বসন্তকালের শুরুতে যখন আমাদের পুরনো বাসার চারদিকের ভেজা পচা মাটিতে গজিয়ে উঠছে ব্লুবেল ফুলের নীল নীল ঘণ্টাগুলো, তখন সেই বাসাটা থেকে সাতমার পালোয়ান হারিয়ে গেল। সাতমার পালোয়ান কিরিল্কার পোষা বেড়াল, তার আসল নাম অন্য। কিরিল্কার বেড়াল বললেও ভুল বলা হয়, আমার আগে কিরিল্কার এক ম্যাসিডোনীয় প্রেমিক ছিল, যার চেহারা কিরিল্কা বলত খানিকটা ডার্ক বোগার্ডের মতো, সেই পুওর ম্যানস ডার্ক বোগার্ডের দু’খানা বেড়াল ছিল, সম্পর্ক ফুরালে একটাকে সে কোলপাঁজা করে নিয়ে গিয়েছিল, আরেকটাকে দিয়ে গেছিল পাঁজাকোলা। কিরিল্কা অনেকদিন সেই ভাঙনের শোক ভুলতে পারেনি। আমাকে সে নির্বাচন করেছিল কান্নাকাটি করার কাঁধ আর বুক হিসেবে। প্রথমদিকে সজলতার আধার হিসেবে আমার কাঁধ ব্যবহার করলেও একদিন সে না কেঁদেই আমার কাঁধে মাথা হেলাল, তারপর একদিন হাসি-কান্নার মাঝখানে ভেসে গিয়ে আমার ‘সন্তাপ-ভঞ্জন’ ভূমিকা তখন ফুরাল। এভাবে ‘ব্যবহার করেছিল’, ‘নির্বাচন করেছিল’ বলাটা বেশ বাজে শোনাচ্ছে। অবশ্য এসব কেউ শুনতে পাচ্ছে না, আমার মাথার ভেতর বলছি। পরিত্যক্ত প্রেমিকের মাথা। হাজামজা ডোবার চেয়ে ভয়াবহ জিনিস, দাঁড়িয়ে থই পাবে না, কাদায় ডুবতেই থাকবে ক্রমাগত, আর কী নেই সেই কাদায়, পুরনো পয়সা থেকে শুরু করে ভাঙা কেতলি হয়ে বাচ্চার ট্রাইসাইকেল অবধি সবকিছু।

নিজেকে পরিত্যক্ত ভাবাটা আমার থামাতে হবে। মনে করতে হবে, কেউ কাউকে পরিত্যাগ করে যায় না, পৃথিবী একটি বৃহদাকার চামড়ার থলের মতো বা পালোয়ানের পাকস্থলীর মতো সবাইকে জারকরসে ধারণ করে আছে। এসব ব্যথানাশক ভাবনা আমি খুব ভেবেছি কয়েক মাস, যখন ব্যথা প্রবল ছিল। আসলে আমি ভাবিনি, কিরিল্কা চলে যেতে পারে। একটি নিটোল বছর আমরা একসঙ্গে সব করেছি, এমনকি পোস্ট অফিসে যাওয়াটাও। রৌদ্রের দিনে একে অন্যের কাপড়চোপড় কাচাকুচি করেছি, মামুলি হলেও ঘরের সবক’টি আসবাব কিনেছি একত্রে, সৈকতে বেড়াতে গিয়ে তুলে এনেছি ক্ষয়া ঝিনুক। বাগানে সেই ঝিনুক আর পাথর দিয়ে সাজিয়ে রক গার্ডেন বানিয়েছি। রক গার্ডেনের প্রতিটি সাক্যুলেন্ট কিনেছি একসঙ্গে। ছুটিতে বুলগেরিয়া বেড়াতে গিয়ে ফেরার সময় কিরিল্কা নিয়ে এসেছিল তার মায়ের করা রোস্টেড ফিগ, ডুমুরের মোরব্বা, তার ভেতরে একটি করে খুদে মস্তিষ্ক আকারের আখরোট। এসব মিথস্ক্রিয়ার একটির অর্থও বাগদান নয়, মনে রাখতে হবে। ভালোবাসা তো নিঃশর্ত, অর্থাৎ কিনা ভালোবাসায় এমন কোনো শর্ত নেই, যা ভাঙা যায় না। অতএব পুরো রান্নাবাটি খেলাটাকে অস্বীকার করে কিরিল্কা চলে গেল।

এই চলে যাওয়াটা আমাদের দুজনকেই (আমাকে আর পালোয়ানকে) দুভাবে বিঁধল। আমি কিছুই ফেলতে পারি না, ব্যবহার্য জুতোজোড়া ছিঁড়ে গেলেও না, অতএব কেউ আমাকে ফেলে চলে গেল, সেটা আমাকে যারপরনাই কষ্ট দিতে থাকল। চেইন পড়ে যাওয়া রিকশার মতো স্তব্ধগতি হয়ে গেলাম। সাতমার পালোয়ান ছিল খুব গুমোরওয়ালা বেড়াল, টি-ট্রি অয়েল মেখে চিরুনি দিয়ে তার চুলের জট ছাড়াতে হয়, বাটিতে ক্যাটফুড দিয়ে ‘খাও আমার সোনামানিক’ ইত্যাদি না বললে সে দাঁড়িয়ে থাকে, হামলে পড়ে খেতে শুরু করে না। সে ধরেই নিয়েছিল, কোপার্নিকাসের কথা ভুল, পৃথিবী তার চারদিকে ঘোরে। ইহ পৃথিবীতে হঠাৎ সে হাগামোতা সাফ করার জন্য কেবল আমার ওপরই নির্ভরশীল, এমন দুর্দিনের সামনা করার জন্য বোধ করি সেও প্রস্তুত ছিল না।

কিন্তু আমরা সয়ে নিলাম। পালোয়ান ভালো বাংলা জানে না। কিন্তু সে অন্য ঘর থেকে দিব্যি আমাকে ‘দুলাল-দুলাল’ ডাকতে পারে (কিরিল্কার চেয়ে স্পষ্ট করে, তীক্ষ করে)। দুলাল আমার ডাকনাম, জ্যাঠামণির দেয়া। পালোয়ান ছিল বলে বাংলাদেশে একবার ঘুরে আসতে পারলাম না। কার কাছে দিয়ে যাব জ্যান্ত একটা প্রাণীকে, যার নিয়মিত পরিচর্যা লাগে? এ দেশের নিয়মানুযায়ী পালোয়ানের বিচি কাটা যাওয়ার কথা ছোট্টবেলায়, দয়ার সাগর ডার্ক বোগার্ড সেটা করাতে দেয়নি, ফলে কোনো ক্যাটারি এ সন্তান প্রদানে সক্ষম বেড়াল নেবে না। মায়ের মুখখানা, মায়ের হলুদ ফুল দিয়ে রাঁধা রিঠা মাছের তরকারি, ভগ্নস্বাস্থ্য ফেরানোর সুদূর শৈলাবাসের মতো আমাকে হাতছানি দিতে লাগল শুধু, মায়ের কাছে যাওয়া হলো না, আমি আর পালোয়ান আমরা যে যার মতো করে নিজেদের ক্ষত নিরাময় করে ফেললাম। এসবের ভেতরেও বাগদানের মতো কিছু ছিল না, মানে আমার আর পালোয়ানের মাঝে তো বাগদান সম্ভবই না।

ফলে বসন্তের শুরুতে পালোয়ান হারিয়ে গেল। লোকে বলতে থাকল, বিচিওয়ালা বেড়াল যেদিকে খুশি একদিন চলে যেতেই পারে, মাইলকে মাইল দূর থেকে এরা স্ত্রী বেড়ালের রতিতৃষ্ণা টের পায় ইত্যাদি। আবার আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো যে, আমাকে পরিত্যাগ করে পালোয়ানও চলে গেছে। আমি প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা পার্কের দিকটা চক্কর মেরে আসতে থাকলাম। অন্ধকারে মুখে পাখি নিয়ে যেসব শেয়াল দৌড়ে ঝোপের আড়ালে চলে যায়, তাদের প্রত্যেকের মুখ চেনা হলো আমার। এদের কার চিমসে পেটে পালোয়ানের জায়গা হবে, সেটাও পরিমাপ করতে লাগলাম অবিরাম, আরএসপিসিএতে ফোন দিয়ে বিরক্ত করতে লাগলাম শেয়াল দশাসই বেড়াল শিকার করতে পারে কিনা তা নিয়ে। কিরিল্কার বন্ধু কেটি এসে একদিন জোর করে আমাকে পানশালায় নিয়ে গেল, হূত প্রাণশক্তি পুনরুদ্ধার প্রকল্প, কেটির কথামতো বড়শির মতো বাঁকা হয়ে বসে রইলাম মেয়েবন্ধু ধরার জন্য, ফাতনা নড়ল না। ভোরের দিকে বাড়ি ফিরতে ফিরতে শুনলাম, আমাদের পুরনো বাসার কাছের হ-থর্ন ঝোপে আত্মহারা হয়ে ব্ল্যাকবার্ডগুলো কাওয়ালি গাইছে, আকাশে নীল শুকতারা। সকালবেলা উঠে বেড়াল হারানোর সচিত্র বিজ্ঞপ্তি ছাপিয়ে আনলাম। স্টেশন রোডের কাছটা, লাইব্রেরি বিল্ডিংয়ের মোড়টা, কসাইখানা আর লন্ড্রির মাঝের গলিটা, কালভার্টের দিকের সড়কটা— কিছুই বাদ দিলাম না বিজ্ঞপ্তি সাঁটতে।

সন্ধ্যাবেলা বাড়ির দিকের গলিতে যখন কেউ ফিরে আসেনি, যখন তালপৈঠায় পাঁজা করা অ্যালুমিনিয়ামের বাসনের মতো আমার ঠাণ্ডা আর পরিত্যক্ত লাগতে থাকে অন্ধকারে, তখন শ্বাসকষ্টে খাবি খেতে খেতে প্রমিস করি, এবার এলেই পালোয়ানের বিচি কেটে দেব, এ পরিব্রাজকের জীবন যাপন করতে দেব না তাকে। ফোনটা এল তখনই। এক বুড়ি ফোন দিয়ে জানাল, সে বাসস্টপে আমার বিজ্ঞপ্তিটা পড়েছে। তার ধারণা, পেছনের বাগানে যে বেড়ালটা আসছে ইদানীং, সেটাই বাগাতুর (পালোয়ানের আসল নাম)। কাল বেলাবেলি আমি যেন খাঁচা নিয়ে এসে বেড়ালটাকে নিয়ে যাই। বুড়ি একটু কানে খাটো। একসময় সে হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘আমি টেক্সট করে দিচ্ছি ঠিকানা, তুমি এসে তাকে নিয়ে যেও!’ অনেকদিন পর রান্নাঘরে ঢুকে নোনা পরিজ বানালাম, কিরিল্কার সেই মোরব্বা তখনো আছে ফ্রিজে, সেটা মাখিয়ে পরিজ খেয়ে শান্তির ঘুম ঘুমালাম রাতে।

সকাল হতেই উঠে থালাবাসন ধুলাম, বিছানা বদলালাম, খাঁচা পরিষ্কার করে খাঁচা দোলাতে দোলাতে গেলাম বুড়ির বাড়ি, স্নায়বিক উত্তেজনায় প্রায় বিস্ফোরিত হওয়ার উপক্রম আমার। বুড়ি বুড়ি বলাটা শোভন হচ্ছে না, তার নাম ক্যাথলিন, ‘কে’ দিয়ে না, ‘সি’ দিয়ে (পইপই করে বলে দিয়েছে সে)। ক্যাথলিন অপেক্ষায় ছিল তার উঠানেই, একটা লাল ব্লাউজ আর ফুল ফুল স্কার্ট পরনে, পরিষ্কার শরীরের গন্ধ তার চারপাশে। মনটা প্রফুল্ল হয়ে উঠল বাড়িটায় ঢুকতে ঢুকতে। আমাকে সমাদর করে একটা ক্যাডমিয়াম ইয়েলো ঘরে বসাল ক্যাথলিন, রয়্যাল ডাল্টনের চীনামাটির পুতুলঠাসা একটা ঘর। তরতাজা ক্যামোমাইলের গন্ধ। কেতলিতে জল ফুটছে। জানালার কাছে একটা ফুল তোলা পাত্রে বিশাল অ্যালোভেরা গাছ। ক্যাথলিন বোধহয় উল বুনছিল, তার সোফায় নীল উলের গোলা আর কাঁটা।

বেড়ালটা আসে ঠিক ১১টা নাগাদ বুঝলে, ততক্ষণ আমরা চা খেতে পারি। ঘোষণা দিয়ে ক্যাথলিন ফরাসি টিন থেকে বিস্কুট খুঁজতে থাকল, গুছিয়ে চায়ের সরঞ্জাম পাতল। এর ভেতরে খুঁটিনাটি আলাপ সেরে নিলাম আমরা, এই যেমন আমি দুলাল ভারতবর্ষীয় নই। ক্যাথলিন ১৩ ভাইবোনের একটি আইরিশ পরিবার থেকে এসে এখানে বোতাম সেলাইয়ের কাজ করত, বোমা আতঙ্কের সময় এ পাড়ার চেহারাটা কেমন ছিল, দেয়ালে কার কার ছবি, বিয়ের সাদা সাটিনের গাউনটার দাম কত গিনি, প্রীতিভোজে হ্যাম স্যান্ডউইচ ছিল আর কার্ডবোর্ডের কেক... ক্যাথলিনের পায়ে একটু সমস্যা আছে, তাই সিঁড়ি ভাঙতে পারে না আর ইত্যাদি।

ঢঙ ঢঙ করে দেয়ালঘড়িতে ১১টা বাজল। আমি উদ্বিগ্ন হয়ে রান্নাঘরের দরজার দিকে দেখলাম, ওদিক দিয়ে বাগানে নামতে হয়, একফালি রোদ এসে শুয়ে পড়েছে তালিদার পাপোশে। যেন একটা পাপেটের মতো অদৃশ্য সুতোয় নাচছিলাম, কারো হাত থেকে ঝুপ করে সুতোগুলো পড়ে গেছে। পড়ে গেছে আর আমার মনে হচ্ছে, বাগানে যে বেড়ালটা ১১টায় আসে, সে বাগাতুর নয়। ক্যাথলিনের তুবড়ে যাওয়া মুখে আশ্চর্য সজীব দু’খানা নাচুনে চোখ। সে নিচু হয়ে চা ঢালতে ঢালতে বলল, ‘এত বছরেও অভ্যাস পালটায়নি আমার, ঘুম থেকে উঠেই গা ধুয়ে ফর্সা কাপড় পরা চাই। দিনের মুখোমুখি হওয়ার জন্য তৈরি।’ আচ্ছা, আমি কি ওকে জিজ্ঞেস করব, এ বেড়ালটা বাগাতুর না হলে আমি আর এ বাড়িতে আসতে পারব কিনা? ভাবতে না ভাবতে ক্যাথলিন ট্রে নিয়ে হেলেদুলে কাছে এসে আগাম বলে দেয়, ‘বেড়ালটা তোমার বেড়াল না হলেও এসো এখানে আবার। কেউ তো নেই!’

চা খেতে খেতে আমার মনে হলো, ঠিক এক্ষুনি আমি বাগাতুরকে খুঁজতে চাই না। টিভির অবিশ্রান্ত শব্দের ভেতর ক্যাথলিন বাঁ হাতে উলের গোলাটা আলগোছে কোলে তুলে নিল একবার, নিয়েই আবার নামিয়ে রাখল। লাল ব্লাউজের কলারটা মেয়েলি রুমালের মতো স্কলোপড, তাতে সুচ-সুতো দিয়ে ফুল সেলাই করা। এই যে হলুদ পেইন্ট করা সুসজ্জিত ঘরে একটা মানুষ বিনা প্ররোচনায় প্রতিদিন উঠে বসে, পরিপাটি যুদ্ধসাজে দিনের সব রিক্ততার মুখোমুখি হয়, এর শক্তির উৎস কোথায়? আমাকে একটা ভালো লাগার আমেজ নরম শরীরের সুগন্ধের মতো জড়িয়ে ধরছে। কেমন একটা টান। রান্নাঘরের দরজার কাছ থেকে একটা নাছোড় গলার ম্যাও শোনা গেল।

পরপর চারদিন আমি ক্যাথলিনের কাছে গেলাম। চায়ে ভিজিয়ে মৌসুমের প্রথম টক স্ট্রবেরি খেলাম। ক্যাথলিনের ইলেকট্রিক মিটার রিডিং দেখে দিলাম। একদিন সারাবেলা আমরা চা খেলাম আর ইনগ্রিড বার্গম্যানের ‘গুডবাই অ্যাগেইন’ দেখলাম, ষাটের দশকের ছবি, ৪০ বছরের বার্গম্যান ২৫ বছরের প্রেমিককে ফিরিয়ে দিতে দিতে সিঁড়িঘরে চিত্কার করে বলছে, ‘আই অ্যাম ওল্ড! আই অ্যাম ওল্ড!’ আড়চোখে একবার ক্যাথলিনকে দেখলাম। ক্যাথলিন মুখ বাঁকিয়ে বলল, ‘এহ, বার্গম্যানের মুখে এমন কথা শোভা পায় নাকি!’ খুশি হয়ে উঠে বললাম, ‘একেবারেই না।’ এরপর একদিন সে ফোন ধরল না আর আমারও লন্ড্রি যেতে হলো বলে যাওয়া হলো না। তার পরদিনও ফোন ধরল না। আমার দুশ্চিন্তা হতে লাগল। সে যে বলেছিল, তার পায়ের সমস্যা, পড়ে গেল না তো পায়ে পা বেঁধে কিংবা ঘুমের ঘোরে যদি তার স্ট্রোকই করে, কে হাসপাতালে ফোন দেবে... ফোন বাজছেই, বাজছেই। ফোন ধরল পরদিন। ক্যাথলিন নয়, তার বোন ইভলিন। কর্কশ গলায় জিজ্ঞেস করল, কে আমি, আমার মতলবটা কী, কেন ক্যাথলিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। এ দেশে একলা জীবন কাটানো বুড়ো-বুড়ির পড়ে গিয়ে মরে যাওয়ার বিপদ তো আছেই, তাকে গুম-খুন করে পুঁতে ফেলে বছরের পর বছর তার ভাতা নেয়ার ঘটনাও আছে, এসবই আমি জানি এবং ইভলিন এসবই আমাকে আবার জানাতে লাগল, জানা জিনিস জানতে আমার খুব অপমানবোধ হলো। হঠাৎ করে আমি আলোয় উজ্জ্বল নিঃসঙ্গ সকালে চা খাওয়ার সঙ্গী থেকে মতলববাজ ফেরেববাজ বাদামি ভারতীয় যুবকে পরিণত হলাম। আমি তাকে এও মনে করিয়ে দিলাম না যে, আমি দুলাল ভারতবর্ষীয় নই। কী লাভ! এদের কাছে আফ্রিকা একটি মহাদেশ নয়, একটি দেশ, কালোদের দেশ। এশিয়া বোধহয় দুটো দেশ মিলিয়ে একটা দেশ, একদিকে ভারতীয়রা আরেকদিকে মালয়রা। আমার গায়ে অনেক কিছু লেখা আছে, লেখা আছে ব্রিটিশরা ডিস্ট্রিক্ট গ্যাজেটিয়ারে আমাদের নিয়ে যা যা লিখত তার সব, স-অ-ব, হাত না বুলিয়েও এ ব্রেইলের অক্ষর পড়া যায়।&dquote;&dquote;

অথচ আমি এবারো শপথ করে উঠতে পারলাম না যে, ক্যাথলিনের বাড়িতে আর নয়। মনে হতে লাগল, ইভলিন চলে গেলেই ক্যাথলিন নিজে আমায় ফোন দেবে। ওরও তো টিভির কুলকুচো করার শব্দের সমুদ্রে ভেসে ভেসে সময় কাটানোর জন্য কোনো মানুষ চাই, ইনকন্টিনেন্সের জন্য পরা ন্যাপি পাল্টাতেও কখনো সাহায্য চাই। এই যেমন আমারও চাই অন্য আরেকটা পরিচয়, যেখানে আমি শরীর এঁটো হওয়া গৃহস্থের ছেলে নই, বিপত্নীক জ্যাঠার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী নই। যেখানে আমার উপস্থিতি কাম্য, আদরণীয়।

আমার দিনরাত্রি পারদের মতো স্থানু হয়ে রইল। নিজেকে বিছানার আয়তক্ষেত্রটা থেকে বিচ্ছিন্ন করা এত কঠিন কেন? কেন এত ভয়াল প্রতিটা দিনের শুরু করা? এত উদ্দেশ্যহীনতা। সন্ধ্যা হতে হতে বাগানে পাখি ডাকতে লাগল, আমি নীলচে অন্ধকারে বসে বসে একবার ভাবলাম, বাংলাদেশে ফিরে যাই, অন্তত ক’দিনের জন্য। কিন্তু পালোয়ান এসে যদি ফিরে যায়?

শুক্রবার বিকালে মরিয়া হয়ে ক্যাথলিনের বাড়ি গেলাম, বেল বাজালাম, কেউ দরজা খুলল না। উঠানটা ঘাস-আগাছায় থইথই করছে, রাজ্যের উড়ে আসা প্লাস্টিকের ফালি উড়ছে কোণে কোণে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর আমার মনে হলো, আমি ঠিক মানুষ নই। জ্যাঠারা প্রাণের ভয়ে ইন্ডিয়া পালানোর আগে দুপুরবেলা পুকুরের বড় মাছ সব তুলে ভেজে কড়াই ভরে রেঁধে ফেলেছিল মা আর জেঠিমা। কিন্তু গভীর যাতনা বিকারে সেই মাছ কেউ মুখে তুলতে পারেনি। আমি সেই ঝোল থইথই কড়াই। খুব পাকা হাতে রাঁধা মাছ বোঝাই একটা কড়াই। কেউ যা খাবে না।

বাড়ি ফিরলাম অন্ধকার নামার পরে। গেটের কাছের ঝোপটায় আজকেও খুব ব্ল্যাকবার্ড শিস দিচ্ছে। অনতিউচ্চ দেয়ালে দাঁড়িয়ে আছে একটা বেড়াল, আমাকে দেখেই ‘ম্যাও’ করে উঠল।