সংগীতচর্চা বা সাধনার জন্য অন্যতম প্রয়োজনীয় বাদ্যযন্ত্র তবলা। তবলা ছাড়া গানের প্রাণ পাওয়া যায় না। দেশে একটি প্রবাদবাক্য আছে জর্দা ছাড়া পান তেমনি তবলা ছাড়া গান ভালো লাগে না। কিন্তু এই তবলা তৈরি করে সেই কারিগররা ভালো নেই। সারা দিন পরিশ্রম করে যে অর্থকড়ি পান তা দিয়ে সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে। যে কারণে নতুন করে কেউ আর এ পেশায় আসছে না। এমনকি যারা এ পেশায় জড়িত আছেন তারাও ছেলেমেয়েদের এ পেশায় আনছেন না। একসময় তবলার গ্রাম হিসেবে পরিচিত ছিল নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার ত্রিবনীপুল এলাকার এনায়েতনগর ঋষিপাড়া ও নোয়াদ্দা ঋষিপাড়া। প্রায় শতবছরের ঐতিহ্যবাহী তবলা তৈরির গ্রামে একসময় কত শত মানুষ জড়িত ছিল তবলা তৈরিতে। বংশ পরম্পরায় এ পেশায় যুক্ত হয়ে কাজ করে আসছেন তবল তৈরির কারিগররা। কিন্তু বর্তমানে নতুন করে কেউ আর এ পেশার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন না। যে কারণে বর্তমানে ২০-৩০ জনের মতো এ পেশায় যুক্ত রয়েছেন।

ত্রিবনীপুল এলাকায় অবস্থিত দুলাল চন্দ্র দাসের নির্মল মিউজিক সেন্টারে ৪০ বছর ধরে তবলা তৈরির কাজ করে আসছেন কারিগর সুজন চন্দ্র দাস (৫৩)। বাবা ক্ষিতিশ চন্দ্র দাসের কাছ থেকে শেখেন তবলা তৈরির কাজ। এক সপ্তাহে চার-পাঁচটি তবলা তৈরি করতে পারেন। প্রতিটি তবলা বেঁধে দিলে মজুরি পান ১৫০-১৬৫ টাকা। কয়েক ধাপে তৈরি করতে হয় একটি তবলা। একের ধাপের কাজ শেষ করে আবার শুকাতে হয়। পরের দিন আরেক ধাপের কাজ করতে হয়। এভাবে একটি তবলা পরিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে হলে কমপক্ষে তিনদিন সময় লাগে। কিন্তু তবলা বানিয়ে যে টাকা পাওয়া যায় তা দিয়ে সংসার চলে না। অন্য কোনো কাজ না শেখায় বাধ্য হয়েই এ কাজ করতে হচ্ছে। ফলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে খেয়ে না খেয়ে চলছে সুজন চন্দ্র দাসের জীবন-সংসার। সুজন জানান, তার একমাত্র ছেলেকে তিনি এ পেশায় আসতে দেননি। কারণ এ পেশা দিয়ে জীবন চলবে না। তাই ছেলেকে এসএস পাইপের কাজ শিখিয়েছেন। এখন তিনি ওই পেশায় কাজ করছেন।

নির্মল মিউজিক সেন্টারের স্বত্বাধিকারী সুজিত চন্দ্র দাস জানান, তবলা তৈরির জন্য বডি বা বাঁয়ার কাঠ আসে মানিকগঞ্জ থেকে আর পিতরে বাঁয়া আসে ঢাকার জিঞ্জিরা থেকে। চামড়া নিয়ে আসা হয় রংপুরের গাইবান্ধা থেকে। একটি তবলা বানাতে তিনটি চামড়া প্রয়োজন হয়। দুটি গরুর চামড়া, একটি খাসির চামড়া। সব মিলিয়ে একটি তবলা তৈরি করে ৭ হাজার টাকা বিক্রি করলে প্রতি জোড়া তবলায় ৮০০-৯০০ টাকা লাভ হয়। কিন্তু পুরো মাসে বেচাকেনা হয় আট-দশ জোড়া তবলা। আর যারা প্রফেশনাল তবলাবাদক তারা শুধু তবলার ছাউনি করে নিয়ে যান। একটি পুরনো তবলায় ছাউনি করাতে খরচ পড়ে ১ হাজার ২০০ টাকা। বর্তমানে সাধারণ মানের তবলা বিক্রি হয় ৪ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকায়, ভালো মানের তবলা বিক্রি করা যায় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। কিন্তু বর্তমানে সংস্কৃতিচর্চার হার কমে আসায় তবলা বেচাকেনায় খুবই খারাপ অবস্থা। তিনি বলেন, ‘বেচাকেনা না থাকায় কোনোমতে টিকে আছি আমরা। আমাদের এ জেনারেশনের পর এ পেশা টিকবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।’

লোকনাথ যন্ত্র সংগীতের কারিগর কেশব দাস জানান, মাত্র ৯ হাজার টাকা বেতনে কাজ করছেন তিনি। তিন বছর কাজ শিখে এ পেশায় আছেন। কিন্তু যে পরিমাণ পরিশ্রম করে একটি তবলা তৈরি করতে হয় সে অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, ‘এ পেশায় এসে এখন বুঝতে পারছি অনেক ভুল করেছি।’

তবলা তৈরির ব্যবসায়ী মনোরঞ্জন দাস বলেন, ‘৩৫ বছর ধরে এ পেশায় আছি। নিজে তবলা তৈরি করে বিক্রি করছি। কিন্তু বর্তমানে যে অবস্থা হয়েছে তবলা তৈরি করে বিক্রি করে সংসার চলে না। নিজের পরিচিতজন ছাড়া বাইরের কোনো অর্ডার নেই। সরকারিভাবে এ পেশায় নিয়োজিতদের জন্য কোনো উদ্যোগ নেই। আগে আমাদের গ্রামে দুই শতাধিক মানুষ তবলা তৈরি ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত ছিল। কিন্তু বর্তমানে ত্রিবনীপুল এলাকার তিনটি দোকানে ১০ জন কারিগর এবং এনায়েতনগর ঋষিপাড়া এলাকায় ১০-১২ জন এ ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে। বর্তমানে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ঝিমিয়ে পড়ার কারণে আমাদের অবস্থা আরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘২০২১ সালের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১ লাখ ১৮ হাজারের বেশি প্রাইমারি স্কুল, সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ আছে, সেখানে যদি শুদ্ধ সংস্কৃতিচর্চা হতো তবে তবলার চাহিদা বাড়ত।’

 

আমির হুসাইন স্মিথ: সাংবাদিক