তারা দুই বোনই কথাসাহিত্যিক— বড় বোন উইনসাম রুথ কে গডেন (১৯০৬-১৯৮৪) আর ছোট বোন মার্গারেট রুমার গডেন (১০ ডিসেম্বর ১৯০৭-৮ নভেম্বর ১৯৯৮)। উইনসাম গডেনই জন গডেন নামে লিখেছেন। বাবার চাকরিসূত্রে ব্রিটেনের মানুষ এই দুই বোনের শৈশব কেটেছে তত্কালীন পূর্ববঙ্গে, এখনকার বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জে। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে মা-বাবা তাদের ইংল্যান্ড থেকে নারায়ণগঞ্জে নিজেদের কাছে নিয়ে আসেন। জন ও রুমারের বয়স তখন যথাক্রমে ছয় ও সাত বছর। তাদের বাবা আর্থার লেই গডেন তখন ব্রিটিশ স্টিমার কোম্পানির (ব্রহ্মপুত্র স্টিম নেভিগেশন কোম্পানি) এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। এর পর শুরু হলো জন ও রুমার গডনের ভারতীয় জীবন। তারা বাস করেছেন তত্কালীন পূর্ববঙ্গের নারায়ণগঞ্জে, ঘুরেছেন দার্জিলিং, কাশ্মীর প্রভৃতি স্থান। একবার হুগলি থেকে নদীপথে সফর করেছেন সুন্দরবন। হুগলি থেকে স্টিমারে করে তারা খুলনা এসেছিলেন। সুন্দরবন ভ্রমণ দুই বোনের জীবনে স্থায়ী ছাপ ফেলেছিল। তারা দুজনই এ সফরকে তাদের পরবর্তী জীবনে লেখা উপন্যাসের প্লট হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

 দুই বোন তত্কালীন ভারতবর্ষে কাটানো শৈশবের বর্ণনা নিয়ে যৌথভাবে স্মৃতিকথা লিখেছিলেন, যা ‘টু আন্ডার দ্য ইন্ডিয়ান সান’ নামে ১৯৬৫ সালে প্রথম প্রকাশ হয়। তত্কালীন পূর্ববঙ্গের নারায়ণগঞ্জের জীবন তাদের এ স্মৃতিকথায় অনেকটা জায়গা নিয়ে আছে। কারণ পরিবারের সঙ্গে এ শহরেই তারা বসবাস করেছেন। স্মৃতিকথামূলক এ গ্রন্থে তত্কালীন পূর্ববঙ্গের সামাজিক জীবনের বিভিন্ন দিকের প্রাণবন্ত বিবরণ রয়েছে। গডেনদের নারায়ণগঞ্জের বাড়ির খাওয়ার টেবিলের ভৃত্য ছিল মুসলমান, অন্য কাজের জন্য আরো ছিল কয়েকজন চাকর এবং আয়া ছিল মাদ্রাজের খ্রিস্টান, বাগানের মালি ছিল ব্রাহ্মণ আর মেথররা ছিল অস্পৃশ্য। ১৯১৯ সালে দুই বোন ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়েছিলেন।

রুমার গডেনের প্রকাশিত ৭০টি বইয়ের মধ্যে ২১টি ছিল উপন্যাস। এসব উপন্যাসের অনেকগুলোই ছিল বেস্টসেলার এবং সেগুলো অবলম্বনে সিনেমাও নির্মাণ করা হয়েছে। তার বিখ্যাত বইগুলোর মধ্যে ছিল— ব্ল্যাক নার্সিসাস (১৯৩৮), দ্য রিভার (১৯৪৬), দ্য গ্রিনগেজ সামার (১৯৫৮) প্রভৃতি। বিখ্যাত ফরাসি পরিচালক জ্যা রেঁনোয়া রুমারের দ্য রিভার উপন্যাস অবলম্বনে সিনেমা নির্মাণ করেছেন। এ সময় রুমার এই পরিচালকের সঙ্গে দুই বছর কাজ করেছেন। জন গডেনের প্রথম উপন্যাস ‘দ্য বার্ড এসকেপড’ প্রকাশ হয় ১৯৪৭ সালে। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে আছে— দ্য হাউজ বাই দ্য সি, শিবা’স পিজিয়ন, আহমেদ অ্যান্ড দ্য ওল্ড লেডি প্রভৃতি।

 

জন ও রুমার গডেনের সুন্দরবন ভ্রমণ

বাবা মাঝে মাঝে অপ্রত্যাশিত অনেক কাজ করতেন। একবার শীতকালে জনের দাঁতে ব্যথা শুরু হলো। তাকে কলকাতায় এক দন্ত বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। কারণ তখন নারায়ণগঞ্জে সে রকম কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক নেই। বাবা বললেন, ‘আমরা সবাই যাব এবং ফিরব কোনো ট্রেন বা মেইল স্টিমারে নয়, বরং একটা বিরাট আকারের স্টিমারে করে নদীপথে সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে।’

সুন্দরবন কী? ‘জঙ্গল, সত্যিকার জঙ্গল’, বাবা বললেন। ‘গাঙ্গেয় বদ্বীপের নদীর জঙ্গল। স্টিমার আসাম পর্যন্ত যাবে কিন্তু আমরা আগেই নারায়ণগঞ্জে নেমে যাব।’ 

মা বললেন, ‘এটা খুব ব্যয়বহুল হয়ে যাবে আর্থার।’ তবে বাবার খুব সম্ভবত আমাদের তার নিজের জীবন ও স্বয়ং নিজেকে দেখানোর একটা ইচ্ছা ছিল। কারণ শিগগিরই আমরা ইংল্যান্ডে চলে যাব এবং বেশ কয়েক বছর তিনি আর আমাদের দেখতে পাবেন না।

বাবা ভারতে এসেছিলেন ১৯ বছর বয়সে। লন্ডন থেকে তিনি বের হতে চেয়েছিলেন। তাই আনন্দচিত্তে ভারতে এসেছিলেন। তিনি যদি একটি বিস্তৃত জগত্ চেয়ে থাকেন, তাহলে সেটা তিনি ভারতে পেয়েছেন। কোম্পানি তাকে যে কাজ দিয়েছিল, তাতে তিনি নদীগুলো চষে বেড়িয়েছেন। মাঝে মাঝে তিনি একটানা মাসখানেক নদীতেই ভেসে বেড়াতেন। তিনি এ অঞ্চলের নদীগুলোকে নিজের হাতের তালুর মতোই চিনতেন। এটা ছিল একাকী আর কষ্টকর জীবন। কিন্তু তিনি এ জীবন এতটাই পছন্দ করতেন যে, একবার কোম্পানির মূল কার্যালয় কলকাতায় যোগ দিতে প্রস্তাব দেয়া হলেও রাজি হননি। বাবা একটা কথা বলতে ভালোবাসতেন, ‘আমি হয়তো তাহলে বেশ টাকা-পয়সার মালিক হতে পারতাম। আমি হয়তো একজন সিনিয়র পার্টনার হতে পারতাম কিন্তু সারা জীবন অসন্তুষ্ট থাকতাম।’

আমাদের স্টিমার কলকাতা থেকে জোয়ার আসার পর মধ্যরাতে ছাড়বে। অর্থাত্ আমাদের রাতে ঘুমাতে যাওয়ার নিয়মিত সময়ের অনেক পরে। আমরা হোটেল ছাড়লাম ক্যারিজে করে। পেছনে হান্নাহ, জেট্টাহ আর মালপত্র নিয়ে আসছিল একটা টিক্ক-গাড়ি। হাওড়া সেতু পার হয়ে আমরা ঘাটে পৌঁছলাম। সারেং আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি ছিলেন কোম্পানির নৌবহরের কমান্ডার। তার মুখে দাড়ি, চেহারায় নেতৃত্ব দেয়ার ছাপ স্পষ্ট। তার পরনে ছিল সাদা শার্ট ও প্যান্ট এবং মাথায় পাগড়ি। আমরা মানে জন আর রুমার থাকার জন্য সাদা রঙ করা একটা কেবিন পেলাম।

‘জন বিছানার নিচের দিকে একটা তোলাপোকা দৌড়ে গেল’— রুমার বলল।

‘কোনো সমস্যা নেই’— জনের জবাব।

আমাদের কেবিনটা ছিল নদীর দিকে, কোলাহলপূর্ণ ঘাট থেকে একটু দূরে। কিন্তু চিত্কার আর অনেক ধরনের শব্দ ভেসে আসছিল। ঘুমানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়, আমরা দুই বোনই একমত হলাম। কিন্তু আমরা ঘুমিয়ে গেলাম এবং যখন ঘুম ভাঙল তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। সূর্যের কিরণ তখন আমাদের কেবিনে প্রবেশ করেছে। জেগে উঠে পায়জামা পরা অবস্থাতেই আমরা ডেকে ছুটে গেলাম। দেখি আমরা হুগলির মধ্য দিয়ে ছুটে চলেছি। নদীর তীর তখন বেশ দূরে, আমাদের নদীতীরের মতোই। তীরে ছোট ছোট গাছ, মন্দির, কুঠি, ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছে।

‘বাবা, আমরা কি তোমার বাইনোকুলার দিয়ে দেখতে পারি? ব্রিজে কি ক্যাপ্টেনকে দেখা যাচ্ছে? আমাদের কি কাপড় বদলাতে হবে? আমরা প্রাতরাশ খেতে চাই না।’ কিন্তু আমাদের কাপড় বদলে প্রাতরাশ খেতে হলো।  

এর পর দেখা গেল একটি মত্স্যজীবীদের গ্রাম। সাগরগামী অসংখ্য ছোট নৌকার মধ্য দিয়ে আমাদের স্টিমার ধীরগতিতে এগিয়ে চলছিল। মনে হচ্ছিল যেন আমরা কোনো গ্রামীণ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি। নৌকা আর শুকাতে দেয়া মাছ ধরার জালের পেছনে গ্রামের ঘরবাড়িগুলো এতটাই কাছে ছিল যে, আমরা ঘরগুলোর ভেতরে পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছিলাম। একটি ঘরের ভেতরে দেখলাম একজন নারী বাতি জ্বালাচ্ছেন। আরেকটিতে দেখেছিলাম এক নারী রান্না করছেন। তারপর হঠাত্ করে গ্রামটা মিলিয়ে গেল, তবে মাছের দুর্গন্ধ আরো কিছুক্ষণ পাওয়া যাচ্ছিল।

পুরো যাত্রায় প্রথম ও শেষবারের মতো আমরা রাতের বেলায় নোঙর করলাম। অগভীর পানিতে আমাদের স্টিমারটি ছাড়া আরো একটি স্টিমার নোঙর করে ছিল। তারা সম্ভবত জোয়ারের জন্য অপেক্ষা করছিল। নোঙর করার সময় শিকলের শব্দে একদল পাখি আর সারসের ঝাঁক উড়ে চলে গেল। তারা ঢলে পড়া সূর্যের দিকে উড়ে গিয়ে গাছপালার অন্ধকার অংশে গিয়ে জড়ো হলো। পরের দিন খুব সকালে উঠে জানতে পারলাম যে, আমরা এখন সুন্দরবনে।

আমাদের কামরায় বসে জানালা দিয়ে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল একটা পাতার চলমান দেয়াল আমাদের চোখের সামনে। এত কাছে যে মনে হচ্ছিল হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। হঠাত্ দেখলাম পাতার ভেতর দিয়ে একটা বাদামি মুখ উঁকি দিয়ে আবার হারিয়ে গেল।

‘বানর! বানর!’ বলে আমরা চিত্কার করে উঠলাম। মনে হচ্ছিল আমরা আগে কখনো বানর দেখিনি। কিন্তু এটা ছিল একটা বন্য বানর, একেবারে জঙ্গলের বানর। আমরা ডেকে চলে এলাম। আশপাশে গাছগাছালির মধ্যে ঠেলে ঠেলে স্টিমার এগিয়ে চলছিল, তারপর হঠাত্ করেই সরু চ্যানেলটা প্রশস্ত হয়ে গেল। আমাদের সামনে তখন এক বিশাল নদী। নীল পানির বিস্তার আর দূরে তীর দেখা যাচ্ছিল এক সরু রেখার মতো। আলোড়নের একটি সরু রেখা। চারপাশে শুধু পানি আর আকাশ ছাড়া কিছু নেই, সঙ্গে আছে শুধু গাছপালার সবুজ। সামনে সূর্যের আলোর চমকের মধ্যে সাদা ও কালোর কিছু বিন্দু দেখা যাচ্ছিল।

‘বাবা, ওটা কী?’

বাবা পায়জামা পরে, গলায় বাইনোকুলার ঝুলিয়ে ডেকে ছিলেন। তিনি আমাদের সঙ্গে রেলিংয়ের গা-ঘেঁষে দাঁড়ালেন।

‘ওগুলো একটা চ্যানেলের নিশানা। দেখো, আমাদের স্টিমারটা সোজা ওই চিহ্নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।’ বাবা আরো জানালেন, চিহ্ন স্থাপন করা, চ্যানেলগুলো পরিষ্কার রাখা, ড্রেজিং করা থেকে শুরু করে শত শত মাইল নদীপথের সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে স্টিমার কোম্পানি।

‘আমাদের কোম্পানি?’ আমাদের দুই বোনের জিজ্ঞাসা।

‘আমাদের কোম্পানি’, বাবা জবাব দিলেন।

বাবা তরুণ বয়সে লঞ্চে করে কাজ পর্যবেক্ষণ করতে যেতেন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ জঙ্গলে কাটাতেন। ‘এখানে মশাগুলো খুব ভয়ানক। তবে আমি অনেক কুমিরকে গুলি করে মেরেছি।’

প্রাতরাশ সেরে জামাকাপড় পরে তৈরি হতে হতে বিন্দুগুলো দুটো চাকতিতে বদলে গেল। কাদায় গেড়ে রাখা খুঁটির ওপর সেগুলো আটকে রাখা হয়েছে। আমরা আবার সরু একটা খালে প্রবেশ করতে শুরু করলাম। গাছপালা আবার স্টিমারের কাছে চলে এল, তবে এবার গাছের ছায়ায় ঘাস খেতে দেখা গেল চিত্রা হরিণগুলোকে।

‘সুন্দরবন’ নামটি এসেছে একটি ম্যানগ্রোভ গাছের নাম থেকে। এ গাছ বদ্বীপের এই অদ্ভুত জলমগ্ন জঙ্গলের সৃষ্টি করেছে। গাছগুলো খুব লম্বা হয় না, পাতা ছোট এবং পানির কাছে কাদায় জন্মে। বনের বেশির ভাগ অংশ দেখে মনে হলো, সরীসৃপ, মাছ আর পাখি ছাড়া অন্য প্রাণীর জন্য এ জঙ্গল সুবিধার নয়। কিন্তু বাবা জানালেন, ‘এখানে বাঘ বাস করে। বিরাট আকারের বাঘ, দুনিয়ার আর সব স্থানের মতোই বড় এখানকার বাঘ। এরা চিত্রা হরিণ খেয়ে বাঁচে।’ চ্যানেলে চিহ্ন দিতে আসা কর্মীদের মাঝে মাঝে বাঘের কবলে পড়তে হয়। তাদের রাজত্বে কেউ সামান্য বিঘ্ন ঘটালেও তারা গর্জন করে প্রতিবাদ প্রকাশ করত। এ রকম গর্জন শুনে কর্মীরা কাঁপতে কাঁপতে নৌকায় ফিরে আসত। বাবা একবার স্টিমার থেকে একটি বাঘকে সাঁতরে চ্যানেল পার হতে দেখেছিলেন। বাঘ দেখে স্টিমারের সারেং সাইরেন বাজান। সাইরেন শুনে তীরের দিকে যেতে থাকা বাঘটি দাঁড়িয়ে ঘুরে তাকিয়ে গর্জন করে ওঠে। বাবা বললেন, ‘আমার বন্দুকটা আনতে আনতে বাঘটা চলে গিয়েছিল।’ বাবা হতাশ ভঙ্গিতে তথ্যটা জানালেও আমরা খুশি হয়েছিলাম।

একটিবারের জন্য বাঘ দেখতে আমরা সারা দিন ও পরের দিন তীক্ষ দৃষ্টিতে বাবার বাইনোকুলার দিয়ে বনের সবুজের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বাঘ দেখার জন্য আমরা ডেক থেকে ১ মিনিটের জন্যও সরতে রাজি ছিলাম না। তবে এই বদ্বীপ অঞ্চলের অন্যতম বড় এক নদী পাড়ি দেয়ার সময় অবশ্য বাঘ দেখার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। কারণ উত্তর থেকে দক্ষিণে বয়ে সাগরে মেশা এ নদী এতটাই বড় যে, পানি আর আকাশ ছাড়া আশপাশে কিছুই চোখে পড়ত না। আবার আমরা একটা সরু নদী বা চ্যানেলে প্রবেশ করলাম। তীরের গাছপালা স্টিমার ছুঁয়ে যাচ্ছিল। মা বরাবরের মতো আমাদের আগ্রহটা বুঝেছিলেন, তাই তিনি ডেকে বসেই আমাদের খাবার খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। ‘তোমরা তোমাদের কম্বল আর বালিশ নিয়ে এখানেই শুতে পারো।’ তিনি বললেন, ‘তোমরা রেলিংয়ের যত কাছে চাও, সেখানে শুতে পারো।’

আমরা কোনো বাঘ দেখতে পাইনি। তবে প্রচুর বানর দেখেছিলাম। বড় বড় কুমির দেখেছি, এর মধ্যে অনেকগুলো মানুষখেকো। এরা নদীর বালুময় তীরে রোদ পোহায়। একটা কুমির দেখেছিলাম, যেটা কমপক্ষে ২০ ফুট লম্বা, পাখিরা এর খুলে রাখা প্রকাণ্ড চোয়ালের মধ্যে আটকে যাচ্ছে। ‘বাবা, তুমি এটাকে গুলি করছ না কেন?’ হান্নাহ আমাদের এই সরীসৃপ সম্পর্কে অনেক ভয়ানক গল্প শুনিয়েছিল। কীভাবে এরা গ্রামের কাছে নদীতে ডুবে নারী-শিশুদের নদীতে নামার অপেক্ষায় থাকে। হান্নাহ বলেছিল, ‘কুমিরের পেট নারী ও শিশুদের অলঙ্কারে পূর্ণ থাকে।’

‘বাবা, ওটাকে গুলি করো।’ কিন্তু বাবা তার রাইফেলটাও এমনকি আনলেন না।

‘এটা কোনো লঞ্চ না যে আমি থামাতে পারব; এটা কোম্পানির স্টিমার আর যাচ্ছে মালপত্র নিয়ে। একে দেরি করানো উচিত নয়।’

মানুষখেকো কুমিরের চেয়ে অনেক আকর্ষণীয় ছিল মাছখেকো নিরীহ ঘড়িয়ালগুলো। আরো ছিল শুশুক, সাপ এবং অসংখ্য পাখি— বক, সারস, মাছখেকো ঈগল ও পানির ওপর নানা রঙের ঝলক তুলে মাছ শিকারি মাছরাঙা। এখানেও মানুষের দেখা পাওয়া যায়, যদিও খুব কম। মাঝে মাঝে আমাদের পাশ দিয়ে মাছ ধরার নৌকা ও বাঁশের ভেলা পার হয়ে যায়। আবার মাঝে মাঝে দূরে যান্ত্রিক গর্জন শোনা যায়, দিগন্তে ধোঁয়া দেখা যায়। অর্থাত্ আরেকটি স্টিমার আমাদের পথে আসছে বা যাচ্ছে। তারপর একসময় আমাদের সঙ্গে সেই স্টিমারের দেখা হয়ে যায়। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দুই পক্ষের মধ্যে কথাবার্তাও হয়। আবার চ্যানেলটি খুব সরু হলে একটি স্টিমারকে তীরঘেঁষে থেমে থাকতে হয় এবং অন্যটি পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যায়। দুই স্টিমারের লোকজন রেলিংয়ের ধারে দাঁড়িয়ে একে অন্যের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে। তারপর ইঞ্জিনের গর্জন আর কয়লার ধোঁয়ার গন্ধ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে আবার বনের নীরবতা, শান্তি ফিরে আসে।

সফরের তৃতীয় বিকালে একটি একাকী ভাঙাচোরা, ছেঁড়া পালের জেলে নৌকা আমাদের স্টিমারের দিকে এগিয়ে এল। নৌকায় ছিল একজন প্রায় নগ্ন বৃদ্ধ জেলে আর এক বালক। তারা পানি থেকে কিছু টেনে তুলতে চেষ্টা করছিল, এটা ছিল একটা বিরাট মাছ। বাবা বললেন, ‘তারা একটা বিরাট ভেটকি মাছ ধরেছে। কিন্তু মাছটা এত বড় যে, তারা তা নৌকায় তুলতে পারছে না। তারা মাছটা আমাদের কাছে বিক্রি করতে চায়।’ ভেটকি মাছ সাদা রঙের, সুস্বাদু। এ মাছ আমরা অনেকবার খেয়েছি কিন্তু জীবিত অবস্থায় কখনো দেখিনি।

‘বাবা, তুমি কি মাছটা কিনবে?’ কিন্তু হঠাত্ সারেং মাছটি কিনে বাবাকে উপহার দিলেন। মাছটা স্টিমারে তোলা হলো, সেটা তখনো জীবিত, দাপাদাপি করছে। লস্কররা মাছটা উপরের ডেকে বাবার পায়ের কাছে এনে রাখল। বাবা ও সারেংয়ের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হলো। আমরা মাছটার দাপাদাপি দেখে আর সহ্য করতে পারছিলাম না। ‘মাছটা মেরে ফেলো বাবা। মেরে ফেলো। দয়া করে তাড়াতাড়ি মেরে ফেলো!’ এক লস্কর আমাদের কাকুতি-মিনতি শুনে দাঁত বের করে হেসে মাছটার মাথায় আঘাত করল।

‘কী দারুণ উপহার!’, মা বললেন। আর বাবা বললেন, ‘এটার ওজন ১০০ পাউন্ডের বেশি।’

‘স্টিমারের লোকজন মাছটা কয়েক দিন ধরে খেতে পারবে। কিন্তু জেলে এজন্য কত পেল?’ বাবার প্রশ্ন।

সন্ধ্যা হয়ে এল। পাখিরা উচ্চৈঃস্বরে কলরব করতে করতে তাদের নীড়ে ফিরছে। মনে হচ্ছিল পুরো জঙ্গল সন্ধ্যায় ডুবে যাচ্ছে। পুরো চরাচরে যেন শুধু নদী আর আমাদের স্টিমারটিই আছে। কী এক অদ্ভুত বিষাদ নিয়ে স্টিমার নদীর বুক বেয়ে এগিয়ে চলছে। আমরা রেলিংয়ে ঝুঁকে সূর্যাস্ত দেখতে লাগলাম। এক লস্কর গান গাইছিল, আমরা কান পেতে শুনছিলাম। অন্ধকার নেমে আসা পর্যন্ত লস্কর গান গাইছিল, তারপর সার্চলাইট জ্বলে উঠল। মা ও আন্টি মেরি তখন আমাদের পরিবারের একেবারে ছোট সদস্যদের কামরায় নিয়ে গেলেন যেন আলো দেখে জড়ো হওয়া পোকামাকড় ওদের কোনো ক্ষতি করতে না পারে। কিন্তু আমরা মানে জন আর রুমার ভেতরে যেতে অস্বীকৃতি জানালাম। আমরা একেবারে উপরের ডেকে দাঁড়িয়ে রইলাম, পোকামাকড়ের হাত থেকে বাঁচতে মাথায় স্কার্ফ লাগালাম। তবে পোকা আমাদের মুখে এসে লাগছিল। আমরা দাঁড়িয়ে পানিতে আলোর খেলা দেখতে লাগলাম। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম দূরে লাইটের আলোয় জ্বলে ওঠা এক জোড়া চোখ দেখার জন্য, একটা বাঘ যেন আমাদের চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়। তবে বাঘ দেখার আশা না থাকলেও আমরা সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকতাম। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে সার্চলাইটের আলোয় আমরা পোকামাকড় দেখছিলাম। ‘বাচ্চারা, এবার ভেতরে এসো।’ হান্নাহ আমাদের নিতে এল। ‘গোসল ও রাতের খাবারের সময় হয়ে গেছে।’ কিন্তু বাবা এসে ধরে নিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত আমরা সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। অবশ্য বাবা এসে প্রথমে আমাদের পেছনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন, তার হাতে হুইস্কির গ্লাস, আলোর দিকে তাকিয়ে তিনি যেন সামনে শত মাইল বিস্তৃত জঙ্গলের নিস্তব্ধতাকে শুনছিলেন। অনেকক্ষণ পর তিনি বলে উঠলেন, ‘এখন তোমরা শুতে যাও। হান্নাহকে অপেক্ষা করিয়ে রাখা উচিত নয়।’

যেতে যেতে পেছনে ফিরে তাকিয়ে আমরা দেখলাম বাবা তখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন, আলোর বিপরীতে কালো একটা ছায়ার মতো তাকে দেখা যাচ্ছে। খুব সম্ভবত বাবা সেই সময়ের কথা ভাবছিলেন, যখন তার কাঁধে পরিবারের দায়িত্ব ছিল না, স্টিমার রুটের বাইরে তখন তিনি গভীর জঙ্গলে ঘুরতেন, জাহাজের অন্য কর্মীরা যা খেতেন, তিনিও তা-ই খেতেন, ঘুমিয়ে পড়তেন ডেকেই। এসব গল্প তিনি একবার আমাদের শুনিয়েছিলেন। মনে হচ্ছিল, বাবা আমাদের ছেড়ে যেন অনেক দূরে চলে গেছেন, দুর্গম কোনো এলাকায়। এসব দেখে আমাদের দুই বোনের মধ্যে কী হলো কে জানে! আমরা দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম, যেটা খুব কম সময়ই করতাম এবং বললাম, ‘শুভরাত্রি, বাবা।’  

পরের দিন বিকালে চরম বিরক্তির সঙ্গে আমরা সভ্যতার চিহ্ন দেখতে পেলাম। হঠাত্ করেই নদীতে নৌকার সংখ্যা বেড়ে গেল। তবে নদীর এক তীরে তখনো বনের অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে দিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেত ও কুঁড়েঘরের গ্রাম। নারীরা নদী থেকে কলসে পানি ভরে নিয়ে যাচ্ছেন, শিশুরা নদীতে জলকেলি করছে। ‘অবশেষে দেখার মতো কিছু দৃশ্য দেখা গেল। একঘেয়ে সবুজ দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম’, মেরি আন্টি বলে উঠলেন।

আমরা অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকালাম; আমাদের কাছে এই নীরস গ্রামের দৃশ্যের সঙ্গে জঙ্গলের কোনো তুলনাই হতে পারে না। এই যাত্রা শেষ হয়ে যাক, সেটা আমরা কোনোভাবেই চাইছিলাম না। সন্ধ্যা নামার একটু আগে আমরা খুলনা পৌঁছে গেলাম। হান্নাহর সঙ্গে আমরা নদীতীরের শহরে একটু ঘুরতে যেতে চাইছিলাম। মা-বাবা তখন আমাদের স্টিমারে বসে স্থানীয় এক স্টিমার এজেন্টের সঙ্গে কথা বলছিলেন। একটু পরেই আবার আমাদের স্টিমার ঘাট ছেড়ে নদীপথে রওনা দিল। আমরা দারুণ খুশি। কারণ আবার নদীপথে ভ্রমণ শুরু হচ্ছে।

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে পানিতে প্রতিফলিত হয়ে ছাদে নাচতে থাকা আলোর ছটা দেখার মতো আনন্দ আর হয় না। কামরা থেকে বেরিয়ে দেখলাম, আমরা এক বিরাট নদী দিয়ে চলছি। আশপাশে সবুজের কোনো নিশানা নেই। তীর দেখা যাচ্ছে অনেক দূরে, কেবল একটা রেখার মতো। এত জোরদার বাতাস ছিল যে, ডেকে বসে খাওয়া যাচ্ছিল না। তবে রাতে ঠাণ্ডা নেমে এল আর এই পানির রাজত্বে মশারি টানানোর দরকার হয়নি। কারণ মশাদের দেখা নেই।

মাঝে মাঝে ব্রিজ-টেলিগ্রাফ বেজে ওঠে এবং তখন ইঞ্জিন ধীর করে দেয়া হয়। তখন লাইনম্যান সুর করে বলতে থাকে, ‘এক বাঁও মেলে না!’

‘বাবা, সে কী বলছে?’

‘৬ ফুটের নদীর তল পাওয়া যায়নি। তবে কাছেই অগভীর জায়গা আছে। একটু পরেই চর দেখতে পাবে’— বাবা জানালেন।

হঠাত্ লাইনম্যানের সুর বদলে গেল, মনে হচ্ছিল জরুরি কিছু। নদীপথের গভীরতা খুব কমে এসেছিল, আমরা স্টিমারের তলায় কিছু ঝাঁকিও অনুভব করলাম।

বাবা বললেন, ‘আমরা ডুবোচরায় ঘষা খেয়েছি, তবে এখন বেরিয়ে এসেছি।’ বাবা জানালেন, গ্রীষ্মকালে নদী অগভীর হয়ে পড়ে, তখন অনেক সময় স্টিমার চরে আটকে যায়। ‘একবার আমি সারা দিন আটকে ছিলাম। অন্য একটি স্টিমার এসে আমাদের টেনে মুক্ত করতে গিয়ে নিজেও চরে আটকে গিয়েছিল। কিছু সময়ের মধ্যে ওই পথের আরো তিনটি স্টিমার সেখানে আটকে যায়। নদীর পানি বৃদ্ধি পর্যন্ত আমাদের সেখানেই অপেক্ষা করতে হয়েছিল।’

‘কী মজা!’

‘মোটেই না। স্টিমার কোম্পানি খুশি হয়নি। স্টিমারের কয়েকজন যাত্রী আটকে যাওয়ার জন্য আমাকে দোষারোপ করছিল। এবং খাদ্যও শেষ হয়ে আসছিল।’

আমরা রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে পানির দিকে চেয়ে ছিলাম। ‘তোমাদের কি বাড়ির বাগানের কথা মনে পড়ছে না? ঘোড়া বা ঘুড়ির কথা? নদীতে কি যথেষ্ট ঘোরা হয়নি? এবার কিন্তু আমাদের নারায়ণগঞ্জ যেতে হবে’— মা আর মেরি আন্টি আমাদের দুই বোনের উদ্দেশে বললেন।

‘আমরা কি আসাম পর্যন্ত যেতে পারি না?’ দুই বোনের আকুতি।

মনে হলো, বাবা আমাদের কথা শুনে খুশি হয়েছেন। যদিও হেসে হেসে তিনি মাথা নাড়িয়ে আমাদের অনুরোধের প্রতি অসম্মতি জানালেন।

এরপর আমরা নদীতে আরো অনেক সফর করেছিলাম। উত্তর আসাম, কাছাড়, চট্টগ্রাম থেকে বার্মা। গঙ্গায় এক সফর জনকে দ্য সেভেন আইল্যান্ড বইটা লেখার ধারণা দিয়েছিল। আরেকটা সফরে তৈরি হয়েছিল রুমারের দ্য রিভার উপন্যাসটির প্লট।

যুদ্ধের সময় (প্রথম বিশ্বযুদ্ধ) আমরা যে রকম স্টিমারে ভ্রমণ করেছিলাম, সে রকম স্টিমারে করে সেনা পরিবহন করা হতো। এ রকম স্টিমারে করেই বার্মা থেকে উদ্বাস্তু ও পরাজিত সেনাদের আনা হয়েছিল। পরবর্তীতে এ রকম স্টিমারে আরো উদ্বাস্তুদের পরিবহন করা হয়েছে— পাকিস্তান থেকে হিন্দুদের কলকাতায় আর মুসলিমদের ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্তানে আনা হতো। এসবই অনেক পরের ঘটনা। তবে আমাদের (জন ও রুমার) কাছে হুগলিতে স্টিমারে ওঠার প্রথম সকাল ছিল চিরস্মরণীয়। সেই সকাল থেকেই আমরা জানি, একটা চমত্কার ভ্রমণের উপায় হচ্ছে নদীপথের স্টিমার।