বাকেরগঞ্জের ইতিহাসের
আদিপর্বে যেতে
হলে আমাদের
প্রথমত লোককথার
আশ্রয় নিতে
হবে। প্রচলিত
আছে বিক্রমপুরে
জনৈক চন্দ্রশেখর
চক্রবর্তী শক্তিমন্ত্রে
দীক্ষিত হয়েছিলেন।
বিয়ের পর
তিনি জানতে
পারেন তার
স্ত্রীর নাম
‘ভগবতী’
বা ‘কাত্যায়নী’।
সে কথা
শুনে তিনি
একটি নৌকায়
করে নিরুদ্দেশে
যাত্রা করেন।
ক্রমাগত দক্ষিণে
যেতে যেতে
কোনো এক
স্থানে এক
জেলেকন্যা তাকে
থামায়। পরবর্তী
সময়ে জেলেকন্যা
নিজেকে চন্দ্রশেখরের
ইষ্টদেবী বলে
পরিচয় দেন
এবং চন্দ্রশেখরের
বিবাহিতার নাম
পরিবর্তন করে
তার সঙ্গে
সংসার করার
আদেশ করেন।
পাশাপাশি তিনি
আরো বলেন,
ওই জলমগ্ন
স্থান শুকিয়ে
ভূমি তৈরি
হবে এবং
তা চন্দ্রশেখরের
নামে চন্দ্রদ্বীপ
বলে পরিচিত
হবে। লোককথার
পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক
দৃষ্টিকোণ থেকে
বলা যায়,
বহু বছর
আগে বর্তমান
বরিশালের কোনো
অস্তিত্ব ছিল
না। সমুদ্রগর্ভ
থেকেই তার
উত্পত্তি।
কোনো এক
সময় বাকেরগঞ্জ
ছিল চন্দ্রদ্বীপের
অংশ। প্রাচীনকালের
বৃহত্তর বাকেরগঞ্জ-চন্দ্রদ্বীপের
সীমানা বলতে
পূর্বে খুলনা,
উত্তরে ফরিদপুর,
দক্ষিণে সমুদ্র
এবং পশ্চিমে
মেঘনা নদী—এর
মধ্যবর্তী ভূখণ্ডকে
বোঝানো হয়।
বৈদিক যুগে
এ অঞ্চলের
কোনো অস্তিত্ব
ছিল না।
বৈদিক সাহিত্যে
উল্লেখ পাওয়া
যায় না।
সমুদ্র গুপ্তের
সময়কালে এলাহাবাদের
স্তম্ভে থাকা
লিপি থেকে
জানা যায়
তিনি সমতট
নামে একটি
করদ রাজ্য
প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
রমেশচন্দ্র মজুমদার
এবং অন্যান্য
ইতিহাসবিদ মনে
করেন সমতট
বলতে দক্ষিণ-পূর্ব
বাংলাকে বোঝায়।
বাকেরগঞ্জও সমতটের
অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অর্থাৎ খ্রিস্টীয়
চতুর্দশ শতাব্দীতে
বাকেরগঞ্জের অস্তিত্ব
ছিল বলে
মেনে নেয়া
যায়।
বৈণ্য গুপ্ত
নামে গুপ্ত
বংশের এক
সদস্য সমতট
রাজ্যের প্রশাসক
নিযুক্ত হয়েছিলেন।
তিনি গুপ্তদের
দুর্বলতার সুযোগে
নিজেকে স্বাধীন
ঘোষণা করেন।
সপ্তম শতাব্দীর
শেষের দিকে
খড়গ নামে
নতুন এক
বংশের উত্থান
হয়। বাকেরগঞ্জ
এদের শাসনাধীন
ছিল বলে
মনে করা
হয়। খড়গ
রাজবংশের পর
দেব বংশের
বীরদেব, আনন্দদেব
এবং শান্তিদেব
স্বনামখ্যাত হয়েছিলেন।
কুমিল্লার ময়নামতিতে
আবিষ্কৃত দুটি
ফলক থেকে
জানা যায়,
তারা দক্ষিণ-পূর্ব
বঙ্গ পর্যন্ত
তাদের শাসন
বিস্তার করেছিলেন।
চট্টগ্রামে আবিষ্কৃত
শান্তিদেবের তাম্রশাসন
থেকে জানা
যায় তারা
হরিকেলের রাজত্ব
পেয়েছিলেন। হরিকেল
বলতে সিলেট
বোঝালেও বৃহত্তর
অর্থে বঙ্গ
বোঝাত। রামপালে
শ্রীচন্দ্রের তাম্রশাসন
থেকে জানা
যায় ত্রৈলোক্যচন্দ্র
প্রথমে হরিকেলের
একজন সামন্ত
রাজা ছিলেন।
রমেশচন্দ্র মজুমদারের
মতে, ত্রৈলোক্য
ও কান্তিদেবের
রাজ্য বাকেরগঞ্জ
পর্যন্ত বিস্তৃত
ছিল। দশম
শতাব্দীতে চন্দ্রবংশের
শাসকরা বাকেরগঞ্জসহ
দক্ষিণ-পূর্ব
বাংলার অধিকাংশ
অধিকার করেছিলেন।
সেন বংশের
বিজয় সেন
সারা বাংলায়
নিজের প্রভাব
বিস্তার করেছিলেন।
বাকেরগঞ্জে তার
সামন্ত কোনো
রাজা শাসন
করে থাকতে
পারেন। পরবর্তী
সময়টি মূলত
মুসলিম শাসনের।
বখতিয়ারের নদীয়া
জয়ের পর
ধীরে ধীরে
সারা বাংলায়
মুসলিম শাসন
ছড়িয়ে পড়ে।
পরবর্তী সময়ের
বাকেরগঞ্জের জনমিতি
লক্ষ করলে
সেখানে মুসলিম
সংখ্যাধিক্য দেখা
যায়। এ
সময়ে বাকেরগঞ্জে
কোনো মুসলিম
শাসক ছিলেন
এমন কোনো
প্রমাণ পাওয়া
যায় না।
কিন্তু সুলতান
গিয়াসউদ্দীন বলবনের
শাসনামলে মুঘিসউদ্দিন
তুঘরিল বাংলার
সুবাদারি লাভ
করেন এবং
তার আধিপত্য
ফরিদপুর পর্যন্ত
পৌঁছে। অন্যান্য
অঞ্চলের মতো
দক্ষিণবঙ্গে ইসলাম
আগমনের মাধ্যম
ছিল মূলত
পীর দরবেশ।
সুলতানি আমলে
তারা উপকূলীয়
অঞ্চলে ইসলাম
প্রচার করেন।
বাকেরগঞ্জে ইসলাম
জনপ্রিয় হয়েছিল।
প্রাচীন ইতিহাসে
বাকেরগঞ্জের শাসক
বা রাজা
সম্বন্ধে দনুজমর্দন
দেবের নিশ্চিত
উল্লেখ পাওয়া
যায়। তার
সময়কাল আনুমানিক
ত্রয়োদশ-চতুর্দশ
শতাব্দী। মূলত
মধ্যযুগে মুসলিম
শাসক ও
তাদের প্রশাসকরা
বাংলায় নিজেদের
প্রভাব রাখলেও
দক্ষিণে তারা
পুরোপুরি প্রবেশ
করতে পারেননি।
এ সময়ে
দক্ষিণবঙ্গে ছোট
ছোট হিন্দু
রাজত্বের উদ্ভব
হয়। দনুজমর্দন
ও তার
উত্তরাধিকারী সম্পর্কিত
আলোচনা দেখে
মনে হয়
ত্রয়োদশ থেকে
সপ্তদশ শতাব্দীর
শুরু পর্যন্ত
তাদের রক্ত
সম্পর্কিতরাই শাসনে
ছিল কিন্তু
আসলে এর
মধ্যে শাসনে
ভাঙন এসেছিল
বা তারা
খুব ছোট
ভৌগোলিক সীমানার
অধিকারী ছিলেন।
কেননা যদিও
দনুজমর্দনের উত্তরপুরুষ
জগদানন্দ, কন্দর্পনারায়ণ
সম্পর্কে তথ্য
এবং কথকতা
প্রচলিত, তাদের
শাসনকালের পূর্বে
আলাউদ্দিন হোসেন
শাহর সময়ে
এখানে স্থাপিত
নসরত গাজী
মসজিদের অস্তিত্ব
এখনো আছে।
অন্যদিকে পাঠান
শাসনের সময়
সম্রাট আকবর
বাংলা আক্রমণ
করলে সে
সময়ে পাঠানরা
দক্ষিণ বঙ্গের
দিকেই পালিয়ে
যান।
ব্লকম্যান মনে
করেন, বাকলা
তথা বাখরগঞ্জ
১৪৮৭ সাল
পর্যন্ত স্বাধীন
ছিল। আলাউদ্দীন
হোসেন শাহর
সময়ে এটি
মুসলিম শাসনের
আওতায় আসে।
বারোভুঁইয়াদের ইতিহাস
থেকে জানা
যায়, কন্দর্পনারায়ণের
পর তার
পুত্র রামচন্দ্র
রায় বাখরগঞ্জের
শাসনাধিকার লাভ
করেন। মাধবপাশায়
তাদের রাজধানী
ছিল। কন্দর্পনারায়ণ
মোগলদের সঙ্গে
সন্ধি করেছিলেন।
রামচন্দ্র তার
নিজের এলাকায়
প্রায় স্বাধীনভাবেই
রাজত্ব করেন।
তবে এখানে
মনে করিয়ে
দিতে হয়
আকবরের সময়ে
টোডরমল ১৫৮২
সালে ভূমি
ব্যবস্থার সংস্কার
করলে সে
তালিকায় বাকলাও
অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সে তালিকা
অনুসারে বাকলা
ছিল একটি
‘সরকার’
এবং এর
অধীনে বাকলা,
শ্রীরামপুর, শাহবাজপুর
ও ইদিলপুর
নামে চারটি
পরগনা ছিল।
আইন-ই-আকবরী থেকে জানা
যায়, এ
সরকার থেকে
বছরে ১
লাখ ৮০
হাজার টাকা
রাজস্ব আদায়
হতো। তাদের
ছিল ৩২০
জন ঘোড়সওয়ার
এবং ১৫
হাজার পদাতিক
সৈন্য।
সপ্তদশ শতাব্দীর
শুরুর দিকে
খ্রিস্টান মিশনারিরা
বাকেরগঞ্জ অঞ্চলে
আগমন করেন।
ফাদার ফনসেকা
যখন বাকলায়
আসেন, তখন
সেখানকার শাসনে
ছিলেন কন্দর্পের
পুত্র রামচন্দ্র
রায়। রামচন্দ্র
তাকে গির্জা
স্থাপনের অনুমতি
দেন। নিকোলাস
পাইমেন্টার লিখিত
চিঠিতেও বাকলার
উল্লেখ আছে।
১৬১১ সালে
ইসলাম খাঁ
বাকলা দখল
করলে সেখানে
মোগল শাসন
প্রতিষ্ঠিত হয়।
এখানে জলদস্যুদের
আক্রমণ রোধ
করতে মোগলরা
দুর্গ নির্মাণ
করে। আরাকানী
মগদের রুখতে
সুবাদার শাহ
সুজা নলছিটিতে
(তত্কালীন সুজাবাদ)
একটি দুর্গ
নির্মাণ করেন।
মাটির দেয়াল
হলেও দুর্গটি
সুনির্মিত। বলে
রাখা ভালো,
নলছিটি ও
বাকেরগঞ্জ পাশাপাশি
অবস্থিত।
কিন্তু যে
সময়ের কথা
হচ্ছে, তখনো
এ অঞ্চলের
নাম বাকেরগঞ্জ
হয়নি। বাকেরগঞ্জ
নাম মূলত
হয় আলিবর্দি
খানের সময়কার
ব্যক্তিত্ব আগা
বাকেরের নাম
থেকে। আগা
বাকের এখানে
একটি হাট
বা গঞ্জ
প্রতিষ্ঠা করেন।
এখান থেকে
বাকেরের নামানুসারে
স্থানটির নাম
বাকরগঞ্জ বা
বাকেরগঞ্জ (বাখরগঞ্জ
বলে অধিক
উল্লেখিত) হিসেবে
পরিচিতি পায়।
এ কথা
কমবেশি সবাই
জানলেও বুজুর্গ
উমেদপুর নামকরণের
ইতিহাসটি স্বল্প
আলোচিত। মূলত
সম্রাট আওরঙ্গজেবের
শাসনামলে শায়েস্তা
খাঁকে এ
অঞ্চলের সুবেদার
করা হলে
তিনি জলদস্যু
দমনে মনোযোগ
দেন। এ
সময় মোগল
স্থল বাহিনীর
সেনাপতি বুজুর্গ
উমেদ খানের
নৈপুণ্যে নোয়াখালী
থেকে বাকেরগঞ্জ
পর্যন্ত অঞ্চল
আরাকানী মগমুক্ত
হয়। তার
নামানুসারে পরগনার
নামকরণ করা
হয়।
১৭৬৫ সালে
ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানি বাংলায়
দেওয়ানি লাভ
করে। অন্যদিকে
লবণ ব্যবসা
এবং কলকাতা
যাত্রার সুবিধার
জন্য বাকেরগঞ্জের
দিকে কোম্পানির
দৃষ্টি আকর্ষিত
হয়। এদিকে
একই কারণে
এ অঞ্চলে
ব্যবসাকেন্দ্র ও
লোকবসতি বাড়ে।
কেন্দ্র থেকে
দূরের এ
অঞ্চল শাসনের
জন্য আলাদা
প্রশাসন প্রয়োজন
দেখা দেয়।
একজন সিভিল
জজকে প্রশাসনিক
ক্ষমতা দিয়ে
১৭৮১ সালে
নলছিটির বরইকরণে
নিয়োগ দেয়া
হয়। তিন
বছর পর
সুন্দরবনের কমিশনার
তার সঙ্গে
যোগ দেন।
ডাকাত দমনে
সুন্দরবনের কমিশনারকে
বিশেষভাবে বিচারিক
ক্ষমতা দেয়া
হয়। ১৭৯২
সালে উভয়ের
দপ্তর বাকেরগঞ্জে
স্থানান্তর করা
হয়। ১৭৯৭
সালে কমিশনারের
বিচারিক ক্ষমতা
লোপ করা
হয় এবং
ঢাকা প্রদেশের
দক্ষিণ অঞ্চলগুলো
নিয়ে বাকেরগঞ্জ
নামে আলাদা
জেলা গঠিত
হয়। জেলা
প্রশাসকের কার্যালয়
বাকেরগঞ্জেই স্থাপিত
হয়।
পরবর্তী সময়ে
দক্ষিণাঞ্চলের জেলা,
উপজেলার গঠন
ও প্রশাসনিক
ব্যবস্থায় পরিবর্তন
আনা হয়।
১৮০১ সালে
বাকেরগঞ্জ জেলার
সদর দপ্তর
বরিশালে স্থানান্তরিত
হয়। ১৮২২
সালে হাতিয়া
ও দক্ষিণ
শাহবাজপুরের দ্বীপাঞ্চলগুলো
নোয়াখালীর সঙ্গে
যুক্ত হয়।
১৮৬৯ সালে
দক্ষিণ শাহবাজপুরকে
নোয়াখালী থেকে
নিয়ে বাকেরগঞ্জের
সঙ্গে যুক্ত
করা হয়।
প্রশাসনিক দিক
থেকে ১৮১৪
সালে জেলা
কোর্টের রেজিস্ট্রার
বাকেরগঞ্জের রাজস্ব
আদায়ের জন্য
সহকারী কালেক্টর
হিসেবে নিয়োগ
পান। ১৮১৭
সালে তিনিই
কালেক্টর পদ
লাভ করেন।
১৮৮২ সালে
ম্যাজিস্ট্রেট ও
কালেক্টর অফিসকে
একত্র করে
বিচার ও
রাজস্বের দায়িত্ব
কালেক্টরের ওপর
ন্যস্ত করা
হয়। ১৮১৭
সালে আনুষ্ঠানিকভাবে
বাকেরগঞ্জ জেলা
স্থাপিত হয়।
১৮১৭-১৯৯৩
সাল পর্যন্ত
বাকেরগঞ্জ জেলার
মর্যাদায় ছিল।
তবে জলদস্যুদের
উৎপাতের পরিপ্রেক্ষিতে
১৮১১ সালে
জেলার কার্যক্রম
পরিচালনার জন্য
সদর দপ্তর
হিসেবে বরিশালকে
বেছে নেয়া
হয়। সে
সময় থেকে
বাকেরগঞ্জ জেলার
সদর হিসেবে
বরিশালই প্রতিষ্ঠা
পেয়েছিল।
১৯৮২ সালের
৭ নভেম্বর
বাকেরগঞ্জ উপজেলা
গঠিত হয়।
১৯৯০ সালে
বাকেরগঞ্জে পৌরসভা
প্রতিষ্ঠিত হলে
এটি পৌরশহরের
মর্যাদা লাভ
করে। প্রশাসনিক
সুবিধার কারণে
১৯৯৩ সালে
বরিশাল বিভাগ
প্রতিষ্ঠিত হলে
সে সময়
বাকেরগঞ্জ জেলা
লুপ্ত হয়।
বরিশালের নামকরণ
সম্পর্কে মতভেদ
আছে। বড়
বড় শালগাছের
কারণে (বড়+শাল)=বরিশাল,
পর্তুগিজ বেরী
ও শেলীর
প্রেমকাহিনীর জন্য
বরিশাল, বড়
বড় লবণের
গোলার জন্য
বরিশাল—এমন
অনুমানগুলো প্রচলিত।
গিরদে বন্দরে
(গ্রেট বন্দর)
ঢাকার নবাবদের
বড় বড়
লবণের চৌকি
ছিল। এ
জেলার লবণের
বড় বড়
চৌকি ও
লবণের বড়
বড় দানার
জন্য ইংরেজ
ও পর্তুগিজ
বণিকরা এ
অঞ্চলকে ‘বরিসল্ট’
বলত। এ
বরিসল্ট পরিবর্তিত
হয়ে বরিশাল
হয়েছে বলে
অনেকের ধারণা।
বর্তমান বরিশাল
জেলা মূলত
বাকেরগঞ্জেরই উত্তরাধিকারী।
আসরার আবেদিন: প্রাবন্ধিক






