লাহোরের পার্ল কন্টিনেন্টাল হোটেল। সম্মোহিতের মতো শুনছে মানুষ। মনোযোগ ওস্তাদ জাকির হোসেনের দিকে। মঞ্চে ধ্যানীর মতো বসে তিনি। স্বতঃস্ফূর্ত হাতে তবলায় আঘাত করছেন। আলো ঠিকরে পড়ার মতো করে ছড়িয়ে পড়ছে সুর। হঠাৎ যেন থেমে গেলেন ওস্তাদ জাকির। এক সৌম্য প্রৌঢ় পুরুষের দিকে চোখ পড়ে। মঞ্চ ছেড়ে নিচে নেমে আসেন তিনি। তারপর অবনত মস্তকে অভ্যাগত পুরুষকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। জন্মদাতা পিতা আল্লা রাখা ভারতে বসবাস করেন। সামনের মানুষটা তার সংগীতজগতের পিতা ওস্তাদ শওকত হোসাইন। দুই প্রথিতযশা তবলিয়ার সাক্ষাৎ বিস্ময় নিয়ে উপভোগ করল মানুষ। তবলার সঙ্গে যারা জীবন বেঁধেছে, তারা সাধারণ কেউ ন। তবলার তাল সবাইকে মুগ্ধ করলেও সবার হাতে তবলা বশীভূত হয় না। তার পরও এমন কিছু ধ্যানী এসেছেন, তবলার ইতিহাসে যাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

১৮৮০ সালে বারানসিতে জন্মগ্রহণ করেন কণ্ঠে মহারাজ। বাল্যকাল থেকে প্রকাশ হতে থাকে প্রতিভা। শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন পণ্ডিত বলদেবের কাছে, সাত বছর বয়স থেকে ২৩ বছর বয়স পর্যন্ত। বলদেব নেপালে চলে যান একসময়। গুরুর প্রতি ভালোবাসায় হাজির হন মহারাজ নিজেও। গুরুভক্তিতে বিস্মিত হন বলদেব। অর্জিত বিদ্যা উজাড় করে দেন শিষ্যকে। মহারাজ তখন দিনে ১৭ ঘণ্টাও তবলার পেছনে ব্যয় করেছেন। ধৈর্য ও নিষ্ঠার কারণে দ্রুত সময়ে চারদিক ছড়িয়ে পড়ল খ্যাতি। লায়কারি ও পরশে তার প্রভাব ছাপ ফেলে পরবর্তী বেনারস ঘরানার তবলাচর্চায়। অজরাড়া ঘরানার তবলিয়াদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় হিসেবে স্মরণ করা হয় ওস্তাদ হাবিবুদ্দিন খাঁর নাম। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯১ সালে। মাত্র ১২ বছর বয়সে পিতার কাছে শুরু করেন তালিম। পরবর্তী সময়ে দিল্লির ওস্তাদ নখু খাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় ও তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। প্রায় ১০ বছর তবলা শিখেছেন সেখানে। রপ্ত করেন নানা কৌশল। ক্রমে উপমহাদেশীয় তবলিয়াদের মধ্যে পোক্ত আসন করে নেন। একক বাদন ও যৌথ সংগীতে তিনি শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন। হাবিবুদ্দিন খাঁর মতো আহমেদজান থিরকুয়ার পরিবারেও ছিল সংগীতের ঐতিহ্য। ১৮৯২ সালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা ওস্তাদ হোসেন বখশ খাঁ ছিলেন বিখ্যাত সারেঙ্গী বাদক। তবে তবলাকেও আঁকড়ে ধরেন আহমেদজান। দুই মামা বাসেত খাঁ ও ফৈয়াজ খাঁ তবলার ওস্তাদ। তবলার প্রতি আগ্রহ তাদের থেকেই আসে। পরবর্তী জীবনে মিরাটের ওস্তাদ মুনির খাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন হাবিবুদ্দিন। প্রায় ২৪ বছর অবস্থান করে রপ্ত করেন তবলার পাঠ। তার বাদনের গুণে মুগ্ধ ছিলেন রামপুরের নবাব। সেখানেই অতিবাহিত করেন দীর্ঘদিন। পরবর্তী সময়ে তবলার অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন লক্ষেৗয়ের মরিস কলেজে। তার তিন পুত্র নবীজান, আলীজান ও মুহম্মদজান। তবলিয়া হিসেবে সুনাম অর্জন করেছেন তারাও। আহমেদজানের তবলার ছন্দে মুগ্ধ হয়ে উস্তাদ আবদুল আজিজ খাঁ তাকে থিরকুয়া উপাধিতে ভূষিত করেন। কানপুরের সংগীত ভারতী থেকে সংগীত মার্তণ্ড ও এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আফতাবি মৌসিকি উপাধি লাভ করেন তিনি। ভারত সরকার তাকে দেয় পদ্মশ্রী উপাধি। বাদনে দিল্লি ঘরানার প্রভাব থাকলেও ফরুখাবাদ ও অন্যান্য ঘরানার সঙ্গেও ছিল বিশেষ পরিচিতি। বাঁয়া ও তবলার সমান প্রাধান্য তাকে সমাদৃত করে তুলেছে। দেখিয়েছেন তর্জনী ও মধ্যমার প্রয়োগ। তবলার দুনিয়ায় কেশবচন্দ্রের আগমন অনেকটা নাটকীয়। ১৯৩৬ সালে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে অল বেঙ্গল মিউজিক কনফারেন্সে সেতার জাদুকর এনায়েত খাঁর সঙ্গে তবলা নিয়ে হাজির হন তিনি। সেদিনই বদলে যায় তার নিয়তি। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। জন্মেছিলেন ঢাকা জেলার নারায়ণগঞ্জে। দাদা রামচন্দ্রও ছিলেন একজন তবলাবাদক। শৈশব থেকেই প্রকাশ পেতে থাকে তবলার প্রতি প্রেম। ওস্তাদ আতা হোসেনের শিষ্য ওস্তাদ প্রসন্ন বণিকের কাছে নেন তালিম। পরবর্তী সময়ে বেনারসের মৌলবীরাম মিশ্র ও দিল্লি ঘরানার ওস্তাদ নাত্থু খাঁর কাছে রপ্ত করেন নানা কৌশল। তারই প্রকাশ ঘটে পরবর্তী জীবনে। এলাহাবাদ মিউজিক কনফারেন্সে বিচারক হিসেবে হাজির হন তিনি। বিভিন্ন ঘরানার একাধিক ওস্তাদের সংস্পর্শে আসার কারণে প্রতিটি ঘরানার প্রভাব তার ওপরে পড়েছে। তৈরি হয়েছে নিজস্ব ধরন। ১৮৯৪ সালে উত্তর প্রদেশের মুরাদাবাদে জন্মগ্রহণ করেন মসিত খাঁ। ফরুখাবাদ ঘরানার শ্রেষ্ঠ তবলাবাদকদের একজন তিনি। এলাহাবাদ সংগীত সম্মেলনে তবলাবাদক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তার শিষ্যদের মধ্যে পরবর্তীকালে জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, রাইচাঁদ বড়াল ও মুন্নে খাঁ খ্যাতি অর্জন করেন। পুত্র কেরামত খাঁ আসীন হন অত্যুচ্চ আসনে। কেরামত খাঁর জন্ম ১৯১৭ সালে। পিতার মতো তার মধ্যেও শৈশব থেকে গড়ে উঠেছিল তবলার সঙ্গে সখ্য। তার বাদনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল যুগল সৃষ্টি। অন্য কোনো শিল্পীর সঙ্গে ভারসাম্য স্থাপনের মধ্য দিয়ে। দীর্ঘদিন তিনি কলকাতার আকাশবাণীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভারত সরকার কর্তৃক নির্বাচিত হয়ে অস্ট্রেলিয়া যান সাংস্কৃতিক সফরে। তার ছাত্রদের মধ্য থেকেই পরবর্তী সময়ে খ্যাতি অর্জন করেন নিখিল ঘোষ, অনিল রায় চৌধুরি ও ফকির মুহম্মদ। পিতার মতো তিনিও ফরুখাবাদ ঘরানার সব বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখতেন। তার সঙ্গে ছিল নিজস্বতার মিশ্রণ। তবলার ঐতিহ্য অনেক দিক থেকেই পারিবারিক প্রভাবে প্রভাবিত। সংগীতের ঐতিহ্য না থাকলে চর্চায় বিকশিত করা কঠিন। তার উদাহরণ বাঙালি পরিবারে জন্ম নেয়া হীরেন্দ্র কুমার গাঙ্গুলি। ১৯১১ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ভবানীপুরের শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমান পরিবারের সন্তান। পিতা মন্মথ নাথ গাঙ্গুলি ছিলেন একই সঙ্গে মিউনিসিপ্যাল ম্যাজিস্ট্রেট ও তবলাবাদক। দিল্লির বিখ্যাত তবলিয়া বাবু খাঁর কাছে নেন তালিম। পরবর্তী সময়ে ১২ বছর ধরে বিখ্যাত তবলাবাদক ওস্তাদ আবিদ হোসেন খাঁর কাছে তালিম নেন। সাধারণ শিক্ষার ক্ষেত্রেও চলছিল তালিম। ধীরে ধীরে সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে তার সুনাম। অজস্র সংগীত সম্মেলনে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। তার বাদনশৈলী ছিল লক্ষেৗ ঘরানার। তবে বিজ্ঞানসম্মতভাবে বোল, কায়দা, পেশকার ও অন্যান্য ক্ষেত্রে নিজের পারঙ্গমতা দেখান। তার ওস্তাদ আবিদ হোসেন খাঁকে নিয়ে না বলাটা অন্যায় হবে।  আবিদ হোসেন খাঁ জন্মগ্রহণ করেন ১৮৬৭ সালে। পিতা মুহম্মদ খাঁ ছিলেন লক্ষেৗ ঘরানার প্রতিনিধিস্থানীয় তবলাবাদক। সেখানেই তার শিক্ষার হাতেখড়ি হয়। পিতার মৃত্যুর পর তিনি বড় ভাই ওস্তাদ মুন্নে খাঁর কাছে তালিম নেন। রপ্ত করেন তবলাসংক্রান্ত যাবতীয় কলাকৌশল। তবলায় তার মুনশিয়ানার জন্য খলিফা উপাধি দেয়া হয়। অজস্র সংগীত সম্মিলনে তিনি ছিলেন মনোযোগের কেন্দ্র। কিছুকাল মরিস কলেজে অধ্যাপনার দায়িত্ব পালন করেন। বাংলার হীরেন্দ্রকুমার ছাড়াও তার কয়েকজন বিখ্যাত শিষ্যের অন্যতম ছিলেন বেনারসের বীরু মিশ্র ও ইন্দোরের জাহাঙ্গীর খাঁ।

১৯০৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ। পিতামহ ছিলেন বেহালাবাদক। সাত বছর বয়সে টনিবাবুর অধীনে তবলা বাদনে হাতেখড়ি ঘটে। তারপর ওস্তাদ হিসেবে একে একে পেয়েছেন আজিম খাঁ, মজিদ খাঁ, ফিরোজ খাঁকে। বিশেষ করে মজিদ খাঁয়ের প্রভাব ছিল তার পরবর্তী জীবনের পাথেয়। তবলার পাশাপাশি গান শিখতেও শুরু করেন। ছন্দ, তাল ও লয়ে ঈর্ষণীয় সাফল্য আসে। সংগীতের গুরু ছিলেন শব্বন খাঁ ও সগীর খাঁ। এদিকে ওস্তাদ মুহম্মদের কাছে নেন হারমোনিয়ামের তালিম। ভারতের বহু সংগীত অনুষ্ঠানে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। ভারতের সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে রাশিয়া, পোল্যান্ড, চেকোস্লোভাকিয়াসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। আকাশবাণী থেকে অবসর নিয়ে তিনি যোগ দেন ভারতীয় সংগীতের অধ্যাপক হিসেবে। চলচ্চিত্রজগতেও তার ছাপ ছিল স্পষ্ট। বসন্তবাহার ও যদুভট্ট তার অনন্য উদাহরণ। জ্ঞানবাবুর বাদনশৈলীর মধ্যে ফরুখাবাদ ঘরানাই প্রাধান্য বিস্তার করেছে। তার জন্মের এক যুগ পরে বারানসিতে জন্মগহণ করেন শান্তাপ্রসাদ। পিতার মৃত্যুর পর তিনি বিক্কু মহারাজের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ সময় রেওয়াজে কাটাতেন তিনি। এমনকি দিনে ১৭-১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত রেওয়াজ করেছেন তিনি। ১৯৪২ সালে এলাহাবাদে সংগীত সম্মেলনে তিনি তবলা পরিবেশন করে বিপুল খ্যাতি অর্জন করেন। ক্রমে কলকাতা, বোম্বে, গোয়ালিয়র, বারানসি, লক্ষেৗ ছড়িয়ে যায় তার তবলিয়া খেতাব। হিন্দি ও বাংলা চলচ্চিত্রেও রাখেন অবদান। ঝনক ঝনক পায়েল বাজে, বসন্তবাহার, অসমাপ্ত ও ঢুলী সিনেমায় তার অংশগ্রহণ ছিল। ভারত সরকারের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন তিনি। লন্ডনের এডিনবরায় তার তবলার মজলিস শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করেন সংগীতবোদ্ধারা। শান্তাপ্রসাদ ছিলেন বেনারস ঘরানার শক্তিশালী তবলিয়া। হাতের কৌশল ও জড়তাহীন গতি তাকে অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে। কায়দা, পেশকার ও বিশেষ ছন্দের কাজে তিনি ছিলেন অনন্য। ১৯২৪ সালে এলাহাবাদের জন্মগ্রহণ করেন লালজি শ্রীবাস্তব। জীবনের প্রথম দিকে তিনি সংগীতচর্চার জন্য তেমন উৎসাহ পাননি। ১৭ বছর বয়সে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়। ছতরপুরের বিখ্যাত ওস্তাদ ইউসুফ খাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। একাধারে চার বছর তালিমে রপ্ত করেন তবলার কলাকৌশল। পরবর্তী সময়ে গৃহে রেওয়াজ করেন নিয়মিত। বারানসির তবলাবাদক শ্যামলাল এলাহাবাদ এলে তিনি তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। শ্যামলাল তিন বছর পর বারানসি চলে যান। গভীর পরিবর্তন আসে জীবনে। জয়পুরের বিখ্যাত তবলিয়া জয়লালের কাছে দুই বছর তালিম নেন। জয়লাল এলাহাবাদ ছেড়ে চলে গেলে নিজেই বাকি পথ যাত্রা করেন। বিভিন্ন সংগীত অনুষ্ঠানে তার তবলাবাদন সবাইকে মুগ্ধ করে। ১৯৫০ সালে কানপুরের ললিতকলা বিদ্যাপীঠ তাকে ‘আচার্য’ উপাধিতে ভূষিত করে। এলাহাবাদ প্রয়াগ সংগীত সমিতিতে দীর্ঘকাল তিনি অধ্যাপনার কাজ করেন। বিভিন্ন ঘরানার ব্যক্তিদের কাছে তালিম নেয়ার কারণে তার বাদনশৈলীতেও এসেছে অভিনবত্ব।

ভারতীয় সংগীতের বিস্ময়পুরুষ ওস্তাদ আল্লা রাখা। অনেক ওস্তাদের মতো তিনি পারিবারিক সিলসিলায় বেড়ে ওঠেননি, সিলসিলা তৈরি করেছেন। জন্মগ্রহণ করেন ১৯১৫ সালে পাঞ্জাবের গুরুদাসপুরের রতনগড় গ্রামে কৃষক পরিবারে। সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করার পরও হয়ে উঠেছেন সংগীতের ওস্তাদ। ১৫ বছর বয়সে পাঠানকোটে নাটক কোম্পানিতে চাকরি নেন। তবলার তালিম নেন ওস্তাদ লাল মুহম্মদের কাছ থেকে। প্রতিষ্ঠা করেন সংগীত বিদ্যালয়। যদিও তা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। সেখান থেকে চলে যান লাহোরে। ওস্তাদ কাদের বখশের কাছে তালিম নেন। মূলত কাদের বখশই তাকে সত্যিকার রূপ দেন। কিছুকাল আকাশবাণীতে কাজ করার পর এ আর কুরেশী নামে আত্মপ্রকাশ করেন সংগীত পরিচালক হিসেবে। জনপ্রিয়তাও বাড়তে থাকে তরতর করে। ১৯৬০ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক আয়োজিত সংগীত সম্মেলনে অতিথি হিসেবে হাজির থাকেন তিনি। বাদনের ধরনে পাঞ্জাবি ঘরানার প্রভাব ছিল স্পষ্ট। বোলগুলো পাখোয়াজঘেঁষা হওয়ার কারণে তার আওয়াজ ছিল গম্ভীর। অনুসারী ও নিকটজনের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন আব্বাজি হিসেবে। ওস্তাদ কাদের বখশই তাকে পাঞ্জাবি ঘরানার পরবর্তী খলিফা ঘোষণা করেন। ১৯৩০ সাল থেকে তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিও স্টেশনে কাজ শুরু করেন। ১৯৪০ সালে সরে আসেন বোম্বে। স্টেশনের প্রথম একক তবলাবাদক ছিলেন তিনি। পণ্ডিত রবিশংকরের সঙ্গে পঞ্চাশের দশক থেকে ধ্রুপদি সংগীত পরিবেশন করতে থাকেন। শত শত জলসা মাতিয়ে তুলেছেন দুজন। ১৯৮৬ সালে তিনি আল্লা রাখা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৭ সালে ভারত সরকারের হাত থেকে গ্রহণ করেন পদ্মশ্রী সম্মাননা। ঠিক পাঁচ বছর পর পান সংগীত নাটক একাডেমি অ্যাওয়ার্ড। তিনি যে অত্যুচ্চ আসন তৈরি করেছিলেন, তা এগিয়ে নিয়েছেন প্রধান শিষ্য ও সন্তান ওস্তাদ জাকির হোসেন। ওস্তাদ জাকির হুসেন মাত্র ১২ বছর বয়সেই পিতার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালে তিনি পণ্ডিত রবি সংকরের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে যান। জীবনে অজস্র আসরে নেতৃত্ব দেন। গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড, পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ, সংগীত নাটক একাডেমি ও কালিদাস সম্মাননা পান। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে পূর্ণকালীন অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ২০১৯ সালে তিনি বার্কলে কলেজ অব মিউজিক ও ইন্দিরা কলা সংগীত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি বাণিজ্যিক জলসায় পরিবেশন করেন না। ২০২৩ সালে তিনি ভারত সরকারের পক্ষ থেকে পদ্মবিভূষণ খেতাব পান। তার তবলা বাদন বর্তমানেও মুগ্ধ করে রেখেছে কোটি মানুষকে। ‘অ্যাপোক্যালিপ্স নাউ’ কিংবা ‘লিটল বোদ্ধা’র মতো বিখ্যাত চলচ্চিত্রে রয়েছে তার তবলার সরব স্বাক্ষর। ধ্রুপদি সংগীতের প্রসঙ্গ এলেই উঠে আসে জাকির হুসেনের নাম।

তবলিয়াদের দীর্ঘ সারির মধ্যে ব্যতিক্রম নাম অনুরাধা পাল। তিনি তবলা শিখেছেন শ্রী মানিকরাও পোপাটকার ও পণ্ডিত মদন মিশ্রের কাছে। বেনারস ঘরানার সঙ্গে যাত্রা করলেও ওস্তাদ আল্লা রাখা ও ওস্তাদ জাকির হোসেনের মাধ্যমে পাঞ্জাব ঘরানার সঙ্গে পরিচিত হন। তাকে গণ্য করা হয় প্রথম পেশাদার নারী তবলিয়া হিসেবে। ১০ বছর বয়সে তিনি প্রথম পরিবেশন করেন। ১৭ বছর বয়সে অর্জন করেন ‘লেডি জাকির হুসেন’ খ্যাতি। পণ্ডিত যশরাজ ও পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়ার সঙ্গে পরিবেশন করেন সংগীত। ব্রাজিলের ফেস্টিভ্যাল অব ইন্ডিয়া ও স্কটল্যান্ডে বিবিসি মিউজিক লাইভ ও পোল্যান্ডের উডস্টক ফেস্টিভ্যালের মতো বহু আন্তর্জাতিক আসরে তিনি তবলা পরিবেশন করেছেন। মুম্বাইয়ে অনুরাধা পাল সাংস্কৃতিক একাডেমিতে বর্তমানে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন নিয়মিত। তবলিয়া সিলসিলায় নারীদের অংশগ্রহণের বড় উদাহরণ অনুরাধা। তবলার সঙ্গে জীবনকে যুক্ত করার এ সিলসিলা আধুনিক সময়েও থেমে নেই।

 

আহমেদ দীন রুমি: লেখক