একসময় শিক্ষা
ও সংস্কৃতির
সমৃদ্ধ কেন্দ্র
হিসেবে খ্যাত
মালির টিম্বাক্টু
শহর বর্তমানে
গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য
ও বিশ্বের
সবচেয়ে বড়
প্রাচীন পাণ্ডুলিপির
সংগ্রহশালা হিসেবে
পরিচিত।
টিম্বাক্টু পশ্চিম
আফ্রিকার একটি
শহর, যার
নাম দীর্ঘদিন
ধরে বিশ্বের
কাছে অজানা
ছিল। শহরটি
লবণ, স্বর্ণ
ও হাতির
দাঁতের ব্যবসার
মাধ্যমে সমৃদ্ধি
অর্জন করেছিল।
এটি চৌদ্দ
শতকের মালি
সাম্রাজ্যের অংশ
ছিল। সমৃদ্ধ
পুস্তক সংগ্রহ
এবং অসংখ্য
বিখ্যাত পণ্ডিতদের
মিলনমেলার মাধ্যমে
এখানকার সাংকোরে
বিশ্ববিদ্যালয় শহরটিকে
আফ্রিকার একটি
বিখ্যাত জ্ঞানকেন্দ্র
হিসেবে প্রতিষ্ঠিত
করেছিল।
লরেন বোইসোনাল্ট
‘টিম্বাক্টুর
স্বর্ণযুগ’ গ্রন্থে
বলেন, ‘সাহারা
মরুভূমির দক্ষিণ
প্রান্তে, নাইজার
নদীর উত্তরে
ধূসর টাওয়ার
ও ধূলিপূর্ণ
রাস্তার এই
শহরটি যেন
বালির ভেতর
থেকে বেরিয়ে
এসেছে। এর
রয়েছে প্রায়
এক সহস্রাব্দের
সমৃদ্ধ ইতিহাস।
‘‘গুপ্ত
স্বর্গ’’ হিসেবে
পরিচিতি পাওয়ার
জন্য বহু
শতাব্দী ধরে
এটি আশীর্বাদপ্রাপ্ত
কিংবা অভিশপ্ত
হয়েছে। এটি
একজন বিখ্যাত
সুলতানের হাত
থেকে আগ্রাসী
উত্তরাঞ্চলীয়দের হাতে
এবং এরপর
ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের
কাছে চলে
যায়। পরবর্তী
সময়ে এটি
একটি ছোট্ট
যাযাবর চৌকি
থেকে একটি
বড় সাংস্কৃতিক
কেন্দ্র হয়ে
ওঠে। ইতিহাসের
বিভিন্ন সময়ে
এই মরু
শহরটি স্বর্ণসমৃদ্ধ,
দুর্ভেদ্য এবং
বিংশ শতাব্দীর
অন্যতম বড়
পরিবেশগত বিপর্যয়ের
সাক্ষী হওয়ার
জন্য বিখ্যাত
ছিল। এমনকি
এই গুগল
ম্যাপের যুগেও
শহরটি বিশ্বের
অজানা প্রান্তের
মতোই।’
শহরটি সম্পর্কে
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা
লিখেছে, ‘পশ্চিম
আফ্রিকার দেশ
মালির টিম্বাক্টু
শহরটি ট্রান্স-সাহারান
বাণিজ্য রুটে
একটি বাণিজ্য
চৌকি এবং
ইসলামী সংস্কৃতির
কেন্দ্র হিসেবে
ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এটি সাহারার
দক্ষিণ প্রান্তে
এবং নাইজার
নদী থেকে
প্রায় আট
মাইল উত্তরে
অবস্থিত। শহরটি
১৯৮৮ সালে
ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড
হেরিটেজ সাইট
হিসেবে মনোনীত
হয়। ২০১২
সালে এ
অঞ্চলে সশস্ত্র
সংঘাতের প্রতিক্রিয়ায়
টিম্বাক্টুকে ইউনেস্কোর
বিশ্ব ঐতিহ্যের
সংকটাপন্ন তালিকায়
যুক্ত করা
হয়েছিল।’
জোশুয়া হ্যামার নামক টিম্বাক্টুর একজন লাইব্রেরিয়ান বলেন, ‘টিম্বাক্টু এখন পৃথিবীর সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানেও বিখ্যাত হয়ে গেছে। একসময় এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও শৈল্পিক কেন্দ্র।’
জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে টিম্বাক্টুর উত্থান
আল-জাজাইরির
মতে পশ্চিমা
অনুপ্রবেশ হওয়ার
আগে কিছু
আফ্রিকান অঞ্চল
ইসলামের পৃষ্ঠপোষকতায়
এবং গুরুত্বপূর্ণ
বাণিজ্য কেন্দ্র
হিসেবে ভূমিকা
রাখায় মধ্যযুগে
সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ
কেন্দ্র হয়ে
ওঠে। মালি
ছিল এমনই
একটি জায়গা।
স্বর্ণ বাণিজ্যের
যাত্রাপথের সবচেয়ে
দুর্গম স্থান
হিসেবে চৌদ্দ
শতকে মালি
ভূমধ্যসাগরীয় বিশ্বে
বিখ্যাত হয়ে
ওঠে। এর
শাসক মানসা
মুসা (রাজত্বকাল
১৩১২-৩৭
খ্রিস্টাব্দ) কিংবদন্তিতে
পরিণত হয়েছিলেন।
হজপালনকারী তিনজন
মানসার (শাসক)
মধ্যে তিনি
অন্যতম ছিলেন।
এটি মালি
রাজ্যের শক্তি
এবং স্থিতিশীলতা
উভয়েরই প্রমাণ
দেয়। কারণ
হজপালন করতে
তার এক
বছর সময়
লেগেছিল। তিনি
সঙ্গে ১০০টি
উট নিয়ে
যাত্রা করেছিলেন,
যার প্রত্যেকটির
পিঠে ৩০০
পাউন্ড স্বর্ণ
ছিল। এটি
ছিল মালির
দরবারের ঐতিহ্য
ও ঐশ্বর্য,
যা বিভিন্ন
অঞ্চলের মানুষকে
মুগ্ধ করেছিল।
১৩২৪ সালে
মক্কায় হজযাত্রা
থেকে ফিরে
আসার সময়
মানসা মুসা
তার সঙ্গে
মুসলিম কবি
এবং স্থপতি
আস-সাহেলীকে
নিয়ে আসেন,
যিনি টিম্বাক্টু
ও গাওয়ের
মসজিদ এবং
এর বিখ্যাত
শিক্ষায়তন নির্মাণ
করেছিলেন। টিম্বাক্টুকে
তখন শিক্ষাদীক্ষার
বড় একটি
কেন্দ্র হিসেবে
দেখা হতো।
মানসার সাম্রাজ্যের
উত্কর্ষের খবর
ইউরোপে পৌঁছে
গিয়েছিল। ১৩২০
খ্রিস্টাব্দের মেজরকান
মানচিত্র এবং
১৩৭৫ খ্রিস্টাব্দের
ক্যাটালান অ্যাটলাসে
মালির শাসককে
লাতিন রাজার
মতো চিত্রিত
করা হয়েছিল,
যেখানে ব্যতিক্রম
ছিল কেবল
তার কালো
মুখটাই।
মানসা মুসা
সম্পর্কে ফিলিপ
ফার্নান্দেজ আর্মেস্টো
তার ‘বিফোর
কলম্বাস’ গ্রন্থে
লিখেছেন, ‘মানসার
সবকিছুই তার
ব্যক্তিত্বের কথা
প্রকাশ করে।
দাড়ি, মুকুট,
সিংহাসন, বর্ম,
শিরস্ত্রাণ ও
রাজদণ্ড তাকে
বর্বর নয়,
বরং একজন
মননশীল শাসক
হিসেবে উপস্থাপন
করে। যেকোনো
খ্রিস্টান রাজপুত্রের
সমকক্ষ একজন
সার্বভৌম শাসক
হিসেবে চিত্রিত
করে।’
টিম্বাক্টুর
পণ্ডিতরা
মুসলিম
সভ্যতার স্বর্ণযুগের
অনেক জ্ঞানকেন্দ্রের
মতো টিম্বাক্টুতেও
অনেক পণ্ডিত
ছিলেন। তাদের
মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ
কয়েকজন পণ্ডিত
হলেন মোদিবো
মোহাম্মদ আল
কাবুরি, আল
কাদি আল
হাজ, আবু
আব্দুল্লাহ, আগ
মোহাম্মদ ইবনে
মোহাম্মদ ইবনে
উসমান, শেখ
সিদি আবু
আল বারাকাত
মাহমুদ ইবনে
উমর ইবনে
আকিত, আল
মোক্তার আগ
মোহাম্মদ ইবনে
উসমান, আব্দুর
রহমান আগ
মোহাম্মদ ইবনে
উসমান, আবু
আল আব্বাস
আহমদ বুরিউ
ইবনে আগ
মোহাম্মাদ ইবনে
উসমান, আবু
আব্দুল্লাহ আগ
মোহাম্মদ ইবনে
আল মোক্তার
আন নাহাবী,
আল মোক্তার
ইবনে মোহাম্মদ
ইবনে আল
মোক্তার আন
নাহাবী ইবনে
আগ মোহাম্মদ,
আহমেদ বাবা
এস সুদানী,
মোহাম্মদ বাগায়োগো
এস সুদানী
আল ওয়াঙ্গারি
ও আরো
অনেকে।
টিম্বাক্টুুর বৌদ্ধিক
পরিমণ্ডল বিষয়ে
ওসমান ওমার
কেইন তার
‘বিয়ন্ড
টিম্বাক্টু’ গ্রন্থে
লিখেছেন, ‘টিম্বাক্টুুর
অনেক পণ্ডিতের
শতশত বা
হাজার হাজার
বইয়ের ব্যক্তিগত
লাইব্রেরি ছিল।
পণ্ডিতরা মসজিদে
শিক্ষাদান করতেন।
যেমন সানকোর
মসজিদ, সিদি
ইয়াহিয়া ও
জিঙ্গারবার মসজিদ।
কিন্তু বেশির
ভাগ পণ্ডিত
তাদের নিজস্ব
বাড়িতে একটি
বিশেষ কক্ষে
শিক্ষার্থীদের জ্ঞান
প্রদান করতেন,
যেখানে তাদের
বইও থাকত।
বিশেষজ্ঞরা তাদের
ছাত্রদের নির্দিষ্ট
বিষয় শিক্ষাদানের
জন্য অনুমোদন
দান করতেন।
অনুমোদনের মর্যাদা
বিশেষজ্ঞের পরম্পরার
ওপর নির্ভর
করত। এখনো
এটা ভাবা
হয় যে
একজন বিখ্যাত
বিশেষজ্ঞ কর্তৃক
অনুমোদিত একজন
পণ্ডিত, যিনি
নিজে অন্য
একজন বিখ্যাত
বিশেষজ্ঞের প্রাক্তন
ছাত্র, তিনি
একজন কম
বিখ্যাত বিশেষজ্ঞের
দ্বারা শেখানো
একজন পণ্ডিতের
চেয়ে বেশি
আস্থাভাজন হবেন।’
টিম্বাক্টুর পাণ্ডুলিপি
মাইকেল
এবং মেরি
বি উডস
‘প্রাচীন
আফ্রিকার সপ্তাশ্চর্য’
গ্রন্থে লিখেছেন,
‘প্রাচীন
টিম্বাক্টুু ছিল
ইসলামী শিক্ষার
কেন্দ্র। এতে
পাণ্ডুলিপিতে পূর্ণ
লাইব্রেরি ছিল।
পাণ্ডুলিপিগুলো আরবি
ভাষায় হাতে
লেখা ছিল।
আরবি ছিল
ইসলামী পণ্ডিতদের
ভাষা। আধুনিক
সময়ে প্রায়
সাত লাখ
প্রাচীন পাণ্ডুলিপি
এখনো টিম্বাক্টুতে
রয়েছে। সেগুলো
সরকারি বা
ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে
সংরক্ষিত আছে।
এগুলোর মধ্যে
রয়েছে গণিত,
রসায়ন, জ্যোতির্বিজ্ঞান,
চিকিৎসাবিজ্ঞান, ইতিহাস
ও ধর্মীয়
বইয়ের পাণ্ডুলিপি।
অনেক পাণ্ডুলিপি
হারিয়ে যাওয়ার
আশঙ্কায় রয়েছে।
সময় তাদের
পাতাগুলোকে ভঙ্গুর
করে দিয়েছে।
এগুলো স্পর্শ
করলে কাগজ
ভেঙে যায়।
পোকামাকড়, আর্দ্রতা
ও ছত্রাকও
পাণ্ডুলিপির ক্ষতি
করেছে। টিম্বাক্টুর
কর্মকর্তারা পাণ্ডুলিপিগুলো
বাঁচানো এবং
আরো ভালো
অবস্থায় সংরক্ষণের
জন্য অর্থ
সংগ্রহ করছেন।’
দীর্ঘ সময়
ধরে টিম্বাক্টুু
পশ্চিম আফ্রিকায়
ইসলামী শিক্ষা
ও সাহিত্যের
ঐতিহ্যবাহী শহর
হিসেবে প্রতিষ্ঠিত
ছিল, যা
পরবর্তী সময়ে
উত্তর মালির
কল্পিত শহরগুলোর
নামের মাঝে
প্রচ্ছন্ন হয়ে
যায়। টিম্বাক্টুর
সাম্প্রতিক সংকটের
সময় এটি
ভালোভাবে ফুটিয়ে
তোলা হয়েছিল,
যখন পাণ্ডুলিপিগুলো
ধ্বংসের আশঙ্কায়
আন্তর্জাতিক বিপদঘণ্টা
বাজানো হয়েছিল।
মৌরিতানিয়া, নাইজার
ও নাইজেরিয়ায়ও
এ সাহিত্য
ঐতিহ্যের পাণ্ডুলিপির
অনেক বড়
সংগ্রহশালা রয়েছে।
একাধিক জাতিরাষ্ট্রের
সীমানা দ্বারা
বিভক্ত এ
পাণ্ডুলিপিগুলো একই
ইসলামী ঐতিহ্যের
প্রতিনিধিত্ব করে।
হাসান তানভীর: অনুবাদক





