প্লেগের ভয়াবহতা কারো অজানা নয়। প্লেগ শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাগাতার মৃত্যু আর পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার হাজার ইতিহাস। আর আছে প্লেগ নিয়ে নানা রাজনীতি। প্লেগের উপস্থিতি আছে ইতিহাসে, সাহিত্যে, সিনেমায়, এমনকি ধর্মগ্রন্থে—ভগবতপুরাণ কি বাইবেলেও। প্লেগকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, তবে তার আগে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনে যাওয়া কয়েকটি প্লেগ নিয়ে আলাপ করা যাক।

প্লেগ ছড়ানোর দায়ে দীর্ঘদিন ধরে ইঁদুরকে দায়ী করা হলেও প্রকৃতপক্ষে তা ছড়ায় মাছির মাধ্যমে। মাছি আক্রান্ত ইঁদুরের গায়ে বসার পর মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটায়। ভয়াবহ মহামারীর তালিকায় প্রথমেই আসে খ্রিস্টপূর্ব ৪৩০ সালের স্মল পক্স মহামারীর কথা। ভেরিওলা ভাইরাসের প্রভাবে গ্রিসের এথেন্সে মারা গিয়েছিল ৩০ হাজারের বেশি মানুষ। এরপর বলা যায় ৫৪২ খ্রিস্টাব্দে রোমান সাম্রাজ্যে ঘটা প্লেগের কথা। জাস্টিনিয়ান I সম্রাটের আমলে বাইজেন্টাইন শহরে এ প্লেগ দেখা দেয়। প্লেগটি শুরু হয়েছিল মিসর থেকে। মিসর থেকে কনস্ট্যান্টিনোপল হয়ে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় ছড়াতে এর সময় লেগেছিল ২০০ বছর। আর এই ২০০ বছরে এক কোটি মানুষ আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।

এরপর আসে ১৩৩৪ সালের প্লেগের কথা। এটি শুরু হয়েছিল চীন থেকে। চীনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে লন্ডন পর্যন্ত আসতে সময় লেগেছিল ছয় মাস। এই প্লেগে মারা যায় এক লাখের বেশি মানুষ। কাছাকাছি সময়ে বহুল আলোচিত ব্ল্যাক ডেথ প্লেগ শুরু হয় ১৩৪৬ সালে, যাকে বাংলায় বলা হতো কালামড়ক। কারণ আক্রান্ত স্থানে কালশিরে পড়ে ধীরে ধীরে রোগীর মৃত্যু ঘটত। এ প্লেগ প্রথমে শুরু হয় এশিয়ায়, তারপর ইউরোপে। তবে এটি মূলত আঘাত হেনেছিল ইউরোপেই। ১৪ শতকে এর কারণে ইউরোপের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়। অনেকের ধারণা এ প্লেগ চীনের উত্তর-পশ্চিমাংশে শুরু হয়ে সিল্ক রোড আর অন্যান্য বাণিজ্যপথ ধরে মধ্যপ্রাচ্যে উপস্থিত হয়। মিসরের ইতিহাসবিদ আল মাজরিকির রচনায় দেখা যায়, এ প্লেগে তিন শতাধিক আদিবাসী গোষ্ঠী নির্মূল হয়ে গেছে। তার মতে, এশিয়ায় মানুষের অস্তিত্ব ব্ল্যাক প্লেগের কারণে সংকটাপন্ন অবস্থায় পৌঁছেছিল। অবশ্য সিরিয়ার লেখক ইবনে আল ওয়ারদি, যিনি নিজেই ১৩৪৮ সালে প্লেগে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। মৃত্যুর আগে লিখে গিয়েছিলেন যে ব্ল্যাক ডেথ নামের প্লেগটি এসেছে এশিয়ার মধ্যভাগ থেকে। তারপর চীন আর ভারত হয়ে তা পৌঁছে যায় উজবেকিস্তানে। তারপর পারস্যসহ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল তার কবলে পড়ে। শুধু ইউরোপেরই ৬০ শতাংশ মানুষ প্লেগে আক্রান্ত হয়।

১৫১৯ সালে মেক্সিকোয় স্মল পক্সের মহামারী দেখা দেয়, যাতে দুই বছরে মারা যায় ৮০ লাখ মানুষ। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে অখণ্ড ভারতে প্লেগের ভয়াবহ রূপটি প্রকাশ পেয়েছিল। কেবল ১৮৯৮ থেকে ১৯০৫-এর মধ্যেই মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল পাঁচ লাখের বেশি। ১৮৯৬ সালে বোম্বাই শহর সর্বপ্রথম প্লেগে আক্রান্ত হয়। পরে গুজরাট, সিন্ধু, কচ্ছ, পাঞ্জাবের কিছু অংশ, মাদ্রাজ ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু অংশে প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। কলকাতা শহরে প্লেগ প্রবেশ করে ১৮৯৮ সালে। এর  ঠিক আগে আগে কলকাতায় স্থাপিত হয়েছিল রামকৃষ্ণ মিশন। স্বামী বিবেকানন্দের আহ্বানে মানুষের সেবায় নিয়োজিত হতে পাশ্চাত্য থেকে সেখানে এসেছিলেন মার্গারেট এলিজাবেথ নোবল। মানুষের সেবায় উৎসর্গীকৃত এ নারী ভারতবর্ষে সিস্টার নিবেদিতা হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন। তার বর্ণনায় জানা যায়, স্বামী বিবেকানন্দ এবং তিনিসহ মিশনারির লোকেরা প্লেগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছিলেন। ১৮৯৮ সালে কলকাতায় প্লেগের প্রভাবে মৃত্যু যতটা হয়েছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়েছিল আতঙ্ক। মানুষের অজ্ঞতাজনিত কারণে আশঙ্কা বাড়াতে তারা নানা রকমের ভুলের মধ্যে জড়িয়ে পড়ছিলেন, যেসব কারণে ভোগান্তি বেড়েছিল। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার তখন প্লেগ নিরাময় ও নির্মূলের জন্য কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল। বাংলার তত্কালীন স্যানিটারি কমিশনার ক্যাপ্টেন ডব্লিউডব্লিউ ক্লেমশার লেখা অ্যান অ্যাকাউন্ট অব প্লেগ ইন বেঙ্গল (১৯০৬) প্রতিবেদনে তিনি কলকাতায় প্লেগের প্রবেশ এবং এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলকাতায় প্লেগ এসেছিল সমুদ্র মারফত। অনেকে যেমনটা মনে করে ট্রেনের মাধ্যমে এসেছিল, তা সত্য নয়। ১৮৯৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজের মাধ্যমে আক্রান্ত ইঁদুর এসে উপস্থিত হয়। আর তারপর তাদের শরীরে বসা মাছি থেকে প্লেগ সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। বিহার, সারান আর পাটনা সবার আগে সংক্রমণের কবলে পড়ে। এরপর প্লেগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে হুগলি, চব্বিশ পরগনা আর মেদিনীপুরে। তবে পূর্ববঙ্গ আর রাজশাহীতে প্লেগ ছড়ায়নি বলে জানা যায়।


প্লেগ ছড়াতে প্রয়োজন হতো দুটো জিনিস, এক হলো প্রচুর পরিমাণে ইঁদুরের উপস্থিতি আর দুই হলো অন্ধকারাচ্ছন্ন, বাতাস চলাচলবিহীন, অপরিষ্কার বাড়ি। নির্দিষ্ট কিছু রকমের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের পরিবেশ স্বাভাবিকভাবেই পাওয়া যেত। আর এ কারণেই দোকানদার, বিশেষ করে খাদ্যশস্যের ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত কিংবা জড়িত ছিলেন মিষ্টির ব্যবসার সঙ্গে, তারা প্রথম অবস্থায় এবং পরবর্তী সময়েও সবচেয়ে বেশি প্লেগে আক্রান্ত হয়েছেন। প্রধানত গ্রামাঞ্চলের দোকানপাটে মানুষ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। কিন্তু যেসব পেশায় এ ধরনের ঘরবাড়ি ছিল না, যেমন জেলে, যাযাবর, সাপুড়ে—তারা বেশির ভাগ বেঁচে গেছেন। আর পরিবেশের কারণে বিহারে প্লেগ ছড়িয়েছিল অনেক দ্রুত, যেখানে জায়গার অভাবে পাশাপাশি আর গাদাগাদি করে বাড়ি বানানো হতো। ইঁদুরের বসবাসের জন্য সেই এলাকা ছিল উপযুক্ত। অন্যদিকে পূর্ববঙ্গে ছিল বিস্তৃত গ্রাম আর মাঝে মাঝে বিস্তীর্ণ মাঠ। সেখানে এ কারণেই প্লেগের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা দেখা দেয়া কঠিন ছিল।

ক্যাপ্টেন ডব্লিউডব্লিউ ক্লেমশার রচনাসহ আরো অনেকের বর্ণনায় দেখা যায়, মানুষের ভ্রমণের মাধ্যমেই মূলত প্লেগ ছড়িয়েছিল। প্রথমত, একজন নিজের অজান্তে প্লেগের ভাইরাস শরীরে নিয়ে নতুন একটি স্থানে উপস্থিত হতো এবং হয়তো একদল মানুষের সংস্পর্শে আসত। প্রত্যেকের শরীরে জীবাণুর বিস্তার ঘটিয়ে মানুষটি মৃত্যুবরণ করত। সেখানে ইঁদুরের উপস্থিতি থাকলে তারাও একই জীবাণুতে আক্রান্ত হতো। তারপর প্রত্যেক অথবা ইঁদুর আবার নতুন কোনো স্থানে গিয়ে পৌঁছলে সেখানেও একইভাবে রোগের বিস্তার ঘটত। এভাবে মূলত জ্যামিতিক হারে রোগটি ছড়িয়ে পড়ত, বাড়ির পর বাড়ি, গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহর এভাবে দ্রুত আক্রমণের আওতায় চলে আসত। অনেক সময় মৃত ব্যক্তির সত্কার বা তার ব্যবহূত জিনিসপত্রের সংস্পর্শে আসার মাধ্যমেও রোগজীবাণু ছড়াত এবং মানুষ আক্রান্ত হতো। জিনিসপত্র কেনাকাটা থেকে শুরু করে আক্রান্ত শহরে উপস্থিতি—সবই যেকোনো মানুষের জন্য ভীতিকর ছিল। শরীরে জীবাণু সংক্রমণের পর একটি নির্দিষ্ট সময় তা শরীরে সুপ্ত থাকে। সময়টা ১০ দিন থেকে এক মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত।


ধীরে ধীরে প্লেগের বিস্তৃতি কেবল স্যাঁতসেঁতে আর বদ্ধ ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯০৩ সালে কলকাতার জেলখানাগুলোয়ও প্লেগে মরা ইঁদুর পাওয়া গেল এবং কদিনের মধ্যে জেলখানায় মানুষের মৃত্যু হতে লাগল। এভাবে নিত্যনতুন জায়গায় প্লেগের আক্রমণ বেড়ে যেতে লাগল।

প্লেগ নিয়ন্ত্রণে যে পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়েছিল, তা হলো প্রথমত, আক্রান্ত মানুষটিকে পরিবার ও প্রতিবেশীর সংস্পর্শ থেকে পুরোপুরি পৃথক করে ফেলা। দ্বিতীয়ত, রোগীর বাড়িটি সম্পূর্ণভাবে খালি করা, অর্থাৎ পরিবারের লোকজনকে সরিয়ে অন্য কোথাও যেতে বাধ্য করা। তৃতীয়ত, পুরো এলাকাটিকে পরিচ্ছন্ন করার পর জীবাণুনাশক ছিটানো। সংক্ষিপ্ত আকারে বললে বলা যেতে পারে, ভারতে প্লেগবিষয়ক যতটুকু জ্ঞান তখন উপস্থিত ছিল, তার আলোকে তারা আক্রান্ত এলাকাকে জনমানবশূন্য করার বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন বেশি। এলাকাটিতে মানুষের উপস্থিতির সম্ভাবনা না থাকলে তারা প্রচুর পরিমাণে হাতের কাছে থাকা জীবাণুনাশক ছিটিয়ে দিতেন। পূর্ববঙ্গে তখন ইঁদুর মারার ধুম পড়েছিল। হ্যামিলনের বাঁশিওয়লার মতো নির্বিচারে ইঁদুর হত্যা তখন প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল।

ইতিহাসের পথ ধরে ভয়ংকর সব প্লেগ পেরিয়ে এসে আজকের দিনে আর প্রাকৃতিকভাবে হুট করে প্লেগের আবির্ভাবের আশঙ্কা নেই বললেই চলে। এর প্রধান কারণ চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি এবং সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা। এখন দরকারি ওষুধপত্র এবং রোগীকে তার সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনাময় মানুষ থেকে পৃথক করতে বেশি সময় লাগে না। যোগাযোগের সুব্যবস্থার জন্য তাকে যেকোনো মূল্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদানের স্থানেও নিয়ে যাওয়া যায়। তার পরও ক্রমাগত একের পর এক মহামারীর আশঙ্কা কিংবা প্রকোপ লেগে থাকে। যেমন এইডসের ভয়াবহ বিস্তৃতি, সোয়াইন ফ্লু বা ইবোলা ভাইরাস, এমনকি হাল আমলে ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া সামান্য অসাবধানতার সুযোগে ভয়ানক বিস্তৃতির দিকে চলে যেতে পারে। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং বাংলাদেশের গত কয়েক বছরে এসব অসুখে মৃত্যুর সংখ্যা এমনটাই ইঙ্গিত দেয়। এসব রোগ ছড়াতে মাছির পরিবর্তে মশা অংশগ্রহণ করে। মালয়েশিয়ায় কঠোরভাবে প্রতিষেধক এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সত্ত্বেও সেখানে ডেঙ্গু আর চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব লেগে আছে। মাত্র দুই দশক আগেও এইডসে আফ্রিকা এবং আমেরিকায় হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। এইডসের বিস্তৃতি এখন ধীরগতিসম্পন্ন হয়ে গেলেও একেবারে থেমে যায়নি। কেবল সেপ্টেম্বর ২০১৫ অব্দি সিয়েরালিওন ও লাইবেরিয়ায় ২৮ হাজার মানুষ ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ১১০০-এর বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। মড়কের কারণে সিয়েরালিওন ও লাইবেরিয়া এখন বিধ্বস্ত নগরী। নতুন করে উঠে দাঁড়াতে তাদের আর্থিক সাহায্য-সহযোগিতার প্রয়োজন। বিশ্বব্যাপী বিস্তৃতি ঠেকানো গেলেও ছোট ছোট মড়কে সীমাবদ্ধ এলাকায় এখনো বিপুল ক্ষতি হয়।


চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি এবং সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে পৃথিবীতে বিশ্বায়ন সহজ হয়েছে। এতে আজ আমেরিকার সৈন্য আফ্রিকায় গিয়ে ঘাঁটি গাড়ে ইবোলা ভাইরাসের মড়ক নিয়ন্ত্রণ করতে। অবস্থাদৃষ্টে তাদের কার্যকলাপের অন্য অর্থ সামনে আনে; ইবোলা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের নামে এ যেন পুরনো উপনিবেশবাদের আধুনিক প্রকাশ! অন্যদিকে ২০১৪ সালে ইবোলা ভাইরাস বহনকারী একজন তরুণ যখন গিনি থেকে সেনেগালে ভ্রমণ করেছিল এবং সেনেগালের মানুষের মধ্যে ভাইরাসের মড়ক ছড়িয়ে দিয়েছিল, তখন সেখানকার মানুষ তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল। পুরো শহরের আক্রোশের মধ্যে তরুণ জীবনের শেষ সময়টুকু পার করেছিল। মনে হতে পারে যে সভ্যতার উজ্জ্বল আলো থেকে অনেকখানি দূরে থাকা সেনেগালের জনগণের এ প্রতিক্রিয়া তাদের পশ্চাত্পদতার প্রমাণ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ‘সভ্য’ আমেরিকার দিকে তাকালে দেখা যায় লাইবেরিয়া থেকে যখন ইবোলা রোগীর শরীরবাহিত হয়ে আমেরিকায় গিয়েছিল, তখন আমেরিকার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘৃণার ঝড় উঠেছিল। এতে বোঝা যায় মহামারী তথা দলে দলে মৃত্যুর সম্ভাবনা এমন এক আশঙ্কা, যার কারণে ‘সভ্য-অসভ্য’ সবাই এক কাতারে দাঁড়াতে পারে।

এভাবে মড়ক বা তার সম্ভাবনা মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে দেয়। মড়ক নিয়ে রাজনীতিও কম হয় না, অতীতেও যার উদাহরণ আছে। আমেরিকায় একবার সিফিলিসের মড়কের সম্ভাবনা রুখতে ভ্যাকসিন বিতরণের সময় মানুষকে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। ধর্ম গ্রহণের মাধ্যমে তারা ভ্যাকসিন পাওয়া এবং বেঁচে থাকার উপযুক্ত বিবেচিত হয়েছিল। বর্তমানে খোদ ঢাকায় মশা নিয়ন্ত্রণের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিবার ভোট চাওয়া হয়। পৃথক দুই সরকারের আমলে হলেও মশাবহিত রোগের ব্যাপারে জনগণের ভোগান্তি একই থেকে যায়। তারা মশার মাধ্যমে বিস্তার লাভ করা রোগে আক্রান্ত হয় এবং মৃত্যুবরণ করে। জনগণের প্রতিনিধি ভোট-পরবর্তীকালে প্রতিশ্রুতিমাফিক শক্ত হাতে মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়। তবে নির্বাচনের আগে আগে মড়কের হাত থেকে রেহাই দেয়ার কথা বলে ভোট হাতিয়ে নেয়ার বিষয়ে প্রত্যেক প্রার্থী ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। এখানে মশাজনিত মড়ক যেন তাদের জন্য এক সুযোগ তৈরি করে দেয়।


এছাড়া পৃথিবীব্যাপী জীবাণু ছড়িয়ে যুদ্ধ লাগানোর রাজনীতি তো আছেই, মড়কের জীবাণু যখন ‘বায়োলজিক্যাল উইপন’ হিসেবে ব্যবহূত হয়। কোনো জাতি-গোষ্ঠীকে ঘায়েল করার জন্য অথবা তাদের দেশ দখলের জন্য জীবাণুর বিস্তৃতি অস্ত্র হিসেবে কাজ করতে পারে বইকি। ইথিওপিয়ার কাফফায় একবার এ রকম ঘটনা ঘটেছিল। ১২০০ শতাব্দীর পর থেকে কাফফা ছিল ইতালির ব্যবসায়ীদের দখলে। পূর্ব ইউরোপে ১৩০০ শতাব্দীতে আধিপত্য স্থাপনকারী মঙ্গল জাতি, যাদের বলা হয় গোল্ডেন হর্ড, তারা জীবাণুর বিস্তারের মাধ্যমে কাফফা থেকে ইতালির ব্যবসায়ীদের তাড়িয়েছিল। ১৩৪৪ সালে গোল্ডেন হর্ড কাফফার ক্রিমসন বন্দর দখল করে নেবে বলে সিদ্ধান্ত নিল। ১৩৪৭ সাল পর্যন্ত জনি বেগের নেতৃত্বে মঙ্গল জাতি কাফফা নিজেদের দখলে রেখেছিল। তারা সেখানে প্লেগ ছড়িয়ে সামনে এগোতে এগোতে নিজেদের সীমানা পর্যন্ত দখল করে নিয়েছিল। ইতালির একজন ডাক্তার তার স্মৃতিকথায় লিখে গেছেন, মঙ্গলদের ছড়ানো জীবাণুতে তাদের সেনাবাহিনীর প্রায় সবাই আক্রান্ত হয়েছিল। প্রতিদিন হাজার হাজার সৈন্য মৃত্যুবরণ করছিল। মৃত শরীরগুলো মঙ্গলরা শহরের মাঝখানে রেখে আসত যেন দ্রুত শহরের মানুষ মড়কের জীবাণুতে আক্রান্ত হয়।

এ ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বায়োলজিক্যাল উইপন ব্যবহারের প্রথম উদাহরণ হয়ে আছে। যদিও ব্ল্যাক ডেথ প্লেগের সঙ্গে এর সম্পর্কের ব্যাপারে ব্যাপক তথ্য পাওয়া যায় না, তবে ফ্রেঞ্চ ইতিহাসবিদ গিলিস লি মুইসিসের বর্ণনায় দেখা যায়, ইতালীয় সেনাবাহিনী মড়কের প্রভাবে এমনভাবে মৃত্যুবরণ করছিল যে তাতে ৯৫ শতাংশ সৈন্য ঝরে গিয়েছিল। এক পর্যায়ে খ্রিস্টানদের মধ্যেও জীবাণু ছড়িয়ে যায়। গোল্ডেন হর্ড কিছু বন্দিকে উদ্বাস্তু হিসেবে জাহাজে করে জেনোয়ার দিকে যাত্রা করিয়ে দিয়েছিল। ধারণা করা হয়, ওই আক্রান্ত বন্দিদের মাধ্যমেই ইউরোপে জীবাণুর বংশবিস্তার ঘটে, যার কারণে ভয়াবহ ব্ল্যাক ডেথ প্লেগ সংঘটিত হয়। এই প্লেগই পরবর্তী সময়ে ক্রমে মধ্য এশিয়া, ইউরোপ আর ভারতকে প্রায় জনশূন্য করে ফেলে।

শুধু বাস্তবের রাজনীতি নয়, কল্পকাহিনীতেও প্লেগের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। বাংলা সাহিত্যের কথা ভাবলে বিশেষ করে আঠারো শতকের শেষে এবং ঊনিশ শতকের শুরুর দিকে অখণ্ড ভারতের সাহিত্যে প্লেগ বা প্লেগজনিত মৃত্যুর ঘটনার উপস্থিতি লক্ষণীয়। সাহিত্য সাজানো কাহিনীর মাধ্যমে জীবনের বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন ঘটায়। বিশ্বজুড়ে যুগে যুগে গল্প-উপন্যাসে তাই প্লেগের কথা এসেছে। প্লেগসংক্রান্ত পরিস্থিতির কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় আলবেয়ার কামুর দ্য প্লেগ উপন্যাসটির কথা। এর কাহিনীতে দেখা যায়, আলজেরিয়ার শহর ওরানে হঠাৎ করে হাজার হাজার ইঁদুর মরতে থাকে। এ ঘটনার কারণে শহরবাসীর মধ্যে এক রকমের বিষণ্নতা ভর করে। তারই মধ্যে হঠাৎ একজন মানুষ অজানা এক রকমের জ্বরে মারা যায়। পরে জানা যায়, অসুখটি হলো বুবোনিক প্লেগ। দ্রুত রোগীর সংস্পর্শে আসা মানুষের মধ্যে প্লেগ ছড়াতে থাকে। প্রত্যেকের ব্যক্তিগত কষ্ট তার কাছে প্রধান হয়ে ওঠে। রেমন্ড র্যামবার্ট নামে একজন সংক্রমিত হয়ে পড়লে প্যারিসে থাকা তার স্ত্রীর কাছে চলে যেতে চায়। কিন্তু জীবাণু ছড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাকে যেতে দেয়া হয় না। সে তখন চুপি চুপি পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে।

কামুর প্লেগ উপন্যাসের মূল উপজীব্য বিষয় হলো প্লেগের ঘটনার মধ্য দিয়ে পরাধীনতার কথা বলা। প্লেগের ফলে মানুষের জীবনে যা হুট করে নেমে আসে, তা হলো একাকিত্ব। রোগীকে আলাদা করে একা থাকতে বাধ্য করা হয়। জীবাণুর ক্রমেই সংক্রমণের হাত থেকে বাকিদের বাঁচানোর জন্য তাকে তার পরিবার বা প্রিয়জনদের থেকে পৃথক করা প্রথমত, জরুরি হয়ে পড়ে। এতে মানুষ শারীরিক কষ্টের চেয়েও মূলত মানসিক কষ্টে ভোগে। যেমন করে লেখক উপন্যাসে বর্ণনা করেছেন প্লেগের ফলে ঘটতে থাকা পরিস্থিতির কথা—রাতের নিস্তব্ধ পরিবেশে একটি অ্যাম্বুলেন্স এসে সংক্রমিত মানুষকে তুলে নিয়ে যায়। মানুষটির আর্তনাদে অন্ধকারের স্তব্ধতা খান খান হয়ে ভাঙে কিন্তু তার করুণ কান্না কারো মনে দরদের উদ্রেগ করে না। প্লেগজনিত একাকিত্বকে যুগে যুগে বহু লেখক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অত্যাচারের ক্যাম্পের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

উপন্যাসে আলবেয়ার কামু আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন, প্লেগের ফলে মানুষের জীবনে যে একাকিত্ব আর পরাধীনতা নেমে এসেছিল, তার আগেও কি মানুষ সংঘবদ্ধ ও স্বাধীন ছিল? প্লেগ মানুষের জীবনে মৃত্যুর ভয়াবহতা বয়ে আনতে পারে ঠিকই, কিন্তু জীবিত অবস্থায় কিংবা ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে ঝুঁকে পড়ার আগপর্যন্ত ঠিক কী রকমের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন আনতে পারে? আক্রান্ত মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করে যে প্লেগজনিত কড়া নিয়মকানুনের বেড়াজালে আবদ্ধ হওয়ার আগেও তারা মুক্ত ছিল কি? আবিষ্কার করে যে তারা ছিল নিজেদের তৈরি আচার-ব্যবহার আর সাজানো অভ্যাসের দাস। তাদের জীবন ছিল অদ্ভুত এক অদৃশ্য সংবিধানের মাধ্যমে পরিচালিত। তার চেয়ে বড়ো কথা, প্লেগে একে একে মরে যাওয়ার আগেও তারা প্রকৃতপক্ষে জীবিত ছিল কি? ভালোবাসার মানুষ বা আপনজনের সান্নিধ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরে তারা একাকিত্ব ও আপনজন হারানোর বেদনা বুঝতে পারে। তখন সেই আপনজনের জন্য কষ্টে মুষড়ে পড়ে, যার অস্তিত্ব এতদিন তার কাছে ছিল সহজলভ্য, তাই দেখেও না দেখার মতো উপেক্ষার। আলবেয়ার কামু যেহেতু বিধাতা এবং পরকালে বিশ্বাসী ছিলেন না তাই মৃত্যুকে বাড়তি মহিমা দানেও তার অস্বীকৃতি ছিল। তিনি বেঁচে থাকা এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মৃত্যুভয় উড়িয়ে জীবনের জন্য লড়ে যাওয়াকে লক্ষ্য মনে করেছেন। আর তাই তো দেখা যায়, প্লেগ শুরুর আগে মানুষের জীবন থাকে একাকী, লোকালয়ের সমুদ্রে যেন একেকজন একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ অথচ প্লেগ আসতেই তা পাল্টে যায়। প্রত্যেকে তখন নিজ নিজ সমস্যার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে সামগ্রিকভাবে প্লেগকে রুখে দেয়ার কার্যকলাপে সংঘবদ্ধভাবে নিমজ্জিত হয়। প্রকৃত অর্থে, উপন্যাসটির মতো বাস্তবেও যুগে যুগে প্লেগ মানুষকে মৃত্যু দিয়েছে ঠিকই কিন্তু প্রতিরক্ষার তাড়নায় সংঘবদ্ধ করেছে, এনে দাঁড় করিয়েছে এক শামিয়ানার নিচে, যাদের কোনো জাত-ধর্ম থাকেনি, থেকেছে কেবল আগামীর পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার বাসনা।

অন্যদিকে প্লেগ পরিস্থিতি আলোচনায় গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের উপন্যাস লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা-র কথাও উল্লেখ করা যেতে পারে, যেখানে ভালোবাসা আর মড়ক একটি অন্যটির হাত ধরে চলে। মড়ক যেমন সুযোগ পেলেই লোকালয়ের কোণে কোণে বিস্তার করে, উপন্যাসে চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতিও হয়ে ওঠে তেমন। কলেরার মড়ক যেমন আসে অবাধ বন্যার মতো, মানুষের হূদয়ে ভালোবাসাও তাই, যাকে কোনো বাঁধ দিয়ে আটকানো যায় না। তাই তো মড়কের প্রকোপের সঙ্গে কেবল তুলনা করা চলে ভালোবাসার তীব্রতাকে, যা ধ্বংস বোঝে না, নিশ্চিহ্ন হওয়াকে তোয়াক্কা করে না, কেবল নিজের দিকে টেনে নিয়ে বিলীন করতে চায়।

আফসানা বেগম: কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক