হরিণ, কাক ও শেয়াল

বিষ্ণুশর্মা বলতে লাগলেন: সুবুদ্ধি কাকের কথা শুনে দুষ্টবুদ্ধি শেয়াল ক্ষেপে গেল। সে সুবুদ্ধির উদ্দেশে বলল: তুমি যেদিন চিত্রাঙ্গকে প্রথম দেখেছিলে, সেদিন সেও তো তোমার অজানা-অচেনা ছিল। তারপর ধীরে ধীরে তোমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গাঢ় হয়েছে। তাহলে আমার বেলায় তা হবে না কেন? আমাকে তুমি পর মনে করছ কেন? দেখো, পণ্ডিতেরা বলেন: যারা ছোটলোক, তারা আপন-পর ভেদ করে। আর যারা মহত্, তারা গোটা পৃথিবীকেই আপন মনে করেন।

সুবুদ্ধি ও দুষ্টবুদ্ধির বাদানুবাদ শুনে সরলপ্রাণ চিত্রাঙ্গ বলল: এত বাদানুবাদের কী প্রয়োজন? এসো না আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে থাকি। দেখো, কে বন্ধু আর কে শত্রু, তা তো ব্যবহারেই বোঝা যায়।

চিত্রাঙ্গর কথা শুনে সুবুদ্ধি বলল: বেশ, তা-ই হোক। আজ থেকে আমরা তিন বন্ধু।

এরপর যে যার জায়গায় চলে গেল।

একদিন দুষ্টবুদ্ধি চিত্রাঙ্গকে গোপনে ডেকে বলল: বন্ধু, ওই বনের ধারে এক শস্যক্ষেত আছে। কী কচি কচি পাতা! তুমি যদি চাও, তাহলে আমি তোমায় সেখানে নিয়ে যেতে পারি।

কচি শস্যক্ষেতের কথা শুনে চিত্রাঙ্গর আর লোভ সইল না। সে দুষ্টবুদ্ধিকে জড়িয়ে ধরে বলল: বন্ধু, আমায় একটিবার নিয়ে চলো না!

দুষ্টবুদ্ধির পরিকল্পনা সফল হতে চলেছে ভেবে সে মনে মনে খুশি হলো। সে মনের আনন্দে একদিন চিত্রাঙ্গকে সেই শস্যক্ষেতে নিয়ে গেল। চিত্রাঙ্গও কচি কচি শস্যপাতা খেয়ে অল্প দিনেই নাদুসনুদুস হয়ে উঠল। এদিকে ক্ষেতের মালিক চিত্রাঙ্গকে শস্য খেতে দেখে তাকে ধরার ফন্দি আঁটল। সে একদিন ক্ষেতে জাল বিছিয়ে দিল। পরদিন চিত্রাঙ্গ শস্যক্ষেতে গিয়েই জালে আটকা পড়ল। এমন সময় দুষ্টবুদ্ধি সেখানে গিয়ে উপস্থিত। সে ভাবল: শুভক্ষণ আর দূরে নয়। ক্ষেত্রপতি যখন একে কাটবে, তখন রক্ত-মাংস মাখানো এর হাড্ডি আমার ভাগ্যে জুটবে। দীর্ঘদিন পর একটা ভূরিভোজ হবে!

বিপদগ্রস্ত চিত্রাঙ্গ কিন্তু দুষ্টবুদ্ধিকে দেখে আশ্বস্ত হয়ে বলল: বন্ধু, শিগগির আমাকে উদ্ধার করো। জাল ছিঁড়ে আমাকে মুক্ত করো। বন্ধুর বিপদে তো বন্ধুই এগিয়ে আসে। তাই তো শাস্ত্রে বলা হয়েছে: যুদ্ধে চেনা যায় বীরকে, সজ্জনকে চেনা যায় ঋণ শোধে, স্ত্রীকে চেনা যায় দারিদ্র্যে, আর বন্ধুকে চেনা যায় বিপদে। তাছাড়া উত্সবে, বিপদে, দুর্ভিক্ষে, রাষ্ট্র বিপ্লবে, বিচারালয়ে ও শ্মশানে যে পাশে থাকে, সে-ই তো প্রকৃত বন্ধু।

চিত্রাঙ্গর কাতরোক্তি শুনে দুষ্টবুদ্ধি মনে মনে হাসতে হাসতে মুখে হতাশার ভাব ফুটিয়ে বলল: বন্ধু, কী সব্বনাশ! আজ যে রবিবার! এদিন তো আমি মাংস খাই না। তুমি যে জালে আটকা পড়েছ, তা পশুর নাড়ি দিয়ে তৈরি। তাই তুমি একটু ধৈর্য ধরো। রাতটা পোহাক। কাল আমি তোমাকে ঠিকই মুক্ত করব।

এই বলে সে কাছেই একটা জঙ্গলে লুকিয়ে রইল। এদিকে সারা দিন যায়, সন্ধ্যা হয়; কিন্তু চিত্রাঙ্গর দেখা নেই। তাই সুবুদ্ধি চিন্তায় পড়ে গেল। সে একসময় চিত্রাঙ্গর খোঁজে বেরিয়ে পড়ল। উড়তে উড়তে সেই শস্যক্ষেতে গিয়ে চিত্রাঙ্গকে জালে আবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পেল। বলল: বন্ধু, এ কী?

চিত্রাঙ্গ লজ্জা ও করুণার সুরে বলল: এ হচ্ছে বন্ধুর কথা না শোনার ফল!

সুবুদ্ধি ক্রোধের সঙ্গে বলল: সে প্রতারকটা কোথায়?

চিত্রাঙ্গ। কাছে হয়তো কোথাও লুকিয়ে আছে আমার মাংস খাওয়ার আশায়।

সুবুদ্ধি: দেখো বন্ধু, পণ্ডিতেরা বলেন: যারা সামনে মিষ্টি কথা বলে আর পেছনে সর্বনাশ করে— এমন মিত্রকে বর্জন করা উচিত। কারণ তাদের মুখে মধু, অন্তরে বিষ। আরো বলেন: দুর্জনের সঙ্গে কখনো মিত্রতা করতে নেই। তারা বন্ধু হলেও বিপদ, শত্রু হলেও বিপদ। যেমন অঙ্গার তপ্ত হলে হাত পোড়ায়, আবার শীতল হলে হাত নোংরা করে। যাহোক। এখন আমার কথা মন দিয়ে শোনো। কাল সকালে ক্ষেতের মালিক যখন আসবে, তখন তুমি মড়ার মতো পড়ে থাকবে। পেটটা ফুলিয়ে পাগুলো ছড়িয়ে দেবে। তারপর আমি যখন ‘কা-কা’ শব্দ করব, তখন ছুটে পালাবে।

পরদিন সকালে ক্ষেত্রপতি হাতে একটা লাঠি নিয়ে এদিকে আসছিল। তাকে আসতে দেখেই চিত্রাঙ্গ পেট ফুলিয়ে পা ছড়িয়ে মড়ার মতো পড়ে রইল। ক্ষেত্রপতি দূর থেকে চিত্রাঙ্গকে দেখতে পেয়ে আনন্দে উত্ফুল্ল হয়ে উঠল। কিন্তু কাছে এসে চিত্রাঙ্গকে মৃত অবস্থায় দেখতে পেয়ে হতাশ হলো। অগত্যা চিত্রাঙ্গকে জাল থেকে ছাড়িয়ে যেই জাল গোছাচ্ছিল, ঠিক তখনই সুবুদ্ধি ‘কা-কা’ করে উঠলে চিত্রাঙ্গ উঠে ভোঁ দৌড় দিল। ক্ষেত্রপতি তার পেছনে পেছনে কিছু দূর গিয়ে লাঠিটা ছুড়ে মারল। লাঠি পড়ল গিয়ে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা দুষ্টবুদ্ধির ওপর। লাঠির আঘাতে সে অক্কা পেল। সুবুদ্ধি আর চিত্রাঙ্গ তাদের গন্তব্যে চলে গেল।

এসব বলে হিরণ্যক লঘুপতনকের উদ্দেশে বলল: তাই আমি বলছিলাম, ভক্ষ্য আর ভক্ষকের মধ্যে বন্ধুত্ব হয় না।

লঘুপতনক বলল: দেখো, তোমার কথামতো তোমাকে যদি আমি খাইও, তাতে আমার পেট ভরবে না। বরং তোমাকে বন্ধু হিসেবে পেলে, তুমি বেঁচে থাকলে আমিও চিত্রগ্রীবের মতো সুন্দরভাবে বাঁচতে পারব।

হিরণ্যক। তুমি বড় চপল স্বভাবের। চপলের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা উচিত নয়। তাছাড়া তুমি আমাদের শত্রুপক্ষ। শত্রুর সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন মৃত্যুতুল্য। তাই তো বলা হয়েছে: শত্রুর সঙ্গে সন্ধি করা গেলেও মিত্রতা স্থাপন কখনই নয়। কারণ জলকে অনেক গরম করা হলেও আগুনের সঙ্গে তার মিত্রতা হয় না। সে সুযোগ পেলেই আগুনকে নেভাবে। পণ্ডিতেরা বলেন: দুর্জন বিদ্যায় ভূষিত হলেও তাকে ত্যাগ করা উচিত। কারণ সাপের মাথা মণি দ্বারা ভূষিত হলেও সে ভয়ঙ্করই হয়। যা অসম্ভব, তা কোনো দিনই সম্ভব নয়; যা সম্ভব, তা সবসময়ই সম্ভব। দেখো, গাড়ি কখনো জলে চলে না, আবার নৌকা কখনো স্থলে চলে না। কেউ যদি বিশেষ প্রয়োজেনে শত্রু কিংবা দ্বিচারিণী স্ত্রীতে বিশ্বাস করে, তবে তার মৃত্যু অবধারিত।

লঘুপতনক। আমি তোমার সব কথাই শুনলাম। তার পরও তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপনে আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তা না হলে আমি আত্মহত্যা করব। কারণ দুর্জনের সঙ্গে বন্ধুত্ব মাটির পাত্রের মতো, সহজেই ভেঙে যায়। কিন্তু সজ্জনের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্বর্ণপাত্রের মতো। তা ভাঙা কঠিন এবং ভাঙলেও জোড়া দেয়া যায়। তাছাড়া বিভিন্ন ধাতুর মিলন হয় দ্রব্যত্বের কারণে, পশু-পাখির মিলন হয় বিশেষ প্রয়োজনে, মূর্খদের মিলন হয় ভয় অথবা লোভের কারণে, কিন্তু ভালো লোকের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় তার অসাধারণ গুণের কারণে। দেখো, পণ্ডিতদের কাছে শুনেছি, ভালো লোকেরা হয় নারকেল ফলের মতো। তার বাইরে শক্ত ও অসুন্দর, কিন্তু ভেতরটা কোমল ও সুন্দর। অন্য পক্ষে খারাপ লোকেরা হয় মাকাল ফলের মতো। তাদের বাইরেটা সুন্দর, কিন্তু ভেতরটা কদর্য। প্রকৃত বন্ধুর কতগুলো গুণ আছে— পবিত্রতা, দানশীলতা, শৌর্য, সুখে-দুঃখে সমভাব, অনুরাগ ও সত্যনিষ্ঠা। এর সবই তোমার মধ্যে আছে। তাই বন্ধু করতে হলে আমি তোমাকেই করব। নতুবা তোমার দরজায় আত্মহত্যা করব।

লঘুপতনকের কথায় মুগ্ধ হয়ে হিরণ্যক বাইরে এসে বলল: আমি তোমার অমৃততুল্য কথায় অত্যন্ত প্রীত ও আশ্বস্ত হলাম। দেখো, ঘর্মাক্ত লোককে শীতল জলে ম্লান কিংবা সুগন্ধ চন্দন লেপন ততটা সুখ দিতে পারে না, যতটা পারে সজ্জনের মিষ্ট ভাষণ। এ যেন বশীকরণ মন্ত্র। তাছাড়া গোপন কথা ফাঁস করা, ভিক্ষা করা, নিষ্ঠুরতা, মনে স্থিরতা না থাকা, ক্রোধ, মিথ্যাবাদিতা ও পাশা খেলা — এগুলো বন্ধুর খারাপ গুণ। এর কোনোটাই তোমার মধ্যে নেই। থাকলে তোমার কথায়ই তা ধরা পড়ত। যাদের অন্তর পরিষ্কার, তাদের বন্ধুত্ব এক রকমের। আর যাদের মন শঠতায় পূর্ণ, তাদের কথায় ও কাজে মিল থাকে না। দুরাত্মাদের মনে এক, কথায় আরেক ও কাজে আরেক রকম হয়ে থাকে। মাহাত্মারা কিন্তু মনে-কথায়-কাজে এক হয়ে থাকেন। তাই তোমার ইচ্ছাই পূরণ হোক।

এই বলে হিরণ্যক লঘুপতনকের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করে তাকে ভালো ভালো খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করে নিজের গর্তে প্রবেশ করল। আর লঘুপতনকও হিরণ্যককে ধন্যবাদ জানিয়ে নিজের বাড়ি চলে গেল। সেদিন থেকে তারা পরস্পর আহার প্রদান, কুশল বিনিময় ও খোশ গল্প করে দিন কাটাতে লাগল।

একদিন লঘুপতনক এসে বিরস বদনে হিরণ্যককে বলল: বন্ধু, এখানে আর থাকা যাবে না। খাবারের খুব অভাব। তাই ভাবছি অন্য কোথাও চলে যাব।

হিরণ্যক। কোথায় যাবে বন্ধু? যাওয়ার আগে একবার ভালো করে ভাবো— জন্মস্থান ত্যাগ করবে কিনা। কারণ বুদ্ধিমানেরা এক পায়ে চলেন, আরেক পায়ে দাঁড়ান। তারা পরের জায়গা ভালো করে না দেখে আগের জায়গা ছাড়েন না।

লঘুপতনক। আমি সে জায়গাটা ভালো করে দেখে এসেছি।

হিরণ্যক। কোথায় সেটা?

লঘুপতনক। দণ্ডকবনে কর্পূরগৌর নামে এক সরোবর আছে। সেখানে আমার বহুকালের প্রিয় বন্ধু বাস করে। নাম মন্থরক। পরম ধার্মিক। দেখো, পরকে ধর্মোপদেশ দিয়ে পাণ্ডিত্য প্রকাশ করার লোকের অভাব নেই। কিন্তু নিজে ধর্ম পালন করেন, এমন মহাত্মা কদাচিত্ পাওয়া যায়। মন্থরক তেমনই একজন ধার্মিক।

হিরণ্যক। তাহলে আমিই বা এখানে থেকে কী করব? কারণ যে দেশে সম্মান নেই, জীবিকার উপায় নেই, মনের মতো বন্ধু নেই, বিদ্যার্জনের পথ নেই, সে দেশ বর্জন করাই উচিত। পণ্ডিতেরা বলেন: জীবিকা নির্বাহের উপায়, ভয়, লজ্জা, বদান্যতা, দানশীলতা— এ পাঁচটি যেখানে নেই, সেখানে বাস করবে না। আরো বলেন: ঋণদাতা, বৈদ্য, বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ ও জল ভরা নদী— এ চারটি না থাকলে সেখানেও বাস করা উচিত নয়। অতএব, তুমি আমাকেও সেখানে নিয়ে চলো।

তারপর একদিন লঘুপতনক ও হিরণ্যক বিচিত্র আলাপ করতে করতে সেই সরোবরের কাছে গেল। মন্থরক দীর্ঘদিন পর বন্ধু লঘুপতনককে পেয়ে অতিশয় আনন্দিত হলো। সে লঘুপতনকের সঙ্গে হিরণ্যককেও যথোচিতভাবে আপ্যায়ন করল। কারণ পরিচিতই হোক আর অপরিচিতই হোক, কেউ যদি বাড়িতে উপস্থিত হয়, তবে তার অভ্যর্থনা করা উচিত। কারণ অতিথি দেবতুল্য।

একপর্যায়ে লঘুপতনক মন্থরককে বলল: বন্ধু, এ হচ্ছে মূষিকরাজ। নাম হিরণ্যক। একজন মহান ব্যক্তি। বহুগুণের আধার। করুণার সাগর। এর গুণের কথা সহস্রমুখ বাসুকির পক্ষেও বর্ণনা করা সম্ভব নয়। তাই তুমি একে যথাযথভাবে মান্য করো।

লঘুপতনকের কথা শুনে মন্থরক হিরণ্যককে বলল: তা তোমার এ নির্জন বনে আসার কারণ কী?

হিরণ্যক বলতে লাগল: শোনো তাহলে। চম্পক নগরে পরিব্রাজক সন্ন্যাসীদের এক মঠ ছিল। সেখানে চূড়াকর্ণ নামে এক সন্ন্যাসী বাস করত। সে তার ভিক্ষান্ন ভোজন করে যা অবশিষ্ট থাকত, তা দেয়ালে পোঁতা একটি কাঠের দণ্ডে ঝুলিয়ে রাখত। আর আমিও প্রতি রাতে লাফিয়ে লাফিয়ে তা খেয়ে ফেলতাম। তারপর একদিন তার প্রিয় বন্ধু বীণাকর্ণ নামে এক সন্ন্যাসী সেখানে এল। রাতের বেলা তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে সে আমাকে তাড়ানোর জন্য একটি বাঁশের লাঠি দিয়ে মাটিতে আঘাত করছিল। এতে বীণাকর্ণ ক্ষুব্ধ হয়ে বলল: তুমি আমার ব্যাপারে মনোযোগ দিচ্ছ না। এর কারণ কী? আমি আসায় তুমি কি বিরক্ত?

চূড়াকর্ণ বিনয়ের সঙ্গে বলল: না বন্ধু, না। একটা সামান্য ইঁদুর আমাকে জ্বালিয়ে মারছে। দেখো না, আমি সারা দিন ভিক্ষা করে যা পাই, রাতে তা খেয়ে অবশিষ্টটা ওই দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখি। আর আমি যখন ঘুমাই, তখন ও লাফ দিয়ে উঠে তা খেয়ে ফেলে। কিছুতেই ওর সঙ্গে পারছি না। তাই ওকে তাড়ানোর জন্য বাঁশ দিয়ে মাটিতে আঘাত করছি।

বীণাকর্ণ সব শুনে বলল: ইঁদুরের শক্তি কম। তা সত্ত্বেও সে এত উঁচুতে লাফ দিয়ে ওঠে কী করে? নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। কারণ ছাড়া কোনো কিছু ঘটে না। তাই তো এক যুবতী স্ত্রী একদিন হঠাত্ করে তার বৃদ্ধ পতিকে সজোরে আলিঙ্গন করে কেশগুলো ছড়িয়ে দিয়ে চুম্বন করল।

চূড়াকর্ণ কৌতূহল ভরে জানতে চাইল: কী সেই ঘটনা।

বীণাকর্ণ। বলছি, শোনো।

বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা

গৌড় দেশে কৌশাম্বী নামে এক নগরী ছিল। সেই নগরীতে চন্দনদাস নামে এক ধনী বণিক বাস করত। বৃদ্ধ বয়সে সে লীলাবতী নামে এক যুবতীকে বিয়ে করে। কিন্তু সে তাকে তৃপ্তি দিতে পারত না। কারণ শীতার্ত লোকের যেমন চাঁদে আনন্দ হয় না, গরমে অতিষ্ঠ লোকের যেমন সূর্যে আনন্দ হয় না, তেমনি বৃদ্ধ স্বামীতে যুবতী স্ত্রী খুশি হয় না। তাই সে পরপুরুষে আসক্ত হয়ে বৃদ্ধ পতিকে কেবল আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু সেই বৃদ্ধ পতি তার স্ত্রীকে খুব ভালোবাসত। কারণ ধন ও জীবনের আশা মানুষের চিরকালীন। কিন্তু বৃদ্ধের কাছে যুবতী স্ত্রী প্রাণের চেয়েও প্রিয়। অথচ দেখো, জরাগ্রস্ত বৃদ্ধ বিষয় ভোগও করতে পারে না, আবার তা ত্যাগও করতে পারে না। দন্তহীন কুকুর যেমন জিভ দিয়ে কেবল হাড় চাটে, কিন্তু তা খেতেও পারে না, আবার ফেলতেও পারে না। তেমনি বৃদ্ধ পতি যুবতী স্ত্রীকে ভোগও করতে পারে না, আবার তাকে ত্যাগও করতে পারে না। তাই লীলাবতী যৌবনের তাড়নায় এক বণিক পুত্রের সঙ্গে প্রণয়ে মত্ত হলো। দিনের পর দিন তারা সুখে মিলিত হতে লাগল। একদিন তারা পালঙ্কে বসে মধুর আলাপ করছিল। তখন সূর্য পাটে বসেছে। ঘরের মধ্যে আবছা অন্ধকার। হঠাত্ স্বামীকে দেখে লীলাবতী ছুটে গিয়ে স্বামীকে জড়িয়ে ধরল এবং নিজের কেশরাশি দিয়ে স্বামীর চোখ ঢেকে দিয়ে তাকে চুম্বন করল। এ সুযোগে তার উপপতি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

বৃদ্ধ ও তার তরুণী ভার্যার গল্প বলে বীণাকর্ণ বলল: তাই আমার ধারণা, ইঁদুরটা যে এত দূরে লাফিয়ে ওঠে, এর পেছনেও একটা কারণ আছে এবং সে কারণটা হতে পারে অর্থ। কারণ এ সংসারে যার অর্থ আছে, সে-ই বলবান। অতএব, ওর অর্থের সন্ধান করতে হবে। ওর অর্থটা নিতে পারলেই ওর শক্তি শেষ। তুমিও নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবে।

হিরণ্যক বলল: তারপর বীণাকর্ণের কথায় চূড়াকর্ণ খন্তা এনে গর্ত খুঁড়ে আমার বহুদিনের সঞ্চিত ধন নিয়ে নিল। সেই থেকে আমি আমার শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। আমার সমস্ত উত্সাহ-উদ্দীপনা নষ্ট হয়ে গেছে। নিজের আহার পর্যন্ত সংগ্রহ করতে পারছি না। একদিন যখন ভয়ে ভয়ে সেই মঠের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন চূড়াকর্ণ আমায় দেখে বলতে লাগল: এ সংসারে ধন থাকলেই মানুষ বলবান হয়। ধন থাকলে লোকে তাকে পণ্ডিত বলে। দেখো, এ দুষ্ট মূষিক এখন তার স্বজাতির অন্য সবার মতো হয়ে গেছে। আসলে অর্থহীন পুরুষের সব বিদ্যা গ্রীষ্মকালের ক্ষুদ্র জলাশয়ের মতো শুকিয়ে যায়। যার টাকা আছে তার বন্ধু আছে, আত্মীয় আছে, তার সবই আছে। যার পুত্র নেই তার গৃহ শূন্য। মূর্খের ১০ দিক শূন্য। আর দরিদ্রের সব শূন্য। এসব কারণেই আমার পক্ষে আর ওখানে থাকা সম্ভব হচ্ছিল না। আর এসব কথা কাউকে বলাও অনুচিত। কারণ পণ্ডিতেরা বলেন: অর্থনাশ, মনঃকষ্ট, নিজ বাড়ির অনাচার, কারো দ্বারা বঞ্চনা, অপমান— এসব কাউকে বলা উচিত নয়। এই যখন আমার অবস্থা, তখন লঘুপতনকের মতো একজন বন্ধু পেলাম। আর তার মাধ্যমে পেলাম তোমাকে। বাকি জীবনটা তোমাদের সঙ্গেই কাটিয়ে দিতে চাই।

হিরণ্যকের কথা শুনে সবাই কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর মন্থরক একপর্যায়ে হিরণ্যককে বলল: বন্ধু, তোমার তো যোগ্যতা ছিল। তুমি আবার অর্থ সঞ্চয়ের চেষ্টা করলে না কেন?

হিরণ্যক বলল: বন্ধু, ভেবে দেখলাম, জীবন চলার জন্য যেটুকু প্রয়োজন, তার বেশিতে প্রয়োজন কী? শাস্ত্রেও তো বলা হয়েছে— সঞ্চয় ভালো, কিন্তু অতিসঞ্চয় ভালো নয়। এ অতিসঞ্চয় করতে গিয়েই তো বোকা শেয়ালের জীবন গেল।

মন্থরক ও লঘুপতনক। কী সে ঘটনা? খুলে বলো তো।

হিরণ্যক। বলছি, শোনো।

 

অতিলোভী শেয়াল

কল্যাণনগরে ভৈরব নামে এক ব্যাধ বাস করত। একদিন সে শিকারের খোঁজে বিন্ধ্যারণ্যে গেল। সেখানে সে একটি হরিণ মারল। সেটাকে কাঁধে নিয়ে যাওয়ার সময় ভয়ঙ্কর এক শূকরকে দেখতে পেল। তখন সে হরিণটাকে মাটিতে রেখে শূকরটাকে বাণে আহত করল। আহত শূকর বজ্রের মতো গর্জন করে ব্যাধকে আক্রমণ করল। তাতে ব্যাধ মারা গেল এবং শূকরটাও মারা গেল। তাদের পা দাপানিতে একটি সাপও মারা গেল। এমন সময় দীর্ঘরাব নামে এক শেয়াল খাবারের খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে সেখানে এল। বেজায় ক্ষুধার্ত সে। এতগুলো খাবার সামনে দেখে তার মনটা আনন্দে ভরে উঠল। তিন মাসের জন্য তার আর চিন্তা নেই। সে মনে মনে হিসাব করল: সাপের মাংসে যাবে একদিন। মানুষের মাংসে যাবে এক মাস। আর শূকরটার মাংসে যাবে দুই মাস। ব্যাধের ধনুকের ছিলাটা (গুণ) ছিল পশুরণ্ডায়ুতে তৈরি। তাই শেয়াল ভাবল: এটাকেই বা বাদ দিই কেন। স্বাদ একটু কম হলেও এটা দিয়েই শুরু করি।

এই ভেবে যেই ছিলায় কামড় দিয়েছে, অমনি ছিলা ছিঁড়ে ধনুকের সুচালো মাথা গিয়ে বিঁধল শেয়ালের বুকে। সঙ্গে সঙ্গে সে মারা গেল। পড়ে রইল তার তিন মাসের খাবার। হিরণ্যক বলল: এজন্যই আমি বলছি— সঞ্চয় ভালো, কিন্তু অতিসঞ্চয় ভালো নয়। অর্থাত্ অতিলোভ ভালো নয়।

হিরণ্যকের কথা শুনে মন্থরক বলল: বন্ধু, তুমি ঠিকই বলেছ। যা নষ্ট হয়ে গেছে, বুদ্ধিমানেরা তার জন্য অনুশোচনা করেন না। তুমি ওসব ভুলে আনন্দে থাকো। তুমি তোমার মনের শান্তি বজায় রাখো। দেখো, রাজা, কুলস্ত্রী, ব্রাহ্মণ, মন্ত্রী, স্তন, ধন, দাঁত, চুল, নখ— এগুলো একবার স্থানচ্যুত হলে আর শোভা পায় না। আর বুদ্ধিমানের কাছে স্বদেশ-বিদেশ বলতে কিছু নেই। তিনি যেখানেই যাবেন, সেখানেই নিজ বুদ্ধিবলে নিজের জায়গা করে নেবেন। এটাই সত্য। আরেকটা কথা সর্বদা মনে রেখো, সুখ-দুঃখ চাকার মতো ঘোরে। তাই উভয়কেই সমানভাবে গ্রহণ করা উচিত। তাহলে আর কষ্ট পাবে না। আরেকটা কথা স্মরণে রেখ: মেঘের ছায়া, দুর্জনের বন্ধুত্ব, যৌবন এবং সম্পত্তি — এগুলো বেশিদিন ভোগ করা যায় না। তাছাড়া অর্থ উপার্জনে কষ্ট, নাশে কষ্ট, রক্ষণে কষ্ট। অতএব, অর্থ আনন্দ দেয়, এ কথা কীভাবে বলা যায়? কাজেই অতীত ভুলে আজ থেকে তুমি আমাদের সঙ্গেই থাকো।

এতক্ষণ মন্থরকের বুদ্ধিদীপ্ত কথাগুলো শুনে লঘুপতনক তার উদ্দেশে বলল: বাহ্! বন্ধু, বাহ্! তোমার মতো একজন মহান ব্যক্তিকে বন্ধু হিসেবে পেয়ে আমরা ধন্য। তোমার গুণাবলি সব দিক থেকেই প্রশংসনীয়। সত্ লোকেরাই সত্ লোকদের বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারে। হাতি পাঁকে পড়লে হাতিই তাকে উদ্ধার করতে পারে। তাই আজ থেকে আমরা তিন বন্ধু একসঙ্গে সুখে বসবাস করব। লঘুপতনকের এ কথায় সবাই সায় দিল। ঠিক এমন সময় একটা হরিণ প্রাণভয়ে ছুটতে ছুটতে তাদের দিকে এগিয়ে এল। তারা সবাই তার দিকে তাকিয়ে রইল।

 

[আগামী সংখ্যায়]