ইংরেজ আমলে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোয় স্টিমার চলাচল শুরু হয়। বাকেরগঞ্জের নদীতে ১৮৮০ সালের আগেই স্টিমার যাতায়াত করলেও খুলনা ও বরিশালের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াত শুরু হয় ১৮৮৪ সালে। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে বাকেরগঞ্জের গুরুত্ব বাড়ে। সরাসরি কলকাতার সঙ্গে নৌপথ যোগাযোগ স্থাপিত হয়। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলেও যাতায়াত সহজসাধ্য হয়ে ওঠে। স্টিমার স্টেশনে পরিণত হয় বরিশাল। সরাসরি স্টিমার চলতে শুরু করে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও মাদারীপুরের মধ্যে। এ সময় বরিশাল কলকাতা থেকে বাংলাদেশের অন্যান্য জেলায় যাতায়াতের একটি প্রধান স্টেশন হয়ে ওঠে। যাত্রী ও মালামাল পরিবহনে নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়। মাল পরিবহন ও যাত্রী চলাচল সহজসাধ্য হয়ে ওঠে।

বরিশালের স্টিমার সার্ভিস চালুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জেমস জনস্টনের নাম। ১৮২৯ সালে তাকে মেরিন বোর্ডের অধীন বাংলার নদীগুলোয় চলাচলকারী সব গণপরিবহনের অস্থায়ী নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব দেয়া হয়। ১৮৩০ সালের দিকে তিনি কোম্পানি সরকারকে ভারতীয় নদীগুলোয় চলাচলের উপযোগী স্টিমার নির্মাণ ও নকশা তৈরির পরামর্শ দেন। তখন গঙ্গা নদীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির কিছু স্টিমার চলত। ১৮৪৪ সালে ব্রিটিশ ব্যক্তিমালিকানাধীন দি ইন্ডিয়ান জেনারেল স্টিম নেভিগেশন (আইজিএসএন) কোম্পানি এ অঞ্চলে কাজ শুরু করে। ১৮৭৩ সালে রিভার স্টিম নেভিগেশন কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৮৮০’র দশকে এ অঞ্চলে স্টিমার চলাচল শুরু হয়।

প্রথম পর্বে স্টিমার চলাচলের পথ ছিল নানা দিকে ছড়িয়ে। কেবল বাইরে নয়, জেলার অভ্যন্তরেও স্টিমার চলাচল করত। জেলার উত্তরাংশে এবং বরিশালের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করত টর্কি নদীপথের স্টিমার সার্ভিস। আরেকটি স্টিমার সার্ভিস সাকিপুর ও নয়াভাঙানি নদীপথে ঢাকায় যেত। পথটি ছিল পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ রক্ষাকারী। শাহবাজপুরের বিভিন্ন স্থান হয়ে নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের মধ্যে একটি স্টিমার সার্ভিস ছিল। কলকাতার সঙ্গে সংযোগ রক্ষায় ছিল দুটি স্টিমার সার্ভিস। জেলার পশ্চিম অংশে সংযোগ রক্ষাকারী স্টিমার সার্ভিস দুটির একটি যাতায়াত করত কালীগঞ্জ নদী হয়ে হুলারহাট থেকে উত্তরে এবং অন্যটি কচা নদীপথে তুষখালী হয়ে দক্ষিণে। জেলার গুরুত্বপূর্ণ একটি স্টিমার সার্ভিস ছিল খয়রাবাদ নদীপথে। এ স্টিমারগুলো যেত পটুয়াখালী ও গলাচিপা পর্যন্ত। আরেকটি সার্ভিস ছিল বিশখালী নদীপথে ফুলঝুড়ি পর্যন্ত।

কয়েক বছরের মধ্যে বেশ কয়েকটি স্টিমার সার্ভিস জেলার বিভিন্ন স্থান হয়ে চলাচল করে। সব নদীতে স্টিমার চলাচল করতে পারত না। ছোট ছোট নদীপথে নৌকায় যাত্রী ও মাল নিয়ে আসা হতো স্টিমার স্টেশনে। এভাবে শুরু হয় পরিবহন ব্যবস্থায় নতুন যুগের।

১৮৮৪ সালে ফ্লোটিলা কোম্পানি বরিশাল এবং খুলনা রেলওয়ে স্টেশনের মধ্যে স্টিমার চালানো শুরু করে। ফ্লোটিলা কোম্পানি ১৮৯৬ সালে ইন্ডিয়ান জেনারেল নেভিগেশন ও রিভার স্টিম নেভিগেশন নামের যৌথ কোম্পানির অধীনে চলে আসে। বরিশালকে কেন্দ্র করে এরা চারদিকে স্টিমার চালাত। বরিশাল সদরে কোম্পানির একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা স্টিমার সার্ভিসের দেখাশোনা করতেন, এখানে তাদের একটি এজেন্সি ও ওয়ার্কশপ ছিল।

স্টিমারগুলো ছিল প্যাডেল স্টিমার। শুরুতে অর্ধশতকের বেশি সময় এগুলো স্টিম ইঞ্জিন দিয়ে চালিত হয়েছে। ষাটের দশকে এগুলোয় হাইড্রোলিক প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়। বরিশাল রুটের স্টিমারগুলো রকেট নামে পরিচিত। স্টিমারগুলোর মধ্যে পিএস অস্ট্রিচ, পিএস গাজী, পিএস মাহসুদ, পিএস লেপচা, পিএস টার্নের নাম ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে।