অনুবাদ: শওকত হোসেন

আদেলফি চেম্বারের সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় কিঞ্চিৎ ভয় লাগছিল। পরীক্ষা হলে ঢোকার আগে যেমন হয়, অনেকটা সেরকম। অবশ্য এমনিতেও অচেনা লোকজনের সঙ্গে দেখা করার বেলায় অস্বস্তিতে থাকি। কিন্তু সেটাই যেন যথেষ্ট নয়, এখানে অচেনা মানুষটা ছিলেন খোদ মান্টো— প্রথমবারের মতো তার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলাম। আমার ভয়-ভয় ভাবটা বাড়তে বাড়তে আতঙ্কের সীমায় পৌঁছে গেল। সন্ত্রস্ত হয়ে শহীদকে বললাম, ‘চলো ফিরে যাই। মান্টো হয়তো বাড়ি নেই।’

কিন্তু শহীদ আমার পরিকল্পনায় জল ঢেলে দিল। ‘সন্ধ্যয় কখনই বাড়ির বাইরে যান না উনি। কারণ এটা তার পানের সময়।’

ভেবে দেখুন। এটা যেন ঠিক পরাস্ত বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়ার মতো! ইশ, মান্টোকে দিয়ে শুরুই কি যথেষ্ট খারাপ ছিল না। অথচ এখন ব্যাপারটাকে আরো জটিল করে তুলতে মদ পানে ব্যস্ত মান্টো হতে যাচ্ছেন তিনি! কিন্তু নিজের ইচ্ছাকে জোরালো করে তুললাম আমি। কী এসে যায় আসলে? নিশ্চয়ই গিলে খাবেন না আমাকে! ধারালো জিভ হলে হোক। আমিও ঠুনকো বুদ্বুদ নই যে, তুড়িতেই চুপসে যাব। নোংরা, ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজ তোলা সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলাম আমরা। ফ্ল্যাটের দরজা আধখোলা ছিল। সম্ভবত বৈঠকখানাই হবে, এক কোণে একটা সোফা ছিল ওটার। অন্য পাশে একটা পরিষ্কার সাদা বিছানা। জানালার ধারে হাঁটু গেড়ে বসে ছিলেন পিঁপড়েসুলভ একজন শীর্ণ কৃষকায় দুর্বল চেহারার মানুষ।

‘ভেতরে আসুন, আসুন’— আনন্দিত কণ্ঠে কথাটা বলে উঠে দাঁড়ালেন মান্টো। তার পরনে ছিল খাকি খদ্দরের কুর্তা আর জওহর কাট জ্যাকেট।

মান্টো সবসময়ই হাঁটু ভাঁজ করে চেয়ারে বসেন, ফলে খর্বাকৃতি মনে হয়; কিন্তু যখন আড়মোড়া ভাঙেন, বেশ লম্বাই দেখায়। আর মান্টো বসা অবস্থা থেকে পিছলে বেরিয়ে এসে সোজা হয়ে দাঁড়ান যখন, তখন পুরোপুরি তেজি ভাব ফুটে ওঠে।

‘ওহ! আমি ভেবেছিলাম আপনি ভয়ানক কৃষ্ণ, হালকা-পাতলা কেউ হবেন। আসলে কিনা আধমরা’— দেঁতো হাসি দিয়ে বললেন তিনি।

‘আর আমি ভেবেছি বাঁজখাই কণ্ঠের পাঞ্জাবি হবেন আপনি’— জবাব দিলাম আমি। তার কথায়ই তাকে কায়দা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলাম। কিছুতেই তাকে ছড়ি ঘোরাতে দেয়া যাবে না এবং পরমুহূর্ত থেকেই সর্বশক্তি নিয়ে তর্কে জড়িয়ে পড়ি আমরা। মনে হচ্ছিল যেন আরো আগেই পরিচিত না হয়ে একে অন্যের ভয়ানক ক্ষতি করে ফেলেছি আর এখন সেই ক্ষতির মাশুল আদায় করতে হচ্ছে। কখনো কখনো বাক্য বিনিময় কিছুটা যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তখনো আমাদের ভেতর কিছুটা সংকোচ থাকায় পরের সাক্ষাৎ অবধি তুলে রেখেছিলাম সেটা। এরপর বহু ঘণ্টা আমাদের চোয়াল অবিরাম নানা বিষয়ে কথা আর বাক্যের মিছিলকে চিবিয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ করেছে। অচিরেই জানতে পারলাম, আমার মতো মান্টোও অন্যজনকে কথা শেষ করার সুযোগ না দিয়েই অভ্যস্ত। পুরো জবাব না শুনে পাল্টা উত্তর দিতে শুরু করেন। ফলে সামান্য যেটুকু সৌজন্যের ব্যাপার ছিল, সেটাও উবে গেল। দ্রুততার সঙ্গেই সংলাপ পরিণত হলো তর্কে, তর্ক হয়ে দাঁড়াল সত্যিকারের ঝগড়া এবং মাত্র কয়েক ঘণ্টার পরিচয়ের সুবাদেই পরস্পরকে আমরা কিঞ্চিৎ সাহিত্যিক ভাষাতেই নির্বোধ, পাগল আর ঠুনকো যুক্তির স্থপতি তকমা দিয়ে বসলাম।&dquote;&dquote;

লড়াই চলছিল, কিন্তু আমিও নিজেকে খানিকটা বিচ্ছিন্ন করে ভালো করে দেখলাম। পুরু কাচের ওপাশে বড় বড় গাঢ় মণিওয়ালা চোখ যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আপনাআপনিই ময়ূরের পালকের কথা মনে পড়ে গেল। কিন্তু ময়ূরের পালকের সঙ্গে কী সম্পর্ক এর? এ ধাঁধার ফয়সালা কখনই করতে পারিনি, কিন্তু ওই চোখজোড়ার কথা ভাবলেই মনের ভেতর ময়ূরের পালকের ছবি খেলে গেছে। সম্ভবত ওই চোখের আন্তরিকতার পাশাপাশি ঔদ্ধত্য আর প্রগলভতাই আমার মনে ওই ছবি ফুটিয়ে তুলেছিল। চোখ জোড়ার দিকে তাকালেই হূিপণ্ডের একটা স্পন্দন খোয়াতাম আমি। মনে হতো ওই চোখজোড়া অন্য কোথাও দেখেছি, খুব কাছ থেকে দেখেছি। গম্ভীরভাবে অট্টহাসি দিচ্ছে, মুচকি হাসছে আর বিদ্রূপের কাঁটা ঝরাচ্ছে। দুর্বল হাত-পা যেন মরণের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মতো আড়ষ্ট হয়ে আসছে।

মান্টোর মাথাভর্তি চুল ছিল, গর্তে বসে যাওয়া পাণ্ডুর গাল, হলদে ভাঙা দাঁত। সহসা দম বন্ধ করা কাশিতে ভেঙে পড়লেন মান্টো। ভীত হয়ে উঠেছিলাম আমি। ওই কাশির সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। ছোটবেলায় শুনেছি ওই কাশি, ভীষণ রাগ হচ্ছিল।

মনে নেই কোন কথার উত্তরে বলেছিলাম কথাটা। বললাম, ‘এটা একদমই ভুল।’

তার পরই আমাদের ভেতর রীতিমতো যুদ্ধ বেঁধে গেল। ‘আপনি তো কেবল তর্কের খাতিরেই তর্ক করছেন।’

‘এটা নির্বুদ্ধিতা।’

‘এটা প্রতারণা, বাহেন ইসমাত।’

‘আমাকে আপনার বোন বলছেন কেন?’ রাগি কণ্ঠে বললাম।

‘এমনি। মেয়েদের সাধারণত আমি বোন ডাকি না। আসলে আমার আপন বোনদেরও বোন ডাকি না।’

‘তাহলে কি আমাকে ক্ষেপাতেই কথাটা বলছেন?’

‘বিলকুল না! কীভাবে এটা ভাবতে গেলেন?’

‘কারণ আমার ভাইয়েরা সবসময় আমাকে ক্ষেপাত, মারত কিংবা মার খাওয়াতো।’

জোরে হেসে উঠলেন মান্টো। ‘তাহলে নিশ্চিত থাকতে পারেন, আমি সবসময় বোনই ডাকব আপনাকে।’

‘তাহলে আপনিও মনে রাখবেন, আমার আপনার সম্পর্কে সুবিধার ধারণা নেই... আপনার কাশিটা, চিকিৎসা করাচ্ছেন না কেন?’

‘চিকিৎসা করাব! ডাক্তারগুলো সব গাধা। তিন বছর আগে ওরা বলে দিয়েছিল, এক বছরের মধ্যেই পটল তুলব আমি। আমার যক্ষ্মা হয়েছে। এটা তো পরিষ্কার যে, না মরে ওদের ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রমাণ করেছি। আর এখন ডাক্তারদের আমি নির্বোধ ছাড়া কিছু ভাবি না। ওঝা আর হিপনোটিস্টরা এসব ডাক্তারের চেয়ে ঢের বুদ্ধি রাখে।’&dquote;&dquote;

‘আপনার আগে আরেক প্রবীণ ভদ্রলোক একই রকম দাবি করতেন।

‘কোন প্রবীণ লোক?’

‘আমার ভাই আজিম বেগ। এখন মাটির নিচে বিশ্রাম নিচ্ছেন তিনি।’

অচিরেই আজিম বেগের শিল্পকর্ম নিয়ে তর্কে মেতে উঠলাম আমরা। স্বল্পায়ু সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে এসেছিল শহীদ, কিন্তু আলাপে এমনভাবে মগ্ন হয়ে পড়েছিলাম আমরা, কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাত ১১টা বেজে গেল। সাইডলাইনে বসে আমাদের সংঘাত প্রত্যক্ষ করছিল শহীদ। ক্ষুধায় অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল ওর। মালাদে পৌঁছতে পৌঁছতে রাত ১টা বেজে যাবে, তাই মান্টোর ওখানেই খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা। মান্টো আমাকে কাবার্ড থেকে চামচ আর থালা আনতে বলে হোটেল থেকে রুটি আনতে বেরিয়ে গেলেন।

‘ওই বয়্যাম থেকে আচারটা নিন।’

ব্যস্ত হাতে টেবিলে খাবার সাজালেন মান্টো, তারপর চেয়ারে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন। খানিকক্ষণ আগেও সাহিত্যিক কর্মকাণ্ডের গণ্ডি টেবিলখানা নিমেষে ডাইনিং টেবিলে পরিণত হলো। শুরুর আগে অন্যদের পাতে খাবার তুলে দেয়ার সব সৌজন্য উপেক্ষা করে নিমেষে শুরু করে দিলাম, যেন অনেক বছর ধরে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করি আমরা।

খাবারের সঙ্গে সঙ্গে তপ্ত আলাপও চলল। খানিক একথা-সেকথার পর মান্টো ফের ‘লিহাফে’র প্রসঙ্গে ফিরে এসে ওটাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেললেন। গল্পটা তখন আমার ভীষণ মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ওকে উপেক্ষা করার সর্বাত্মক চেষ্টা করলাম, কিন্তু হার স্বীকারে অস্বীকৃতি জানিয়ে গল্পটাকে একেবারে কুটিকুটি করে ছাড়লেন তিনি। ‘লিহাফ’ লিখে অনুতপ্ত হওয়ার কথা বললে সত্যিই হতাশ বোধ করলেন। লম্বা বক্তৃতা ঝেড়ে আমাকে অদূরদৃষ্টিসম্পন্ন, কাপুরুষ বলে গালমন্দ করতে লাগলেন। গল্পটাকে আমার মাস্টারপিস হিসেবে মানতে রাজি ছিলাম না আমি, কিন্তু মান্টো জোরের সঙ্গে সেটাই বলছিলেন। অচিরেই সব বাধা হাওয়ায় ছুড়ে ‘লিহাফ’ ছাড়িয়ে খোলাখুলি অন্যান্য প্রসঙ্গেও তর্ক শুরু করে দিলাম। মান্টোকে অনায়াসে কঠোর আর রাজ্যের অশ্লীল বুলি আওড়াতে দেখে অবাক হয়ে গেলাম। এমন সাহস, স্বতঃস্ফূর্ততা আর নিরীহ চেহারায় কথাগুলো বলছিলেন, ফলে শুনতে গিয়ে অস্বস্তি বোধ করেনি কেউ। কিংবা হয়তো তিনি কী বলছেন, সেটা নিয়ে ভাবার মতো সময় দেননি তিনি। তার কথায় বিতৃষ্ণ বা ক্ষুব্ধ না হয়ে বরং আমোদই বোধ হচ্ছিল।

আরো এক দফা সাফিয়ার কথা উল্লেখ করলেন তিনি। আমরা বিদায় নেয়ার আগমুহূর্তে। ওই সন্ধ্যায় অনেকবারই সাফিয়ার কথা মনে করেছেন মান্টো।

‘সাফিয়া সত্যিই ভালো একটা মেয়ে।’

‘সত্যিকার অর্থে ভালো সালন রাঁধত সাফিয়া। ওর সঙ্গে দেখা হলে সত্যি খুশি হতেন।’

‘ওর কথা বেশি মনে পড়লে ফোন করেন না কেন?’ জিজ্ঞেস করলাম।

‘তাহলে আপনার ধারণা, ওকে ছাড়া ঘুমোতে পারি না আমি?’ নিজের আসল চেহারা দেখাতে শুরু করেছিলেন তিনি।

‘গলায় ফাঁসির দড়ি নিয়েও ঘুমোনো সম্ভব’— প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেলাম।

হাসলেন তিনি।&dquote;&dquote;

‘সাফিয়াকে সত্যিই ভালোবাসেন, তাই না?’ ষড়যন্ত্রের ভঙ্গিতে জানতে চাইলাম আমি।

‘ভালোবাসা!’ যেন খিস্তি দিয়েছি, কুঁকড়ে গেলেন তিনি। ‘মোটেই ওকে ভালোবাসি না আমি।’ চেহারায় তিক্ত ভাব ফুটিয়ে তুলে বিরাট, কালো চোখের মণিতে পাক খাওয়ালেন। ‘ভালোবাসায় বিশ্বাসী নই আমি।’

‘আচ্ছা! তাহলে আপনি কারো প্রেমে পড়েননি?’ মেকি বিস্ময়ে জানতে চাইলাম।

‘না।’

‘আপনার কি তবে কখনো মাম্পসও হয়নি? কিংবা বসন্ত? হুপিং কাশি তো নিশ্চয়ই হয়েছিল।’

হাসলেন তিনি। ‘ভালোবাসা দিয়ে আপনি কী বোঝান? ভালোবাসা অপরিমেয় আর সীমাহীন কিছু। আমাদের মা, বোন আর মেয়ের জন্য ভালোবাসা আছে... স্ত্রীর জন্যও। আমাদের জুতো আর চপ্পলকেও আমরা ভালোবাসি। আমার এক বন্ধু ওর শুয়োরগুলোকে ভালোবাসে। হ্যাঁ, আমার ছেলেকে আমি ভালোবাসতাম।’ ছেলের কথা বলতে গিয়ে ঝাড়া দিয়ে চেয়ারে উঁচু হয়ে বসলেন তিনি। ‘খোদা কি কসম, এতটুকুন ছিল ও, কিন্তু ঘুরে বেড়াত। বিরাট শরীর ছিল ওর। হাঁটুর কাছে হামাগুড়ি দেয়ার সময় মেঝের ফোকর থেকে কাদা খুঁড়ে তুলে খেয়ে ফেলত। সত্যিই আমার কথা শুনত, আমার কথামতো চলত।’

আরো অনেক বাবার মতো মান্টোরও আমাদের তার ছেলের অনন্যতা বিশ্বাস করাতে শুরু করতে হয়েছিল।

‘বিশ্বাস করুন, ওকে আমার বিছানায় ঘুম পাড়ানো শুরু করার সময় মাত্র ছয় কি সাতদিন বয়স ছিল ওর। নিজে ওর শরীর ডলে দিতাম, গোসল করাতাম। বয়স তিন মাস হওয়ার আগেই জোরে হাসতে শুরু করেছিল। সাফিয়াকে কিছুই করতে হতো না। কেবল খাওয়াত। সারারাত গাছের গুঁড়ির মতো ঘুমাত ও। চুপচাপ দুধের বোতলে করে ওকে দুধ খাওয়াতাম, সাফিয়া সেটা টেরও পেত না। বাচ্চাদের খাওয়ানোর আগে দুধের বোতল অডি কোলন বা স্পিরিটে জীবাণুমুক্ত করে নেয়া উচিত, নইলে র্যাশ উঠে যায়।’

খুবই সিরিয়াস ভঙ্গিতে কথা বলছিলেন তিনি। ওর দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, ‘কেমন মানুষ, বাচ্চা মানুষ করার এই বিশেষজ্ঞ?’

‘কিন্তু মারা গেল ছেলেটা’— চেহারায় আমোদিত একটা ভাব ফুটিয়ে তুলে বললেন মান্টো। ‘মরে যাওয়ায় ভালোই হয়েছে। আমাকে আয়া বানিয়ে ফেলেছিল। এখন বেঁচে থাকলে ওর ন্যাপি ধুতে হতো। একদম মূল্যহীন হয়ে যেতাম। আমার পক্ষে আর অন্য কিছু করার উপায় থাকত না। এটা ঠিক, ইসমাত বাহেন, ওকে আমি ভালোবেসেছিলাম।’

ঠিক বিদায়ের সময় তিনি আবার বললেন, ‘সাফিয়া আসছে শিগগিরই। ওর সঙ্গে পরিচিত হলে সত্যিই খুশি হবেন আপনি।’