ফরাসি চলচ্চিত্র নির্মাতা ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো জীবনসায়াহ্নে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, যদি কেউ চলচ্চিত্র নিয়ে লেখালেখি করেন, সেটা তাকে চলচ্চিত্র বুঝতে সাহায্য করে। এর কারণ, লেখালেখি করলে চলচ্চিত্রের সঙ্গে বোঝাপড়া যেমন হয়, তেমনি একটি চলচ্চিত্রের দোষত্রুটিও ধরা পড়ে। এ কথা তো অনেকেরই জানা, তরুণ ত্রুফো চলচ্চিত্র সমালোচনা লিখে লিখেই রুপালি জগতের দিকে পা বাড়িয়েছিলেন। পরে তিনি ছবি পরিচালনা করে বিখ্যাত হন।

ত্রুফোর মতো চলচ্চিত্র-বিষয়ক লেখালেখি ও পরিচালনা যুগপৎ করেছেন এমন পরিচালক বাঙালিদের মধ্যেও রয়েছেন, যেমন— সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন। বাংলাদেশে এমন দু-একজনের নাম নিলে নিতে হয় আলমগীর কবির কিম্বা তারেক মাসুদের নাম। তবে পরিচালক  নন, শুদ্ধ চলচ্চিত্র সমালোচনা বা এই বিষয়েই লেখালেখি করেছেন বা করছেন, তেমন ব্যক্তির সংখ্যাও নেহাত কম নয় দুনিয়ায়। আদ্রেঁ বাজাঁ, রজার এবার্ট, এন্ড্রু স্যারিস থেকে ডেরেক মেলকম, কত কত নাম। ভারতীয় বাঙালিদের মধ্যে বলা যেতে পারে চিদানন্দ দাশগুপ্ত, ধীমান দাশগুপ্ত, সোমেশ্বর ভৌমিকের নাম। বাংলাদেশে অনুপম হায়াৎ, মাহমুদুল হোসেন থেকে শুরু করে তরুণ অনেকের নামই নেয়া যায়, এতে তালিকা দীর্ঘ হবে, সেটি আমার উদ্দেশ্য নয়, মূল কথায় আসি, চলচ্চিত্র সাহিত্য আদতে কী? আর কেনই বা এই বস্তু আমাদের দরকার? এই দুই প্রশ্নের জবাব দিতেই নাতিদীর্ঘ রচনা লিখতে বসা।

চলচ্চিত্রের সাহিত্য, যা চলে লিখিত আকারে, সেটাকেই আমরা চলচ্চিত্র সাহিত্য বা ফিল্ম লিটারেচার বলতে পারি। তো চলচ্চিত্র সাহিত্য কেন প্রয়োজন, সেই আলাপে ঢোকার আগে বলা অপ্রয়োজনীয় হবে না চলচ্চিত্র সাহিত্য বলতে আসলে কী বোঝায়? চলচ্চিত্রকেন্দ্রিক সব রকম লেখালেখি বা লিখিত রূপই এর অন্তর্ভুক্ত— চিত্রনাট্য, ফিল্ম রিভিউ, চলচ্চিত্র সমালোচনা, চলচ্চিত্র গবেষণা, চলচ্চিত্র-বিষয়ক প্রবন্ধ, চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট কারো সাক্ষাত্কার, দিনলিপি, জীবনী, এমনকি চলচ্চিত্র-বিষয়ক বইয়ের সমালোচনাও এর আওতাভুক্ত হবে বলে আমার ধারণা।

চিত্রনাট্য নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, এই বিশেষ লেখালেখিকে আসলে সাহিত্য বলা যায় কিনা, এই প্রসঙ্গে বলা যায় সাহিত্যগুণসমৃদ্ধ চিত্রনাট্য হলে, সেটিকেই চলচ্চিত্র সাহিত্য হিসেবে গণ্য করা যায়, নতুবা নয়। অনেক পরিচালক তো শুটিং স্পটে গিয়ে চিত্রনাট্য তৈরি করেন, তাও আবার লিখিত আকারে সেটি থাকে না, থাকে মাথার ভেতর। যেমন ফরাসি নির্মাতা জঁ লুক গদার, তিনি তো কাগজে নয়, মাথায় ধারণা নিয়ে চিত্রায়ণ করতে নামতেন, এর পর অভিনয়শিল্পীদের সঙ্গে নিয়ে নিজের ধারণাকে একটি রূপ দিতেন। আর যদিও বা কখনো লিখিত চিত্রনাট্য থাকত, তাতে সংলাপ বসত ক্যামেরা অন করার কয়েক মিনিট আগে। আর রবের ব্রেসোঁ শুটিংয়ে কী করবেন, সেটা ভেবেই সকালে রওনা দিতেন স্পটের দিকে, কিন্তু কীভাবে করবেন, সেই ভাবনা ভাবতেন পরে। এমন উদাহরণ আধুনিক চলচ্চিত্র চর্চায় আরো পাওয়া যাবে। সেক্ষেত্রে চিত্রনাট্যের সাহিত্য হয়ে ওঠার প্রসঙ্গ অবান্তর। অবশ্য আন্দ্রে তারকাভস্কি মনে করেন চলচ্চিত্র নির্মাণের পর চিত্রনাট্যকে আর কোনোভাবেই সাহিত্যকর্ম বলা যায় না। তিনি মনে করেন, চলচ্চিত্রের ভেতর থেকে আপনি শুদ্ধ সাহিত্যের গন্ধটুকুই পাবেন, আলাদা অস্তিত্ব পাবেন না। ‘স্কাল্পটিং ইন টাইম’ বইতে এই আলোচনা তিনি আরো বিশদ করেছেন।

এ তো গেল একদল পরিচালক, যারা চিত্রনাট্যের ধার ধারেন না, কেউ আবার চিত্রনাট্যকে স্বতন্ত্রভাবে সাহিত্য বলতেও রাজি নন। তবে অনেক পরিচালক ও পণ্ডিত কিন্তু চিত্রনাট্যকে কবিতার সঙ্গে তুলনা করেন, চিত্রনাট্যের সাহিত্যগুণের কথাও বলেন। তাদের যুক্তি অনেক চিত্রনাট্য পড়লে আপনার চোখের সামনে গল্প ফুটে উঠবে নিশ্চিত। এক্ষেত্রে সত্যজিতের কথা বলতে পারেন। তার চিত্রনাট্য পড়ে সাহিত্যের স্বাদই পাওয়া যায়। কেউ কেউ গ্রাফিক নভেলের অনুভূতিও পেতে পারেন। অধ্যাপক চার্লস ডিমারের বরাত দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের গবেষক মানবেন্দ্র সাহা মন্তব্য করেন, ‘যে চিত্রনাট্যে সাহিত্যের বৈভব আছে, অথবা যে চিত্রনাট্য নান্দনিকভাবে সাহিত্যের সংরূপ হয়ে ওঠে, তাকে সাহিত্যিক চিত্রনাট্য বলা যায়।’ চিত্রনাট্য যে সাহিত্যেরই একটি অংশ, সেটি প্রমাণ করতে গোটা একটি গ্রন্থই রচনা করেছেন সাহা, নাম ‘চিত্রনাট্য: সাহিত্যের নতুন ভুবন’।

সব কবিতা, গল্প বা উপন্যাস যেমন সাহিত্যগুণ সমৃদ্ধ হয় না, তেমনি সব চিত্রনাট্যেরও সাহিত্যগুণ থাকে না। তবে এটা সবাইকে মানতেই হবে, সাহিত্যমান সমৃদ্ধ চিত্রনাট্য ভবিষ্যৎ নির্মাতার জন্য যেমন উপকারী, তেমনি চিত্রসমালোচকের জন্যও দরকারি রেফারেন্স হিসেবে। সুলিখিত চিত্রনাট্য থাকলে সাধারণ পাঠকও চলচ্চিত্র তৈরির রূপকল্পকে লিখিত আকারে হাতের নাগালে পান। যদি সেটা পড়ে চিত্রকল্প মনে আসে, তো সেই চিত্রনাট্য সফল, চলচ্চিত্র সাহিত্যের মাপকাঠিতে। অবশ্য সফল হোক, আর বিফল, শেষ পর্যন্ত বিখ্যাত চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের একটি মহাফেজখানার মূল্য বা আর্কাইভাল ভ্যালু তো থাকেই।

এবার যদি আসি চলচ্চিত্র সমালোচনা প্রসঙ্গে, সাহিত্যের এই বিশেষ শাখার প্রয়োজনীয়তার কথা শুরুতেই কিছুটা ইঙ্গিত দেয়া আছে। শুরুর কথার সাথে আরো যোগ করে বলতে চাই, সমালোচনা সাহিত্য কখনো কখনো শিল্পকর্ম সম্পর্কে চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে, ভাবনার নতুন ভঙ্গি উপস্থাপন করে। চলচ্চিত্র তাত্ত্বিক ক্রিস্তিয়া মেত্জ যেমনটা বলেন, চলচ্চিত্রকে ব্যাখ্যা করা কঠিন, কারণ চলচ্চিত্র দেখে সহজেই বোঝা যায়। ওই কঠিন কাজটিই করে দেন চলচ্চিত্র সমালোচক, তিনি চলচ্চিত্রকে ব্যাখ্যা করেন। এতে অনেক সময় পরিচালকের হয়তো বিরাগভাজন হন সমালোচক, কিন্তু তাতে আখেরে উপকৃত হন দর্শক ও পাঠক, এমনকি পরিচালক এবং শেষ বিচারে চলচ্চিত্র। কারণ সমালোচকের দেখিয়ে দেয়া ভুলত্রুটিগুলো নির্মাতা এড়াতে পারেন পরবর্তী নির্মাণে। সমালোচনার বিষয়টি একটু দার্ঢ্য হতে পারে, ওতে পরিচালকের অতটা বিচলিত না হলেও চলে। কারণ ত্রুফো যেমনটা বলেন, পরিচালকের আসল শত্রু সমালোচক নন, দর্শক।&dquote;&dquote;

দর্শক যদি কোনো সিনেমাকে গ্রহণ করেন, সেটি শত খারাপ হলেও মানুষ দেখবে এবং পরিচালক নাম কুড়াবেন। তাছাড়া পরিচালকের মাথায় রাখা প্রয়োজন, যে কাজ নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনা হয় না, সেটি কোনো কাজই হয়নি আসলে। কাজেই সমালোচকের সমালোচনা নির্মাতা মূল্য দেবেন, কিন্তু ধরে বসে থাকবেন না। সমালোচক যেহেতু শট, সিকুয়েন্স ধরে ধরে আলোচনা করেন, ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন চলচ্চিত্রের সার্বিক চিত্র, হাজির করেন নির্মাতার সাফল্য ও ব্যর্থতার খতিয়ান, সেসব থেকে যতটুকু গ্রহণ করার, নির্মাতা তা করবেন। এর পর নিজের বুদ্ধিবিবেচনা দিয়ে পরবর্তী প্রকল্পের জন্য এগিয়ে যাবেন। অন্যদিকে সমালোচকেরও উচিত নয় অযৌক্তিক সমালোচনা করা। চিদানন্দ দাশগুপ্ত যেমনটা বলেন, জজিয়তি রায় দেয়া সমালোচকের প্রধানতম কর্তব্য নয়। বরং শিল্পী ও দর্শকের মধ্যে সেতুবন্ধনই সমালোচক তথা সমালোচনার প্রাথমিক লক্ষ্য। একই রকম কথা অবশ্য আগেই বলে গেছেন ত্রুফো। সমালোচক থেকে পরিচালক হওয়া ত্রুফো মনে করেন, শিল্পী ও জনগণের মধ্যে সমালোচনার ভূমিকা মধ্যস্থতাকারীর।

সমালোচনা শিল্পের পরিপূরক হওয়া উচিত বলে মনে করেন ত্রুফো। আর সেটা হলে আখেরে শিল্প বা চলচ্চিত্রেরই লাভ। সমালোচনার অনুজ হলো ফিল্ম রিভিউ, এই ধরনের রচনায় একটি ছবি দেখে সেটি সম্পর্কে দু-একটি কথা বলা হয়, প্রাথমিক ধারণা দেয়ার জন্য। ছবির কাহিনী, চরিত্র, অভিনয়, সম্পাদনা ও পরিচালনা নিয়ে মন্তব্যধর্মী সংক্ষিপ্ত লেখাই ফিল্ম রিভিউ। এর সঙ্গে সমালোচনা বা ক্রিটিসিজমের বড় পার্থক্য হলো লেখনশৈলী ও উদ্দেশ্যে। রিভিউর যদি বাংলা করি, ‘দেখে লেখা’। তো এই দেখে লেখার ক্ষেত্রে যেহেতু চলচ্চিত্র সাধারণত একবারই দেখা হয়, তাই লেখাটিও হয় ছোট। এর উদ্দেশ্য হয় পাঠককে ছবি সম্পর্কে একটি মোটামুটি ধারণা দেয়া। অন্যদিকে সমালোচনার ক্ষেত্রে সমালোচককে একটি ছবি দেখতে হয় কয়েকবার। এর কারণ সমালোচক ছবিটির ভালো ও মন্দ বিচার করার ক্ষেত্রে বেছে নেন ছবির নানা অংশ, বিশেষ করে গোটা ছবির বক্তব্য, তার আদর্শিক, রাজনৈতিক ও দার্শনিক অবস্থান তিনি আমলে নেন, এর পর দৃশ্যবিন্যাস, সংলাপ, সম্পাদনা ও পরিচালনা— সবটা মিলিয়ে গোটা ছবি সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ দৃষ্টিভঙ্গি সমালোচক পাঠকের সামনে হাজির করেন। এতে পাঠক নতুন চিন্তাভাবনার খোরাক পান, নিজের দেখা ছবিটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝার সুযোগ পান। সেই তুলনায় ‘দেখে লেখা’র কষ্টটা কম। এদের উপস্থিতি দৈনিক বা পাক্ষিক পত্রিকার একটি ছোট অংশেই দেখা যায়, অন্যদিকে সমালোচনা ছাপা হয় চলচ্চিত্র-বিষয়ক পত্রিকা বা ম্যাগাজিনে, একটু বড় পরিসরে।

আকারে ও মেজাজে সমালোচনা ও রিভিউ ভিন্ন হলেও দুটিতেই কিন্তু পরিচালকের প্রতিক্রিয়া একই রকম হতে পারে। সমালোচনা দেখে পরিচালক যেমন ক্ষেপে যেতে পারেন, ফিল্ম রিভিউও নির্মাতার মেজাজের পারদ ওপরে চড়াতে পারে। যেমন সুইডেনের জগদ্বিখ্যাত নির্মাতা ইঙ্গমার বারিম্যান নাকি একবার স্টকহোমের এক রিভিউয়ারকে চড়ই মেরে বসেছিলেন। পরিচালক ও রিভিউয়ারের এমন সাপে-নেউলে সম্পর্ক কাম্য নয়। তবে এটা ঠিক রিভিউ দেখেই প্রাথমিকভাবে দর্শক সিদ্ধান্ত নেন ছবিটি তারা দেখবেন কি দেখবেন না। পরে অবশ্য সেই সিদ্ধান্তেই যে তারা আটকে থাকেন, তা নয়। ছবির প্রচারের কৌশলের ওপরও নির্ভর করে অনেক কিছু। প্রচার ভালো হলে রিভিউতে তেমন কিছু যায় আসে না। তার পরও ভালো রিভিউর কিন্তু সাহিত্যিক মূল্য আছে। রিভিউ লেখকের গদ্য যদি শক্তিশালী হয়, সঙ্গে যদি থাকে অন্তর্দৃষ্টি, তাহলে সেই ছোট রচনাটিই হয়ে উঠতে পারে সুখপাঠ্য ও গুরুত্বপূর্ণ। সেসবের ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক মূল্যও আছে বৈকি।

সমালোচনা ও ফিল্ম রিভিউর পাশাপাশি চলচ্চিত্র নিয়ে গবেষণার পরিমাণও এখন বাড়ছে। চলচ্চিত্রকে কেন্দ্রে রেখে অনেক গবেষকই আজকাল জনসংস্কৃতিকে নতুন করে বুঝতে চাইছেন, কেউ ব্যাখ্যা করতে চাইছেন জাতীয়তাবাদ, কেউ হাজির করতে চাইছেন মনোবিশ্লেষণ। চলচ্চিত্রকে শিল্পের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে গণ্য করে একে নানা কোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করে গবেষক চান জ্ঞানকাণ্ডে নতুন কিছু যোগ করতে। এতে চলচ্চিত্রচর্চা যেমন সমৃদ্ধ হয়, তেমনি স্বতন্ত্রভাবে জ্ঞানচর্চাও অগ্রসর হয়।

গবেষণার পাশাপাশি চলচ্চিত্র-বিষয়ক যেকোনো প্রবন্ধেরও রয়েছে একই রকম গুরুত্ব। যেমন ধরা যাক, সের্গেই আইজেনস্টাইনের ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজ বনাম সাধারণ মন্তাজ, চলচ্চিত্রে একজন অভিনয়শিল্পী কীভাবে কনস্তানতিন স্তানিস্লাভস্কির ‘ম্যাজিক ইফ’ বা ‘জাদুকরী যদি’র ব্যবহার করেন অথবা চলচ্চিত্রে সেমিওলজি বা চিহ্নবিদ্যা কীভাবে কাজ করে ইত্যাদি নানা আঙ্গিক ও গভীরতার প্রবন্ধ লিখিত হতে পারে। প্রাবন্ধিক নিজের জ্ঞানের আলোকে ও আগ্রহের জায়গা থেকে নানা রকম প্রবন্ধ রচনা করতে পারেন, সেগুলোকে শুধু চলচ্চিত্র সাহিত্যে নয়, প্রবন্ধ সাহিত্যেও মূল্যবান সংযোজন বলে গণ্য করা হবে। সংযোজিত এই বস্তু কিন্তু নির্মাতার জন্যও বেশ উপকারী। কোনো পরিচালক বলবেন যে আদ্রেঁ বাজাঁর ‘হোয়াট ইজ সিনেমা’র দুই বালাম বা জিল দল্যুজের ‘সিনেমা’র দুই বালাম, কিংবা আইজেনস্টাইনের ‘ফিল্ম ফর্ম’ ও ‘ফিল্ম সেন্স’ ইত্যাদি চলচ্চিত্র-বিষয়ক প্রবন্ধের বইগুলো অদরকারি? চলচ্চিত্রকে ইতিহাস, রাজনীতি ও দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে এসব বই বা প্রবন্ধের কোনো বিকল্প নেই। ‘ব্যাটলশিপ পটেমকিন’ ছবিতে কেন দ্বান্দ্বিক উপায়ে সম্পাদনা হাজির করা হয়েছে, এর সঙ্গে কার্ল মার্কসের প্রদর্শিত দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের সম্পর্ক কী, সেগুলো বোঝা যাবে আইজেনস্টাইনের লেখা প্রবন্ধ পড়েই। রুশ মন্তাজ নিয়ে আইজেনস্টাইনের এই প্রবন্ধ যে কত শত পরিচালককে প্রভাবিত করেছে, তার ইয়ত্তা নেই। কাজেই চলচ্চিত্র-বিষয়ক প্রবন্ধ পরিচালকের জন্য যেমন কেজো জিনিস, তেমনি চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছেও জ্ঞান অর্জনের এক ভিন্ন জানালা।

সাক্ষাত্কারের কথা আর কি বলব? সাহিত্যে সাক্ষাত্কারের মূল্য কী, সে তো আর আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই। গোটা দুনিয়ার মাস্টার ফিল্ম মেকাররা চলচ্চিত্র নিয়ে কী ভাবেন বা তাদের চিন্তা ও কর্মপদ্ধতি ছাড়াও জীবনাচরণ, দেশ, কাল, জাতি নানা প্রসঙ্গই উঠে আসতে পারে একজন পরিচালকের সাক্ষাত্কারে। এই সাক্ষাত্কারের মাধ্যমেই একজন অভিনয়শিল্পী বা একজন সিনেমাটোগ্রাফার নিজ অবস্থান থেকে চলচ্চিত্রকে দেখার অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে নিতে পারেন পাঠকের সঙ্গে। ঐতিহাসিক দলিল হিসেবেও সাক্ষাত্কারের গুরুত্ব কম নয়। একজন শিল্পীকে বোঝার ক্ষেত্রে যেমন তার কর্মকে বিচার করা যায়, তেমনি পাঠ করা যায় তার সাক্ষাত্কার। তাই তো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন ভাষায় বিখ্যাত পরিচালক ও অভিনয়শিল্পীদের প্রচুর সাক্ষাত্কারভিত্তিক গ্রন্থের দেখা মেলে।

দিনলিপি বা ডায়েরির কথা যদি বলি, তাহলে তো প্রথমেই মনে পড়ে আন্দ্রেই তারকাভস্কির কথা। আর জীবনী যদি বলি, তো মনে পড়ে ইঙ্গমার বারিমানের ‘দ্য ম্যাজিক ল্যানটার্ন’ বা আকিরা কুরোসাওয়ার ‘সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’র কথা। এসব দিনলিপি বা আত্মজীবনী পড়ে মানুষ সাহিত্যরস আস্বাদনের পাশাপাশি নানা সংস্কৃতি ও জীবনবোধ আবিষ্কার করে। মোট কথা লিখিত এসব দলিলের মূল্য প্রকৃত অর্থেই অমূল্য।

আর যেকোনো সমাজের জন্যই এই কথা সত্য যে, শিল্পচর্চার লিখিতরূপ থাকা চাই। নইলে সবাই বিচ্ছিন্নভাবে একই জায়গা থেকে শুরু করবে। যদি লিখিত কোনো রূপ না থাকে, তাহলে ভাবনার লেনদেন হবে না এবং ধারাবাহিক সংরক্ষণের অভাবে জ্ঞানচর্চা ঘুরপাক খাবে একই বৃত্তে, অগ্রগতি শ্লথ বা বন্ধও হয়ে যেতে পারে। তাই সুবিন্যস্ত লিখিত রূপ বা সাহিত্য অত্যন্ত জরুরি। অবশ্য এটা শিল্পসংস্কৃতি ও জ্ঞানবিজ্ঞানের যেকোনো শাখার ক্ষেত্রেই সত্য।

বাংলাদেশে বিজ্ঞানচর্চা কিম্বা দর্শনচর্চা, মঞ্চনাটক কি চলচ্চিত্র, কোনোটা নিয়েই তেমন উল্লেখযোগ্য হারে সাহিত্য তৈরি হয়নি, হচ্ছে না। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন, বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ ছাড়াও বিচ্ছিন্নভাবে অনেকেই চলচ্চিত্র সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন ছোট পত্রিকা বা সংকলন প্রকাশ করে। ইদানীং অনেক চলচ্চিত্র সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি কিছু প্রতিষ্ঠান চলচ্চিত্র সাহিত্য সৃষ্টিতে মনোযোগী হয়েছে। এটা সুখের বিষয়। তবে প্রয়োজনের তুলনায় এই সাহিত্য অপ্রতুল, চলচ্চিত্র সাহিত্য প্রকাশ করা যায় সে রকম পত্রিকাও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। কারণ চলচ্চিত্রকে জানা ও বোঝার জন্য যে সংখ্যক মানুষ রয়েছে এবং যাদের চলচ্চিত্র বোঝালে চলচ্চিত্র কারখানায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা সম্ভব, সেই পরিমাণ চলচ্চিত্র সাহিত্য তৈরি হচ্ছে না। এজন্য চলচ্চিত্রকর্মীরা দায়ী নন। এ দেশের শিক্ষার যে অবস্থা, তাতে নিজের জমিজমার হিসাব, দৈনিক পত্রিকা পড়া, দরকারি স্বাক্ষর— এসব কাজই ভালোভাবে করতে পারে না অধিকাংশ মানুষ। আর চলচ্চিত্র পাঠ, শিল্পের রস আস্বাদন, সাহিত্যচর্চা এগুলো তো বহু পরের বিষয়। শিক্ষা খাতের প্রতি যদি সরকার আরেকটু আন্তরিক হয়, তাহলে ধীরে ধীরে শিল্পসাহিত্যকে আরো বেশি মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। এতে সমাজে নতুন ভোক্তাশ্রেণী তৈরি হবে, যারা আরো নানা স্বাদের চলচ্চিত্র দেখতে চাইবে, সেসব ছবি সম্পর্কে পড়তে চাইবে। চলচ্চিত্র সম্পর্কে পড়তে চাওয়ার এ চাহিদার ওপর ভর করে নতুন লেখক যেমন তৈরি হবে, তেমনি লেখকদেরও প্রসার বাড়বে, প্রসার ঘটবে জ্ঞানচর্চার।