সাক্ষাত্কার: কল্যাণ মৈত্র
তিনি কেবল প্রয়াত কবি নবারুণ ভট্টাচার্যের মা ছিলেন না, ছিলেন হাজার, লক্ষ, কোটি চুরাশির মা। তার পরও ছিলেন একা। এই ‘ঝাঁসীর রাণী’ রাস্তা দিয়ে হাঁটলে কেউ হয়তো ফিরেও দেখত না। তার পেছনে থাকত না মিডিয়ার ব্যস্ততা। কোনো কালেই তিনি সেলিব্রেটি হয়ে উঠতে চাননি। হয়েছিলেন ভারতের শোষিত, নিপীড়িত, সাধারণ মানুষ, জমিহারা কৃষক আর আদিবাসীদের নৈতিক লড়াইয়ে ‘স্তনদায়িনী’, মা অথবা ‘মারাং-দাই’। ছ’আনা পয়সা বাঁচাতে বাপ্পার মা পিচ-গলা রাস্তায় ভরদুপুরে হাঁটতেন— নব্বই বছরে এসে সেই পা জোড়া থেমে গেছে
‘ঝাঁসীর রাণী’ জীবনী গ্রন্থ, আপনার প্রথম প্রকাশিত বই। প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘নটী’। প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘কি বসন্তে কি শরতে’। ঝাঁসীর রাণী ধারাবাহিকভাবে বেরিয়েছিল দেশ পত্রিকায়। এই ঝাঁসীর রাণী দিয়েই কি আপনার জীবনে লেখালেখির মূল পর্বটি শুরু হয়েছিল?
অনেকটা তাই। ঝাঁসীর রাণী প্রকাশের পর থেকে লিখে উপার্জন করাটা শুরু হয়। আমাকে যে লিখেই খেতে হবে, তার সূচনাটা ওখান থেকেই। আমার প্রথম মুদ্রিত লেখা খগেন্দ্রনাথ সেন সম্পাদিত ‘রং মশাল’ পত্রিকায় প্রকাশ পায়। ১৯৩৯ সালে। ঝাঁসীর রাণী প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৬ সালে। আমি আগেই বলেছি, ‘এ গ্রন্থ প্রচলিত অর্থে ইতিহাস নয়। রানীর জীবন-চরিত্র লেখার বিনীত প্রয়াস মাত্র।’ কেউ কেউ এটিকে উপন্যাস ভাবেন। ঝাঁসীর রাণী উপন্যাস নয়।
এই জীবন-চরিত লেখার নেপথ্য ইতিহাসটা কী রকম ছিল?
সে অনেক বড়। বিচিত্রও। আমি একে বলেছি জেদের ইতিহাস। তার আগে, সেই সময় ও কালের প্রেক্ষাপটটা বুঝতে হবে। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক। আমরা বামপন্থী ছিলাম। ওই সময় কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত, সে যেভাবেই হোক, কোনো মানুষ যদি নাট্যকর্মী, লেখক বা শিল্পী হন, তাহলে তার পক্ষে সংসারে বাঁচা খুব দুরূহ ছিল। বড় কঠিন কাজ। নিদারুণ দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এজন্য সেদিন তো ছিলই না, আজোওআমার মনে কোনো খেদ নেই।
এমনই একটা সময়ের মধ্যে বিজন বোম্বাইয়ে গেল। সিনেমার গল্প লিখতে হবে। ‘নাগিন’ ছবির গল্প লিখে পকেটে কিছু টাকা নিয়ে সে কলকাতায় ফিরেও এল। ওই সময় আমিও ওর সঙ্গে গিয়েছিলাম। আমরা বোম্বাইয়ে ছিলাম আমার বড় মামা শচীন চৌধুরির বাড়িতে। বড় মামার একটি ছোট অথচ সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ছিল। এই বই, সে বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে ঝাঁসীর রাণীর ওপর কয়েকটি বই পড়ে ফেললাম। তৈরি হলো আরো জানার একটা ইচ্ছে। আমাকে তখন পোস্ট অফিসের চাকরি থেকে বের করে দিয়েছে সরকার। ‘লাল সম্পর্ক’র জন্য। এক অর্থে বেকার। বিজনের ওপর নির্ভর করে সংসার চলছে। অতুলচন্দ্র গুপ্তর বাড়িতে ছুটলাম। ওঁর পুত্র প্রতুল গুপ্ত খুব সাহায্য করলেন। বই পড়ি ওঁদের লাইব্রেরিতে। নোট করি। ঝাঁসীর রাণীর সম্পর্কে জানতে হবে। পদ্মপুকুর থেকে ছ’আনা বাঁচাতে হেঁটে যাই ন্যাশনাল লাইব্রেরি। প্রতুলবাবু মারাঠা হিসটোরিয়ানদের হদিস দিলেন। গবেষণা শুরু হলো। লাইব্রেরি যেতাম ভরদুপুরে, ফিরতাম বিকালে। এই কাজ যখন করছি, তখন টিকেকার আমাকে পারসনিস রচিত ‘ঝাঁসি সংস্থানব্য মহারানী লক্ষ্মীবাঈ সাহেবা মঞ্চে চরিত্র’ বইটি পাঠালেন। মারাঠি ভাষায় লেখা। এই সময়েই প্রতুলবাবুর সহায়তায় ঝাঁসীর রাণীর ভাইপো গোবিন্দ চিন্তামণি তাম্বের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ও চিঠি বিনিময় হয়েছে। বাপ্পা মানে নবারুণ তখন খুবই ছোট। এরই মধ্যে ওকে সামলে কাজ করছি। বিজন খুব উত্সাহ দিচ্ছে। ছুটলাম মহারাষ্ট্র নিবাসে। এক মারাঠি গৃহবধূ আমাকে পারসনিসের ঝাঁসীর রাণী বুঝিয়ে দিচ্ছেন নিয়মিত। নোট নিচ্ছি।
এরই মধ্যে বোধহয় সাগরময় ঘোষের সঙ্গে কথা হয়েছিল?
হ্যাঁ। সাগরদাকে একটু আধটু চিনতাম শান্তিনিকেতন থেকেই। বললেন, ‘লেখ’।
একদিন ৩০০-৪০০ পাতার নোট ও লেখা ছিঁড়ে ফেলে দিলাম। কী যেন মনে হলো, এভাবে হবে না। আমাকে ঝাঁসী যেতে হবে। বাপ্পাকে বিজনের কাছে রেখে চলে গেলাম। গোয়ালিয়র গেলাম। ঝাঁসী গেলাম। তার আগে আমেদাবাদ। ট্রেনে থার্ড ক্লাসের যাত্রী হয়ে— সিংগল ফেয়ার ডাবল জার্নি। টাকাও তেমন সঙ্গে নেই। আমার জানতে ইচ্ছে হলো— ব্রিটিশ সরকার যেসব মানুষের প্রতি এত অত্যাচার চালিয়েছে, তারা রানীকে কী চোখে দেখে। আমেদাবাদে ইতিহাস কংগ্রেসে যোগ দিলাম। তার পর গোবিন্দ চিন্তামণি তাম্বের সঙ্গে গেলাম বরোদা। ঝাঁসীর রাণী নিহত হন ১৮৫৮ সালে। তাঁর ভাইপো কোথা থেকে এল? রানির যখন আট বছর বয়স, তখন তাঁর বিয়ে হয়। তাঁর বিপত্নীক পিতা মোরোপণ্ড তাম্বে ৩২ বছর বয়সে একটি সাত বছরের মেয়েকে বিবাহ করেন ও ঝাঁসীবাসী হন। ১৭ বছর বয়সে রানির ভাই চিন্তামণি জন্মান। এই চিন্তামণির প্রথম সন্তানই তাম্বে। রানীর ভাইপো। তিনি আমায় খুব সাহায্য করেছিলেন। মাত্র ২৬-২৭ বছর বয়সে একদম অচেনা একটা জায়গায় গিয়ে কাজ করেছিলাম কীসের তাড়নায়? এখন ভাবলে অবাক হই।
ইতিহাসে আমার ইন্টারেস্ট চিরকালের। ওই জন্য বিষয়টা ক্লিক করেও গেল। সাগরদাও হয়তো ভাবতে পারেননি যে, আমি এতটা সিরিয়াসলি লিখব। এটা তো কোনো গল্প ছিল না। ভেতর থেকে বুঝতে পারতাম তাগিদটা। একটা ওয়েল ডকুমেন্টেড হিস্ট্রি লিখতে চেয়েছিলাম।
‘ক্ষুধা’র মতো এত নির্মম এবং বাস্তব কাহিনী লেখার কথা মাথায় এল কীভাবে?
ক্ষুধার গল্প কীভাবে লেখা হয়েছিল? আমি বেঙ্গল ফেমিন দেখেছি। সে সময় আমার বয়স ১৮ বছর। আশুতোষ কলেজে পড়ি। কলেজে আমাদের মেয়েদের একটা সংগঠন ছিল। আমরা স্বেচ্ছাসেবক হলাম। কাজ করতাম, কোথায় কী দরকার সেসব নিয়ে— সে সময় পথেঘাটে মানুষ...
একটা প্লট তৈরি হয়েছিল। এর কাহিনী পাঠকের অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। আমার এক পরিচিত রাজপুত একবার বললেন, পালামৌতে রাজপুত ছাড়া আর কোনো শোষক দেখেননি? ক্ষুধার প্রেক্ষিত ছিল ডালটনগঞ্জ এবং কৌয়ারে হিন্দি কাগজের একজন রিপোর্টার আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি একজন অ্যাংরি জার্নালিস্ট হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। আমায় অনেক কিছু দেখিয়েছিলেন। সেসব আশির দশকের কথা— কৌয়ারে— বনজ মৌয়া ও কাঠকুটো কুড়ানো ছিল ভূমিপুত্রদের অধিকার। এই অধিকারে জমিদারদের হাত পড়ল— স্বাভাবিকভাবেই প্রতিরোধ গড়ে উঠল— এই প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ আমি দেখেছি। আমার মন এই দেখাটাও হয়তো ধরে রেখেছিল। ক্ষুধায় এই সবটাই হয়তো ধরে ফেলেছিলাম।
আরেকটু বলি— সেদিনের আরণ্য বিহারে তরুণ সাংবাদিকরা ‘মানাত্তুর মানুষখেকো’ লিখে সবাইকে চমকে দেয়। প্রশাসনকে কাঁপিয়ে দেয়। মানাত্তুর জমিদার-মৌয়ার... সিং (নামটা আগেও লিখিনি) তার নিজস্ব চিড়িয়াখানায় কী করত? খাঁচায় বন্দি চিতাবাঘকে তারই বন্ডেড লেবারদের খাইয়ে দিত। ভূমিদাসদের মাংস খেত চিতাবাঘ। কাগজে এসব লেখার পর জানাজানি হলো। ঘটনাটি এক্বেবারে সত্য। একটি নতুন মা ও তার শিশুকে বাঘের খাঁচায় ছুড়ে ফেলার ঘটনা যে সত্যি, তা পাঠকদের বিশ্বাসযোগ্য হওয়া উচিত— কেননা এসব আমি শুনেছি লোকমুখে।
অনেক দিন পর তুমি আবার আমার স্মৃতির গোড়ায় টান দিয়েছ। এই বয়সে মস্তিষ্কের কোষগুলো বোধহয় এখনো নষ্ট হয়নি। আমার এসব কথা শুনে আজ যদি তোমরা বিশ্বাস না করো, তো আমার কিছু করার নেই। দায়ও নেই। কিন্তু ডালটনগঞ্জে যে সাংবাদিকের ঘরে আমি থাকতাম, সে ঘর, শিবাজি ময়দান, গান্ধী হল, পালামৌর দৃশ্য— সব সব সত্যি। ক্রীতদাস প্রথারোধ নিয়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, আমার সঙ্গে তার কর্মীদের যোগাযোগ হয়েছিল।
একটি দলের নেতৃত্বে তা জয়ী হয়। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকার একটা বাড়তি সুবিধা তো ছিলই। যা দেখেছি, তাই মন কুড়িয়ে নিয়েছে। সেসব কথাই আমার লেখা—
ওই যে এর আগে বলছিলাম, তৃপ্তি মিত্র ও আমি হাঁটছিলাম রাস্তায়। দেখলাম, মৃত মা পড়ে আছে রাস্তায়— পাশে তার শিশু স্তন থেকে দুধ টানছে— এমন একটা বিরল দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে গেলাম আমরা। তৃপ্তির সঙ্গেও পরবর্তীকালে যোগাযোগ ছিল। বন্ধুত্ব ছিল। এক সময় সুচিত্রা মিত্রর সঙ্গে গল্পটল্প হতো। সেটা সম্ভবত ছত্রিশ বা আটত্রিশ সাল। ম্যাট্রিকের পর চুয়াল্লিশের শেষের থেকে ছেচল্লিশের মধ্যে আমি গেলাম শান্তিনিকেতনে। সেখানে তখন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় (মোহর), সুচিত্রা মিত্র। দুজনই অসামান্য গাইত। মোহরের সঙ্গে অনেককাল পর দেখা হয় ছিয়াশি সালে। সে বছর আমি পদ্মশ্রী পাই। মোহরও পায়। ওর সঙ্গে ছিল গোরা সর্বাধিকারী। দিল্লিতে আমরা একই জায়গায় ছিলাম। মোহর আমাকে দেখে বলল, দেখ, মহাশ্বেতা আমার কী রকম ডায়াবেটিস! অথচ খেতে গিয়ে দেখি মোহর ভাত, মাছ, মিষ্টি সবই খাচ্ছে। বললাম, মোহর খাস না— সে বলল, ডায়াবেটিস ওর মতো থাকুক, তা বলে আমি খাব না কেন? রাজীব গান্ধী পুরস্কার দেবেন— স্টেজে ওঠার সময় মোহর বলল, এটা কী করেছিস? দেখি, কাচ বসানো সাদা শাড়িটা আমি উল্টো পরেছি। তখন তো চেঞ্জ করা সম্ভব নয়।
মোহরকে নিয়ে একটা ক্লাসিক্যাল গল্প মনে পড়ছে। মোহর খুব গহনা ভালোবাসত। সেই সময় অনেক গল্প করার মাঝে আমায় বলল, ভাবতে পারবি না আমি কী করেছি। এক সাধু বলল, আপনার সব গহনা নিয়ে আমি যজ্ঞ করব। এক রাতের পর দেখবেন যজ্ঞের ছাইয়ের নিচে গহনা ডাবল হয়ে গেছে। কিন্তু সেই সাধুকে পরদিন আর খুঁজে পাইনি। কী মিথ্যেবাদী ভাব!
এই ছিল আমাদের মোহর।
মোহরের গান, সুচিত্রার গান পরেও অনেক শুনেছি। কিন্তু ঘটা করে অনুষ্ঠানে যাওয়ার তাগিদ হয়নি কখনো। আমরা খালি গলায় গান গাইতে ও সবসময় শুনতে অভ্যস্ত ছিলাম। ফলে আলাদা করে গান শুনতে যাওয়ার ইচ্ছে সেভাবে কখনো হয়নি। আই হ্যাভ নেভার বিন এ ভেরি ডেকোরেটিভ পারসন। আমার রবীন্দ্রসংগীত ভালো লাগে। আমি রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে শুনতেই বড় হয়েছি। ১৯৩৬-৩৮ সাল আমাদের কাছে ছিল গোল্ডেন ইয়ার্স। রবীন্দ্রনাথ জীবিত। চিত্রাঙ্গদা, চণ্ডালিকা, শ্যামা প্রভৃতি নৃত্যনাট্য— রবীন্দ্রনাথের সামনে রিহার্সেল হচ্ছে। তিনি হ্যাঁ বললে তবে বাইরে পারফর্ম করতে যাওয়া হতো। আমি এসব রিহার্সেল দেখেছি। তখন এই দেখা ও শোনাটা শান্তিনিকেতনে কম্পালসারি ছিল।
কয়েক দিন আগে ‘গীতবিতান’ নিয়ে বসেছিলাম। কোন কোন গান জানি, তা দাগ দিচ্ছিলাম। দেখলাম অনেক গানই জানি। প্রায় সবকটি গানই। অন্তত একটা করে লাইন গেয়ে দিতে পারব।
বলেছেন, আপনার বিশ্বাস নির্মাণে, নির্মিতিতে। যে উপাদান বই পড়ে, লোকবৃত্তের সঙ্গে পরিচয়ে, পায়ে হেঁটে, ঘুরে জোগাড় করেন, তা আপনার মনে কিমিয়াকৃত হয়ে যায়। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সবসময় দরকার হয় না। সাধ্যের বৃত্ত ছোট, তার মধ্যেই আপনি বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে তুলতে চেষ্টা করেন। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই শেষ কথা নয়। আপনি কি এখনো তা বিশ্বাস করেন?
আজো মনে করি না প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই শেষ কথা। আমি দেখতে দেখতে শিখেছি— সেখান থেকেই এক্সপেরিমেন্ট করার ইচ্ছেটাও সৃষ্টি হয়েছিল। একজন লেখককে ‘ইন কনটেক্সট অব রাইটিং’ বুঝতে হবে। ‘স্তনদায়িনী’ গল্পটা ভাবো: এই যশোদা চরিত্রকে সামনে থেকে দেখেছি।
ধারা অটুট রাখতে তাকে ক্রমাগত নিজের পেটেও সন্তান ধারণ করতে হয়। এটা তার কাছে এ কোশ্চেন অব সারভাইভ্যাল। যশোদার স্বামী কাঙালিচরণ মোটর অ্যাকসিডেন্টে পঙ্গু। সংসার চলে যশোদার বুকের দুধের ওপর। এই যশোদা ক্রমাগত ভগবতী হয়ে উঠল। হালদার বাড়ির আদর-যত্নের বহরে সে বছর বছর বিয়োনোর সব কষ্ট ভুলে গেল। একসময় ধরা পড়ল ক্যান্সার। এই লেখা লেখার সময় ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলে ডিটেল নিয়েছিলাম। বাস্তব জীবনের যশোদা বাঁচেনি। তাকে আমি হাসপাতালে কাঁদতে দেখেছি।
আমি যখন প্রথম পুরুলিয়ার শবরদের মধ্যে যাই, তখন ওরা বছরে একদিন ভাত খেত। বাকি ৩৬৪ দিন খেত বন্য ফলমূল। আর যা পায়, তা-ই খায়। ভাতের মাড় তাও—। শালপাতায় ভাত খেত ওরা— নতুন শালপাতায়। একপাশে নুন, লংকাগুঁড়ো। একদিন ওদের সঙ্গে খেতে বসেছি— আমি জিগ্যেস করেছি, কী দিয়ে খাব? ওদের একজন বলল, ভুখ দিয়ে মেখে খেয়ে নিন। ভাত খাওয়াটা এত প্রেসাস। কী সব দিন গেছে! এসব নিয়ে কখনো কোনো গল্প লিখিনি। অথচ এটা আমার সারা জীবনের জন্য একটা ইম্পর্ট্যান্ট ডকুমেন্ট।
পালামৌতে এবং ভারতের অন্য বেশকিছু অংশে বন্ডেড লেবার সিস্টেম ছিল। ছিয়াত্তরে এ প্রথা সরকার অ্যাবলিশ করে। অনেকেরই জমিজমা ছিল না, কাজ পেত না। মহাজনরা টাকার বিনিময়ে তাদের ক্রীতদাস বানিয়ে ফেলত। যাদের জমি কিছু বা থাকত, চলে যেত। নিরক্ষর মানুষদের ঠকিয়ে জমি নিয়ে নিত মহাজন। পরে সরকার কিছু প্যাকেজ দেয়ার চেষ্টা করে। একটা গ্রাম দেখেছিলাম, যেখানে প্রচুর বন্ডেড লেবার ছিল। সিমড়া গ্রাম। ওই সব ক্রীতদাসকে থাকতে দেয়া হয়েছিল পাহাড়ে। চাষ করতে দিয়েছে ব্যারেন ল্যান্ড। এক জায়গায় দেখলাম কুয়ো কাটা হচ্ছে— দুটো বছর চোদ্দোর ছেলে। জিগ্যেস করে জানলাম ওরা বন্ধুয়া মজদুর— বন্ডেড লেবার। ওদের কোনো স্বাধীনতা ছিল না। যে প্যাকেজ সরকার দিয়েছিল, তা ইমপ্লিমেন্ট করা হয়নি তখনো। ইন্দিরা গান্ধী চেষ্টা করেছিলেন—
লিখতে শুরু করেছিলেন কি লেখার জন্যই?
আমি লিখতে শুরু করেছিলাম আর্থিক চাপে পড়ে। লিখলে পয়সা পাওয়া যায়। প্রথম জীবনে টিউশনি করেছি টাকার জন্যই। লিখলে টাকা আসত— খুব বেশি নয়, তবুও। আমার উল্টোদিকে আকাঙ্ক্ষাও খুব কম ছিল। চলে গেলেই হলো এমন আর কি। ১৫ টাকাও পেলে মনে হয়েছে দ্যাট ইজ আ ফরচুন। পরে টাকার অঙ্কটা বেড়েছে। তখন দিনকাল অন্য ছিল। লেখকরা আর কত টাকাই বা পেতেন— তারই মধ্যে চালিয়ে নিতেন। আমার লেখালেখির পেছনে সাহিত্য প্রেরণা বলতে যা বুঝি, তেমন কিছু ছিল না। লেখক হব, সেই ইচ্ছে নিয়ে এগিয়ে আসিনি। আমি ও বিজন সেই সময় খুব লড়াই করছি... আই ওয়াজ ভেরি ডিফারেন্ট ফর্ম আদারস। যা করেছি, তা তো লিখেই করেছি। বাবা (মনিষ ঘটক) লিখতেন। একটা সময় দেখলাম— এটাই একমাত্র জিনিস, যা আমি পারি। দিস ইজ দ্য ওনলি থিং আই কুড ডু—
(আগামী সংখ্যায় বাকি অংশ)






