেশি কিছু ছিল। পঞ্চতন্ত্রের গল্পগুচ্ছের সঙ্গে ঈশপের উপকথা এবং জাতাকের উপকথার সাদৃশ্য রয়েছে, যা থেকে প্রমাণ হয়, এ গল্পগুচ্ছ প্রাচীনকাল থেকেই ব্যাপকভাবে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল। সাহিত্যের গ্রন্থের মধ্যে পঞ্চতন্ত্র সবচেয়ে বেশি পঠিত এবং বিশ্বের বেশির ভাগ ভাষায়ই এর বিভিন্ন সংস্করণ রয়েছে।

গত শতাব্দীতে পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণার ফলে এবং সে সঙ্গে গ্রন্থগুলোর সংশোধন ও সংস্করণের কারণে উভয় গ্রন্থ দুটির অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা যায়। দুই শতক পর ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে ‘কালিল ওয়া দিমনাহ’ নামে বোরজাভির এ বইটি আরবি ভাষায় অনূদিত হয়। তার এ বইটির অসংখ্য অনুলিপি প্রকাশিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে ফারসি ভাষায় রূপান্তরিত হয় এবং ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় বইটি লিখিত হয় এবং আজো এর অস্তিত্ব বিদ্যমান।

 

পঞ্চতন্ত্রের সময়কাল&dquote;&dquote;

১৯২০ সালের গোড়ার দিকে, জার্মান ভারততত্ত্ববিদ ইয়োহানেস হারটেল ব্যাপক গবেষণা করে বের করেন পঞ্চতন্ত্রের প্রাক-বংশপরিচয়। তিনি গুজরাটের জৈন ভিক্ষু পূর্ণভদ্র রচিত সংস্কৃতের বই পড়তেন এবং এ বইগুলোর সময়কাল ছিল ১২০০ খ্রিস্টাব্দেরও আগে। তবে হারটেল বিশ্বাস করতেন, পূর্ণভদ্র তার সময়ের শতাব্দী দুয়েক আগের সংস্করণের ওপর বেশি নির্ভর করতেন, একে বলা হতো পাঞ্চায়াকনায়াকা (অথবা হারটেলের ভাষায়, টেক্সটুস সিম্পলিসিয়র) এবং এটি ছিল প্রাকৃত সংস্করণে। পূর্বে গল্পগুলোর সংশোধন ও সাদৃশ্যের ওপর ভিত্তি করে হারটেল অনুমান করেন, প্রায় ২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি সময়ে কাশ্মীরে পঞ্চতন্ত্রের উদ্ভব হতে পারে। প্রথম পাণ্ডুলিপিটি হারিয়ে বিলুপ্ত হলেও পরবর্তী সময়ে পঞ্চতন্ত্রের সংস্করণগুলো দ্রুত প্রকাশিত হতে শুরু করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য তৃতীয় শতকে কাশ্মীরে রচিত সংস্কৃত তন্ত্রাখ্যায়িকা।

মৌখিক সংক্রমণ হলো যখনই কোনো নতুন সংস্করণ আসে, সেগুলোকে নতুন কাজের ভেতর অন্তর্ভুক্ত করা, যেমনটি দেখা যায় সোমদেব রচিত কাথাসরিতসাগর (সময়কাল ১০৬৩-৮২), ক্ষেমেন্দ্র রচিত বৃহতকথামঞ্জুরি (১০৪৪) ও হিতোপাদেশা (১৩৭৩)। হারটেল বিশদভাবে এ সংস্করণগুলোর মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য বর্ণনা করেন। ফ্রাসোয়া দু ব্লোয়া ১৯৯০ সালে বোরজাভির কাজের ওপর গবেষণা করেন আর এ কারণে মধ্যযুগের পারস্য সংস্করণে নতুন সংযোজন ঘটে এবং পরবর্তী সময়ে এর পরিবর্তন ও বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়।

দু ব্লোয়া বিশ্বাস করতেন, বোরজাভির বর্ণনামূলক গ্রন্থের মূল উৎস পঞ্চতন্ত্রের পাঁচটি গ্রন্থ (বিশেষ করে তৃতীয় শতকের তন্ত্রাখ্যায়িকা) এবং কিছু গল্প মহাভারত (এর ১২ অধ্যায়) থেকে নেয়া হয়েছিল। বোরজাভির গ্রন্থটি হারিয়ে যায়, তবে সেই গল্পগুচ্ছ এবং তার ভারত সফরের (কাঠামোগত বর্ণনামূলক) মূল অংশ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ভাষায় রূপান্তরিত হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ, বোরজাভির পরে ‘কালিলাগ দামনাগ’ নামে একজন সিরিয়াকের সংস্করণ প্রকাশিত হয় এবং এটি অতি দীর্ঘ ছিল না। আবার একাদশ শতকে নব্য পারস্য সংস্করণে আরবের আবদ-আল্লাহ ইবনে আল-মোয়াকাফফা (৭৫০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি) প্রকাশ করেন কালিলাহ ওয়া দিমনাহ। পরবর্তী সময়ে গ্রিক সংস্করণও প্রকাশিত হয়।

 &dquote;&dquote;

বোরজাভির ভ্রমণ

দু ব্লোয়ার মতে আরবি সংস্করণ কালিলাহ ওয়া দিমনাহর অর্ধেক বিষয়বস্তু রচিত হয়েছে পুরনো সাহিত্যকর্মের ওপর ভিত্তি করে, বাকিটা আল-মুকাফফার নিজস্ব সংযোজন। পরবর্তী সময়ে, ১১ শতকের প্রথমার্ধে পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায়ও লিখিত হয় পঞ্চতন্ত্র।

দু ব্লোয়া প্রাক-বংশপরিচয় উদ্ধার করতে গিয়ে বলেন, এ গল্পগুচ্ছ অনেক স্থান ও অনেক ভাষা অতিক্রম করে এসেছে। এর দৃষ্টান্তস্বরূপ ইন্দো-ইউরোপিয়ান ও সেমিটিক ভাষার কথা বলা যায়। আর এ সংস্করণটি থেকে সম্মত হওয়া যায় যে রাজার আদেশেই বোরজাভির ভারত সফর ও তার জ্ঞানের এই গ্রন্থ সংগ্রহ করা। তিনি এটা কীভাবে সংগ্রহ করেন তার বিভিন্ন গল্প চালু আছে। এক বিবরণীতে পাওয়া যায়, তিনি এক ভারতীয়র সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছিলেন, যে পরবর্তী সময়ে রাজকীয় কোষাগার থেকে বইটি চুরি করে বোরজাভিকে এনে দেন। অন্য আরেকটি বিবরণীতে প্রতীকীভাবে উল্লেখ আছে, এতে বলা হয়েছে, তিনি ঐন্দ্রজালিক ভেষজের খোঁজে যান, প্রকৃতপক্ষে তিনি গিয়েছিলেন জ্ঞানের গ্রন্থের খোঁজে, যা তিনি সঙ্গে করে নিয়ে আসেন এবং এর একটি গ্রন্থই পরবর্তী সমেয় কালিলাহ ওয়া দিমনাহ নামে প্রকাশিত হয়।

বোরজাভি চীনা রাজা ও তার উপদেষ্টার কাছে পঞ্চতন্ত্রের আদিকারণের গল্প করেন; উপদেষ্টা আবার এ গল্প করেন ভারতীয় জ্ঞানী রাজা রাই দেবশালিমের কাছে। রাজা একটি স্বপ্ন দেখেন, যেখানে তাকে পূর্বাভিমুখে ভ্রমণ করার জন্য বলা হয়েছিল। তিনি সেখানে গুহার ভেতর একটি বাক্স খুঁজে পান, যেটাতে অন্য এক রাজার (সিরিয়া) বার্তা পান, সেখানে তাকে একটি দ্বীপে (সেরেন্দিব) ভ্রমণের জন্য নির্দেশ দেয়া হয় এবং সেখানে বিদপাহ নামে একজন পণ্ডিত থাকবেন, যিনি তাকে শাসনকার্য পরিচালনার জ্ঞান বিতরণ করবেন। বিদপাহর গল্পগুচ্ছ পরবর্তী সময়ে পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়। সংস্কৃতের মূল উৎস হিসেবে এ নামটি বিবেচনা করা হয় বিদ্যাপতি, একজন বিজ্ঞ পণ্ডিত (আরেক ক্ষেত্রে প্রাচীন বিষ্ণু শর্মার কথা উল্লেখ আছে, যিনি প্রথম সারির একজন উপকথা গল্পের কথক ছিলেন)।

 

লেখক ও বৈধর্ম্য

আবদ-আল্লাহ ইবন আল-মোয়াকাফফা, যিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেন ইরাক নগরীর বসরায়। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে। তিনি রাজদ্রোহের অভিযোগে আব্বাসীয় খলিফা আল-মনসুর কর্তৃক প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হন। বসরায় তখন অবিরত পরিবর্তন লক্ষণীয় হয় এবং অপরিমেয় ক্ষমতার কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। আল-মোয়াকাফফা প্রথমে খেদমত করতেন উম্মায়াদদের, ইরাকের শাসকগোষ্ঠী এবং পরবর্তী সময়ে খেদমত করতেন আব্বাসীয়দের। সে সময় আল-মোয়াকাফফা অসংখ্য সাহিত্যকর্ম রচনা করেন এবং এর ফলে তিনি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

আরবি গদ্যের গোড়ার দিকের সেরা শিল্পকর্ম হিসেবে বিবেচিত কালিলাহ ওয়া দিমনাহ ব্যতীত তিনি অন্যান্য রাজনৈতিক গ্রন্থও রচনা করেন। এর একটি অংশে রাজকুমারদের আচার-আচরণ ও সামরিক কূটকৌশলের ওপর আলোকপাত করেন। আব্বাসীয় শাসনামলে রাজনৈতিক সংশোধনের জন্য কালিলাহ ওয়া দিমনাহ গ্রন্থে তিনি অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ থেকে চরিত্রগুলো ব্যবহার করেন।

ঐতিহাসিকদের মতানুসারে, তার গল্পগুলোর তর্জমা তার নিজস্ব ভঙ্গিমায় দুর্বোধ্য ও বক্রভাবে রচিত হলেও এর জন্য তার মৃত্যুদণ্ড হয়নি। তবে তিনি রাজনৈতিক অভিজাতদের মধ্যে বিরাগভাজন হয়েছিলেন। পরবর্তী শতাব্দীতে আল-মোয়াকাফফা খারেজি হিসেবেও পরিচিত হয়ে ওঠেন। প্রচলিত আছে, তিনি ষষ্ঠ শতাব্দীর জরথুস্ট্রীয় ধর্মীয় প্রবক্তা মাজদাকের অনুবাদ করেন এবং তিনি ইরানি ধর্ম প্রবক্তা মানিকিজমের অনুসারী হিসেবেও পরিচিতি পান। তৃতীয় খ্রিস্টাব্দে ধর্মীয় গুরু মানির নামানুসারে এ আন্দোলনের নামকরণ হয়। তিনি পারস্য সম্রাট বাহরামের কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন।

গল্প প্রচলিত আছে, ৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে আল-মনসুরের খিলাফত দখলের প্রচেষ্টায় আব্দুল্লাহ ইবন আলী নামে একজন রাজদ্রোহ করেন তখন খলিফার চাচার অনুরোধে আল-মোয়াকাফফা খলিফাকে ধৈর্য ধরার সনির্বন্ধ অনুরোধ জ্ঞাপন করে চিঠি লেখেন, কথিত আছে, প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে কীভাবে ধৈর্যসহকারে মোকাবেলা করতে হবে এবং রাজনৈতিক সমঝোতার করতে আল-মুকাফফা বিস্তারিতভাবে এসব আলোচনা করেছিলেন, কিন্তু এসব আলোচনা আল-মনসুর কর্ণপাত করেননি।

ধারণা করা হয় কালিলাহ ওয়া দিমনাহর একটি গল্পই গুপ্ত সংগঠনের দ্য আকওয়ান আল সাফা (অবিমিশ্র ভ্রাতৃৃবৃন্দ) গঠনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল। এই গুপ্ত সংগঠনটি দশম ও একাদশ শতাব্দীতে ইরাকে গড়ে উঠেছিল। তারা গ্রিক ও পারস্য জগতে জ্ঞাত বিজ্ঞানের জ্ঞান বিস্তারিত সংযুক্ত করে মধ্যযুগের বিশ্বকোষ রচনা করেন। পত্র লেখার কায়দায় এ বিশ্বকোষ রচিত হয়েছিল এবং এর আরবি নাম ছিল ‘রাসা’ইল ইখওয়ান আল-সাফা ‘ওয়া খুল্লান আল-উয়াফা’ (বিশুদ্ধ ভ্রাতৃবৃন্দের চিঠিপত্র ও আন্তরিক বন্ধুরা)। এসব গুপ্ত সংগঠনের এসব লেখক ও লেখার পরিচয় ও লেখার উৎস নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। যদিও এটাই ধারণা করা হয়, তারা বসরা ও বাগদাদেই বসবাস করতেন।

 

আরবি থেকে অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ

এগারো ও তেরো শতকের মাঝামাঝি ১০৮০ শতকে কনস্টান্টিনোপলের বাইজান্টাইন দরবারে সাইমন সেথ নামে একজন বিজ্ঞ চিকিৎসক ছিলেন, যিনি আল-মোয়াকাফফার সংস্করণ গ্রিক ভাষায় অনুবাদ করেন। পরবর্তী সময়ে এ গ্রন্থ নব্য পারস্য, হিব্রু ও পুরনো স্প্যানিশ ভাষায় রূপান্তর হয়েছে। ইউরোপীয় অনুবাদের আদি উৎস হলো জন কেপুয়া রচিত হিব্রু সংস্করণের লাতিন অনুবাদ। স্যার টমাস নর্থ এলিজাবেথের যুগে এটি ইংরেজিতে রূপান্তর করেন।

মোগল দরবারে পঞ্চতন্ত্র

অষ্টম শতকের গোড়ার দিকে কালিলাহ ওয়া দিমনাহর অসংখ্য রূপান্তর দৃশ্যমান হয় এবং ‘নব্য পারসিয়ান’ ভাষার ব্যাপক উন্নতি ঘটে। দশম শতাব্দীর একটি সংস্করণে কবি রুদাকির শ্লোক পাওয়া যায়। নাসরুল্লাহ মুস্তাফার পাশাপাশি ষষ্ঠ শতাব্দীর গোড়ার দিকে হুসাইন বিন আলি আল উয়াইজ কাশেফি ‘আনোয়ার-ই-সুহাইলি’ নামে একটি সংস্করণ রচনা করেন, যখন হেরাতের তিমুরিদ গোষ্ঠীর শাসক ছিলেন হুসাইন মির্জা।

পরে আবুল ফজল ‘আনোয়ার-ই-সোহেলি’র পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত সংস্করণ প্রকাশ করেন। এর নাম দেয়া হলো ‘আয়ার-ই-দানিশ’ (বুদ্ধিবৃত্তির কষ্টিপাথর)। আকবরের দরবারে পঞ্চতন্ত্রের আরেকটি সংস্করণ অনূদিত হয়: মুস্তফা খালিকদাদা আব্বাসি পঞ্চতন্ত্র অনুবাদ করেন জৈন মূল থেকে আসা সংস্কৃত (সম্ভবত নবম শতকে পাঞ্চাখ্যানায়াকা) থেকে।

অনুবাদের কাজ হতো সন্ন্যাস মঠে, একে মক্তবখানাও বলা হতো, যেখানে অনুবাদকেরা কাজ করত তাদের বই ও লেখালেখির অনুষঙ্গ নিয়ে। অনুবাদ করা হতো একটি চিত্তাকর্ষক পদ্ধতি অনুসরণ করে: প্রথমে সংস্কৃতের পণ্ডিতরা মুখে মুখে হিন্দিতে (সম্ভবত হিন্দাভি) রূপান্তরের কাজটি করতেন, তারপর তা ফারসীতে রূপান্তরিত হত। অনূদিত এসব গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মহাভারত ও রাজানামাহ এবং সিংহাসন বাত্তিসিকে অনুবাদ করে নাম দেওয়া হয়েছে খিরাদ আফজা (জ্ঞান বৃদ্ধিকরণ পুস্তক), তবে দারাশিকোর সময়ে এটি পরিবর্তন করে রচিত হয় আয়ার-ই-দানিশ। তবে আয়ার-ই-দানিশের চিত্রকর্মের সঙ্গে পারস্যের পুরনো সংস্করণের অঙ্কন সাদৃশ্য রয়েছে; এর কারণ সুপরিচিত এসব চিত্রশিল্পীরা মোগল দরবারে, বিশেষ করে সম্রাট হুমায়ুনের সময়ে পারস্য থেকেই এসেছিলেন।

হেইলিবারির ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের জন্য যখন পারস্যের ‘আনোয়ার-ই-সুহাইলি’ কিছু সময়ের জন্য পাঠ্যবই হিসেবে ব্যবহূত হয়, মৌলভি হাফিজুদ্দিন আহমেদ ১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে ‘আয়ার-ই-দানিশ’ উর্দু ভাষায় রূপান্তর করেন পরে, এটি কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজেও শিক্ষার্থীদের পাঠদান করানো হয়। এ সংস্করণের নামকরণ করা হয় খিরাদ আফরোজ (বুদ্ধিবৃত্তিক আলোকবার্তা বহনকারী)।

সূত্র: স্ক্রল