রাশিয়ার ইতিহাস, সাহিত্য নিয়ে দু’চার পাতা যিনি পড়েছেন তার কাছে ‘জার’ শব্দটি নতুন নয়। ‘জার’ মূলত একটি উপাধি, যা এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘সিজার’ থেকে, যার সাধারণ অর্থ সম্রাট। ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট কালপর্বে রাশিয়ার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারীর উপাধি ‘জার’ শব্দটি ‘বাদশাহ’, ‘সম্রাট’ প্রভৃতির সমার্থক। রাজা, বাদশাহ প্রভৃতি শব্দ শুনেই আমরা যেমন একজন দোর্দণ্ডপ্রতাপ ব্যক্তির কথা চিন্তা করি, রাশিয়ায় ‘জার’ সেই একই প্রপঞ্চ তৈরি করত। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই জারদের মধ্যে একনায়কের বৈশিষ্ট্য চলে আসে। ষোড়শ শতাব্দীতে শুরু হয়ে ভালো-মন্দ মিলিয়ে রুশ বিপ্লব পর্যন্ত টিকে থাকা এ জারতন্ত্রের কয়েকজন বিশিষ্ট জারকে নিয়ে এ লেখা।

আইভান দ্য টেরিবল (১৫৪৭-৮৪): রাশিয়ার প্রথম জার ছিলেন আইভান ভাসিলিয়েভিচ। মস্কোর গ্র্যান্ড প্রিন্স ভাসিলির দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান আইভান তিন বছর বয়সে বাবাকে হারালে নিয়মানুসারে তিনিই মস্কোর গ্র্যান্ড প্রিন্সে পরিণত হন। আইভানের মা এলেনা গ্লিন্সকায়ার অভিভাবকত্বে ছিলেন মাত্র পাঁচ বছর। ধারণা করা হয়, বিষ প্রয়োগে এলেনাকে হত্যা করা হয়েছিল। অনাথ আইভান এবং তার ভাই ইউরির ছেলেবেলা সম্পর্কে তথ্যের অভাব রয়েছে, তবে অভিষেক হওয়ার আগ পর্যন্ত অভিজাতরা আইভানের হয়ে রাজ্য পরিচালনা করতেন। ১৬ বছর বয়সে যখন তার অভিষেক হয়, তখন আইভান হয়ে গেলেন রাশিয়ার প্রথম জার।

অভিষেকের পর পরই মস্কোতে অগ্নিকাণ্ড ঘটলে সেই দায়ভার পড়েছিল আইভানের মায়ের দিকের আত্মীয়দের ওপর। এ অগ্নিকাণ্ডে রাশিয়ার প্রভূত ক্ষতি হয়, কেননা শহরের বেশির ভাগ অবকাঠামো কাঠের তৈরি ছিল। কিন্তু আইভান এ দুর্যোগ সামলে নিয়ে প্রথমে প্রচলিত আইনে সংস্কার আনেন। শাসনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নিয়ে একটি কাউন্সিল এবং একটি আইনসভা তৈরি করেন। পাশাপাশি গ্রাম পর্যায়ে আঞ্চলিক শাসনের প্রচলন এবং একটি কার্যকর সেনাবাহিনী তিনি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাণিজ্য ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাতে তিনি ইংরেজদের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক তৈরি করেন।

বাণিজ্যের পাশাপাশি আইভান রাজ্য বিস্তারে আগ্রহী ছিলেন। বাল্টিক সাগরের অধিকার লাভ করতে লিভোনিয়ান যুদ্ধ শুরু করেন, যদিও তা ব্যর্থ হয়েছিল। একই সময়ে তার স্ত্রী আনাস্তাশিয়া রোমানভনার মৃত্যু হয় এবং তার একজন উপদেষ্টা আন্দ্রেই কুরবস্কি বিশ্বাসঘাতকতা করলে আইভানের মনোবল ভেঙে যায়। ধারণা করা হয়, এলেনার মতো রোমানভনাকেও বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল। এ সময়ে আইভান নিজেকে শাসনকার্য থেকে সরিয়ে নিতে চাইলে উপদেষ্টাদের অনুরোধে তিনি আবার অধিষ্ঠিত হন কিন্তু শর্ত হয় যে, ওই সময় থেকে আইভানই হবেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।

একনায়কত্ব শুরু করে আইভান একটি নিজস্ব বাহিনী গঠন করেন এবং তাদেরকে প্রভূত পরিমাণ ভূমি প্রদান করা হয়। এ সেনাবাহিনী আইভান ছাড়া আর কারো কাছে জবাবদিহি করত না। ফলে তাদের অত্যাচারের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যায়। কৃষকদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। ১৫৬০-এর দশকে আইভান রুশ-টার্কিশ যুদ্ধ শুরু করেন, যা ১৫৭০-এ সন্ধি হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে। পরের বছর আইভানের নির্দেশে তার বিশেষ বাহিনী অপ্রিচনিকিকে দিয়ে নভোগর্ড শহর ধ্বংস করে দেয়া হয়, কেননা তিনি শুনেছিলেন দুর্ভিক্ষপীড়িত এ শহর লিথুনিয়ার কাছে পরাজয় স্বীকার করবে।


কোনো অদ্ভুত কারণে আইভানের মানসিক অবস্থার অবনতি হয়েছিল। জীবনের শেষ দিকে আইভানের মানসিক অবস্থা এতটাই খারাপ হয় যে, একবার তিনি তার পুত্রবধূ এলেনাকে পিটিয়েছিলেন, কেননা তার মনে হয়েছিল এলেনার পোশাক অমার্জিত। আইভানের মৃত্যুর পর রাশিয়ার শাসন ব্যবস্থায় চূড়ান্ত অবনতি এসেছিল। সূচনায় আশা জাগিয়ে দুঃশাসন কায়েম করা এই আইভান ইতিহাসে ‘আইভান দ্য টেরিবল’ নামে পরিচিত হন।

প্রথম মিখাইল (শাসনকাল ১৬১৩-৪৫): মাইকেল ছিলেন রাশিয়ার প্রথম রোমানভ বংশীয় জার। চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে আইভানের তুলনায় মাইকেল খুবই সাদামাটা। কিন্তু আইভানের শেষ জীবনে তৈরি হওয়া অপশাসন এবং আইভান-পরবর্তী সংকট থেকে উত্তরণের কারণে মিখাইল স্মরণীয় হয়ে আছেন। মজার ব্যাপার হলো, আইভানের মতো মিখাইলেরও অভিষেক হয়েছিল ১৬ বছর বয়সে। যদিও অভিষেকের পর উপযুক্ত স্থান লাভ করতে তার প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লেগেছিল।

মিখাইলের শাসন লম্বা সময় ধরে হলেও ইতিহাসে তেমন কোনো ছাপ রাখেনি। তিনি তার উপদেষ্টাদের সহায়তায় রাজ্য শাসন করতেন। কিন্তু মিখাইলের মাধ্যমেই আসলে রোমানভ জারদের পত্তন হয় এবং পরবর্তী ৩০০ বছর সেই শাসনই চলেছিল। এছাড়া মিখাইল যখন শাসক হন, তখন রুশ সংগীত মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছিল। চার্চের নির্দেশে সংগীত নিষিদ্ধ হয়েছিল অনেক আগেই। কেবল কিছু লোকগান বেঁচে ছিল। মিখাইলের শাসনকালে পশ্চিম থেকে সংগীতকাররা রাশিয়ায় আসতে শুরু করলে সেখানে নতুন করে সংগীতের চর্চা শুরু হয়।

পিটার দ্য গ্রেট (১৬৮২-১৭২৫): পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক শাসক থাকেন, যারা তাদের সময়ে ‘খ্যাপা’ হিসেবে পরিচিত হন কিন্তু দেখা যায় প্রকৃতপক্ষে তাদের সিদ্ধান্ত সময়ের তুলনায় এগিয়ে ছিল। প্রথম মিখাইলের পৌত্র পিটার অ্যালেক্সিভিচ এমনই একজন ছিলেন, যার চিন্তা, স্বপ্ন ছিল সময়ের তুলনায় অগ্রগামী। তাই কখনো কখনো তার আচরণ অদ্ভুত বলে মনে হতো। অবশ্য এটাও ঠিক, কখনো কখনো তিনি সত্যিই অদ্ভুত আচরণ করতেন। ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে যখন তিনি কূটনৈতিক সফরে ফ্রান্স গিয়েছিলেন, ফ্রান্সের সিংহাসনে তখন সাত বছর বয়সী সম্রাট ষষ্ঠ লুইসের অধিকার। বয়স যা-ই হোক না কেন তিনি সম্রাট এবং এক্ষেত্রে ‘প্রটোকল’ মানাই স্বাভাবিক, কিন্তু পিটার সেখানে গিয়ে ‘শিশু সম্রাট’কে কোলে তুলে চুমু খেয়েছিলেন।

পিটার তার ৪৩ বছরের শাসনকালে রাশিয়াকে সবদিক থেকে বদলে দিতে চেয়েছেন। সাম্রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধি থেকে শুরু করে সৈন্য ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনেন তিনি। পিটারের সময়ে বাল্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত রাশিয়া বিস্তৃত হয়েছিল এবং তিনি রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গে স্থানান্তর করেন। এ স্থানান্তরের একটি উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার রাজধানীকে পশ্চিমা বিশ্বের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া। পিটারের পশ্চিমপ্রীতি ইতিহাসে আলাদা স্থান করে নিয়েছে।

ইউরোপ প্রায় বরাবরই অন্যান্য অঞ্চলকে অশিক্ষিত, বর্বর জ্ঞান করত। রাশিয়া সম্পর্কেও তাদের সেই ধারণাই ছিল। তাদের এ মনোভাব বদলে দেয়ার চেষ্টার পাশাপাশি ইউরোপের অনেক রীতিনীতি এমনকি পোশাকের প্রতিও পিটারের আগ্রহ ছিল। তিনি তার সৈন্য ও প্রশাসন ব্যবস্থা ইউরোপীয় কায়দায় সাজিয়েছিলেন। এমনকি তিনি তার কর্মকর্তাদের দাড়ি কামাতে বাধ্য করেন এবং নারীদের ক্ষেত্রে পশ্চিমা পোশাকের প্রতি জোর দিয়েছিলেন। এসব বিষয় খামখেয়াল মনে হতে পারে। কিন্তু নজর আরেকটু বিস্তৃত করলে দেখা যায়, পিটার প্রায় দুই শতাধিক কারখানা তৈরি করেন। সামরিক, বেসামরিক এমনকি প্রযুক্তিগত শিক্ষার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও তৈরি করিয়েছিলেন। ফরাসি ইতিহাসবিদ লিচেন্টেনের মতে, ‘যদিও নানা নতুন নিয়মের মধ্য দিয়ে শাসনের পাশাপাশি অনেক যুদ্ধ-বিগ্রহের মধ্য দিয়ে রাশিয়াকে দুর্বল করা এবং জাতীয় প্রশাসনে অনিয়ম থাকা সত্ত্বেও পিটারই প্রথম রাশিয়ার আধুনিকায়ন করেছিলেন।’

পিটার নিজে আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক ছিলেন। ১৫ বছর বয়সে কম্পাস এবং অ্যাস্ট্রোল্যাব দেখে বিজ্ঞান সম্পর্কে কৌতূহল জন্মেছিল তার। ফ্রানৎস টিম্মারম্যান নামের এক নাবিকের কাছ থেকে তিনি এসবের ব্যবহারও শিখেছিলেন এবং টিম্মারম্যানের মাধ্যমেই পিটারের মধ্যে জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত, জ্যামিতির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি দীর্ঘ ১৮ মাস ধরে ছদ্মবেশে ইউরোপে ভ্রমণ করে বিজ্ঞানের নানা বিষয় জানার চেষ্টা করেছিলেন। ১৬৯৭-এর মার্চ থেকে ১৬৯৮-এর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ ভ্রমণ তার জীবনকে আমূল বদলে দিয়েছিল। বিজ্ঞান থেকে শুরু করে অস্ত্রবিদ্যা এমনকি ছুতারের কাজও তিনি শিখেছিলেন।


ছয় ফুট আট ইঞ্চির ‘দানবীয়’ উচ্চতার এ জার বিজ্ঞানীদের সংস্পর্শ পছন্দ করতেন। তিনি বিজ্ঞানীদের সঙ্গে আলোচনা করতেন, কখনো তাদের গবেষণাগার কিংবা বাড়িতেই চলে যেতেন। একসময়ে তিনি ফ্রান্সের রয়্যাল একাডেমি অব সায়েন্সের লেকচার শুনতেন। ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি একাডেমির বিশেষ সদস্য হওয়ার দুর্লভ সম্মান লাভ করেন।

এলিজাবেথ অব রাশিয়া (১৭৪১-৬২): পিটার দ্য গ্রেটের কন্যা এলিজাবেথ ১৭৪১ খ্রিস্টাব্দে রক্তপাতহীন একটি অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। নিজের পুরো শাসনকালে তিনি কারো প্রাণদণ্ড দেননি। অবশ্য এখান থেকে যদি ভাবা হয় এলিজাবেথের শাসনকাল শান্তিপূর্ণ ছিল, তাহলে ভুল হবে। তার শাসনকালে দুটি বড় ঘটনা ঘটে। সাত বছর লম্বা একটি যুদ্ধ ও অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধ। অষ্টাদশ শতকের এ যুদ্ধ রীতিমতো জটিল ছিল, কেননা বারবার পরিস্থিতি বদলের সঙ্গে সঙ্গে শত্রু-মিত্র এমনকি অবস্থানও বদল করতে হতো।

এসবের বাইরে রাশিয়ায় এলিজাবেথের পরিচিতির সবচেয়ে বড় কারণ মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপনা। এছাড়া তিনি শিক্ষা বিস্তার ও অন্যান্য অবকাঠামোগত ক্ষেত্রেও অনেক অর্থ ব্যয় করেন। শাসক হিসেবে খুব একটা দক্ষ না হলেও এলিজাবেথ এখন পর্যন্ত রাশিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় জার।

ক্যাথরিন দ্য গ্রেট (১৭৬২-৯৬): এলিজাবেথের মৃত্যুর পর ছয় মাস পর্যন্ত ক্যাথরিনের স্বামী তৃতীয় পিটার রাশিয়া শাসন করেছিলেন। প্রুশিয়ার প্রতি রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের কারণে তিনি গুপ্তহত্যার শিকার হলে ক্যাথরিন ক্ষমতায় আসেন। এখানে মজার ব্যাপার হলো, ক্যাথরিন নিজেই একজন প্রুশীয়।

ক্যাথরিনের সময়ে রাশিয়ার সীমানা বিস্তৃত হয়েছিল। কৃষ্ণসাগরের উপকূল অঞ্চল দখল, পোল্যান্ডের কিছু অংশ ও ক্রিমিয়া এ সময়ে জারের রাজ্যের অংশ হয়ে ওঠে। ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে ক্যাথরিন অস্ট্রিয়ার সাহায্য নিয়ে তুরস্কের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। চার বছরের যুদ্ধের পর রাশিয়া অনেক ভূমি দখল করে, যার মধ্যে ক্রিমিয়া অন্যতম। আলাস্কার যে অংশ পরবর্তী সময়ে আমেরিকার কাছে বিক্রি করা হয়েছিল, তাও ক্যাথরিনের সময়ে রাশিয়া অধিকার করেছিল।

পিটার দ্য গ্রেট যে পশ্চিমীকরণ শুরু করেছিলেন, ক্যাথরিন তা চালু রাখেন এবং আরো এগিয়ে নিয়ে যান। রাশিয়াকে আধুনিক করে তোলার এ প্রচেষ্টা সাধুবাদ পেয়েছিল। কিন্তু একই সময়ে তিনি সার্বদের খেপিয়ে তুলেছিলেন। ক্যাথরিনের আদেশে বিচার চেয়ে রাজদরবারে তাদের আবেদন করার অধিকার রহিত হয়। এতসবের মধ্যে ক্যাথরিন দেখেছিলেন তার ছেলে পল সিংহাসনের যোগ্য নয়। ফলে তিনি পলের ছেলে আলেকজান্ডারকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার আগেই ক্যাথরিনের মৃত্যু হয়।

শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ক্যাথরিন তুলনামূলকভাবে একজন সুশাসক ছিলেন। রাজ্য বিস্তারও করেছিলেন। কিন্তু নারী হওয়ার কারণেই হোক বা অন্য কোনো কারণে, জীবদ্দশাতেই তাকে নিয়ে নানা গুজব প্রচলিত ছিল। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি নানা ব্যভিচারে যুক্ত হয়েছিলেন বলে কথিত আছে। বহু প্রেমিকের বিষয়টি ইতিহাসবিদরা স্বীকার করে নিলেও ক্যাথরিনের বিরুদ্ধে থাকা বিকৃত যৌনাচারের অভিযোগ নিতান্তই প্রতিহিংসামূলক বলে তারা মন্তব্য করেন।

দ্বিতীয় নিকোলাস (১৮৯৪-১৯১৭): একটি রাজবংশের যিনি প্রতিষ্ঠাতা এবং যার সময়ে সেই বংশ লোপ পায়—ইতিহাস দুজনকে নিয়েই বিস্তৃত আলোচনা করে। এক্ষেত্রে জার দ্বিতীয় নিকোলাস দ্বিতীয় দলের অন্তর্ভুক্ত। তিনিই ছিলেন জারতন্ত্রের শেষ শাসক। অর্থাৎ রাশিয়ার সর্বশেষ জার।

মাত্র ১৩ বছর বয়সে নিকোলাস তার পিতামহের হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছিলেন। বলা হয়ে থাকে, পরবর্তী জীবনে তার রক্ষণশীল মনোভাবের পেছনে এ ঘটনা প্রভাব ফেলেছে। পিতার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত নিকোলাস কোনো ধরনের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেননি। বিংশ শতাব্দীতে যখন পৃথিবীতে নানা পরিবর্তন আসছিল, নিকোলাস সেসব বিষয়ে মাথা ঘামাননি। তার শাসনে একের পর এক দুর্যোগ এসেছে এবং নিকোলাসের ক্ষমতা ধীরে ধীরে শূন্য হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলেন, শাসন ও সেনাবাহিনী পরিচালনায় তার অযোগ্যতা ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পালে হাওয়া দিয়েছিল।

ক্ষমতায় আরোহণের পর পিতা আলেকজান্ডারের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সুসম্পন্ন করতে ব্যর্থ নিকোলাসকে নিয়ে তখন থেকেই সমালোচনা শুরু হয়। পিতার মৃত্যুর দেড় বছর পর অভিষেকের সময় নিকোলাসের সম্মানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কোদ্যাঙ্কা মাঠে বিশৃঙ্খলায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ হারায়। কিন্তু অভিষেক সম্পর্কিত অনুষ্ঠানে নিকোলাস কোনো পরিবর্তন না আনায় জনতা তার প্রতি বিরূপ হয়েছিল। অর্থাৎ নিকোলাসের সূচনাটা কোনো হিসেবেই শুভ হয়নি।

দূরপ্রাচ্যে নিজের সীমানা বাড়াতে গিয়ে নিকোলাসের নজর পড়েছিল পোর্ট আর্থারে। জাপানিদের সেখান থেকে হটিয়ে দেয়ার নিকোলাসের এ চেষ্টায় নাখোশ হলে কূটনৈতিক উপায়ে তারা সমঝোতার চেষ্টা করে। কিন্তু বারবার তাদের ফেরত পাঠানো হয় এমনকি জারের সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ পর্যন্ত করতে দেয়া হয়নি। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে জাপান একটি ঝটিকা আক্রমণ করে বসে। নিকোলাসের কোনো রকম প্রস্তুতি না থাকার দরুন পরের বছর সেপ্টেম্বরে রাশিয়া জাপানের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। ইতিহাসে প্রথমবার রাশিয়া, তথা জার কোনো এশীয় শক্তির কাছে পরাজিত হয়। নিকোলাসের নির্বুদ্ধিতার কারণে প্রাণ হারায় প্রায় ৮০ হাজার রুশ সৈনিক। রাশিয়ায় নিকোলাসের জনপ্রিয়তা তলানিতে পৌঁছে যায়।

পৃথিবীর আকাশজুড়ে তখন সাম্যবাদ, গণতন্ত্রের ভাবনা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এদিকে নিকোলাসের একনায়কত্বে রাশিয়ার শ্রমিক শ্রেণী রীতিমতো নিপীড়িত। জাপানের সঙ্গে যুদ্ধ তাদের রাগ আরো বাড়িয়ে তুলেছিল। কাজের সময় কমানো, মজুরি বৃদ্ধি, উন্নত জীবনের দাবি নিয়ে তারা মাঠে নামার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিল বেশ কিছুদিন ধরে। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ২২ জানুয়ারি একজন যাজকের নেতৃত্বে শ্রমিকরা নিরস্ত্র হয়ে তাদের দাবি জানানোর জন্য ‘উইন্টার প্যালেস’-এর সামনে জড়ো হয়েছিল। সঙ্গে একটি স্মারকলিপি নিয়ে এসেছিল তারা। নিকোলাস তখন প্রাসাদে ছিলেন না, কিন্তু প্রাসাদের সামনে অস্ত্রধারী সৈন্যরা অপেক্ষা করছিল। জনতার ওপর ছোড়া গুলিতে সেদিন অসংখ্য শ্রমিক নিহত হন। যদিও নিকোলাস এ গুলির নির্দেশ দেননি, কিন্তু তারই অব্যবস্থাপনার দরুন এ ঘটনা ঘটেছিল, যা ‘ব্লাডি সানডে’ নামে কুখ্যাত হয়ে আছে।

‘রক্তাক্ত রোববার’ থেকে শুরু করে জারিনা (জারের স্ত্রী) আলেকজান্দ্রার সঙ্গে রাসপুতিনের সম্পর্ক, সবকিছু মিলিয়ে নিকোলাসের মেয়াদ ফুরিয়ে আসছিল। সমাজতন্ত্রীদের আন্দোলনের মুখে রাজার অনুগত প্রশাসকরা রাজপরিবারকে পশ্চিম সাইবেরিয়ায় স্থানান্তর করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থা চালু করে। ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের নেতৃত্বে অক্টোবর বিপ্লবের পর রাশিয়ার ক্ষমতা বলশেভিকদের হাতে কেন্দ্রীভূত হলে রোমানভ বংশের ৩০০ বছরের ‘জার শাসন’ বা ‘জারতন্ত্র’ সমাপ্ত হয়।

ব্যক্তি নিকোলাসের সমাপ্তি আরো হূদয়বিদারক। ১৯১৭ সালের ১৭ জুলাই রাত ২টায় বলশেভিকরা নিকোলাসকে সপরিবারে হত্যা করে। ১৯৯৮ সালে জার দ্বিতীয় নিকোলাস ও তার পরিবারের সদস্যদের দেহাবশেষ ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়। ২০০০ সালে তাদের হত্যাকাণ্ডের স্থানে তাদের সম্মানে নির্মিত হয় ‘চার্চ অন দ্য ব্লাড’।

 

মাহমুদুর রহমান: লেখক