বরিশালে খ্রিস্ট ধর্মের আগমন ঘটেছিল মোটামুটি ১৮৩০ সালে। অতি অবশ্যই মিশনারিদের হাত ধরে। এ সময় বড় ভূমিকা ছিল বাকেরগঞ্জের তত্কালীন ম্যাজিস্ট্রেট মি. গ্যারেটের। সে সময় বেশির ভাগ খ্রিস্টান ছিলেন ব্যাপটিস্ট চার্চের অনুসারী। অল্পসংখ্যক ছিলেন চার্চ অব ইংল্যান্ড ও রোমান ক্যাথলিক। শ্রীরামপুর মিশনের চেষ্টায় গৌরনদীর অনেক নিম্নবর্ণের হিন্দু খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেন।

মুসলমান ও উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে খ্রিস্টান মিশনারিরা কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। ১৯০১ সালে সে সময়ের বাকেরগঞ্জে খ্রিস্টান ছিল ৫ হাজার ৫৯১ জন। এরপর ১৯৪১ সালে তা ৯ হাজার ৩৫৭, ১৯৫১ সালে ১১ হাজার ২৪৫ ও ১৯৬১ সালে ১১ হাজার ৭৭৬ জন হয়।

বাকেরগঞ্জ জেলার সদর দপ্তর ছিল বরিশাল। এটি কয়েকশ বছর ধরেই পূর্ববঙ্গে ধান উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র। নদীর সূত্রে বরিশালের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল ঢাকা ও কলকাতার। ১৮৯৮ সালে প্রকাশিত খোসালচন্দ্র রায় তার বাকেরগঞ্জের ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন—‘বাকেরগঞ্জের ম্যাজিস্ট্রেট মি. গেরেট সাহেবের সময়ে ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে প্রথমে এদেশে খ্রিস্ট ধর্ম প্রচার আরম্ভ হয়। উক্ত সাহেব বাহাদুর স্বয়ং অবগাহমণ্ডলী ভুক্ত হইয়াছিলেন। গৌরনদী থানার অন্তর্গত আস্কর ও ধোনসার এ দেশীয় খ্রিস্টানদিগের প্রধান বসতি স্থান। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে গৌরনদীর অন্তর্গত বারোপাইকার খ্রিস্টানদিগের একটি মোকদ্দমা হইয়া গিয়াছে। উহা দ্বারা এ দেশীয় খ্রিস্ট সমাজ ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছিল। এ দেশে খ্রিস্টধর্ম প্রচারকগণ যেরূপ উৎসাহ ও উদ্যম সহকারে প্রচার কার্য নির্বাহ করিতেছেন তাঁহারা অতুল্য ফল পাইতেছেন না। নিম্নশ্রেণীর কতকগুলি চণ্ডাল ব্যতীত অপর কেহই তাহাদিগের দলভুক্ত হয় নাই। উক্ত চণ্ডালদিগের মধ্যেও কেহ কেহ হিন্দুশাস্ত্রানুসারে প্রায়শ্চিত্ত করিয়া পুনরায় হিন্দু হইতেছে। ইহাদিগকে ‘ফিরতি খোচ’ বলে। মি. জুশন ও মি. উইলিয়াম কেরী সাহেবের যত্নে বরিশালে যে একটি বাইবেল ক্লাস খোলা হইয়াছে, তদ্বারা বহুসংখ্যক বালকের নৈতিক উপকার সাধিত হইতেছে। ইহায় খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারের অন্যতম উদ্দেশ্য। এই স্কুলটির জন্য বরিশালবাসী উক্ত মহাত্মাগণের নিকট চিরকৃতজ্ঞ থাকিবেন। খ্রিস্টানগণ যিশুখ্রিস্টকে ঈশ্বরের অবতার মনে করেন, তিনি ভিন্ন আর কেহই মানুষের পাপ মোচন করিতে সক্ষম নহে। যিশুকে ভজনা না করিলে অনন্ত নরকে ডুবিতে হইবে, ইহাই তাহাদিগের ধর্মমত। ৪৬৫৯ জন খ্রিস্টান বাস করেন।’

অবশ্য কয়েক বছর আগে হেনরি বেভারিজ তার The District of Bakarganj: Its History and Statistics (1876) নামের আকর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, লোকগণনায় প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের কারণে অনেক খ্রিস্টান বাকেরগঞ্জের বাইরে পড়ে গেছেন। তার মতে, বাকেরগঞ্জে খ্রিস্টানদের সংখ্যা বাংলার অন্যান্য এলাকার তুলনায় বেশি এবং তা সম্ভব হয়েছে মিশনারিদের সাফল্যের কারণে। তিনি উল্লেখ করেছেন, তখন শিবপুরে এক পর্তুগিজ কলোনিতে অন্তত ৮০০ খ্রিস্টান বাস করতেন। তারা ছিলেন রোমান ক্যাথলিক। এছাড়া জেলার উত্তরাংশে যে খ্রিস্টানদের বসবাস ছিল তারা সবাই ধর্মান্তরিত হওয়ার আগে ছিলেন চণ্ডাল কিংবা নিম্নবর্ণের হিন্দু। অন্যদিকে বেভারিজ জানিয়েছেন, পুরো বাকেরগঞ্জে তার জানামতে একজন মুসলমানও খ্রিস্টান হননি। তার মতে, মুসলমানরাই মিশনারিদের কাজে সবচেয়ে বড় বাধা। বাকেরগঞ্জের উত্তরাংশে মিশনারিদের সফলতার পেছনে তিনি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্থানীয় ভূস্বামী ও তাদের পাইক-পেয়াদাদের অত্যাচার। তাদের কাছে খ্রিস্টধর্মের সামাজিক ন্যায়বিচারের বাণী আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল। অন্যদিকে পাদ্রিরা জমির মালিক ও এই গরিব চণ্ডালদের মধ্যে রক্ষাকবচের মতো দাঁড়িয়েছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে ভূস্বামীরা মিশনারিদের বিরোধিতা শুরু করেন। এটা মূলত হয়েছিল তাদের বৈষয়িক স্বার্থে আঘাত লাগার কারণে। এমনকি একজন খ্রিস্টান ভূস্বামীও ছিলেন এদের মধ্যে। বেভারিজ জানাচ্ছেন, এ দ্বন্দ্ব চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল ২০ বছর আগে। তখন স্থানীয় কয়েকটি খ্রিস্টান পরিবারকে অপহরণ ও বন্দি করে রাখা হয়েছিল। এ ঘটনা আদালত পর্যন্ত গড়ায়, যা বারোপাইকা কেস নামে বিখ্যাত হয়। এ মামলা বাকেরগঞ্জ জেলা, কলকাতা এমনকি ইংল্যান্ডে আলোড়ন তুলেছিল। বেভারিজের বিবেচনায় পুরো ঘটনাটি সত্য সত্যই ঘটেছিল, কিন্তু ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে’ আপিল আদালতে অভিযুক্তরা খালাস পেয়ে যান।

ম্যাজিস্ট্রেট গ্যারেটের কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তিনি বিচারক হয়েছিলেন। তিনি ব্যাপটিস্ট ছিলেন। তার নাজির মি. পারি সক্রিয় ধর্মপ্রচারক ছিলেন। পরে তিনি যশোরে মিশনারি হিসেবে কাজ করেন। তার স্থলে বরিশালে এসেছিলেন মি. স্মিথ এবং তারপর মি. সিলভেস্টার বারেইরো। সিলভেস্টার এসেছিলেন চট্টগ্রাম থেকে এবং বরিশালে কিছুদিনে স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন। তিনি ব্যাপটিস্ট মিশনের কাজ করেছেন অনেক দিন, কিন্তু নৈতিক স্খলনের দায়ে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। তখন তিনি চার্চ অব ইংল্যান্ডে যোগ দেন। এরা ব্যাপটিস্ট মিশনের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। বিশপ অব কলকাতা এদের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাপটিস্টদের মতে, এরা ছিলেন বিভিন্ন চার্চ থেকে বহিষ্কৃত মানুষ।

বাকেরগঞ্জে খ্রিস্টান জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে সে সময় বেশ ভূমিকা রেখেছিলেন মি. পেজ। তিনি ছিলেন ব্যাপটিস্ট মিশনারি। বেশ কয়েক বছর তিনি বাকেরগঞ্জে অবস্থান করেন এবং অনেককে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত করেন। এরপর মি. সেলও তার ভূমিকার জন্য স্থানীয় খ্রিস্টান সমাজে প্রশংসিত হয়েছেন।

মি. পেজের পুরো নাম ছিল জন চেম্বারলিন পেজ। তিনি মিশনারি হিসেবে বরিশালে এসেছিলেন ১৮৪৮ সালের ২৮ নভেম্বর। তার জন্ম বিহারের মুঙ্গেরে, এক সামরিক পরিবার। বাবা ছিলেন কোম্পানির সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন আর মা ছিলেন এক কর্নেলের মেয়ে। তার বাবার সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব ছিল সে আমলের এক বিখ্যাত ব্যাপটিস্ট মিশনারি চেম্বারলিনের সঙ্গে এবং তিনি তার নামেই নিজের ছেলের নাম রেখেছিলেন। যা হোক, জন চেম্বারলিন পেজ শিক্ষাজীবন ইংল্যান্ডে শেষ করে ভারতে ফিরে আসেন। মুঙ্গেরে তিনি অ্যান্ড্রু লেসলি নামের এক মিশনারির ঘনিষ্ঠ হন এবং তার সঙ্গে শ্রীরামপুরে চলে আসেন। ১৮৪১-এর এপ্রিলে পেজ নিজেই মিশনারি হন।

মিশনারি হিসেবে পেজের প্রথম দায়িত্ব ছিল কলকাতার দক্ষিণাংশের গ্রামাঞ্চলে। বরিশালে তার কাজের শুরুটা খুব একটা স্বস্তিদায়ক ছিল না। তিনি মি. সিলভেস্টার বারেইরোর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন, যিনি পদচ্যুত হয়েছিলেন। তিনি বরিশালে সবচেয়ে বড় যে চ্যালেঞ্জটি মোকাবেলা করেছিলেন, সেটা হলো বড়পাইকা মামলা। ১৪ জন স্থানীয় খ্রিস্টানকে অপহরণ ও বন্দি করেছিলেন স্থানীয় জমিদার ও নীলচাষী। ঘটনাটির বিচার শুরু হলে নিম্ন আদালত খ্রিস্টানদের পক্ষে রায় দিলেও আপিল আদালতে তারা হেরে যান। বরং মিথ্যা গল্প সাজানোর জন্য খ্রিস্টানদের দায়ী করা হয়। শেষমেশ আদালত প্রথম রায় বহাল রেখেছিলেন, কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেটের দেয়া রায় বদল করা যায় না বলে এটা ছিল আক্রান্ত খ্রিস্টানদের জন্য নৈতিক বিজয়।

পেজ ও তার দুই সহকারী মার্টিন ও অ্যান্ডারসন মিলে হিন্দু ও মুসলমানদের বিভিন্ন উৎসবে খ্রিস্ট ধর্মের প্রচারণা চালাতেন। কালিসুরিতে তারা একবার মুসলমানদের কোনো জমায়েতে গিয়েছিলেন। এখানে প্রায় দেড় লাখ মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। মার্টিনের কথায় এরা সবাই ‘খেতে ও ফসল বেচা-কেনা’ করতে এসেছিলেন। ধারণা করা যায়, এটা কোনো বার্ষিক মেলা বা হাট হতে পারে। এ জমায়েতে তারা তিনজন সকাল ৭টা-১০টা এবং বেলা ৩টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত প্রচারণা চালাতেন। এভাবে তারা পাঁচদিন কাজ করেন।

তাদের এ ধর্মপ্রচারে খুচরো, খুঁতখুঁতে তর্ক ছাড়া সিরিয়াস ধরনের কোনো তর্কবিতর্ক কখনো হয়নি। এ পর্যায়ে মার্টিনের রেখে যাওয়া কিছু পর্যবেক্ষণ কৌতূহলোদ্দীপক। তিনি লিখেছেন, সমাজিক রীতিনীতি, নৈতিকতায় মুসলমানরা হিন্দুদের চেয়ে এগিয়ে। তার যখন ব্রাহ্মণদের মধ্যে নিজেদের ধর্মীয় পুস্তকাদি বিতরণ করতেন, তখন কখনো আশা করতেন না যে তারা সেগুলো পড়বেন। মার্টিনের মতে, ব্রাহ্মণরা শিক্ষিত হলেও নিজ ধর্ম নিয়ে খুব একটা পড়াশোনা করেন না। হিন্দুরা তাদের ধর্মীয় ব্যবস্থার ওপর খুব যে আস্থা রাখেন তেমনটাও মনে হয়নি মার্টিনের। তার কাছে মনে হয়েছে, স্থানীয় হিন্দুরা যে আচার-রীতি অনুসরণ করে, তা তাদের বহুদিনের প্রতিষ্ঠিত সামাজিক রীতি, বর্ণ এবং স্টেরিওটাইপ।

মার্টিন আরো বলেছেন, বাঙালিরা কোনো বিষয়ে সিরিয়াস আলাপে আগ্রহী নয়, বরং তারা রুপি, হুক্কা আর খাবার পেলেই সন্তুষ্ট। হিন্দুদের মধ্যে পাপ-পুণ্য নিয়ে কোনো আলাপ নেই। অন্যদিকে মুসলমানরা খ্রিস্ট ধর্মের অনেক বিষয়, গ্রন্থকে সত্য স্বীকার করবে, কিন্তু যেই যিশুকে ত্রাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়, অমনি তারা ক্ষিপ্ত হবে এবং আপনাকে শত্রুজ্ঞান করবে—মার্টিনের মন্তব্য।

অন্যদিকে পেজ স্থানীয় ধর্মান্তরিতদের নৈতিক, ধার্মিক বিকাশ নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। পুরো দুই দশক সময় তিনি বরিশালে একনিষ্ঠভাবে খ্রিস্ট ধর্ম প্রচার করেন। ১৮৯৫ সালের ২২ নভেম্বর দার্জিলিংয়ে তিনি মারা যান।

বাকেরগঞ্জ অঞ্চলে ব্যাপটিস্টদের প্রধান কেন্দ্র ছিল গৌরনদীর আস্কর ও ধোনসার। মি. বারেইরোর গির্জা ছিল ধনডোবায়। বেভারিজ জানাচ্ছেন, তার সময়ে এসে ধর্মান্তরের সংখ্যা একেবারে কমে এসেছে। তিনি লিখেছেন, সে সময়ে এসে মিশনারিদের কর্যক্রম স্তিমিত হয়ে এসেছে। নতুন কাউকে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষা দেয়ার চেয়ে তারা স্থানীয় খ্রিস্টান সমাজকে ঐক্যবদ্ধ রাখতেই কাজ করছিলেন। কিন্তু এ কাজেও তারা পুরোপুরি সফলতা পাচ্ছিলেন না, অনেকে পুনরায় হিন্দু ধর্মে ফিরে গিয়েছিলেন। এদের ‘ফিরতি’ বলে ডাকা হতো।

হেনরি বেভারিজ এমন কয়েকজন ফিরতির সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছিলেন। তারা কেন পিতৃপুরুষের ধর্মে ফিরে গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে অনুসন্ধান করেন। তাদের একজন বেভারিজকে জানিয়েছিলেন, তিনি আর খ্রিস্টান থাকতে চাননি কারণ টেন কমান্ডমেন্টস পালন করা তার জন্য খুব কঠিন। তবে বেভারিজের নিজস্ব মত ছিল এ ধর্মত্যাগীরা তাদের নিজস্ব সমাজে ফিরে যেতে আগ্রহী হয়েছিলেন। আরো একটি বড় কারণ মেয়েদের বিয়ে দেয়া। সে সময় স্থানীয় খ্রিস্টান সমাজে মেয়েদের বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স ছিল ১৩। কিন্তু হিন্দুরা আরো আগেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিতেন। স্থানীয় খ্রিস্টানরা তখনো হিন্দু সংস্কৃতিকে ভুলে যাননি। তারা বিভিন্ন হিন্দু আচার-অনুষ্ঠান পালন করতেন।

 

শানজিদ অর্ণব: লেখক ও অনুবাদক