শাজার আল-দুর্র, প্রায় আট শ বছর আগে মিসরের একজক মুসলিম নারী শাসক ছিলেন। তিনি তার বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, জ্ঞানের জন্য ইতিহাসের অন্যতম মুসলিম নারী শাসক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। আরবে যখন ক্রুসেডারদের দৌরাত্ম্য চলছে তিনি সে সময় মুসলিম বংশোদ্ভূত একজন নারী হয়েও সফলতা ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তার শাসনাধীন এলাকা পরিচালনা করেছেন। এবং তার চৌকস শাসনের কারণে রাজ্য পরিচালনার পন্থা হিসেবে সেগুলো আজো আলোচিত হয়।

ইতিহাসবিদদের মতে, শাজার আল-দুর্র ছিলেন তুর্কি বংশোদ্ভূত। যে সময়ের কথা আলোচিত হচ্ছে সে সময় দাস ও হেরেম সংস্কৃতি সমাজের স্বাভাবিক একটি অংশ ছিল। আস-সালিহ আইউব সুলতান হওয়ার আগে একত্রে বেশকিছু দাসী ক্রয় করেন, যারা তার সঙ্গে রাজ কর্মকাণ্ডের সময় বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণকালে সহাবস্থান করতেন। ১২৪০ সালে আস-সালিহ আল আইউব রাজ্যের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং সুলতান হিসেবে নিযুক্ত হন। তিনি ছিলেন মিসরের আইয়ুবি বংশীয় শেষ সুলতান। সে সময়ে শাজার আল-দুর্রসহ আরো অনেকে তার সঙ্গে মিসরে প্রত্যাবর্তন করেন। সে সময় শাজার আল-দুরেরর গর্ভে একটি পুত্রসন্তান জন্ম নেয় এবং মাত্র তিন মাস বয়সে সেই পুত্রের মৃত্যু ঘটে। কিন্তু শাজার আল-দুরেরর সৌন্দর্য ও বুদ্ধিমত্তায় বিমুগ্ধ হয়ে সুলতান আইউব তাঁকে নিকাহ করেন। কিন্তু ঘটনার মোড় ঘুরে যায় যখন সুলতান আইউব মৃত্যুবরণ করেন।

মৃত্যুর আগে সুলতান আইউব বেশকিছু উন্মুক্ত কাগজে স্বাক্ষর করে গিয়েছিলেন, যে কাগজগুলো পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল। সে সময় নতুন মুদ্রার প্রচলন করা হয়েছিল। এই সবকিছুই কার্যে পরিণত হয় শাজার আল-দুরেরর দূরদর্শিতা ও বুদ্ধিমত্তার ফলে। ১২৪৯ সালের বসন্তে সুলতান আইউব সিরিয়ায় মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মিসরে ফিরে এসে দামিট্টার নিকটবর্তী আশ্মুম-তানাহে চলে যান। তিনি শুনলেন ফ্রান্সের রাজা চতুর্থ লুই সাইপ্রাসে ক্রুসেডার বাহিনী জমায়েত করেছেন এবং মিসরের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করতে চলেছেন। ১২৪৯ সালের গ্রীষ্মকালে, ক্রুসেডাররা নীল নদের নিকটবর্তী দামিট্টায় পরিত্যক্ত শহরে হাজির হয়।

সুলতান আইয়ুবকে সুরক্ষিত আল মনসুরাহ শহরে তার প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যেখানে তিনি মারা যান। শাজার আল-দুর্র তত্কালীন মিসরীয় সেনাবাহিনীর কমান্ডার আমির ফখর আদ-দ্বীন ইউসুফ বেন শায়েখ এবং প্রাসাদের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান তাওয়াশি জামাল আদ-দ্বীন মুহসিকে সুলতানের মৃত্যুর খবর জানিয়েছিলেন। কিন্তু যেহেতু দেশটি আক্রমণের শিকার হয়েছিল এবং সুলতান আইউবের মৃত্যুর খবর শত্রুপক্ষকে আরো বেশি আক্রমণাত্মক করে দেয়ার সম্ভাবনা রাখে, তাই এই মৃত্যুসংবাদটি গোপন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

ইতিহাসের কিছু ঘটনা গল্পের মতোই রোমাঞ্চকর! এখানেও তার ব্যতিক্রম দেখতে পাওয়া যায়নি। নীল নদের নিকটস্থ আল-রুদাহ দ্বীপের একটি দুর্গে সুলতানের কফিনযুক্ত দেহ গোপনে নৌকায় করে নিয়ে যাওয়া হয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে মৃত্যুর আগে সুলতান বিপুলসংখ্যক সরকারি ফাঁকা কাগজে স্বাক্ষর করেছিলেন,  যা শাজার আল-দুর্র হুকুম জারির ক্ষেত্রে এবং শাসনতান্ত্রিক আদেশ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছিলেন।  তিনি জনগণকে এবং সে সঙ্গে শত্রুপক্ষেকে বোঝাতে সফল হন, সুলতান নানাবিধ শারীরিক জটিলতার কারণে জনাসমাগম এড়িয়ে চলছেন। সরকারি কর্মকর্তারা এটাই ধরে নিয়েছিলেন যে সুলতান কেবল অসুস্থ ছিলেন এবং এসব নির্দেশ তাঁর পক্ষ থেকেই আসছে।

একসময় পরাক্রমশালী ফরাসি সৈন্যরা কায়রোর অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। রাজা নবম লুইয়ের ভাই কাউন্ট আলফেনোসের নেতৃত্বে সৈন্যদলের শক্তি বৃদ্ধি করা হয় এবং কায়রো আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনায় দুদিক থেকে মিসরীয় শিবির আক্রমণের নকশা করা হয়। অন্য একটি ফরাসি দল বর্তমান আল বাহার আল সাগির খাল পেরিয়ে মিসরীয় শিবির আক্রমণ করেছিল।

আক্রমণ চলাকালে সেনাপতি আমির ফখর আদ-দ্বীন নিহত হন এবং ক্রুসেডার বাহিনী আল মনসুরাহ শহরের দিকে অগ্রসর হয়। শাজার আল-দুর্র শহরকে রক্ষা করার জন্য বাইবার্সের পরিকল্পনায় সম্মত হন। শহরের ভেতরে ক্রুসেডার বাহিনী আটকা পড়েছিল। ফরাসি সমরের প্রধান নেতুত্ব দানকারীদের অধিকাংশ জনকেই হত্যা করা হয়েছিল এবং ক্রুসেডার বাহিনীকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। মিসরীয় বাহিনী ও নগরবাসীর নেতৃত্বে এ প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়।

কায়রো, মিসর ও জেরুজালেমকে বাঁচিয়ে এবং পরাজিত নবম লুইয়ের সৈন্যদলকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। তবুও শাজার আল-দুর্র অন্যান্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন যখন তিনি শেষ পর্যন্ত সুলতানের মৃত্যুর খবরটি প্রকাশ করেছিলেন। সিরিয়ার আমিররা তার রাজত্বকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছিলেন।

উপায়ন্তর না পেয়ে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করতে বাধ্য হন। তাঁর দ্বিতীয় বিয়েটি একটি রাজনৈতিক সমাধান ছিল। যদিও তার নতুন স্বামীর অন্য স্ত্রীরা বিভিন্ন সময়ে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে। কিন্তু এটা কেবল জনশ্রুতি।

শাজার আল-দুরেরর শাসন আমলে নতুন মুদ্রার প্রচলন হয়, নির্দিষ্ট প্যাটার্নে ভবন নির্মাণের রীতির প্রচলন হয়। যা মিসরীয় স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন হয়ে আছে। একই সঙ্গে শাজার আল-দুরেরর  পরাক্রমশালী নেতৃত্বের প্রমাণ রাখে এ নিদর্শনগুলো।

তাঁর সমাধিতেও গম্বুজ দ্বারা মহিমান্বিত করা হয়েছিল। তাঁর শাসনকাল মিসরে একটি যুগের সূচনাই করে না, বরং নেপথ্যের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, দীপ্তিময় এক নারীর কথাও সাক্ষ্য দেয়।

 

সামিয়া কালাম: লেখক ও অনুবাদক