যুদ্ধ-বিদ্রোহ, লড়াইয়ের ইতিহাস মানবসভ্যতার আদি থেকেই। তরবারি বা তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধের ইতিহাসও তেমনি প্রাচীন। রোমান সাম্রাজ্যে তলোয়ার লড়াই শুরু হয়েছিল কেবল বিনোদনের জন্যই। সোর্ডসম্যানশিপ বা তলোয়ার যুদ্ধ বলতে যেকোনো ধরনের তরবারি সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধ বা প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত দক্ষতা ও কৌশলকেই সাধারণত বোঝায়। এটিকে যেকোনো ধরনের মার্শাল আর্টেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। যারা এ পেশার সঙ্গে যুক্ত তাদের সোর্ডসম্যান বলা হয়। ইংরেজি শব্দ সোর্ডসম্যান লাতিন শব্দ গ্ল্যাডিয়েটর থেকে এসেছে। আবার গ্ল্যাডিয়েটর শব্দটি লাতিন শব্দ গ্ল্যাডিয়াস থেকে এসেছে, যা এক ধরনের তলোয়ার।
খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত রোমান সৈন্যবাহিনী ও রোমান সামরিক বাহিনী যুদ্ধে স্কুটাম, যা এক ধরনের ঢালের সঙ্গে সরু বা তুলনামূলকভাবে ছোট খোঁচা তরবারি হিসেবে গ্ল্যাডিয়াসকে ব্যবহার করত। রোমান লেখক ভেজিসিয়াসের মতে, রোমানরা প্রধানত হাতে ছুরি বা খোঁচা ব্যবহার করত, কারণ এর সাহায্যে অন্যান্য অস্ত্রের চেয়ে শত্রুকে দ্রুত আঘাত করে মেরে ফেলা যেত। তবে রোমান অসি যোদ্ধারা সামরিক বাহিনীর চেয়ে ছোট তরবারি ব্যবহার করত। তখন স্পাথা ছিল একটি দীর্ঘ দ্বিধারি তলোয়ার, যা প্রাথমিকভাবে শুধু কেল্টিক সৈন্যরাই ব্যবহার করত। তবে পরে রোমান অশ্বারোহী বাহিনীতে সহায়ক হিসেবে এটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে রোমান সাম্রাজ্যের বেশির ভাগ অংশজুড়ে স্পাথা ব্যবহার হতো।
প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এবং শৈল্পিক চিত্রণ থেকে মধ্যযুগীয় যুদ্ধকৌশল সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। তবে যতটুকু জানা যায় তা কেবল ভাইকিং যুগ (অষ্টম-একাদশ শতাব্দী) থেকেই তরবারি বা তলোয়ার ব্যবহার নিয়ে কিছু প্রমাণ রয়েছে। যদিও ভাইকিং যুগে তরবারির ব্যবহার সীমিত ছিল, বিশেষ করে ভাইকিংরা এবং অন্যান্য উত্তর জার্মানিক উপজাতিদের মধ্যে। তখন বর্শা, কুড়াল ও ঢালবিশিষ্ট অস্ত্র ছিল। শুধু অভিজাত শ্রেণীর অস্ত্রই ছিল তলোয়ার। দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষের দিকে রোমান সাম্রাজ্যে উদ্ভাবিত ধাতুর ঢালাইয়ের কৌশল, পরবর্তী সময়ে উত্তরাঞ্চলীয় অস্ত্র তৈরিতে তেমনি ছাপ পাওয়া গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্পাথা তরবারি হিসেবে যেমন ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি মধ্যযুগে নাইটদের কাছে উল্লেখযোগ্য অস্ত্র হিসেবে মর্যাদা পায় হিল্ট নামের তরবারিটি। বর্ম ব্যবহারও বিকশিত হয়েছিল এ সময়ে, ফলে প্লেট বর্মের প্রয়োজনীয়তাও বেড়ে যায় এবং একইভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রেখে শত্রুকে হত্যা করার লক্ষ্যে তলোয়ার চালনাও শুরু হয়। প্রারম্ভিক মধ্যযুগের বেশির ভাগ সময় ধরে তলোয়ার মর্যাদার প্রতীক হিসেবে রয়ে গেছে। পরবর্তী সময়ে তলোয়ার তৈরি, কৌশল পরিচালনায় দক্ষতা সবকিছু মিলিয়ে এটি বিশেষ অস্ত্রে পরিণত হয়। তখন এটি কেবল ধনী ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সবচেয়ে ধনী শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
আধুনিক সময়ে এসে তলোয়ারের ব্যবহার কমেছে। কারণ ষোড়শ শতাব্দীতে আগ্নেয়াস্ত্রের আবির্ভাব ঘটে। ফলে তলোয়ার চালনার সামরিক গুরুত্ব দ্রুত কমে। সে সময়ে যুদ্ধক্ষেত্রে সর্বশেষ ব্যবহৃত তলোয়ারটি ছিল ব্যাকসোর্ড। যদিও এটি কোনো নতুন উদ্ভাবন ছিল না। তবে এটি যুদ্ধকৌশলকে নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করত। অশ্বারোহী বাহিনীরাই ব্যবহার করত। আগ্নেয়াস্ত্রের শক্তি, নির্ভুলতা ও নির্ভরযোগ্যতা ক্রমাগত উন্নত হওয়ার ফলে দ্রুতই আনুষ্ঠানিক উদ্দেশ্য বাদ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে তলোয়ার সামান্য স্থান নিয়েছিল।
তবে বিশ্বজুড়ে তরবারি বা তলোয়ারের ব্যবহার হয়েছে শতভাবে শত শত বছর ধরে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, ব্যক্তিগত বিরোধ, দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধের মীমাংসার ক্ষেত্রে তলোয়ার ছিল পছন্দের অস্ত্র। বর্তমানে কেবল কয়েকজন মার্শাল আর্টিস্ট ও আধুনিক ফেন্সাররা প্রাচীনকাল থেকে অনুশীলন করা কার্যকর যুদ্ধ শিল্পের সঙ্গে পরিচিত। মধ্যযুগীয় এবং রেনেসাঁর তলোয়ার লড়াইয়ের শৈলীগুলো হিংসাত্মক ও আক্রমণাত্মক ছিল, যা আধুনিক যুগের কৌশলগুলোর সঙ্গে সামান্য সাদৃশ্য রয়েছে।
বিভিন্ন ধরনের মার্শাল আর্ট রয়েছে, যা শেখায় কীভাবে একজন তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ করতে পারে। ঐতিহাসিক ইউরোপীয় মার্শাল আর্ট, জাপানি মার্শাল আর্ট ও অলিম্পিক ফেন্সিংয়ে রয়েছে তলোয়ার লড়াইয়ের সব রূপ। বিভিন্ন ঐতিহ্যও বিভিন্ন তরবারির ধরনকে কেন্দ্র করে হয়েছে।
ঐতিহাসিক ইউরোপীয় মার্শাল আর্ট বা হেমা
হেমা মধ্যযুগের শেষে, রেনেসাঁ ও আধুনিক যুগের প্রথম দিকের গ্রন্থগুলোর ওপর ভিত্তি করে তলোয়ারধারীদের যুদ্ধের শৈলীগুলো পুনরায় তৈরি করেছে। মার্শাল আর্টিস্টরা তলোয়ার এবং বাকলার, লং সোর্ড, র্যাপিয়ার, ব্রিটিশ মিলিটারি স্যাবার ও অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করে। মধ্যযুগের প্রথম দিকে পদাতিক সৈন্যরা তাদের বাহু ও কাঁধে বাঁধা একটি ছোট বাকলার ঢালসহ একক হাতের তলোয়ার ব্যবহার করত। তলোয়ার ও বাকলার যুদ্ধ সে সময়ে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ছিল।
মধ্যযুগের শেষের দিকে নাইটরা সাঁজোয়া যুদ্ধের জন্য লং সোর্ড ব্যবহার করত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি ডুয়ালের প্রধান অস্ত্রে পরিণত হয়। সাধারণ তলোয়ারগুলোর বিপরীতে, লং সোর্ডগুলোর হাতল ছিল লম্বা। ফলে দুই হাতে তলোয়ারটি ব্যবহার করা যেত। তবে যথেষ্ট হালকা গড়নের হওয়ায় যোদ্ধারা এক হাতেই তা পরিচালনা করতে পারতেন। বেশকিছু বইয়ে লং সোর্ডের ভিন্ন ভিন্ন কৌশল নিয়ে বলা আছে। হেমার তথ্যমতে, বর্তমানে লং সোর্ড সবচেয়ে জনপ্রিয় তলোয়ার। মধ্যযুগীয় লং সোর্ড যুদ্ধের বিভিন্ন কৌশল রয়েছে। ইতালীয় ও জার্মান পূর্ববর্তী মধ্যযুগীয় নাইটরা তরবারি লড়াইয়ের যে কৌশল ব্যবহার করত, তা পনেরো শতকে ফেন্সিং গিল্ড দ্বারা ব্যবহৃত কৌশলগুলোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
ষোলো শতকে র্যাপিয়ার বেসামরিকদের জন্য একটি আত্মরক্ষার অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। তবে এটি ডুয়ালের প্রধান অস্ত্র এবং ফ্যাশনের সঙ্গে আরো বেশি যুক্ত হয়েছিল। র্যাপিয়ার একটি সরু, তীক্ষ্ণ ব্লেড দ্বারা তৈরি, যা নিরস্ত্র বেসামরিক যুদ্ধের জন্য ডিজাইন এটিকে বিভিন্ন গ্রুপ ও শহুরে মিলিশিয়াদের মধ্যে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। র্যাপিয়ার উদ্ভূত হয়েছিল স্পেন ও ইতালিতে এবং পশ্চিম ইউরোপজুড়েও জনপ্রিয় হয়েছিল।
সতেরো শতকের শেষের দিকে ছোট তরবারি বেশ দীর্ঘ এবং ভারী র্যাপিয়ারকে বাদ দিয়ে পছন্দের বেসামরিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছিল। আকারে ছোট, হালকা ওজনের তাই বহন করতে সহজ হতো। ছোট তরবারি বা তলোয়ার দিয়ে খেলা ইউরোপীয় অভিজাতদের মধ্যে একটি সামাজিক বিনোদন হয়ে উঠেছে। এছাড়া ব্রডসওয়ার্ড ফাইটিংয়ে ষোল ও সতেরো শতকে অশ্বারোহী বাহিনীরা বিভিন্ন ধরনের ব্রডওয়ার্ড তলোয়ার ব্যবহার করত। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল এটি বিস্তৃত, দ্বিধারি ব্লেড দ্বারা তৈরি। এদিকে স্যাবার হলো একটি তলোয়ার, যার একক ধার, বাঁকা ফলক রয়েছে। ইউরোপের ইতিহাসে দীর্ঘ সময় ধরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল স্যাবার ফাইটিং।
প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের সৈন্যরা তাদের হাতে একটি ঢাল ও বর্শা বহন করার সময় একটি তলোয়ার, খঞ্জর এবং যুদ্ধ-কুড়াল কোমরে রাখত। এর মধ্যে সোজা তলোয়ার ও সামান্য বাঁকা স্যাবার উভয়ই অন্তর্ভুক্ত ছিল। সাধারণ শক্ত, সোজা তরবারি ছিল বলে মনে হয় এবং মহাকাব্যের প্রথম দিকের ভাস্কর্য চিত্রতেও তাই দেখা যায়। আবার একটু বাঁকা তলোয়ারগুলো বৌদ্ধ যুগ থেকে সাধারণভাবে ব্যবহার হয়ে আসছে। বাঁকা তলোয়ারের সবচেয়ে সাধারণ ধরন কাট্টি, যা এখনো ভারতীয় উপমহাদেশের দক্ষিণ থেকে সুদূর উত্তর-পূর্ব পর্যন্ত সর্বত্র বিভিন্ন নামে দেখা যায়। এছাড়া আধুনিক যুগে জনপ্রিয় অসি ক্রীড়া হলো অলিম্পিক ফেন্সিং। এটি অলিম্পিক প্রতিযোগিতার বিভিন্ন নিয়ম মেনে ব্যবহার হয়। প্রতি ম্যাচে, ফেন্সাররা প্রতিপক্ষের ব্লেড দ্বারা আঘাত না করে প্রতিপক্ষের শরীরের ওপর লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে পয়েন্ট অর্জন করে থাকেন। এভাবে পৃথিবীজুড়েই নানাভাবে তলোয়ার ব্যবহারের পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক হয়ে থেকেছে সোর্ডসম্যানশিপ। অসি ক্রীড়ার গল্প ছড়িয়ে আছে প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্য থেকে আধুনিক অলিম্পিকের মাঠ পর্যন্ত।
ফারিহা আজমিন: লেখক





