বুবোনিক প্লেগ
বা শুধুই
প্লেগ যে
নামে ডাকা
হোক না
কেন, এ
মহামারী পনেরো
শতকে ইউরোপের
মোট জনসংখ্যার
তিন ভাগের
এক ভাগকে
বিলুপ্ত করে
দিয়েছিল ধরণি
থেকে। কিন্তু
প্লেগের জন্ম
আসলে এশিয়ায়
এবং এ
মহামারী এশিয়াকেও
বিভিন্ন সময়ে
বিপর্যস্ত করেছে।
দুর্ভাগ্যক্রমে
এশিয়ায় প্লেগের
মহামারী চলাকালে
সংশ্লিষ্ট অনেক
বিষয় নথিভুক্ত
করা হয়নি।
১৩৩০-৪০
সালের মধ্যে
এ রোগ
ব্যাপক বিস্তৃতি
লাভ করেছিল।
কালো মৃত্যুর উৎপাত্তি
গবেষকরা
মনে করেন,
প্লেগের উদ্ভব
চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে।
আবার অনেকে
মনে করেন,
এশিয়ার মধ্যাঞ্চল
থেকে এ
রোগের উৎপাত্তি
হয়েছে। আমরা
জানি যে
১৩৩১ সালে
ইউয়ান সাম্রাজ্যে
এক মহামারীর
সূত্রপাত হয়েছিল,
যার ফলে
চীনে মোঙ্গল
শাসনের যবনিকা
ঘটেছিল। ঠিক
তিন বছর
পরই হেবেই
প্রদেশের ৯০
শতাংশ মানুষ
প্লেগে মারা
যায়। মৃতের
সংখ্যা ছিল
৫০ লাখের
মতো।
বিজ্ঞানীরা
প্রাণীর বংশগত
জিনের ধারা-উপাত্ত
বিশ্লেষণ করে
জানতে পেরেছেন,
দুই হাজার
বছর আগে
চীনে উৎপাত্তি
হওয়া প্লেগ
রোগ পৃথিবীর
প্রায় ১০
কোটি মানুষের
প্রাণ হরণ
করেছে। বিভিন্ন
দেশের বিজ্ঞানীরা
মেডিকেল জার্নাল-নেচার
জেনেটিকসে এসব
তথ্য জানিয়েছেন।
প্রাথমিককাল থেকে
অষ্টাদশ শতাব্দীর
শেষ ভাগ
পর্যন্ত প্লেগ
মহামারীর গঠন
গবেষকরা জিনোম
সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে
পুনর্গঠিত করতে
পেরেছেন।
নতুন
এ গবেষণায়
বলা হয়েছে,
দুই হাজার
বছর আগে
চীনে উৎপাত্তি
হওয়া প্লেগ
রোগ সারা
বিশ্বে ভয়ংকরভাবে
ছড়িয়ে পড়েছিল
বিভিন্ন কালপর্বে।
বিজ্ঞানীরা প্লেগের
১৭টি সম্পূর্ণ
জিনোম ও
৯৩৩টি পরিবর্তনশীল
ডিএনএ নিয়ে
তুলনামূলক পর্যালোচনা
করেছেন এবং
তাদের কাছে
সারা দুনিয়ার
বিভিন্ন প্রান্ত
থেকে সংগ্রহ
করা প্লেগ
জীবাণুর নমুনা
ছিল। এ
গবেষণা থেকে
তারা জানতে
পেরেছেন, প্লেগ
রোগ মহামারী
আকারে কোথায়
কোথায় সংঘটিত
হয়েছিল এবং
কীভাবে কাজ
করেছে।
গবেষকরা
জানিয়েছেন, শুরুতে
প্লেগ রোগের
জীবাণু চীনের
কাছাকাছি অথবা
চীনে বিস্তার
লাভ করেছিল।
পরে এ
রোগ বিভিন্ন
পথে মহামারী
আকারে ছড়িয়ে
পরে। যেমন
পশ্চিম এশিয়ায়
পৌঁছে যায়
রেশমপথ হয়ে
এবং একজন
চৈনিক পরিব্রাজক
ঝ্যাং হের
মাধ্যমে ১৪০৯-৩৩
সালের মধ্যে
হাজির হয়
আফ্রিকায়।
কালো
মৃত্যুখ্যাত প্লেগ
রোগ এশিয়া,
ইউরোপ ও
আফ্রিকায় ছড়িয়ে
পড়ে ১৩৪৭-৫১
সালের মধ্যে।
প্লেগ ছড়িয়ে
যাওয়ার ফলে
পৃথিবীর জনসংখ্যা
৪৫ থেকে
নেমে ৩৫
কোটি হয়ে
গিয়েছিল। চীনের
জনসংখ্যার অর্ধেক,
ইউরোপের তিন
ভাগের এক
ভাগ এবং
আফ্রিকার আট
ভাগের এক
ভাগ প্লেগের
আক্রমণে মারা
গিয়েছিল।
১২০০
সালে চীনের
জনসংখ্যা ছিল
১২ কোটি,
কিন্তু ১৩৯৩
সালের পরিসংখ্যান
জানায় যে
দেশটিতে মাত্র
৬ কোটি
৫০ লাখ
বেঁচে ছিল।
এর মধ্যে
আবার অনেকে
দুর্ভিক্ষের কারণে
এবং ইউয়ান
রাজত্ব থেকে
মিং শাসনের
উত্থান পর্বের
অরাজকতার প্রেক্ষিতে
মারা যায়।
কিন্তু লাখ
লাখ মানুষ
মারা যায়
বুবোনিক প্লেগ
রোগে।
কালো
মৃত্যু বা
প্লেগ রোগ
তার উৎপাত্তিস্থল
সিল্ক রোডের
পূর্ব প্রান্ত
থেকে বাণিজ্য
পথে পশ্চিম
দিকে এগিয়ে
যায় এবং
পথিমধ্যে যাত্রাবিরতি
করে মধ্য
এশিয়ার মরুভূমির
পান্থশালাগুলো এবং
মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোতে।
এভাবে প্লেগ
এশিয়ায় বসবাসকারী
সকল জাতিকেই
সংক্রমিত করে।
মিসরীয়
পণ্ডিত আল
মাজরিকি উল্লেখ
করেন, ঋতু
পরিবর্তনের সময়
পশুচারণের জন্য
স্থাপিত তাদের
শীত ও
গ্রীষ্মকালীন তাঁবুগুলোতে
অবস্থানরত তিন
শতাধিক গোষ্ঠীর
সবাই মারা
গিয়েছিল কোনো
দৃশ্যমান কারণ
ছাড়াই। তিনি
দাবি করেছেন,
এভাবে কোরিয়ার
উপদ্বীপসহ সমগ্র
এশিয়া প্রায়
জনশূন্য হয়ে
গিয়েছিল।
সিরীয়
লেখক ইবনে
আল-ওয়ারদি
১৩৪৮ সালে
প্লেগ রোগে
মারা যান।
তিনি তার
জীবদ্দশায় লিখে
গিয়েছিলেন যে
এ কালো
মৃত্যু ‘অন্ধকার
ভূমি’ বা
মধ্য এশিয়া
থেকে এসেছিল।
সেখান থেকে
চীন, ভারত,
কাসপিয়ান সাগর,
উজবেকদের ভূমি,
পারস্য ও
ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে
ছড়িয়ে পড়ে।
।
পারস্য ও
ইজেক-কলে
প্লেগের আঘাত
চীনে
দৃশ্যমান হওয়ার
কিছুদিন পরেই
প্লেগ পারস্যে
আঘাত হানে।
প্রমাণ হিসেবে
বলা যায়,
সিল্ক রোড
ছিল এ
ভয়ংকর ব্যাক্টেরিয়া
ছড়ানোর সহজ
পথ।
১৩৩৫
সালে পারস্য
ও মধ্যপ্রাচ্যের
মোঙ্গল শাসক
আবু সাইদ
এক যুদ্ধের
সময় প্লেগে
মারা যান।
এটা ছিল
এ অঞ্চলে
মোঙ্গল শাসনের
অবসানের ইঙ্গিত।
চৌদ্দ শতকের
মাঝামাঝিতে পারস্যের
আনুমানিক ৩০
শতাংশ মানুষ
প্লেগে মারা
যায়। মৃত
জনসংখ্যার স্থান
পূরণ হওয়ার
গতি ছিল
অত্যন্ত শ্লথ।
কারণ তখন
মোঙ্গল শাসনের
পতনের ফলে
রাজনৈতিক অস্থিরতা
চলছিল এবং
এর মধ্যে
তৈমুর লং
আক্রমণ করে
বসেছিল।
কিরগিজস্তানে
অবস্থিত ইজেক-কল
হ্রদের কিনারায়
প্রত্নতাত্ত্বিক খননের
ফলে জানা
যায় যে
১৩৩৮-৩৯
সালে সেখানকার
নেস্টোরিয়ান খ্রিস্টান
বাণিজ্য সম্প্রদায়
বুবোনিক প্লেগ
রোগের কারণে
নিশ্চিহ্ন হয়ে
গিয়েছিল। ইজেক-কল
ছিল সিল্ক
রোডের অন্যতম
কেন্দ্র। তাই
অনেকে, ইজেক-কলকে
কালো মৃত্যুখ্যাত
প্লেগ রোগের
জন্মস্থান হিসেবে
উল্লেখ করেছেন।
কাঠবিড়ালির চেয়ে
বড় প্রজাতির
ইঁদুর বাস
করত সেখানে।
এরাই ভয়ানক
প্লেগ রোগের
জীবাণু বহন
করত। এটা
বলাই যায়
যে সম্ভবত
ইজেক-কলের
তীরে এ
রোগ নিয়ে
আসে দূরপ্রাচ্যের
ব্যবসায়ীরা।
যদিও
প্রকৃত সংখ্যা
নির্দিষ্ট করে
বলা অসম্ভব।
তবে বিভিন্ন
ঘটনাপঞ্জি থেকে
বলা যায়,
মধ্য এশিয়ার
শহর তালাস
(বর্তমানে কিরগিজস্তানে
অবস্থিত), রাশিয়ার
গোল্ডেন হোর্ডের
রাজধানী সারাই,
উজবেকিস্তানের সমরখন্দসহ
এশিয়ার অনেক
এলাকাই কালো
মৃত্যুর প্রাদুর্ভাবে
সীমাহীন ভোগান্তিতে
পড়েছিল। তাই
অনুমান করে
বলা যায়,
প্রত্যেক জনবহুল
এলাকার অন্তত
৪০ শতাংশ
মানুষ মারা
যায়, যা
কোনো কোনো
ক্ষেত্রে ৭০
শতাংশ পর্যন্তও
পৌঁছেছিল।
মোঙ্গলরা কাফফায় যেভাবে প্লেগ
ছড়ায়
ইতালীয়
আইনজীবী গ্যাব্রিয়েলে
দে মুসিস
জানান, মোঙ্গল
সৈন্যদের সবাই
এ রোগে
আক্রান্ত হয়
এবং প্রতিদিন
হাজার হাজার
মারা যায়।
ফলে মোঙ্গল
রাজা নির্দেশ
দেন যে
মরদেহগুলো শহর
থেকে বাইরে
নিক্ষেপ করার
জন্য, যাতে
এ দুঃসহ
দুর্গন্ধে অন্যরা
মারা না
যায়। ফ্রান্সের
পাদ্রি গিলিস
লি মুইসি
উল্লেখ করেন,
বিপজ্জনক এ
রোগ তাতার
সৈন্যদের নাস্তানাবুদ
করে দেয়
এবং মৃত্যুহার
এতই বেশি
ছিল যে
সেখানে ২০
জনে একজন
জীবিত পাওয়া
যেত। তিনি
জানান, বেঁচে
যাওয়া মোঙ্গল
যোদ্ধারা বিস্মিত
হয়েছিলেন এটা
দেখে যে
কাফফার খ্রিস্টানরাও
এ রোগ
বহন করে
নিয়ে এসেছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে যেভাবে প্লেগ ছড়ায়
ইউরোপীয়
পর্যবেক্ষকরা মধ্যে
পশ্চিম এশিয়া
ও মধ্যপ্রাচ্যে কালো
মৃত্যুর আগমনে
অভিভূত হলেও
চিন্তিত ছিলেন
না। কোনো
এক বর্ণনায়
জানা যায়,
মেসোপটেমিয়া, সিরিয়া,
আর্মেনিয়া মরদেহে
আচ্ছাদিত হয়ে
গিয়েছিল। ভারত
জনশূন্য হয়ে
পড়েছিল। কুর্দিরা
পাহাড়ে পলায়ন
করে বাঁচার
বৃথা চেষ্টা
করেছিল। কারণ
তারাও অচিরে
এ মহামারীতে
আক্রান্ত হয়েছিল।
বিখ্যাত
পরিব্রাজক ইবনে
বতুতার বর্ণনা
থেকে জানা
যায়, ১৩৪৫
সালে সিরিয়ার
দামেস্কে এ
মহামারীতে দৈনিক
দুই হাজার
লোক মারা
যেত। তারা
প্রার্থনা করে
এ রোগকে
পরাজিত করতে
সক্ষম হয়েছিল।
১৩৪৯ সালে
পবিত্র মক্কা
নগরীতে প্লেগ
রোগ হানা
দেয়। সম্ভবত
মক্কায় আসা
কোনো আক্রান্ত
হজযাত্রীর মাধ্যমে
এ পবিত্র
নগরীতে প্লেগের
সংক্রমণ হয়েছিল।
মরক্কোর
ইতিহাসবিদ ইবনে
খালদুন এ
প্রাদুর্ভাবকে এভাবে
বর্ণনা করেন,
‘ধ্বংসাত্মক প্লেগ
রোগের দ্বারা
পূর্ব ও
পশ্চিমের সভ্যতা
আক্রান্ত হয়েছিল।
এটি সভ্যতা
ও জনসংখ্যা
নিশ্চিহ্ন হওয়ার
কারণ হয়ে
উঠেছিল। মানবসভ্যতার
পতনের সঙ্গে
মনুষ্যত্বেরও পতন
ঘটেছিল। শহর,
ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট
বরবাদ হয়ে
গিয়েছিল। বাড়িঘর
জনশূন্য হয়ে
যায়, বিভিন্ন
গোষ্ঠী দুর্বল
হয়ে পড়ে।
সামগ্রিকভাবে মানব
অধ্যুষিত অঞ্চলের
জীবনধারা একেবারে
বদলে গিয়েছিল।’
নিকট অতীতে
এশিয়ায় প্লেগের প্রাদুর্ভাব
১৮৫৫
সালে বুবোনিক
প্লেগ চীনের
ইউনান প্রদেশে
ছড়িয়ে পড়ে,
যা তৃতীয়
মহামারী নামে
পরিচিত। এর
ধারাবাহিকতায় ১৯১০
সালে পুরো
চীন আক্রান্ত
হয়ে চীনে
এক কোটি
লোক মারা
যায়। মৃতদের
অধিকাংশই ছিল
মাঞ্চুরিয়ার।
১৮৯৬-৯৮
সালের মধ্যে
প্লেগ ব্রিটিশ
শাসনাধীন ভারতবর্ষে
ছড়িয়ে পড়ে
প্রায় তিন
লাখ মানুষের
জীবন কেড়ে
নেয়। এটি
মুম্বাই থেকে
শুরু হয়ে
পুনে থেকে
ভারতের পশ্চিম
উপকূলে বিস্তৃত
হয়।
আমাদের
সৌভাগ্য যে
বর্তমানে অ্যান্টিবায়োটিক
আবিষ্কারের ফলে
আজ এ
রোগ থেকে
মুক্তি পাওয়া
যায়।
ক্যালি চেপেস্কি: যুক্তরাষ্ট্র ও কোরিয়াভিত্তিক ইতিহাসের শিক্ষক





