এখন যুদ্ধ মানে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা। এখন যুদ্ধ মানে প্রপাগান্ডা। চার-পাঁচশ বছর আগেও যুদ্ধের অনুষঙ্গ ছিল এগুলো। দুর্গ অবরোধ, নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা হতো। কিন্তু সেকালের আর একালের যুদ্ধে পার্থক্য অস্ত্রের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও দুই বাহিনী মুখোমুখি গুলি ছুড়েছে। এখন বহু দূর থেকে মিসাইল ছোড়া হয়। ড্রোন দিয়ে আক্রমণ করা হয়। কিন্তু ৪০০ বছর আগে যুদ্ধের একটা প্রধান অংশ ছিল সম্মুখসমর। কামান, ম্যাচলকের ব্যবহার তখনো ছিল কিন্তু পদাতিকরা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সামনাসামনি লড়তেন। কেবল পদাতিক কেন, সেনাপতি এমনকি বাদশাহও লড়েছেন। সে লড়াইয়ের অন্যতম মূল হাতিয়ার ছিল তলোয়ার। আর মোগল আমলে তলোয়ার কেবল যুদ্ধের হাতিয়ার না, হয়ে উঠেছিল যোদ্ধাদের সঙ্গী ও সাম্রাজ্যের গৌরব।

ষষ্ঠ মোগল বাদশাহ আওরঙ্গজেব এ উপমহাদেশে আলমগীর নামেও পরিচিত। কথিত আছে, তার পিতা বাদশাহ শাহজাহান, আলমগীর নামে একটি তলোয়ার উপহার দেন এবং পাশাপাশি পুত্রকেও আলমগীর উপাধি দেন। ভিক্টোরিয়া-অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে থাকা আওরঙ্গজেবের একটি তলোয়ারে লেখা ‘আলমগীর পাদশাহ ২৪’ থেকে ধারণা করা হয় সেটি ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দে আওরঙ্গজেব ব্যবহার করতেন। মূলত কোনো বাদশাহই একটি তলোয়ার ব্যবহার করতেন না, তাদের ছিল একাধিক তলোয়ার। এর মধ্যে কোনো কোনোটি বিখ্যাত হয়ে থেকেছে ইতিহাসে।

মোগল আমলের তলোয়ার ছিল নানা প্রকারের। তলোয়ার বলতে ধারালো দীর্ঘ ধাতব ফলা মনে করলে ভুল হবে। এর আকার আকৃতি থেকে শুরু করে কাঁচামালেও ছিল পার্থক্য। মোগল আমলে তলোয়ার নিয়ে নানা গবেষণা হয়েছিল অস্ত্রাগারে। সেখানে বদলেছে এর গড়ন ও গঠন, পাশাপাশি কাঁচামাল।

অন্তত আট রকম তলোয়ার প্রচলিত ছিল মোগল আমলে। এগুলো হলো তলোয়ার, শমশির, ধুপ, খান্দা, সিরোহি, পাতা, গুপ্তি ও জুলফিকার। মূলত সব অঞ্চলের মুসলিম শাসকরা জুলফিকার ব্যবহার করেছেন, কেননা এর আছে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক মূল্য।

দীর্ঘ ধারালো সব ইস্পাতের ফলাকেই তলোয়ার বলে থাকি আমরা। তবে তলোয়ার মূলত একটি নির্দিষ্ট টাইপ। সামান্য বাঁকা এ অস্ত্র তৈরি হতো ইস্পাতে। মোটামুটি চতুর্দশ শতাব্দীতে এর ব্যবহার বাড়ে এবং ষোড়শ শতাব্দীতে তুমুল জনপ্রিয় ও ব্যবহৃত। এর একটি দিকেই ধার থাকত। অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে এটি মূলত পদাতিক, সেপাইরা ব্যবহার করত।

শমশিরও তলোয়ারের মতোই বাঁকানো একধারী অস্ত্র। তবে এর কয়েকটি প্রকারভেদ আছে—কিলিচ, পুলওয়ার ও নিমচা। মূলত সেলজুক খানাত ও উজবেকরা ব্যবহার করত শমশির। মোগলরাও এটিকে আপন করে নেয়। শমশিরকে তলোয়ারেরই জ্ঞাতি বলা যায়।

মোগলরা নিজেদের তলোয়ারের পাশাপাশি অন্যান্য অঞ্চলের তলোয়ারের ডিজাইনও আপন করে নিয়েছিল। তেমনই একটি হলো ধুপ। একদম সোজা ও হাতল থেকে শীর্ষ পর্যন্ত চার-সাড়ে চার ফুটের এ তলোয়ার ছিল দক্ষিণের ঐতিহ্য। অনেক সময় এ জাতের তলোয়ার মখমলের কাপড়ে মুড়িয়ে অভিজাত ব্যক্তি আলংকারিকভাবে নিজের সঙ্গে রাখতেন। এ ধারারই আরেকটি তলোয়ারের নাম খান্দা। ধুপ ও খান্দা মূলত দোধারি তলোয়ার।

আরবের তলোয়ার ছিল সামান্য বাঁকানো। মুসলিম শাসকদের আকর্ষণ ছিল এ ধারার তলোয়ারে। একধারি এ ধারার তলোয়ারের কয়েকটি রকমফের ব্যবহার হতো মোগল আমলে। তারই একটি হলো সিরোহি। এর ব্লেড অর্থাৎ মূল দেহটি আসত দামেস্ক থেকে। বা দামেস্কের ইস্পাত থেকে তৈরি হতো। নিয়মিত তলোয়ারের চেয়ে সিরোহি খানিকটা সরু ও হালকা হতো। প্রায় কাছাকাছি ভরের তলোয়ার ছিল পাতা। এটি যুদ্ধের তুলনায় কুচকাওয়াজ ও অস্ত্রকলার প্রদর্শনীতে বেশি ব্যবহার হতো।

বিবিসির সিরিজ শার্লক হোমসের একটি পর্বে দেখা যায় মাইক্রফট তার ছাতার বাঁট টেনে বের করছেন একটি তলোয়ার। মূলত একসময় ছড়িতেও লুকানো থাকত তলোয়ার। এরই নাম গুপ্তি। লুকিয়ে রাখা যেত সহজে। সরু এ তলোয়ারের বৃদ্ধের ‘‌ওয়াকিং স্টিক’ স্টাইলে একটি খাপে লুকানো থাকত। হাতল ধরে টানলে বেরিয়ে আসত খাপ থেকে।

ইসলামী অন্যান্য আমলের মতো মোগল আমলেও ব্যবহার হতো জুলফিকার। বাঁকানো তলোয়ারটি দোধারি এবং মাথার দিকে দ্বিভক্ত হয়ে যায়। এছাড়া দুই দিকেই থাকে খাঁজকাটা। জুলফিকার দেখতে বেশ ভয়াল দর্শন।

তলোয়ার বানানোর ক্ষেত্রে মোগলরা নানা গবেষণা করেছিল। এর মধ্যে প্রধান ছিল তলোয়ারের কাঁচামাল। তলোয়ার তৈরি হতো ইস্পাত দিয়ে। মোগলদের প্রধান চিন্তা ছিল ইস্পাতের গুণ-মান নিয়ে। এছাড়া তারা খেয়াল করেছিল নানা অঞ্চলে ব্যবহৃত তলোয়ার নিয়ে। সে কারণেই গৃহীত হয়েছিল ধুপ, কিলিচ প্রভৃতি। তবে সেটা নকশার ক্ষেত্রে। এর বাইরে নকশা ও কাঁচামালের ক্ষেত্রে তারা নজর দিয়েছিল ইউরোপে। মোগল আমলে ব্যবহৃত দীর্ঘ ও সোজা তলোয়ারকে বলা হতো ফিরাঙ্গি। মূলত তারা পশ্চিম ইউরোপে ব্যবহৃত তলোয়ারের নকশা ও কাঁচামাল গ্রহণ করেছিলেন। জার্মান স্টিলের এ তলোয়ারের দৈর্ঘ্য ছিল তিন-সাড়ে তিন ফুট। শাহজাহানের অনেক ছবিতেই এ ধারার তলোয়ার দেখা যায়। এছাড়া তারা ‘উটয’ স্টিল ব্যবহার করতেন।

মোগলদের তলোয়ারে থাকত নানা রকম নকশা। তার মূল দেহে ক্যালিগ্রাফি করা হতো। এছাড়া বাঁটেও থাকত নকশা ও ক্যালিগ্রাফি। দেহের ক্যালিগ্রাফির মূল ছিল কোরআনের আয়াত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাদশাহ বা শাহজাদার নাম ও মোহর থাকত। বাঁটেও থাকতে পারে তা। এছাড়া বাঁট তৈরি হতো জেড পাথর, হাতির দাঁত প্রভৃতি দিয়ে। তার ওপর থাকত নানা রকম রত্নপাথর। দক্ষিণ ক্যানিংটনে থাকা আওরঙ্গজেবের তলোয়ারে দেখা যায় এর হাতল সোনালি রঙ করা এবং এতে আছে ক্যালিগ্রাফি। তাছাড়া খোদাই করা আছে আওরঙ্গজেবের নাম। হীরা নামের এ তলোয়ারকে বলা হচ্ছে সবচেয়ে ঘাতসহ অস্ত্র।

মোগলদের তলোয়ারের আরেকটি বিষয়ও উল্লেখ করার মতো। যুদ্ধে বা দ্বন্দ্বে ব্যবহারের পাশাপাশি তলোয়ার, ছোরা ছিল স্বীকৃতিরও অংশ। অভিষেক, যুদ্ধজয়, জন্মদিন প্রভৃতিতে দেয়া হতো কিছু তলোয়ার। এ সবই আনুষ্ঠানিক ও আলংকারিক। নানা নকশা ও রত্ন থাকত এসব তলোয়ারের হাতল ও খাপে। মূলত মোগলদের শেষ সময় থেকে এর বাড়বাড়ন্ত হয়। প্রিন্সলি স্টেটগুলোর রাজা-মহারাজারা জমকালো এসব তলোয়ার রাখতেন। মোগল আমল ও তার পরবর্তীকালেও তলোয়ার ছিল বীরত্ব ও আভিজাত্যের প্রতীক।

মাহমুদুর রহমান: লেখক