পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির চতুর্দশ শতাব্দীর সম্রাট মানসা মুসা মক্কায় হজযাত্রার (১৩২৪-২৫) জন্য ইতিহাসে পরিচিতি লাভ করেন। সম্রাটের সেই সফর মালি সাম্রাজ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল এবং একই সঙ্গে বহির্বিশ্বে মালির খ্যাতিকে ছড়িয়ে দিয়েছিল। এ হজযাত্রা মানসা মুসাকে উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সুপরিচিত এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব করে তুলেছিল, এমনকি সম্রাটের নিজস্ব ধর্মীয় রীতিনীতিতেও পরিবর্তন এসেছিল। পরবর্তী সময়ে সে পরিবর্তন মালির জনগণ কীভাবে ইসলাম অনুশীলন করবে, তা নির্ধারণ করেছিল। বলা হয়, মানসা মুসার রাজত্ব (১৩১২-৩৭), যা মালি সাম্রাজ্যের ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে খ্যাত, সম্পর্কে যা কিছু জানা যায়, তার বেশির ভাগই এসেছে সম্রাটের হজযাত্রার মহাকাব্যিক গল্প বা বিভিন্ন ঘটনা থেকে। একদিকে মানসা মুসার হজযাত্রা ছিল দুনিয়ার কাছে মালির বিপুল ধনসম্পদ প্রদর্শন এবং অন্যদিকে জন্ম দিয়েছিল অসংখ্য চমকপ্রদ উপাখ্যান। তার ঐতিহাসিক হজযাত্রাকে অনেক ইতিহাসবিদ এবং পণ্ডিত পশ্চিম আফ্রিকার সমাজে গভীর পরিবর্তন আনার নেপথ্যে অন্যতম প্রভাবসঞ্চারী ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। পরিবর্তনগুলো পশ্চিম আফ্রিকার সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। ইতিহাস থেকে জানা যায়, পশ্চিম আফ্রিকার মুসলমান শাসকদের মধ্যে মানসা মুসাই সর্বপ্রথম হজপালন করার জন্য মক্কা গমন করেন।

বর্তমান নিবন্ধে মানসা মুসার সেই ঐতিহাসিক হজযাত্রার প্রেক্ষিত, যাত্রাকালীন বিভিন্ন ঘটনাবলির সংক্ষিপ্ত বিবরণ, হজ শেষে ফেরার সময় সম্রাট কী নিয়ে এসেছিলেন এবং পরে স্বদেশে তার সেই হজযাত্রার কী প্রভাব পড়েছিল, সেই সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।

মানসা মুসার এলাকার স্থানীয় ভাষায় ‘মানসা’ নামের অর্থ হলো রাজা, সম্রাট, রাজাধিরাজ বা সুলতান। তাই মানসা তার নামের অংশ নয় বরং উপাধি। তার পুরো নাম ‘মুসা কিতা’। মালির সুলতান হওয়ার কারণে তাকে মানসা খেতাবে ভূষিত করা হয়। মানসা ছাড়াও তার আরো অনেক উপাধি ছিল, যেমন প্রথম মুসা, মালির আমির, ওয়াংগারা খনির সম্রাট, কনকান মুসা বা কানকো মুসা, মালির সিংহ, গঙ্গা মুসা ইত্যাদি। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মানসা মুসার জন্ম ১২৮০ খ্রিস্টাব্দে। তিনি ছিলেন মালি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সান্দিয়াতা কিতার প্রপৌত্র। তার বড় ভাই মানসা আবু-বকরের পর ১৩১২ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘দশম মানসা’ হিসেবে মালির রাজ্যভার গ্রহণ করেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৩২ বছর। সে বয়সেই তিনি পৃথিবীর বড় একটা অংশের সম্রাট হয়েছিলেন। তিনি প্রথম আফ্রিকান শাসক, যিনি ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন। তিনি মালি সম্রাজ্যের এবং আফ্রিকার সবচেয়ে সফল শাসনকর্তা ছিলেন। প্রায় সিকি শতাব্দীর শাসনামলে তত্কালীন মালি সাম্রাজ্য এখনকার মালি, সেনেগাল, গাম্বিয়া, গিনি, নাইজার, নাইজেরিয়া, শাদ, মৌরিতানিয়া ও বুরকিনা ফাসোর কিছু অংশজুড়ে ছড়িয়ে ছিল।


মানসা মুসা ছিলেন অগাধ ধনদৌলতের মালিক। তিনি তার সময়ের সবচেয়ে সম্পদশালী সম্রাট এবং সর্বকালের শীর্ষ ধনী ব্যক্তি। কয়েক বছর আগে সময় এবং মুদ্রাস্ফীতির হিসেব বিবেচনা করে তাকে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি এক অর্থনৈতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ৪০০ বিলিয়ন (অর্থাৎ ৪০ হাজার কোটি) ডলারের সম্পদ ছিল মানসা মুসার। বলা বাহুল্য, অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদরা ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন যে তার সম্পদ একটি বিশেষ সংখ্যায় নির্ণয় করা সম্ভব নয়। তবে তার সেই তথাকথিত অর্থকড়ির সঙ্গে তুলনা করে বলা যায়, বর্তমান সময়ের সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তি ‘অ্যামাজন’-এর প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের সম্পদের পরিমাণ মাত্র আনুমানিক ১৩২ বিলিয়ন (অর্থাৎ ১৩ হাজার কোটি) ডলার। মানসা মুসা এতটাই বিত্তশালী ছিলেন যে তার উদার হস্তে করা দান মিসরের অর্থনীতিকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিল। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক রুডলফ বুচ ওয়ার বিবিসিকে এক সাক্ষাত্কারে বলেন, ‘মুসার সম্পদের সমসাময়িক বিবরণ এতটাই শ্বাসরুদ্ধকর যে তিনি সত্যিই কতটা বিত্তবান ও শক্তিশালী ছিলেন তা ধারণা করাটাও কঠিন।’ উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘মানি ডট কম’-এ জ্যাকব ডেভিডসন লিখেছেন, ‘যতটা বলা সম্ভব, তার চেয়েও অধিক ধনী ছিলেন মানসা মুসা।’

যাই হোক, এত বিত্তশালী হওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়, মানসা মুসার ধনসম্পদের মূল উৎস ছিল স্বর্ণ ও খনিজ লবণ রফতানি। উল্লেখ্য, তত্কালীন সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী তিনটি অঞ্চলের মধ্যে একটি ছিল মালি সাম্রাজ্য। তখন পুরো দুনিয়ায় যত স্বর্ণ উত্তোলন ও লবণ আহরণ হতো, তার অর্ধেকটাই ছিল মালি সাম্রাজ্যে। সেই স্বর্ণ ও লবণের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছিলেন মানসা মুসা। এছাড়া আটলান্টিক মহাসাগরের তীরবর্তী পশ্চিম আফ্রিকা থেকে ভূমধ্যসাগরের তীর পর্যন্ত উত্তর আফ্রিকার মধ্যবর্তী সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক পথ তার অধীনে থাকায় আরব এবং ইউরোপীয় বণিকদের কাছ থেকে আদায় করা রাজস্ব থেকেও প্রচুর আয় হতো। কথিত আছে, মানসা মুসার সম্পদ রক্ষায় দুই লাখ সৈন্য ছিল।

মানসা মুসা ছিলেন একজন ধার্মিক মুসলমান। তিনি কেন হজপালন করেছিলেন, তার কারণ হিসেবে ঐতিহাসিকরা একাধিক বিষয় চিহ্নিত করেছেন। প্রধান দুটি বিষয় হলো:

এক. আফ্রিকার মুসলমান পণ্ডিত মাহমুদ কাতির মতে, মানসা মুসার জীবনে একটা বড় ঘটনা ঘটেছিল, যা তাকে ধার্মিক ও আল্লাহ-ভীরু করেছিল এবং তার জীবনে গভীর পরিবর্তন এনেছিল। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মানসা মুসা ভুল করে তার মাকে হত্যা করেছিলেন। তার জন্য তিনি তীব্র দুঃখ অনুভব করতেন, অনুশোচনায় ভুগতেন এবং শাস্তির আশঙ্কা করতেন। তাই প্রায়শ্চিত্যের জন্য তিনি প্রচুর পরিমাণে দান করতেন এবং সারা বছর রোজা রাখতেন। তার পরও মনে শান্তি না আসায় তিনি ওলামাদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কেমন করে তিনি আল্লাহপাকের ক্ষমা পেতে পারেন। তাদের পরামর্শেই তিনি হজপালনের সিদ্ধান্ত নেন। এছাড়া ওলামারা তাকে মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর রওজা পরিদর্শন করারও পরামর্শ দেন, যাতে নবী করীম (সা.) তার জন্য সুপারিশ ও আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

দুই. বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মালির জোট গঠন এবং

তিন. জাঁকজমকপূর্ণভাবে বিত্তবৈভব ও ক্ষমতা প্রদর্শন করে মালি সাম্রাজ্যকে বিশ্ব মানচিত্রে তুলে ধরা।

মানসা মুসা ১৩২৪ খ্রিস্টাব্দে পবিত্র হজপালনের জন্য যাত্রা করেন। মালি থেকে পুরো আফ্রিকা অতিক্রম করে মক্কা যেতে তার এক বছরেরও বেশি সময় লেগেছিল। বিশাল লটবহরের সেই চিত্তাকর্ষক কাফেলায় আনজামের কোনো কমতি ছিল না। তার সঙ্গে ছিল প্রায় ৬০ হাজার পুরুষ ও নারী এবং তাদের মধ্যে প্রায় ১২ হাজার ক্রীতদাস। তার প্রথম স্ত্রীও সফরসঙ্গী ছিলেন। এছাড়া বেশ কয়েকজন শিক্ষক, চিকিৎসক, সরকারি কর্মকর্তা ও সংগীতশিল্পীও ছিল। তিনি সফরের জন্য সর্বপ্রকার প্রয়োজনীয় সামগ্রী, পর্যাপ্ত পরিমাণের খাদ্যশস্য এবং প্রচুর ধনসম্পদ নিয়ে রওনা হয়েছিলেন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, তার সঙ্গে ৮০টি উট ছিল। প্রত্যেকটি উটের পিঠে ৩০০ পাউন্ড ওজনের স্বর্ণ ছিল। তিনি ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করেছিলেন এবং তার অগ্রভাগে ছিল ৫০০ ক্রীতদাস। সেসব ক্রীতদাস শুধু স্বর্ণমুদ্রা, স্বর্ণখণ্ড ও খনিজ লবণসহ মূল্যবান মণিরত্ন বহনের দায়িত্ব নিয়োজিত ছিল।

কথিত আছে, হজ কাফেলার পথে যত গরিব ও দরিদ্রের দেখা পেয়েছেন, মানসা মুসা সবাইকে অর্থসম্পদ এবং খাদ্য-বস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছেন, এমনকি শহরগুলোর শাসকদেরও প্রচুর স্বর্ণ উপহার দিয়েছেন। তিনি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে বিভিন্ন সুভেনির ক্রয় করেন। এছাড়া যাত্রাপথে তিনি বিভিন্ন শহরে অনেক মসজিদ নির্মাণ করেন। তিনি প্রতি শুক্রবারে একটি করে মসজিদ নির্মাণ করেছেন।


সাহারা মরুভূমি পেরোনোর পরে মানসা মুসার কাফেলা নীল নদের অন্য পাড়ে মিসরের কায়রোতে পৌঁছে। তার আগেই সেখানে মানসা মুসার বিপুল সম্পদের কাহিনী ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সে সুযোগে বণিকরা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য অনেক বেশি বাড়িয়ে দেয়। সেখানে তিনি এত বেশি পরিমাণে অর্থকড়ি এবং স্বর্ণ ব্যয় করেন যে মিসরের বাজারে বিশাল মূল্যস্ফীতি দেখা দেয় এবং অর্থনীতিতে ধস নামে। মানসা মুসা বিষয়টি জানতে পেরে ফেরার পথে মিসরের স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উচ্চসুদে স্বর্ণ ধার করেন। তার পরও মিসরের স্বর্ণের বাজার আগের অবস্থায় ফিরে আসতে প্রায় এক দশক সময় লেগেছিল। কথিত আছে, তিন মাস কায়রোতে বসতি স্থাপনের আগে তিনি মিসরের সুলতানকে স্বর্ণের উপহার পাঠান। সুলতান তাকে গ্রীষ্মের সময় তার প্রাসাদে আতিথেয়তা গ্রহণের অনুমতি দেন। তার পরও মিসরে তাকে তার নিজের সঙ্গে এক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কারণ তখন মিসরের সুলতানকে অভিবাদন জানানোর সময় মাটিতে চুম্বন করার নিয়ম ছিল। নিয়মটি এমন একটি কাজ, যা পালন করার জন্য মানসা মুসা নিজেকে প্রস্তুত করতে পারেননি। ইবনে ফাদল আল-ওমারি, যিনি মিসরে মানসা মুসার সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন, উল্লেখ করেছেন যে সম্রাট সুলতানের দরবারে প্রবেশের জন্য প্ররোচিত হওয়ার আগেই অনেক ধরনের অজুহাত দেখিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের সঙ্গে সমঝোতা করেছিলেন যে যদি তাকে দরবারে প্রবেশের জন্য কুর্নিশ করতে হয়, তবে তা কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে হবে এবং তিনি তাই করেছিলেন।

মক্কায় পৌঁছে মানসা মুসা হজপালন করেন। হজের পর তিনি মক্কার জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশে অভিভূত হন। হজ থেকে ফেরার সময় তিনি উট বোঝাই করে চিকিৎসা, জ্যোতির্বিদ্যা, দর্শন, ভূগোল, ইতিহাস, গণিতশাস্ত্র ও আইনের ওপর প্রচুর বই, এমনকি মক্কার মেধাবী এবং সেরা গণিতবিদ, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী ও স্থপতিদের আমন্ত্রণ করে তার সঙ্গে নিয়ে আসেন। সেই স্থপতিরা মালিতে সর্বপ্রথম পোড়া ইট দিয়ে পাঁচটি মসজিদ নির্মাণ করেন, যা ইসলাম প্রসারকে উৎসাহিত করেছিল। অনেক পণ্ডিত ও বিজ্ঞজনরা একমত যে ইসলামের প্রতি ভালোবাসার কারণে মানসা মুসা তার শাসন পদ্ধতিতে বহু নতুন ধারণা প্রবর্তন করেছিলেন।

মানসা মুসার ঐতিহাসিক হজযাত্রা আফ্রিকা মহাদেশে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছিল। প্রথমত, ইসলামকে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে দিয়েছিল এবং ইসলামিক সংস্কৃতি, শিক্ষা, বাণিজ্য ও বাণিজ্যকে উৎসাহিত করতে সহায়তা করেছিল। দ্বিতীয়ত, মালি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন শহরে অবকাঠামো, বিশেষ করে ভবন নির্মাণে নতুন কৌশল ও স্থাপত্যশৈলীর প্রবর্তন হয়েছিল। পরে সেসব নতুন কৌশল ও স্থাপত্যশৈলী সমস্ত পশ্চিম সুদানে ছড়িয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, মরক্কোর মারাকেচ, মিসরের কায়রো এবং আন্দালুসিয়ার টোলেডোর মতো বাণিজ্য ও জ্ঞানের প্রধান কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব হয়েছিল।

মানসা মুসা টিম্বাক্টু এবং গাওয়ের মতো শহরগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন। তিনি মালি সাম্রাজ্যকে তত্কালীন ইসলামিক বিশ্বে শিক্ষার একটি আধুনিক কেন্দ্রে রূপ দিয়েছিলেন। তার নির্মিত স্থাপত্যগুলোর মধ্যে সাংকোরে মাদ্রাসা বা ইউনিভার্সিটি অব সাংকোরে, হল অডিয়েন্স এবং গ্রান্ড প্যালেস উল্লেখযোগ্য। কথিত আছে, সেই সাংকোরে মাদ্রাসা বা ইউনিভার্সিটি অব সাংকোরে—এ দেশ-বিদেশের শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে অধ্যয়নের সুযোগ পেয়েছিল।

ইতিহাস থেকে আরো জানা যায়, হজযাত্রায় মানসা মুসা তার ধনসম্পদ ও অবস্থান ব্যবহার করে মালির পরিচয় বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করেছিলেন এবং দেশটিকে ‘বিশ্ব মানচিত্রে’ স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কার্টোগ্রাফার (মানচিত্রকর) অ্যাঞ্জেলিন ডুলসার্ট তার প্রতিকৃতি আঁকেন, যা মালির একটি মানচিত্রে দেখা যায়। মানসা মুসা মালিকে বিখ্যাত করে তোলার কারণে ইউরোপীয় কার্টোগ্রাফাররা ক্রমেই মালিকে তাদের মানচিত্রে স্থান দিতে শুরু করে। বিখ্যাত মধ্যযুগীয় বিশ্ব মানচিত্র ‘কাতালান অ্যাটলাস’-এ মানসা মুসা স্থান পেয়েছিলেন, যেখানে নিজ দেশের সম্পদের প্রতীক হিসেবে এক হাতে রাজদণ্ড এবং অন্য হাতে স্বর্ণখণ্ড নিয়ে তাকে সাহারা মরুভূমির মধ্যবিন্দুতে দেখা যায়।

মানসা মুসার হজযাত্রার ফলে মালি সাম্রাজ্যের সম্পদ ও সমৃদ্ধির কথা ইসলামী দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল এবং পরে বিপুলসংখ্যক মুসলমান ব্যবসায়ী ও আলেমদের আকৃষ্ট করেছিল। সেসব মুসলমান আলেম এবং ব্যবসায়ীরা মালির সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বিকাশে প্রচুর অবদান রেখেছিলেন। তার রাজত্বকালেই তিউনিস ও মিসরের সঙ্গে মালির কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং এভাবেই মালি বিশ্বের মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিণত হয়েছিল।

পশ্চিম আফ্রিকার সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক, ইসলাম প্রচারক, শিক্ষা ও বিজ্ঞান অনুরাগী এবং সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ধনী মানসা মুসা মাত্র ৫৭ বছর বয়সে ১৩৩৭ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

পরিশেষে বলা যায়, মানসা মুসার হজযাত্রা আফ্রিকার ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবসঞ্চারী ও গুরুত্বপূর্ণ সফর। তার সেই হজযাত্রা ছিল বিভিন্ন কারণে তাত্পর্যপূর্ণ, যা পরবর্তী সময়ে ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে।

 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: এ লেখার জন্য একাধিক গবেষণাপত্র ও আর্টিকেল, খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রবন্ধ/নিবন্ধ এবং অনলাইন ম্যাগাজিনের বিভিন্ন তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।

 

ফজল হাসান: লেখক ও অনুবাদক