পৃথিবীর সব সাম্রাজ্যেই কোনো না কোনো সময় এমন একজন নৃপতি আসেন, যিনি ওই সাম্রাজ্যকে ইতিহাসে ভিন্ন উচ্চতায় স্থাপন করেন। রোমান, চৈনিক, মঙ্গল থেকে শুরু করে ভারতবর্ষের বিভিন্ন কালপর্বের দিকে লক্ষ করলে এমন অনেক নৃপতির নাম দেখা যাবে। রোমান, চৈনিক, বাইজেন্টাইনদের তুলনায় আফ্রিকার সাম্রাজ্য নিয়ে আলোচনা তুলনামূলক কম হয়। নিকট অতীতে আফ্রিকার অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণ ছাড়াও আফ্রিকার নিজস্ব ঐতিহ্যগত কিছু কারণও রয়েছে। কিন্তু যে আফ্রিকা আজ ধুঁকে মরছে, তারও রয়েছে সোনালি অতীত। বিশেষত পশ্চিম আফ্রিকার ঘানা, মালি ও সোংহাই সাম্রাজ্য অন্যতম। এদের মধ্যে মালির মানসা মুসা কিংবদন্তি রূপে এখনো আলোচিত হন।

বর্তমান মৌরিতানিয়া, নাইজার, আলজেরিয়া দ্বারা তিনদিকে এবং দক্ষিণ পশ্চিমে ছোট ছোট দেশ দ্বারা ঘেরা মালি এককালে আফ্রিকার অন্যতম সম্পদশালী দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। এমনকি মিসর পর্যন্ত মালির সম্পদের সঙ্গে তুল্য হতো না। এহেন মালির স্বর্ণযুগের রাজা ছিলেন মানসা মুসা। মূলত ‘মানসা’ শব্দটির অর্থই রাজা। তার নাম ছিল কাঙ্কা মুসা। ইতিহাস ও কিংবদন্তিতে বিশেষভাবে উল্লেখিত মানসা মুসার জনপ্রিয়তার মূল কারণ মক্কায় হজপালনের যাত্রার সময় অকৃপণ হাতে সম্পদ—বিশেষত স্বর্ণ বিতরণ। আক্ষরিক অর্থেই মালির এই ‘মানসা’ স্বর্ণযুগের রাজা ছিলেন। কিন্তু রাজকীয় এ দান-সদকা বাদেও মানসা মুসা আফ্রিকা ও মালির ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৃপতি। নিজের ২৫ বছরব্যাপী শাসনকালে তার এবং মালির নাম ইসলামী সাম্রাজ্য থেকে ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। স্বর্ণ লুটানো নয় বরং মালিকে নতুন করে গড়ে তোলা মানসার শ্রেষ্ঠত্বের কারণ।

মালির ইতিহাস লক্ষ করলে দেখা যাবে এ অঞ্চল মূলত গোত্রভিত্তিক শাসনের অধীন ছিল। গোত্রে গোত্রে দ্বন্দ্ব হতো এবং শাসন ক্ষমতা পরিবর্তিত হতো। দ্বাদশ শতকে সানদিয়াতা কাইতা সেলেগাল এবং নাইজার নদীর মধ্যকার অঞ্চল অধিকার করে শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। বলা চলে তিনিই মালির প্রতিষ্ঠাতা। নিয়ানিতে রাজধানী স্থাপন করে সাম্রাজ্যের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি তিনি নিজের রাজ্যে আইন-শৃঙ্খলার ব্যবস্থা করেছিলেন। সানদিয়াতার মৃত্যুর ৫৭ বছর পর কাঙ্কা মুসা মালির ‘মানসা’ হন এবং সানদিয়াতা পরবর্তী সংকটকাল পার করে মালি একজন সত্যিকার অভিভাবক ও নির্মাতা পেয়েছিল।

মালি বলতে মূলত বোঝায় মানদিঙ্কা সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাসের স্থান। কিন্তু পৃথিবীর অন্যান্য স্থানের মতো মালিতেও কেবল এক সম্প্রদায়ের লোক বসবাস করত না। সানদিয়াতা যে সোসো সম্প্রদায়কে পরাজিত করে মানদিঙ্কার সমভূমি দখল করেছিলেন, সেখানে ভিন্ন ভিন্ন গোত্রের মানুষ বসবাস করত। এদের সবাইকে একত্রিত করে মালির অধিবাসী হিসেবে নিজেদের প্রকাশ করার দুরূহ কাজটি করেছিলেন মানসা মুসা। এ কারণেই পরবর্তী প্রায় ১৫০ বছর পশ্চিম আফ্রিকার রাজনীতি, অর্থনীতি ও বাণিজ্য মালি কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হতো। দানশীলতার জন্য পরিচিত হলেও মুসা একজন রাজনীতিবিদ, দূরদর্শী রাজা ও একজন নির্মাতা ছিলেন। প্রথমে তিনি রাজ্যের সীমা বৃদ্ধি করেন। আল উমরীর মতে, মানসা মুসা ২৪টি ছোট ছোট রাজ্য জয় করেছিলেন। রাজ্যের সীমা বৃদ্ধির পাশাপাশি তিনি সেখানে অবকাঠামোগত উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বাণিজ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়েছিলেন।

মানসা মুসার সেই বিখ্যাত হজযাত্রার সময় ১৩২৪ খ্রিস্টাব্দ। মালি থেকে মক্কা গমনকালে তিনি যেসব স্থানে যাত্রা বিরতি করেছিলেন, সেসব স্থানে স্বর্ণে মুড়ে দিয়েছিলেন। স্বর্ণকেই মালির সমৃদ্ধির মূল হিসেবে ধরে নেয়া হয় আর মানসা মুসা অকাতরে সে স্বর্ণ দান করেছিলেন। কায়রোর আরব ঐতিহাসিক আল উমরী মুসার এই ভ্রমণ এবং স্বর্ণ দানের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘কায়রোয় প্রতি মিসকাল১ স্বর্ণের মূল্য কখনো ২৫ দিরহামের নিচে নামেনি, কিন্তু মুসার অকাতর দানের কারণে তা ২২ দিরহামের নিচে নেমেছিল।’ পরবর্তী ১২ বছর স্বর্ণের বাজারের ওপর মুসার এই দানের প্রভাব রয়ে গিয়েছিল। ইতিহাস আরো বলে মানসা এত পরিমাণে স্বর্ণ বিলিয়েছিলেন যে ফিরতি পথে নিজেকেই আবার কায়রো থেকে ঋণ করতে হয়েছিল।

কিন্তু মুসার এই চরিত্র দেখে তাকে বেহিসাবি ভাবলে ভুল হবে। মানসা মুসা একজন দূরদর্শী নৃপতি ছিলেন। ক্ষমতা গ্রহণের পরপর তিনি লক্ষ করেন ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলে স্বর্ণের চাহিদা বেড়েছে। আগে যেখানে কেবল মুদ্রা তৈরিতে স্বর্ণ ব্যবহূত হতো, এখন অলংকার এমনকি অস্ত্রেও স্বর্ণ ব্যবহার হয়। মুসা তাই স্বর্ণের খনি থেকে স্বর্ণ উত্তোলনের ব্যবস্থা করেন। পাশাপাশি তিনি অনুভব করেছিলেন স্বর্ণ ছাড়াও ভিন্ন উপায়ে মালির উন্নতি সম্ভব। সিল্ক রোড ধরে বাণিজ্যের কথা মানসার অজানা ছিল না এবং তিনি উপলব্ধি করেছিলেন বাণিজ্যের মাধ্যমেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। মালির অন্যতম মূল্যবান পণ্য ছিল লবণ। খনি থেকে এ লবণ উত্পন্ন, বিপণনের মাধ্যমে বাণিজ্য বিস্তার করার জন্য যে অঞ্চলটি প্রয়োজন ছিল তার নাম গাও।

হজ থেকে ফেরার সময় মুসা খবর পান যে তার অন্যতম সেনাপতি সাগমানদিতার হাতে গাও অঞ্চলের পতন হয়েছে। সোংহাই গোত্রের অধিকারে থাকা এক হাজার মাইলের গাও ওই অঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী রাজ্য এবং পশ্চিম আফ্রিকার অন্যতম বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল। নাইজার নদীর বাঁকে অবস্থিত এ অঞ্চল অধিকারের মধ্য দিয়ে সেই বাণিজ্য পথের অধিকার লাভ করেন। পাশাপাশি এ অঞ্চলের তামার খনি থাকার কারণে বাণিজ্যের আরো একটি পণ্য মুসার হস্তগত হয়। কিন্তু তিনি গাও অধিকার করেই স্থির হলেন না। তার দ্বিতীয় লক্ষ্য হয়েছিল টিম্বাক্টু।

বর্তমানে কিংবদন্তিতে পরিণত হওয়া টিম্বাক্টু ছিল তত্কালীন সোংহাই অধিকৃত আরেকটি বাণিজ্যকেন্দ্র। গাও দখল হওয়ার পর মানসা সেই টিম্বাক্টুর উদ্দেশে পশ্চিমে যাত্রা করেন। ১১০০ খ্রিস্টাব্দে টুয়ারেগদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এ শহরকে মানসা মুসা পুরোপুরি একটি অর্থনৈতিক শহর রূপে গড়ে তোলেন। মিসর, ফেজ, মাগরেব২ থেকে আগত কাফেলাগুলো এখানে এসেই থামত। মূলত এ দুটি শহর মালির বাণিজ্য বিস্তৃতিতে সহায়তা করেছিল। মানসা মুসা উপলব্ধি করেছিলেন শহর দুটিকে কেবল বাণিজ্যের স্বার্থে ব্যবহার করলেই চলবে না। উপযুক্ত বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে তৈরি করতে হলে শহর দুটোকে সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে হবে। আসলে পুরো মালি দেশটাকেই নতুন করে সাজানোর ইচ্ছা ছিল তার। মক্কা থেকে ফেরার সময় প্রথমে গাও এবং পরে টিম্বাক্টু আগমন করলে তিনি এ দুই নববিজিত অঞ্চল থেকেই তার নতুন মালির স্থাপনা শুরু করেন।

প্রথমেই তিনি গাও ও টিম্বাক্টু উভয় শহরে মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দেন। এ কাজে আস-সাহেলী নামের একজন স্থপতিকে দায়িত্ব দেয়া হয়। মুসলিম অধিকৃত স্পেনের অধিবাসী আস-সাহেলীর সঙ্গে মক্কায় মুসার পরিচয় হয় এবং তার প্রতিভার পরিচয় পেয়ে মানসা তাকে মালিতে আমন্ত্রণ জানান। আস-সাহেলীও আগ্রহের সঙ্গে তার কাজ শুরু করেন। গাওয়ে পোড়া ইটের তৈরি মসজিদটি ১৭ শতক পর্যন্ত মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল। কিন্তু ১৩২৭ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত টিম্বাক্টুর মসজিদটি সাহেলীর প্রতিভার সত্যিকার পরিচয় বহন করে। জিঙ্গুরেবার মসজিদ নামে খ্যাত এ মসজিদের খিলান ব্যবহারের ইউরোপীয় নীতির মাধ্যমে এর কাঠামো তৈরি করা হয় এবং আফ্রিকার রীতি অনুসারে এর বাইরের দিকে কাদা ব্যবহার করে ঐতিহ্যও রক্ষিত হয়। ২৫ সারি খিলান দ্বারা তৈরি এ দালানের ভেতরে তিনটি প্রকোষ্ঠ ছিল, যেখানে প্রায় দুই হাজার মানুষের প্রার্থনা করতে পারত। মসজিদের মিনার দুটি মিসরের পিরামিডের কথা মনে করিয়ে দিত।

মানসা মুসার টিম্বাক্টু একটি যেনতেন বাণিজ্য কেন্দ্র থেকে দ্রুত একটি পরিকল্পিত শহরে পরিণত হয়। আস-সাহেলীর প্রতিভার সঙ্গে মুসার অকৃপণ খরচের কল্যাণে টিম্বাক্টু নতুন রূপ পেয়েছিল। জিঙ্গারবার মসজিদ তৈরির জন্য আস-সাহেলী ৪০ হাজার মিসকাল স্বর্ণ পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে মুসার আদেশে টিম্বাক্টুতে তিনি মাডুগু নামে একটি প্রাসাদও তৈরি করেন। সিদি ইয়াহিয়া মসজিদের প্রবেশদ্বারে যেসব নকশা অঙ্কিত হয়েছিল, তা অভূতপূর্ব বলেই বিবেচিত হয়। অবকাঠামোগত এ উন্নয়নের ফলে টিম্বাক্টুর প্রতি মানুষের আকর্ষণ সৃষ্টি হয়, ফলে অচিরেই ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার সংযোগ সেতু হয়ে উঠেছিল এ টিম্বাক্টু।

সাহেলীর নির্মাণ এখানেই সমাপ্ত হয়নি বরং মুসা চেয়েছিলেন যেন মালিতে তার জন্য এমন একটি স্থাপনা নির্মাণ করা হোক, যা কখনো হয়নি। ক্ষমতার প্রকাশক এ দালানটিতে মুসা প্লাস্টার ব্যবহারের নির্দেশ দেন। এর আগে মালিতে কখনো প্লাস্টার ব্যবহার করা হয়নি। মানসার চাহিদা অনুসারে সাহেলী একটি অনবদ্য দরবার নির্মাণ করেছিলেন। বর্গাকার এ দালানের ওপরে একটি গম্বুজ রাখা হয়েছিল। নকশায় ও হাতের কাজ সাহেলী নিপুণতার পরিচয় দেন। গৃহের প্রতিটি কাঠের ওপর কোনো না কোনো নকশা করা হয়েছিল। দ্বিতল এ দালানের জানলায় নকশাদার কাঠের ফ্রেম ব্যবহারের পাশাপাশি ওপর তলার জানলায় রুপার এবং নিচের তলায় স্বর্ণের প্রলেপ ব্যবহার করা হয়।

অবকাঠামোগত এ উন্নয়নই যে সব নয়, মানসা মুসা তা বুঝতেন। তিনি যখন ক্ষমতা লাভ করেন, তার বহু আগে থেকেই আফ্রিকা হতে ইউরোপ এমনকি ভারত পর্যন্ত ইসলামের পতাকা পৌঁছে গিয়েছিল। মুসার আগেই মালির রাজারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু মুসা তার রাজ্যে ইসলামকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন আফ্রিকা এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করতে ইসলামী শিক্ষা সহায়তা করবে। এছাড়া তিনি ব্যক্তিগতভাবেও ইসলামের রীতিনীতি মেনে চলতেন। ইসলামের প্রতি তার সত্যিকারের ভালোবাসা ছিল। নিজের পাশাপাশি মালিতে ইসলামী জ্ঞান ও দর্শন ছড়িয়ে দিতে তিনি মক্কা থেকে বেশ কয়েকজন আলেমকে প্রণোদনা দিয়ে মালিতে এনেছিলেন। মানসা মুসা চেয়েছিলেন মালির জনগণ ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত হোক।

মুসার এ পদক্ষেপ সত্যিই কাজে লেগেছিল। তার নির্মিত অবকাঠামোকে ভিত্তি করে পরবর্তী সময় মালির উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। এমনকি মুসার তৈরি পুরনো দালানের ওপরই মালির একটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। কিন্তু মুসার আরো বড় কৃতিত্ব হলো শাসনকালে তিনি বহির্বিশ্বের সঙ্গে সফল কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা। গাও ও টিম্বাক্টুর নতুন বিন্যাসের পর ইতালি, পর্তুগালের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক তৈরি হয়। ১৩৩৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি মরক্কোর বিখ্যাত শাসক এবং বিজেতা আবু আল হাসানের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। মুসা তার দুজন দূতকে মরক্কো প্রেরণ করেন। সে সময়ে আবু আল হাসান মাগরেবের সবচেয়ে ক্ষমতাধর শাসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। যদিও দূতদের ফেরত আসার আগেই মুসার মৃত্যু হয়, আবু আল হাসানের আতিথ্য এবং বন্ধুত্বপূর্ণ বার্তা এ কূটনৈতিক মিশনকে সফল বলেই প্রমাণ করে।

মুসা যেভাবে আলোচিত হন, তাতে মনে হয় মালির প্রকৃতি প্রদত্ত স্বর্ণ তার সফলতার একমাত্র কারণ। কিন্তু মানসা মুসা মূলত প্রাকৃতিক স্বর্ণ ছাড়াও তার রাজ্যের অন্যান্য ক্ষেত্রকেও স্বর্ণমণ্ডিত করেছিলেন। মুসার ক্ষমতা লাভের আগে যেসব অঞ্চল বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহূত হতো, তিনি সেসব দখলের মাধ্যমে নতুন করে বিন্যাস করার ফলে মুসার সময়ে সাহারা উপ-অঞ্চল এবং সাহারার বহিরাঞ্চলেও মালির বাণিজ্য ছড়িয়ে পড়েছিল। মালিকে যে তত্কালীন আফ্রিকার (কখনো কখনো সমস্ত পৃথিবী) সর্বোচ্চ ধনী রাজ্য বলা হতো তার কারণ মূলত এ ব্যবসা। গাও দখলের পর তামার খনি হস্তগত হওয়ার পাশাপাশি হাতির দাঁতের ব্যবসাও মালির আয়ের অন্যতম উৎস ছিল। ফসলের মধ্যে জোয়ার, কোলাবাদাম, বাজরা প্রভৃতি যা উত্পন্ন হতো সেখান থেকেও নিকটবর্তী অঞ্চলে কিছু প্রেরণ করা হতো। যেহেতু টিম্বাক্টু ও গাও ছিল এসব বাণিজ্য কাফেলার সংযোগস্থল, সেখানে গড়ে উঠেছিল সরাইখানা, বাজার এবং সব ধরনের দেনদেনের কেন্দ্রস্থল।

যদিও সেই চতুর্দশ শতাব্দীতে স্বর্ণ ছিল মুদ্রা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় উদাহরণ, কিন্তু মালির ক্ষেত্রে কিছু ভিন্নতা রয়েছে। এখানে মুদ্রা হিসেবে কড়ি ব্যবহার করা হতো। মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা এবং মিনরের আল উমরী উভয়েই মালিতে কড়ির এ প্রচলনের কথা লিখেছেন। তাদের মতে অভ্যন্তরীণ কিংবা স্বল্প পরিমাণের লেনদেনে কড়ি এবং বড় কিংবা দীর্ঘ লেনদেনের ক্ষেত্রে স্বর্ণ ব্যবহূত হতো। এ থেকে বোঝা যায় মালির ব্যবসা ক্ষুদ্র হতে বৃহৎ, অভ্যন্তরীণ হতে বৈশ্বিক; অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় সব মালিই বাণিজ্যের পিঠস্থান হয়েছিল। হজযাত্রার দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় তিনি ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চল দেখে অভিজ্ঞতা গ্রহণ করেছিলেন এবং তা কাজেও ব্যবহার করেছিলেন।

যদিও মানসা মুসার সময়ে তৈরি আস-সাহেলীর সেই দরবার ধ্বংস হয়ে গেছে, জিঙ্গারবার মসজিদ এখনো দাঁড়িয়ে আছে। মুসা তার সময়ের টিম্বাক্টুকে উপযুক্তরূপেই তৈরি করেছিলেন, কিন্তু পরে ইউরোপিয়ানদের দ্বারা সমুদ্রপথ আবিষ্কারের মাধ্যমে স্থলপথ বাণিজ্য লোপ পেতে আরম্ভ করলে টিম্বাক্টুসহ মালির সমৃদ্ধিও ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। কিন্তু মুসা যে মালি গড়ে তুলেছিলেন তার রূপ অন্তত ২০০ বছর পর্যন্ত অনুভব করা যেত এবং এখনো মালির সেই সময়কার সমৃদ্ধির কথা আলোচিত হয়। সেই সমৃদ্ধির বাইরে মুসার অন্যতম কৃতিত্ব ছিল মালির মানুষকে শিক্ষিত করার প্রচেষ্টা। অবকাঠামো, বাণিজ্য, অর্থনীতি ও উপযুক্ত শিক্ষার মিশ্রণে যে মালিকে তিনি তৈরি করেছিলেন, তার মৃত্যুর কিছুদিন পর ইবনে বতুতা সেখানে উপস্থিত হয়ে মানসা মুসার কীর্তি লক্ষ করে তার প্রশংসা করেছিলেন।

 

টীকা

১.   স্বর্ণ বা স্বর্ণমুদ্রার ওজন পরিমাপের একটি একক। ১ মিসকাল=৪.২৫ বা ৪.৫ গ্রাম।

২.   উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার যেসব দেশ ভূমধ্যসাগরের তীর স্পর্শ করে তাদের একত্রে মাগরেব বলা হয়।

 

মাহমুদুর রহমান: লেখক