সেই ষোড়শ শতকে, মরক্কোর একটি উপকূলীয় শহর ও সেটাকে ঘিরে গড়ে ওঠা পুরো আবাসভূমির দুঁদে শাসনকর্তা ছিলেন এক নারী—এমনটা যদি বলি তাহলে কি অবাক হবেন? হ্যাঁ, এমনটাই ঘটেছিল তখন। মরক্কোর উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত তখনকার তেতুয়ান শহর ও সংলগ্ন এলাকার শাসক হয়েছিলেন শৈশবেই শরণার্থী হতে বাধ্য হওয়া এক আন্দালুসীয় নারী। নাম তাঁর সাইয়েদা আল হুরা। বহু গুণে পরিপূর্ণ এই নারীর নামের (আদতে এটি সেকালের একটি পদবি) আক্ষরিক অর্থ হলো ‘এক স্বাধীন অভিজাত নারী’। যদিও সমকালে তাঁর বিরোধিতাকারীরা তাঁকে ডাকত ‘জলদস্যু রানী’ বলে। সে যা-ই হোক, মরক্কোর ইতিহাসে তিনিই সেই আদৃতা ও বিরল নারী চরিত্র, যিনি কিনা এখনো সেখানকার জনমানস ও
লোকঐতিহ্যের ভেতর রীতিমতো বিপুল জনপ্রিয় আর জীবন্ত হয়ে বিরাজমান।
তাঁর পরিপার্শ্বের সংকটই অনেক ক্ষেত্রে সাইয়েদা আল হুরার জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে দিয়েছিল। এর শুরুটা ঘটে তাঁর শৈশবেই। আনুমানিক ১৪৮৫ সালে জন্ম তাঁর। পৃথিবীতে পা রাখার সাত বছর কাটতে না কাটতেই জন্মভূমি স্পেনের গ্রানাডা থেকে বাবা-মা তাঁকে নিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। তখন ১৪৯২ সাল, রাজা ফার্দিনান্দ ও রানী ইসাবেলা আন্দালুসিয়ার ভূমি থেকে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের তাড়াতে একাট্টা হয়েছেন। ইউরোপের আইবেরিয়ান উপদ্বীপ অঞ্চলে আট শতাব্দীজুড়ে চলে আসা মুসলিম শাসন পতনের মুখে। এমন অবস্থায় হাজার হাজার দুর্ভাগা শরণার্থী উত্তর আফ্রিকার শহরগুলোতে, বিশেষ করে ফেজ, ওরান ও তুনিসে আশ্রয় নিচ্ছিল। মরক্কোর তেতুয়ান ও সালে শহর আর আলজেরিয়ার নিকটবর্তী মেটিজডা এলাকার সমভূমিতেও আন্দালুসিয়ার বহু মুসলমান ঠাঁই হারিয়ে বসতি গড়তে বাধ্য হয়।
কথিত আছে, সাইয়েদা আল হুরার বাবা স্থানীয় গোষ্ঠীপতি আলী ইবনে রশিদ ছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর
বংশধর। তাঁর মা লায়লা জোহরা ফার্নান্দেজ পারিবারিক সূত্রে ছিলেন খ্রিস্টান, বিয়ের পর ধর্মান্তরিত হয়ে তিনি মুসলমান হন। সাইয়েদা আল হুরা, শৈশবে যাঁর নাম রাখা হয়েছিল আয়েশা, আন্দালুসিয়া ছেড়ে আসার পর মরক্কোর তানজিয়েরের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত রিফ পর্বতমালা অঞ্চলে আলী ইবনে রশিদ শেফচাউয়েন নামে এক শহর প্রতিষ্ঠা করেন। নিজে শরণার্থী হওয়ায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া মানুষদের কষ্টটা তিনি বুঝতেন। এ কারণে নিজের তৈরি করা শহরের দরজা তিনি সর্বদাই আন্দালুসিয়া থেকে পালিয়ে আসা মানুষদের জন্য খোলা রেখেছিলেন।
পরিবারের উত্থান-পতন ও জন্মভূমি ছেড়ে আশ্রয়ের খোঁজে ভিনদেশে যাত্রা করার এ ঝঞ্ঝামুখর সময়টা সাইয়েদার মনে বড়সড় অভিজ্ঞতার দাগ রেখে যাচ্ছিল। এরই মধ্যে পারিবারিক উদ্যোগে নানা বিষয়ে সাইয়েদা পড়াশোনা শুরু করেন। এক্ষেত্রে বলতেই হয় যে পরিবারের তরফ থেকে তাঁর জন্য প্রথম শ্রেণীর শিক্ষক ও পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল তখন। ক্যাস্তিলিয়ান ও পর্তুগিজ ভাষায় তিনি দক্ষ হয়ে উঠছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে পড়ছিলেন ধর্মতত্ত্বও। তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মরক্কোর প্রখ্যাত পণ্ডিত আবদুল্লাহ আল-গাজওয়ানি। আবার আল-গাজওয়ানির পিতা শায়খ অদজাল নাকি শিশু বয়সেই সাইয়েদার প্রতিভার নমুনা দেখে তাঁর মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে এমন কথাও বলেছিলেন, ‘এই
মেয়েটি একদিন ভারি উঁচু মর্যাদা পাবে।’
তেতুয়ানের
দরবারে পদার্পণ
১৫১০ সালে প্রবীণ শায়খের আশীর্বাদ প্রাথমিকভাবে সত্যি হতে চলল, ওই পঁচিশে পা দেয়া উজ্জ্বল সুন্দরী ও বিদুষী তরুণী সাইয়েদার সঙ্গে বিয়ে হলো তেতুয়ানের ক্ষমতাশালী গভর্নর আবু হাসান আল-মান্দারির। আল-মান্দারি ওই পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন এর মাত্র পাঁচ বছর আগেই, ১৫০৫-এ। আল-মান্দারি সাইয়েদার থেকে বয়সে বেশ কিছুটা বড় ছিলেন। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা, সাইয়েদার পরিবারের মতো তিনিও আন্দালুসিয়া থেকে আসা শরণার্থী। তেতুয়ান এমনিতেই পর্তুগিজদের হুমকির মুখে ছিল। মরক্কোর এ গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরীতে দুর্গ ও সীমানাপ্রাচীর তৈরি করার মাধ্যমে একে সামরিক দিক থেকে অধিকতর নিরাপদ করে তোলার মূল কারিগর ছিলেন আল-মান্দারি। তেতুয়ানের কর ব্যবস্থাও তিনি ঢেলে সাজান। তবে সাইয়েদা স্বামীর ছত্রচ্ছায়ায় নিজেকে নেতা হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, এমনটা নয়। বিয়ের আগে থেকেই তিনি পরিবারের মধ্যে আস্থা ও প্রশংসা অর্জনে সক্ষম হন। পরে স্বামীর পরিবারের মধ্যেও নিজের যোগ্যতা দিয়ে পরিচিতি পান। কখন কেমন আচরণ করে নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করতে হবে ও কী কী গুণ থাকলে একজন শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যাবে—তা সাইয়েদা স্পষ্টভাবেই জানতেন। তবে আল-মান্দারির সঙ্গে সাইয়েদার বিয়ে দুই পরিবারের জন্যই একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ছিল। এর ফলে নিজের নেতৃত্বগুণকে সামনে আনার প্রথম সুযোগটা সাইয়েদা পান। তেতুয়ানের সহকারী প্রশাসক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পান। আবার অন্যদিকে সাইয়েদার ভাই ইব্রাহিমও মরক্কোর ফেজ এলাকার সুলতান আহমেদ আল-ওয়াত্তসির দরবারের উজির পদে নিয়োগলাভ করেন। ফলে ফেজের সুলতানের সঙ্গে তেতুয়ানের প্রশাসনিক যোগাযোগও আরো শক্তপোক্ত হয়।
একক
শাসক
ঐতিহাসিকদের ধারণা, সাইয়েদার দাম্পত্য জীবন খুব দীর্ঘ সময় স্থায়ী হওয়ার সুযোগ পায়নি আল-মান্দারির অকালমৃত্যুর কারণে। সম্ভবত, ১৫১৫ থেকে ১৫১৯—এই সময়পর্বে আল-মান্দারির প্রয়াণ ঘটে। ঘটনাপরম্পরায় ও নিজের নেতৃত্বগুণে অতঃপর সাইয়েদাই হলেন ‘হাকিমেত তেতুয়ান’—তেতুয়ানের প্রশাসক। তেতুয়ান রাজ্য শাসনের দায়িত্ব তখন তিনি একচ্ছত্রভাবেই পেলেন। আন্দালুসিয়ার আয়েশা পরিণত হন তেতুয়ানের প্রতাপশালী নারীতে (সাইয়েদা আল হুরা নামের আক্ষরিক অর্থ)। সাইয়েদা দায়িত্ব নেয়ার পর তেতুয়ানের সুনাম ও গুরুত্ব আরো দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেতে থাকে। সাইয়েদার প্রায় ২৫ বছর শাসনকালে তেতুয়ানের জয়জয়কার ছিল মরক্কোজুড়ে। তাঁর শাসনের কারণে শহরটি অভূতপূর্ব সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে থাকে ক্রমেই।
নিজের শাসনাধীন শহরের সমৃদ্ধির জন্য সাইয়েদা যে শুধু সুশাসনের ওপর নির্ভর করেছিলেন, এমনটা নয়। স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ
নৌবাহিনীর নজর এমনিতেই ছিল তেতুয়ানের ওপর। শত্রুদের ঠেকানো ও শহরের সম্পদ বৃদ্ধি করা—এক ঢিলে দুই পাখির মারার মতো এই দুই অতি আবশ্যিক কাজ চাইলে একসঙ্গে করা সম্ভব—সাইয়েদা এমনটিই ভাবতেন। এজন্য তিনি বেছে নিলেন তেতুয়ানের কাছে চলে আসা স্বর্ণের মতো দামি জিনিস বা খাদ্যদ্রব্য বহনকারী শত্রু-জাহাজ আক্রমণ করে তা ছিনিয়ে নেয়ার অভিনব রণকৌশল। একই সঙ্গে শত্রুপক্ষের শক্তিক্ষয় আর শহরের সম্পদ বাড়ানোর এই বুদ্ধি তাঁর অধীন জনতাকেও মুগ্ধ করেছিল।
পর্তুগিজ ও স্প্যানিশদের সমুদ্র-অভিযাত্রা ভণ্ডুল ও শহরের প্রতিরক্ষার স্বার্থে সাইয়েদা পশ্চিমে বার্বারোসা নামে পরিচিত আলবেনিয়ার প্রশাসক অরুজ রেইসের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করেন। সমুদ্রে জলদস্যুতা ও নাবিকগিরির অভিজ্ঞতায় পাকা বার্বারোসার সঙ্গে হাত মেলানোয় ভূমধ্যসাগরীয় সমর-রাজনীতিকে সাইয়েদার শক্তি নিঃসন্দেহে বৃদ্ধি পেয়েছিল। সাইয়েদা ক্রমে ক্রমে ভূমধ্যসাগরে নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়াতে থাকেন। পুরো মরক্কোতেই তিনি কিংবদন্তির মর্যাদা পান। জনতার মধ্যে জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে তাঁর। শুধু শত্রুপক্ষের জাহাজ নয়, পর্তুগিজ ও স্প্যানিশদের অধিকারে থাকা বহু শহরেও তিনি নৌ-অভিযান চালান। জিব্রাল্টারে সাইয়েদা অভিযান চালিয়েছিলেন। মূলত সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য অভিযানে নামলেও ওই সময় বহুজনকে বন্দি করেও তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন বলে স্পেনীয় সূত্রগুলোর বয়ান। নিজের শহরকে রক্ষা ও শত্রুপক্ষের ক্ষতিসাধনে তাঁর একাগ্রতা বিরোধীদের আতঙ্কিত করে তুলেছিল। ফেজের সুলতানের দরবারে গিয়ে পর্তুগিজ রাজদরবারের প্রতিনিধি সেবাস্টিয়ান দে ভার্গাস তো একতরফা অভিযোগ করেই বসলেন, সাইয়েদা এতটাই ‘আক্রমণাত্মক ও রগচটা মহিলা’ যে পর্তুগালের জনগণ ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে যেন তাঁরা শিগগিরই সাইয়েদাকে কোনো জাহাজের মাস্তুল থেকে ফাঁসিতে ঝুলতে দেখে!
বস্তুত, সাইয়েদাকে ‘জলদস্যুতার’ পথ বেছে নিতে হয়েছিল নিজের শাসিত শহরের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে। ষোড়শ শতকের ভূমধ্যসাগরে জলদস্যুতার ঘটনা রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘটানোটা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। এই পিচ্ছিল ও নির্দয় পন্থা অবলম্বন করতে হয়েছিল স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার জন্যই। তার ওপর, তখন পুরো মরক্কোতেই কোনো আনুষ্ঠানিক নৌবাহিনী ছিল না। সাইয়েদার অধীন জলদস্যু বাহিনী নৌবাহিনীর অভাব কিছুটা মেটাতে সক্ষম হয়। উপকূলও আগের তুলনায় সুরক্ষিত হতে থাকে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাত থেকে নিজের ভূমিকে রক্ষা করার জন্য সাইয়েদার এই তত্পরতাকে অনেক ইতিহাস লেখকই তাই তখনকার পরিপ্রেক্ষিতে জলদস্যুতা বলতে অনিচ্ছুক।
জীবন-সায়াহ্নে
১৫৪১ সালে, তেতুয়ানের একক ও অবিকল্প শাসক হিসেবে বিশ বছরেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালনের পর সাইয়েদা হঠাৎই দ্বিতীয় বিয়ের প্রস্তাব পেলেন। প্রস্তাবদাতা ফেজের সেই সুলতান, আহমেদ আল-ওয়াত্তসি। প্রস্তাব গ্রহণ করলেন সাইয়েদা। কিন্তু এখানে তিনি নিজের দৃঢ়তা ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখলেন। আল-ওয়াত্তসিকে তিনি জানালেন, মরক্কোর রীতি অনুযায়ী তিনি বরের বাড়ি গিয়ে বিয়ে করবেন না। বরং বরকেই তেতুয়ানে আসতে হবে। এই শর্ত মেনেই সাইয়েদার সঙ্গে আল-ওয়াত্তসির বিয়ে হলো। মরক্কোর কোনো সুলতানের নিজের রাজধানীর বাইরে গিয়ে বিয়ের ঘটনা এর আগে কখনই ঘটেনি, এমনকি পরেও না। এই ঘটনা থেকে সাইয়েদার বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদাবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। এছাড়া বিয়ের পর তিনি আল-ওয়াত্তসিকে নিজের কাছে এসে থাকতে বাধ্য করেছিলেন, এমনটিও দুর্লভ।
১৯৪২-এ এসে সাইয়েদা নিজের প্রজা ও স্থানীয় বণিকদের রোষের মুখে পড়েছিলেন। তিনি পর্তুগিজদের ব্যাপারে অত্যন্ত নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতেন। অন্যদিকে তেতুয়ানের অনেক বণিকই চাইছিলেন পর্তুগিজদের সঙ্গে আপস করে ব্যবসার বিস্তার ঘটাতে। এমন পরিস্থিতিতে তাঁরই এক জামাই স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সহায়তায় তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ভাগ্যগত সাইয়েদা অতএব উপায় না দেখে পিতার প্রতিষ্ঠা করা শহর শেফচাউয়েনে গিয়ে থাকতে শুরু করেন। নিজের জন্মভূমি আন্দালুসিয়ায় ফেরার ভাবনাও তাঁর মনে উঁকি দিত। জীবন-সায়াহ্নের বিশ বছর শেফচাউয়েনে কাটানোর পর সেখানেই সাইয়েদার মৃত্যু হলো ১৫৬১-এর ১৪ জুলাই তারিখে।
শাকের আনোয়ার: প্রাবন্ধিক





