আধুনিক রাজনৈতিক
মানচিত্রে হুবহু
একই না
হলেও আজকের
ইরান হচ্ছে
প্রাচীন পারস্য।
আর বাংলাদেশ,
ভারত ও
পাকিস্তান মেলালে
মিলবে প্রাচীন
ও মধ্যযুগের
হিন্দুস্তান বা
ভারত। প্রাচীন
আমল থেকেই
ভারত ও
পারস্য রাজনৈতিক
ও সাংস্কৃতিকভাবে
গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল
হিসেবে বিবেচিত।
উভয় অঞ্চলেই
সভ্যতার উদ্ভব
ও বিকাশ
ঘটেছে। আর
ওই সভ্যতা
বিকাশের নানা
পর্যায়ে প্রতিবেশী
অঞ্চল হিসেবে
সুপ্রাচীনকাল থেকেই
ভারত ও
পারস্য পরস্পরের
জনজীবনে নানা
মাত্রা যোগ
করেছে। ওই
কারণে জওহরলাল
নেহরু বলেছেন,
জাতিগত ও
ঐতিহাসিকভাবে কিছু
মানুষের সঙ্গে
ভারতের জনগণের
নিকটতম সম্পর্ক
রয়েছে। পারস্য
তথা বর্তমান
ইরানের জনগণ
তার মধ্যে
অন্যতম।
ভারতের জনজীবনে
পারস্যের প্রভাব
বিশ্লেষণ করলে
নেহরুর উপর্যুক্ত
উক্তির সত্যতা
পাওয়া যায়।
সুপ্রাচীন কাল
থেকেই ভারতীয়রা
পারস্য সভ্যতার
নানা উপকরণকে
নিজেদের সভ্যতা
ও সংস্কৃতির
অংশ হিসেবে
গ্রহণ করে
সমৃদ্ধ হয়েছে।
ওই কারণে
ভাষা, সংগীত,
স্থাপত্য, শিল্পকলা,
সাহিত্যসহ নানা
বিষয়ে ভারতীয়রা
পারস্য সভ্যতার
কাছে ঋণী।
ভারতে মুসলিম
শাসনের যুগে
ওই ঋণ
আরো বেড়েছে।
মুসলিমরা পারস্য
সংস্কৃতিকে ব্যক্তিজীবনে
নিয়মিত চর্চা
করার ফলে
সুফিবাদের মতো
অনেক পারসিক
বিষয় ভারতের
সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য
অঙ্গে পরিণত
হয়েছে।
মুসলিমদের ভারত
বিজয় ও
শাসনের ফলে
ভারতে পারস্য
সভ্যতার প্রভাব
স্থানীয় জনজীবনে
দৃশ্যমান হলেও
বাস্তবে ভারতীয়
সভ্যতা ও
সংস্কৃতিতে পারস্যের
প্রভাবের ইতিহাস
বেশ প্রাচীন।
খ্রিস্টপূর্ব ২০০০
অব্দ থেকে
এর শুরু।
পারস্য উপসাগর
পর্যন্ত বিস্তৃত
প্রাচীন মেসোপটেমীয়
সভ্যতা এবং
প্রাচীন ভারতের
সিন্ধু নদের
অববাহিকায় গড়ে
ওঠা সিন্ধু
সভ্যতার সম্পর্কের
ইতিহাসের মধ্যেও
ওই প্রভাব
খুঁজে পাওয়া
যায়। পারস্য
ও সিন্ধু
সভ্যতার হরপ্পায়
যাজক রাজার
শাসন উভয়
সভ্যতার মধ্যে
অন্যতম মিল।
ওই যাজক
রাজার ধারণা
পারসিকরা সিন্ধুর
হরপ্পাবাসীর কাছ
থেকে পায়।
ভারতীয়দের ধর্মগ্রন্থ
প্রাচীন ঋগবেদ
ও পারস্যের
জরথুস্ত্র ধর্মের
ধর্মগ্রন্থ আবেস্তার
ভাষার মধ্যেও
মিল খুঁজে
পাওয়ার ঘটনা
প্রমাণ করে
যে, উভয়
অঞ্চলের মানুষের
মধ্যে প্রাচীনকালেই
গভীর যোগাযোগ
ছিল। ঈশ্বরের
ধারণা ও
ঐশ্বরিক আইন
প্রভৃতি বিষয়ে
ঋগবেদ ও
আবেস্তার বিবরণের
মধ্যে মিল
রয়েছে। আবেস্তায়
অহুর মজদা
বা আহুরা
মাজদা এবং
ঋগবেদের অসুর
মহাৎ একই
উৎসজাত চিন্তা।
দুই.
রাজনৈতিকভাবে
প্রাচীন যুগে
ভারতের কতিপয়
এলাকা পারসিক
শাসকের অধীন
ছিল। এর
মধ্যে আচেমেনিয়ান
যুগে ভারতের
উত্তর-পশ্চিম
সীমান্তের কিছু
এলাকা পারস্য
শাসনের অধীনে
চলে যাওয়ার
ঘটনা অন্যতম।
এর ফলে
ভারত ও
পারস্যের মধ্যে
রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক
ও বাণিজ্যিক
ঘনিষ্ঠতা আরো
প্রবল হয়।
৫৫০-৫২৯
খ্রিস্টাব্দের মধ্যে
ভারতের উত্তর-পশ্চিম
সীমান্ত অঞ্চলের
প্রতিনিধিরা পারসিক
রাজার দরবারে
স্থান পায়।
পারসিক রাজা
মেদেস এবং
সম্রাট সাইরাসের
দরবারে ভারতীয়দের
প্রতিনিধি উপস্থিত
থাকত। পারস্যের
শাসক দারিয়ুসও
ভারতের কয়েকটি
অঞ্চল জয়
করে তার
সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।
পারস্যের রাজকোষের
তিন ভাগের
এক ভাগ
স্বর্ণ ভারত
থেকে দারিয়ুস
কর হিসেবে
লাভ করেন।
ইতিহাসের জনক
হেরোডোটাস তার
দ্য
হিস্টোরিস
গ্রন্থে লিখেছেন,
ভারতীয়রা দারিয়ুসের
সেনাবাহিনীর প্রতিটি
স্তরে নিযুক্ত
ছিল। দারিয়ুসের
পদাতিক ও
অশ্বারোহী বাহিনী
ভারতীয় সৈন্য
দিয়ে সজ্জিত
ছিল। ৩৩০
খ্রিস্টপূর্ব অব্দে
তৃতীয় দারিয়ুসের
সঙ্গে জগত্খ্যাত
গ্রিক বীর
আলেকজান্ডারের যুদ্ধে
ভারতীয় হাতি
বাহিনী দারিয়ুসের
হয়ে গ্রিকদের
বিরুদ্ধে যুদ্ধ
করে।
ভারতীয় অঞ্চলে
পারস্যের শাসনের
ফলে ভারতীয়রা
পারস্য সভ্যতার
নিবিড় সংস্পর্শে
যাওয়ার সুযোগ
লাভ করে।
ফলে তারা
ওই সভ্যতার
নানা বিষয়
দৈনন্দিন জীবনে
চর্চা করে।
মৌর্য রাজকীয়
শিল্পে পারস্য
প্রভাব তার
বড় প্রমাণ।
ভারতীয়রা ওই
যুগে পারস্যের
স্বর্ণ ও
রোপ্য মুদ্রা
ব্যবহার করত।
পরবর্তী সময়ে
ভারতীয়রা পারস্যের
অনুকরণে মুদ্রা
চালু করে।
ওই ভারতীয়
মুদ্রার নাম
কারসা। সম্রাট
অশোকের সময়ে
ভারতীয় সভ্যতায়
পারস্যের প্রভাব
আরো সুস্পষ্টরুপে
দৃশ্যমান হয়।
সম্রাট অশোকের
অনেক স্থাপত্যের
নির্মাণ কৌশলে
পারস্যের প্রভাব
বিদ্যমান। পারস্যের
প্রাচীন যুগের
পাহলভিদের কথা
মনুস্মৃতি, পুরান,
রামায়ণ ও
মহাভারতে উল্লেখ
রয়েছে। ওই
উল্লেখ থাকা
প্রমাণ করে
যে, ভারতীয়
ও পারসিকরা
প্রাচীন যুগে
পরস্পরের সভ্যতা
ও সংস্কৃতি
সম্পর্কে নিবিড়
খোঁজ রাখত।
তাদের মধ্যে
পারস্পরিক যোগাযোগ
ছিল। সাসানীয়
যুগেও ভারতের
গুপ্ত শাসকের
সঙ্গে সাসানীয়
শাসকদের কূটনৈতিক
ও বাণিজ্যিক
যোগাযোগ ছিল।
ওই যোগাযোগের
প্রভাব জনজীবনে
পড়ে। এর
প্রমাণ প্রাচীন
ভারতে প্রাপ্ত
অজন্তা গুহা
চিত্রে পাওয়া
যায়। ওই
গুহা চিত্রে
সাসানীয় পোশাকের
প্রভাব দৃশ্যমান।
অজন্তা গুহা
চিত্রে সাসানীয়
পোশাক পরা
পারস্য রাজার
চিত্র অংকিত
আছে। কুশান,
গান্ধারা ও
গুপ্ত চিত্রেও
সাসানীয় তথা
পারসিক প্রভাব
সুস্পষ্ট।
তিন.
প্রাচীনকাল
থেকেই ভারত
পারস্যবাসীর দ্বিতীয়
বাড়ি বা
সেকেন্ড হোম
ছিল। পারস্যে
রাজনৈতিক সংকট
দেখা দিলে
পারসিকরা ভারতে
পালিয়ে আসত।
আলেকজান্ডারের পারস্য
অভিযানের সময়
পারস্যের রাজপুত্র-রাজকন্যাসহ
অনেক মানুষ
ভারতে পালিয়ে
আসে। পরবর্তী
সময়ে তাদের
অনেকে ভারতে
স্থায়ীভাবে বসবাস
করায় ভারতীয়
সাধারণ মানুষ
পারস্যের সভ্যতা
ও সংস্কৃতির
প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে
এসে তা
আয়ত্ত করে।
নিজের জীবনাচারে
চর্চা করে।
শাহপুর শাসনের
সময়ে (৩১০-৩৭৯)
ভারতীয় চিকিৎসকদের
ইরানে খুজিস্তানের
জনদিশপুর হাসপাতালে
চিকিৎসাবিদ্যা শেখার
জন্য আমন্ত্রণ
জানানো হয়।
গ্রিক ও
পারসিক চিকিৎসকদের
সঙ্গে ভারতীয়
চিকিৎসকরা ওই
হাসপাতালে পারস্যের
রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায়
চিকিৎসাবিদ্যা শেখেন,
যা পরবর্তী
সময়ে ভারতীয়
চিকিৎসাবিদ্যাকে গভীরভাবে
প্রভাবিত করে।
বর্তমান সময়েও
ভারতের আয়ুবের্দী
চিকিৎসাশাস্ত্রে পারসিক
চিকিৎসা পদ্ধতির
অনেক রীতির
প্রয়োগ দেখা
যায়।
ওই সময়ে
ভারতের উত্তর-পশ্চিম
সীমান্ত অঞ্চলে
জরথুস্ত্রীয়ান ও
বৌদ্ধরা পরস্পরের
গভীর সংস্পর্শে
আসে। বৌদ্ধ
ধর্মে বুদ্ধের
অবয়ব নির্মাণে
জরথুস্ত্র ধর্মের
প্রভাব স্পষ্ট।
গোঁড়াপন্থী বৌদ্ধদের
অনেক ধর্মীয়
বিশ্বাস জরথুস্ত্র
ধর্ম থেকে
এসেছে। পঞ্চম
শতকে ভারতীয়
রাজা ভারতীয়
সংগীতকলা প্রদর্শনের
জন্য পাঁচজন
ভারতীয়কে পারস্যে
প্রেরণ করেন।
ওই প্রতিনিধি
দলের মাধ্যমে
ভারতীয় এবং
পারসিক সংগীত
পরস্পরের সঙ্গে
পরিচিত হয়।
ওই সফরের
মাধ্যমে ভারতীয়রা
পারসিক সংগীতের
নানা বিষয়
রপ্ত করে।
পারসিকরা সংগীতে
বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার
করত। বীণা,
বাঁশি ও
অন্যান্য উইন্ড
পাইন যন্ত্রের
মতো যন্ত্রগুলো
ওই যুগেও
সংগীতচর্চায় ব্যবহূত
হতো। ওই
যন্ত্রগুলোর ব্যবহারে
ভারতীয় উপমহাদেশে
পারসিক প্রভাব
লক্ষণীয়। ভারতীয়রা
সংগীতচর্চায় যন্ত্র
ব্যবহারের ক্ষেত্রে
পারসিকদের কাছে
অনেক ক্ষেত্রে
ঋণী। সাসানীয়
শাসক নসিরভানের
(৫৩১-৫৭৬)
সময়ে ভারত
ও পারস্যের
শাসকরা বিজ্ঞানী
ও শিল্প-সাহিত্যিক
বিনিময় করেন।
চার.
ভারতীয়
সভ্যতায় পারস্যের
প্রভাব নানা
কারণে ঘটেছে।
পারসিকদের ভারতের
কতিপয় অঞ্চল
শাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য,
প্রাচীন যুগে
পারসিক সামরিক
বাহিনীতে ভারতীয়দের
নিযুক্তি, মধ্যযুগে
ভারতীয় সামরিক
বাহিনীতে পারসিকদের
নিযুক্তি, সুলতানি
ও মোগল
ভারতে পারসিক
আমলা, উলামা,
সাহিত্যিক-শিল্পীদের
অংশগ্রহণ এবং
ভারতের সঙ্গে
পারস্যের কূটনৈতিক
সম্পর্ক এর
মধ্যে অন্যতম।
তবে ভারতের
সাধারণ মানুষের
মধ্যে পারসিক
সভ্যতা ও
সংস্কৃতির প্রভাবের
প্রধান কারণ
ছিল নানা
সময়ে পারসিকদের
ভারতে অভিবাসী
হয়ে বসবাস।
পারস্য যতবারই
রাজনৈতিক সংকটে
পড়েছে, বৈদেশিক
শক্তির কাছে
পরাজিত হয়েছে,
ততবারই পারসিকরা
পালিয়ে ভারতে
আশ্রয় গ্রহণ
করেছে। আলেকজান্ডারের
পারস্য আক্রমণ
ও বিজয়ের
সময়ে অনেক
পারসিকই প্রাণরক্ষার্থে
পালিয়ে ভারতে
চলে আসে।
পরবর্তী সময়ে
পারস্যের মুসলিম
বিজয়ের ফলে
জরথুস্ত্র ধর্মের
অনুসারীসহ অনেক
অভিজাত শ্রেণীর
লোক ভারতে
পালিয়ে আশ্রয়
নেয়ার ঘটনাও
এক্ষেত্রে উল্লেখ
করা যায়।
ওইসব অভিবাসী
পরবর্তী সময়ে
আর পারস্য
ফিরে না
গিয়ে ভারতে
স্থায়ী হয়েছে।
তাদের ভারতে
ওই স্থায়ী
বসবাসের ফলে
ভারতীয় সভ্যতা
ও সংস্কৃতিতে
পারসিক অনেক
রীতিনীতি আত্তীকরণ
ঘটেছে। সাধারণ
মানুষ পারসিক
সংস্কৃতির সংস্পর্শে
এসেছে এবং
ভারতীয়দের থেকে
যেসব পারসিক
সংস্কৃতি, চিকিৎসাপদ্ধতি
ও রীতিনীতি
উন্নত তা
গ্রহণ করেছে।
এভাবে ধীরে
ধীরে ভারতীয়
সংস্কৃতি ও
সভ্যতায় পারসিক
প্রভাব দৃঢ়
হয়।
মধ্যযুগে ভারতে
মুসলিম বিজয়
ও শাসনের
ফলে আরব,
তুর্কিসহ অন্য
ভিনদেশীদের মতো
বিপুল সংখ্যক
ভাগ্যান্বেষী পারসিক
মুসলিমের ভারতে
আগমন ঘটে।
তারা মুসলিম
সুলতান ও
বাদশা, আঞ্চলিক
শাসক এবং
সুফিদের পৃষ্ঠপোষকতায়
ভারতে স্থায়ী
হয়। ফলে
তাদের মাধ্যমেও
পারসিক সংস্কৃতি
ভারতের অভিজাত
থেকে নিম্নস্তরের
মানুষের কাছে
পরিচিতি লাভ
করে। ভারতীয়দের
চেয়ে যেসব
পারসিক রীতিনীতি
উন্নত ছিল,
সেগুলো ভারতীয়রা
নিজের দৈনন্দিন
প্রয়োজনে রপ্ত
করে নেয়।
ধীরে ধীরে
একসময় তা
ভারতীয় সমাজ
ও সংস্কৃতির
অবিচ্ছেদ্য অংশ
হয়ে ওঠে।
ভারতের মুসলিম
বিজয়ের প্রথম
দিকে পারসিক
সংস্কৃতি ও
রাজকীয় রীতিনীতি
সুলতানদের দরবারি
চর্চার মধ্যে
সীমাবদ্ধ থাকলেও
পরবর্তী সময়ে
সাধারণ মানুষের
সংস্কৃতির বিনির্মাণে
প্রভাব রাখে।
এক্ষেত্রে সুলতান
ইলতুতমিশকে পথিকৃৎ
বিবেচনা করা
যায়। তিনি
পারস্যের শিল্পী,
সাহিত্যিক, বিজ্ঞানীদের
ভারতে আমন্ত্রণ
জানান। স্থায়ী
বসবাসে উৎসাহিত
করেন এবং
তাদের জ্ঞানচর্চায়
রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা
প্রদান করেন।
খিলজি যুগে
দিল্লির সুলতানের
পৃষ্ঠপোষকতায় আমির
খুসরুর মতো
অনেক পণ্ডিত
ফার্সি ভাষা
ও সাহিত্যের
চর্চা করেন।
লোদী যুগে
বিশেষ করে
সিকান্দার লোদীর
সময়ে পারসিক
কবিরা রাজদরবারে
বিশেষ মর্যাদা
পান।
দিল্লির সুলতানদের
মতো অনেক
আঞ্চলিক শাসকও
পারসিক সংস্কৃতি
দিয়ে প্রভাবিত
হন। রাজস্থানের
নাগপুর এমন
একটি শহর।
নাগপুরের অনেক
শিলালিপিতে পারস্যের
প্রভাব প্রবলভাবে
দৃশ্যমান হয়।
বিজাপুর ও
দাক্ষিণাত্যের বাহমানী
রাজদরবারে ফার্সি
সাহিত্যচর্চার ঘটনাও
এক্ষেত্রে উল্লেখ
করা যায়।
বিজাপুর ও
বাহমানী সুলতানরা
তাদের রাজত্বে
পারসিক অভিবাসীদের
সাদরে গ্রহণ
করেন। ওই
সময়ে বড়
পরিসরে পারস্য
থেকে ভারতে
অভিবাসী হওয়ার
ঘটনা ঘটে।
ওই অভিবাসনের
ফলে পারসিক
প্রভাব ভারতীয়
সমাজের নিম্নস্তরেও
পৌঁছে যায়।
মোগলরাও পারসিক
অভিবাসীদের আমন্ত্রণ
জানান। মোগল
সম্রাট হুমায়ুনের
পারস্যবাস এবং
পারস্যের শাসক
শাহ তামাস্পের
(১৫২৪-৭৬)
সহায়তায় হারানো
রাজ্য পুনরুদ্ধারের
ঘটনায় বিপুল
সংখ্যক পারসিক
সৈন্য ভারতে
আগমন করে।
পরবর্তী সময়ে
বৈরাম খানের
মতো প্রায়
অধিকাংশ সেনাপতি
ও তাদের
অধীনস্থ পারসিক
সৈন্যরা আর
পারস্যে ফিরে
না গিয়ে
ভারতে স্থায়ী
হন। সৈন্যদের
সঙ্গে অনেক
পারসিক প্রশাসনিক
কর্মকর্তা, শিল্পী,
সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীর
আগমন ঘটে
ভারতে। তারাও
আর পারস্যে
ফিরে না
গিয়ে স্থায়ীভাবে
ভারতে থেকে
যান। তাদের
প্রভাবে পারস্যের
সংস্কৃতি ভারতের
জনমনে স্থান
করে নেয়।
সুলতানি শাসনের
দরবারি সংস্কৃতিতে
পারস্যের প্রভাবের
যে সূচনা
হয় তা
মোগল আমলে
মহীরুহ আকার
ধারণ করে।
ভারতের মোগল
দরবারি সংস্কৃতি
মূলত পারস্যের
দরবারি সংস্কৃতির
ভারতীয় সংস্করণ।
মোগলদের ওই
দরবারি সংস্কৃতি
পারস্যের দরবারি
সংস্কৃতির ওপর
ভিত্তি করে
ভারতীয় আদলে
চর্চা হতো।
মোগল সম্রাট
হুমায়ুনের পারস্যে
নির্বাসনের ঘটনায়
রাজ্য পুনরুদ্ধারে
সহায়তাকারী পারসিক
সেনাপতি ও
সৈনিক, আমলা
ও উলামা,
সাহিত্যিক ও
শিল্পীরা এক্ষেত্রে
মূল কাণ্ডারীর
ভূমিকা পালন
করেন। তাদের
প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান
ও পৃষ্ঠপোষকতায়
পারসিক সংস্কৃতি
ও রীতিনীতি
মোগল ভারতের
নিজস্ব সংস্কৃতি
ও রীতিনীতি
হিসেবে জায়গা
করে নেয়।
মোগল দরবার
ছিল তুর্কি
ও পারসিক
শিল্পী, সাহিত্যিক,
বুদ্ধিজীবীদের জন্য
বেহশত। তারা
রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায়
জ্ঞানচর্চা করতেন।
তাই ভারতের
মোগল সাহিত্য,
স্থাপত্য ও
চিত্রকলা পারস্যের
কাছে ঋণী।
মোগল চিত্রকলার
পুরোভাগজুড়ে রয়েছে
পারসিক প্রভাব।
ওই সময়ে
পারসিক চিত্রকর
মীর সৈয়দ
আলী, আবদুল
সামাদ, দোস্ত
মোহাম্মদ প্রমুখ
মোগল দরবারের
প্রভাবশালী চিত্রকর
ছিলেন। মোগল
ক্যালিগ্রাফিও মওলানা
সুলতান আলী,
মওলানা মীর
আলীর মতো
পারসিক ক্যালিওগ্রাফারদের
মাধ্যমে বিকাশ
লাভ করে।
মোগল স্থাপত্য
শিল্পেও পারসিক
প্রভাব দৃশ্যমান।
মোগলরা যদি
ভারতে আগমন
না করত,
তাহলে ভারতীয়রা
তাজমহল-লালকেল্লার
মতো সুন্দর
সুন্দর চোখ
জুড়ানো স্থাপত্যের
স্বাদ থেকে
বঞ্চিত হতো।
আর মোগলরা
যদি পারস্য
সভ্যতার প্রভাবে
প্রভাবিত না
হতো, তাহলে
মোগলদের পক্ষে
এত সুন্দর
স্থাপত্য স্থাপন
করা সম্ভব
হতো না।
তাই মোগল
স্থাপত্য শিল্পের
পুরোভাগজুড়েই পারসিক
স্থাপত্য শিল্পের
প্রভাব দৃশ্যমান।
মোগলরা মূলত
পারস্যের খোরসান
মডেলের স্থাপত্যকে
তাদের স্থাপত্য
নির্মাণে ব্যবহার
করেছে। পারসিক
স্থাপত্য শিল্পের
প্রভাবে নির্মিত
মোগলদের অন্যতম
স্থাপত্য নিদর্শন
হচ্ছে হুমায়ুন
টম্ব। ভারতের
ইতিহাসের অন্যতম
শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য
নিদর্শন এটি।
সম্রাট হুমায়ুনের
প্রথম স্ত্রী
বেগা বেগম
হুমায়ুনের স্মৃতির
উদ্দেশে পারসিক
স্থপতি সৈয়দ
মুহাম্মদ মিরাকের
পরিকল্পনায় ওই
সৌধ নির্মাণ
করেন। সম্রাট
হুমায়ুনের বংশধর
বাদশা শাহজাহান
ওই হুমায়ুন
টম্বের স্থাপত্যশৈলীর
আদলে তাজমহল
নির্মাণ করেন।
এ কারণে
তাজমহলের স্থাপত্যশৈলীতেও
পারসিক প্রভাব
রয়েছে। স্থাপত্যবিদ্যার
মতো মোগল
আমলে ভারতীয়
চিকিৎসাশাস্ত্রের ওপর
পারসিক চিকিৎসাশাস্ত্রের
প্রভাব দৃশ্যমান।
সমসাময়িক সময়ে
পারসিক হাকিম
ফতুল্লাহ লিখিত
চিকিৎসাশাস্ত্রের গ্রন্থগুলো
ভারতীয় চিকিৎসকরা
তাদের চিকিৎসাপদ্ধতির
জন্য ব্যবহার
করেছেন।
পারসিক খাবার
ভোজনরসিক ভারতীয়দের
নিত্যসঙ্গী। ওইসব
পারসিক খাবারের
মধ্যে বিরিয়ানি
অন্যতম। ঢাকা,
কলকাতা, দিল্লি,
করাচির অলিগলিসহ
বাংলাদেশ, পাকিস্তান,
ভারতের নানা
প্রান্তে বিরিয়ানি
সহজ ও
মুখরোচক খাবার
হিসেবে বেশ
জনপ্রিয়। এ
বিরিয়ানি পারস্য
থেকে ভারতে
প্রচলিত হয়েছে
মোগলদের মাধ্যমে।
মোগল রাজকীয়
রন্ধনশালায় পারসিক
বিরিয়ানি ভারতীয়
রন্ধন উপকরণের
সংমিশ্রণে আরো
স্বাদময়, মসলাদার
ও রাজসিক
হয়ে ওঠে।
ফার্সি ভাষায়
বিরিয়ানি অর্থ
রান্নার আগে
ভেজে নেয়া।
বিরিয়ানি রান্নার
আগে সুগন্ধি
চাল-ঘি
দিয়ে ভেজে
নেয়া হয়
বলে এর
এরূপ নামকরণ
হয়েছে।
ভারতীয় সভ্যতা
ও সংস্কৃতিতে
পারস্য প্রভাবের
অন্যতম উদাহরণ
হিসেবে বিবেচনা
করা হয়
সুফি সংস্কৃতিকে।
পারসিক সুফি
সংস্কৃতিকে ভারতীয়রা
আপন করে
নেয়। যদিও
সুফি সংস্কৃতির
উৎস খুঁজতে
গেলে ভারতকে
এর জন্মভূমি
বিবেচনা করা
যায়। ভারতীয়
মরমি ধারণাই
পারস্যে গিয়ে
পারস্য ও
ভারতীয় চিন্তার
মিশ্রণে নতুন
চিন্তার বিকাশে
জন্ম দিয়েছে
সুফিবাদ। মূলত
ভারতীয় মরমিবাদই
পারস্যে গিয়ে
পারসিক উপাদান
ধারণ করে
সুফিবাদে রূপান্তরিত
হয়ে মুসলিম
যুগে ভারতে
ফিরে আসে।
তাই সুফিবাদে
পারসিক প্রভাব
প্রবল হলেও
ভারতীয় উপাদান
থাকায় মধ্যযুগে
খুব সহজে
ভারতীদের কাছে
জনপ্রিয় হয়।
ভারতের প্রায়
অর্ধেকেরও বেশি
সুফি-সাধক
পারস্য থেকে
ভারতে অভিবাসী
হয়ে ধর্ম
প্রচার করেছেন।
চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া,
সরোওয়ার্দি তরিকার
সুফিবাদের মূল
জন্মস্থান পারস্য
হলেও তা
বিকশিত হয়েছে
ভারতে। ওই
ঘরানার সুফিরা
পারস্য থেকে
এসে ভারতে
স্থায়ী হয়ে
তাদের সুফি
মতবাদ প্রচার
করেছেন। তাই
ওই তরিকার
সুফি সংস্কৃতির
পুরোটা জুড়েই
রয়েছে পারসিক
প্রভাব।
পাঁচ.
ভারতের
প্রাচীন প্রধান
ভাষা সংস্কৃত
হলেও মুসলিম
শাসনামলে ফার্সি
ভারতে রাজভাষার
মর্যাদা পায়।
ফলে ফার্সি
ভাষায় বহু
সাহিত্য রচিত
হয় সুলতান
ও মোগল
বাদশাদের পৃষ্ঠপোষকতায়।
মধ্যযুগে ফার্সি
ভাষায় যত
সাহিত্য রচিত
হয়েছে, তার
বেশির ভাগই
রচিত হয়েছে
ভারতে। আল
বেরুনির কিতাব
আল হিন্দ,
জিয়া-উদ-দীন
বরানীর তারিখ-ই-ফিরুজ
শাহি ও
আবুল ফজলের
আইন-ই
আকবরির মতো
ফার্সি ভাষায়
লিখিত গ্রন্থগুলো
মধ্যযুগের ভারতীয়
সাহিত্য ও
ইতিহাসকে সমৃদ্ধ
করেছে। মধ্যযুগের
ভারতের প্রধান
কবি সাইব,
বিদিল, নাজিরি,
ফৈজী, উরফি,
আমির খুসরু,
গালিব ও
ব্রাহ্মণ ফার্সি
ভাষায় তাদের
সাহিত্য রচনা
করেছেন।
ব্রিটিশ যুগে
সরকারি কাজে
ইংরেজি চালু
করার আগ
পর্যন্ত ফার্সি
ছিল ভারতের
প্রধান দাপ্তরিক
ভাষা। ফলে
মুসলিম ছাড়া
হিন্দু, বৌদ্ধসহ
নানা ধর্ম-মতের
জাতির মানুষরা
ফার্সি শিখতেন।
ফার্সি ভাষার
চর্চা পরিবারেও
প্রচলিত ছিল।
মধ্যযুগে ভারতীয়রা
রাজকর্মচারী পদে
নিযুক্ত লাভের
জন্য শুধু
ফার্সি শিখতেন
তা নয়,
জনজীবনে ফার্সির
ব্যাপক প্রভাব
থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যসহ
নানা কাজে
যোগাযোগের মাধ্যম
হিসেবে ফার্সি
শেখার প্রয়োজন
হয়। কারণ
আজকের ইংরেজি
ভাষার মতো
সেদিন ফার্সি
ছিল ভারতের
লিংগুয়া ফ্রাংকা।
ফার্সি ছিল
মধ্যযুগের ভারতীয়
সংস্কৃতির মূল
উপাদান। প্রধান
ভাষা। মধ্যযুগের
ভারতীয় সংস্কৃতি
ও সভ্যতা
ওই ফার্সি
ভাষা কেন্দ্র
করে বিকশিত
হয়। ফার্সি
ভাষা জনজীবনে
এতটা প্রভাব
বিস্তার করে
যে অন্য
ভাষাভাষীদের জন্য
অনেক ফার্সি
শব্দ নিজস্ব
শব্দ হয়ে
ওঠে। ফলে
তারা ফার্সি
শব্দকে তাদের
ভাষার শব্দ
হিসেবে জনজীবনে
ব্যবহার করে।
এভাবে ধীরে
ধীরে ফার্সি
ভাষার ওইসব
শব্দ ভারতীয়
অন্য ভাষার
শব্দভাণ্ডারে যুক্ত
হয়। আধুনিক
ভারতের প্রায়
সব ভাষাই
ফার্সি ভাষা
থেকে প্রচুর
শব্দ নিজ
ভাষায় আত্তীকরণ
করেছে। বাংলা,
হিন্দি, উর্দু,
মালায়লাম, তামিল
ভাষার শব্দভাণ্ডারে
প্রচুর ফার্সি
শব্দ রয়েছে।
পরিশেষে, পৃথিবীর
কোনো সভ্যতাই
শুধু নিজস্ব
ভাষা ও
সংস্কৃতির ওপর
নির্ভর করে
গড়ে ওঠেনি।
উদ্ভব ও
বিকাশের নানা
পর্যায়ে অন্য
সভ্যতার সংস্কৃতি
ও ভাষার
কাছে ঋণী।
ভারতীয় সভ্যতার
উদ্ভব ও
বিকাশের নানা
পর্যায়ে ভারতীয়রাও
তেমনি পারসিক
সভ্যতার উন্নত
চিন্তা গ্রহণের
মাধ্যমে সমৃদ্ধ
হয়েছে। প্রাচীনকাল
থেকে ভারতীয়রা
পারসিকদের সংস্পর্শে
আসায় ভারতীয়
ধর্মচিন্তায়ও পারসিক
প্রভাব লক্ষ
করা যায়।
মধ্যযুগে পারস্য
প্রভাবিত মুসলিম
শাসকরা ভারত
শাসন করায়
ভারতে রাজকীয়
পৃষ্ঠপোষকতায় পারসিক
ভাষা ও
সংস্কৃতির বিকাশ
ঘটে। মুসলিম
সুলতান ও
বাদশাহী শাসনে
ফার্সি দাপ্তরিক
ভাষা হওয়ায়
ভারতীয় সমাজের
গভীরে পারসিক
সভ্যতা পৌঁছে
যায়। ওই
প্রভাব আজও
বাংলাসহ ভারতের
অন্য অঞ্চলের
ভাষা এবং
ওই ভাষাগোষ্ঠীর
মানুষের জনজীবনে
বিদ্যমান।
মো. আবুসালেহ সেকেন্দার: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়





