জার রুশ শব্দ, মানে সম্রাট। শব্দটির উৎস ল্যাটিন—সিজার থেকে উদ্ভূত। নবম শতক থেকে রাশিয়ার শাসনভার কখনো কিয়েভের গ্র্যান্ড প্রিন্স, কখনো নভগরোদের গ্র্যান্ড প্রিন্সের হাতে থাকত। পঞ্চদশ শতকে একটি নতুন ক্ষমতা বলয়ের আবির্ভাব ঘটল—গ্র্যান্ড ডাচি অব মস্কো। নতুন ক্ষমতাধররা যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলে, কেবল শাসন ও প্রতিরক্ষা নয়, তারা রাজ্য সম্প্রসারণকেও অন্যতম দায়িত্ব মনে করে। মস্কোভিত্তিক এ ক্ষমতাসীন শক্তি অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে এগিয়ে গেল, মোঙ্গল-তাতার অবরোধকারীদের পরাস্ত করল। রুশ ইতিহাসে তারাই প্রথম জার খেতার গ্রহণ করল। তৃতীয় আইভান চাইতেন তাকে ‘জার’ সম্বোধন করা হোক, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে কখনো জারের মুকুট পরানো হয়নি। তার দৌহিত্র চতুর্থ আইভান বা আইভান দ্য টেরিবল (ভয়ংকর আইভান) আনুষ্ঠানিকভাবে জার পদ অলংকৃত করতে শুরু করেন।

আইভান দ্য টেরিবল জার হিসেবে প্রথম তার দেশকে বিশ্বসভায় তুলে ধরেন, তিনি ইংল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপন করেন। ইংল্যান্ডের রানী প্রথম এলিজাবেথ রাশিয়ায় দূত নিয়োগ দেন। পরবর্তী জার ফিওদর কেবল ব্রিটেনের সঙ্গে বাণিজ্য বাতিল করে দিয়ে রাশিয়াকে সব দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য উন্মুক্ত করেন, রানী এলিজাবেথ এতে অসন্তুষ্ট হয়ে অনেক পত্রবাণ নিক্ষেপ করেন কিন্তু ফিওদর পাত্তা দেননি।

নিঃসন্তান ফিওদরের মৃত্যুর পর বরিস গুডুনভ নিজেকে জার ঘোষণা করলেন। তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করলেন, পেরুতে আগ্নেয়গিরি উদ্গীরণ ঘটলে তার প্রভাবে রাশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি শৈত্যপ্রবাহ চলল। অন্তত ১০ লাখ রুশ দুর্ভিক্ষে মারা গেল। সাধারণ মানুষ খাবারের জন্য চুরি-ডাকাতিতে নেমে পড়ল। এ জার দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিলেন। নৈরাজ্য সৃষ্টি হলো।

১৬ বছর বয়সী মিখাইল রোমানভ যখন জার হলেন, এটা কেউ ভাবেননি যে এ বালক এবং তার বংশের উত্তরসূরিরা পরবর্তী ৩০০ বছরেরও বেশি সময় রাশিয়া শাসন করবে, তাদের হাতেই সৃষ্টি হবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দেশ।

রাশিয়ার আগেই ৯১৯ সালে বুলগেরিয়ার সম্রাট জার খেতাব প্রাপ্ত হন। বুলগেরিয়ার ইতিহাসের ৯১৯-১০১৮ খ্রিস্টাব্দ এবং ১১৮৫-১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দ এবং ১৯০৮-১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দ জার রাজত্ব হিসেবে চিহ্নিত ও সমাদৃত। ১৩৪৬-১৩৭১ সালের সার্বিয়ান সাম্রাজ্যও জার রাজত্বের বলে চিহ্নিত।

রুশদের জার শাসন ১৫৪৭ সালে শুরু। মাঝখানে সম্রাট বলা হলেও ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লব পরবর্তী জার দ্বিতীয় নিকোলাসের ক্ষমতা ত্যাগ ১৫ মার্চ ১৯১৭ পর্যন্ত জারশাসিত মনে করাই সঙ্গত। যে ভাবেই জাররা সমালোচিত হন না কেন, তাদের হাতেই পৃথিবীর অন্যতম বড় এবং সম্ভবত সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্য সৃষ্টি হয়েছে।

লেভ তলস্তয়, ফিওদর দস্তয়েভস্তি, নিকোলাই গোগোল, ইভান তুর্গেনেভ, আন্তন চেখভ, আলেক্সান্ডার অস্ত্রোভস্কি, আলেকজান্ডার পুশকিন, মিখাইল লারমন্টভ প্রমুখ, এমনকি রুশ বিপ্লবের নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনও জার আমলের সৃষ্টি।

জার শাসনকালের শেষ দিকে মোট জনসংখ্যার ৭১ দশমিক শূন্য নয় ভাগ ছিল অর্থোডক্স খ্রিস্টান। সংখ্যালঘুদের শীর্ষে ১১ দশমিক শূন্য ৯ ভাগ মুসলিম। ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের আলাদাভাবে দেখানো হয়েছে ৯ দশমিক ১৩ ভাগ, ইহুদি ৪ দশমিক ১৫ ভাগ, লুথারিয়ান খ্রিস্টান ২ দশমিক ৮৪ ভাগ, আর্মেনিয়ান শূন্য দশমিক ৯৪ ভাগ, অন্যান্য শূন্য দশমিক ৭৬ ভাগ। ২ নভেম্বর ১৭২১ জারশাসিত রাশিয়া সাম্রাজ্য ঘোষিত হয়। ১৮৯৫ সালে রাশিয়ার ভৌগোলিক এলাকা ৮৮ লাখ বর্গমাইল। আর তা পৃথিবীর ভূ-ভাগের এক-ষষ্ঠাংশেরও বেশি। নিবন্ধটিতে জার এবং জার শাসনের কিছু তথ্য উপস্থাপন করা হচ্ছে।

জার শাসন: স্বৈরতন্ত্রের তিন খুঁটি

জার শাসনের প্রধান বৈশিষ্ট্য এককভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ। ক্ষমতার ভাগবণ্টন অন্য কেউ পাবে না। জাররা বিশ্বাস করতেন কিংবা বিশ্বাস করতেন বলে মনে করা হতো, কিংবা তারা জনগণকে বিশ্বাস করাতে সমর্থ হয়েছিলেন যে ঈশ্বরেরই ইচ্ছে জাররা রাশিয়া শাসন করুন। তারা মর্ত্যে ঈশ্বরের প্রতিনিধি। তারা বিশ্বাস করেন না তারা পাপী, তাদের জন্য নিকৃষ্টতম নরক সংরক্ষিত থাকবে। যে তিনটি খুঁটি জার শাসনকে বলিষ্ঠ ও পরিপুষ্ট করেছিল তা হচ্ছে—সেনাবাহিনী, আমলাতন্ত্র ও গোঁড়া খ্রিস্টীয় চার্চ বা অর্থোডক্সি।

সেনাবাহিনী: জারদের ক্ষমতা সুরক্ষিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সেনাবাহিনী। কেবল ১৮৮৩-১৯০৫ পর্যন্ত ২২ বছরে দেশের বিভিন্ন অংশে বিদ্রোহ ও অস্থিরতা দমন করতে ছোট-বড় ১ হাজার ৫০০ সেনা অভিযান পরিচালিত হয়েছে। সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা হতেন রুশ অভিজাত পরিবারের এবং বরাবরই জারের অনুগত। এ ধরনের সরকারপন্থী নাগরিক নিপীড়ন করা অভিযান চালাত সেনাবাহিনীর অশ্বারোহী ইউনিট। অশ্বারোহী সৈনিকদের প্রায় সবাই ছিলেন কোজাক। আর কোজাকরা জারের অন্ধ সমর্থক। সাধারণ সৈনিকদের অনেকেই ছিলেন কৃষিজীবী পরিবারের। তবে তাদের ওপর কঠোর শৃঙ্খলা আরোপ করা হতো, কঠিন শাস্তি দেয়া হতো, বেতনও কম দেয়া হতো। তাদের প্রাপ্য সৈনিকের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেয়া হতো না।

আমলাতন্ত্র: ম্যাক্স ওয়েবার মেধানির্ভর যে নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্রের কথা বলেছেন, তার সঙ্গে জারশাসিত রাশিয়ার আমলাতন্ত্রের দুস্তর ব্যবধান। এ আমলা প্রশাসন সুযোগ-সুবিধা ও পদোন্নতির জন্য জারের সন্তুষ্টির ওপর নির্ভর করত। সন্তুষ্টি প্রাপ্তির পদ্ধতি ছিল অন্যায়ভাবে হলেও জারের ইচ্ছেমতো কাজ করা। রুশ আমলাতন্ত্র অদক্ষ এবং স্বার্থন্বেশী হিসেবে চিহ্নিত হয়। অধস্তন আমলাদের বেতন-ভাতা কম ছিল, তারা ঘুষ নির্ভর হয়ে ওঠে। জ্যেষ্ঠ ও সুযোগসন্ধানী আমলারা মিষ্টি কথা দিয়ে জারকে ভুলিয়ে রেখে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করতেন।

জারকে গোপন সংবাদ দেয়ার জন্য বিশাল গোয়েন্দা পুলিশ বাহিনী গড়ে ওঠে। তারা গ্রেফতার ও নির্যাতন করার জন্য এবং যে কাউকে জার বিরোধী অ্যাখ্যা দিয়ে তাকে শিক্ষা দেয়ার দায়িত্ব নিজেদের হাতে নিয়ে নিত। তারা অত্যাচার ও হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যেত। তাদের বিরুদ্ধে নালিশ দেয়ার সুযোগ ছিল কমই। জারের ক্ষমতা নির্বিঘ্ন করতে তারা কিঞ্চিত প্রতিবাদী অসন্তুষ্ট নাগরিককেও সাইবেরিয়ায় নির্বাসন দিত।


জারের মন্ত্রীদের অধিকাংশই ছিল তাদের স্বজন ও বন্ধু গোত্রীয়।

অর্থোডক্স চার্চ: হাজার বছর ধরে রুশ অর্থোডক্স চার্চ রাশিয়ার জনগণের ওপর আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে এসেছে। ১৭২১ সালে জার শাসনামলে ‘হলি সাইনড’ নাম দিয়ে একে সরকারের একটি বিভাগে পরিণত করা হয়। এর প্রধান ‘চিফ প্রকিউরেটর’ নিযুক্ত করতেন জার। চার্চ ও রাষ্ট্র রাশিয়ায় পরস্পর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে অবস্থান করেছে। চার্চকে উপেক্ষা করলে রাষ্ট্র অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। পাশ্চাত্যের দেশগুলোয় চার্চের সঙ্গে রাষ্ট্রের বরাবরই একটি বৈরিতার সম্পর্ক, তার অন্যতম কারণ রাষ্ট্র চার্চ নির্ভর নয়, চার্চের যেকোনো ফরমান রাষ্ট্র উপক্ষো করলে নাগরিক এ নিয়ে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবে না। কিন্তু জারশাসিত রাশিয়াতে বটেই, তারও আগ থেকেই রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ হিসেবে কাজ করে এসেছে চার্চ। ধর্মভীতি ও ঐশ্বরিক অনুজ্ঞার কথা বলে নাগরিকদের বিক্ষোভ ও বিদ্রোহ দমন করে চার্চ সরাসরি ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করত। এটা অনস্বীকার্য যে সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্রের চেয়ে জারদের কাছে চার্চ কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। রুশ চার্চের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত আসে ১৯১৭ সালে বলশেভিক বিপ্লবের সময়—রাষ্ট্রের কাছে ধর্ম, ঈশ্বর, চার্চ এসব তুচ্ছ হয়ে যায়। জারদের টিকে থাকার জন্য রাশিয়ার সেনাবাহিনী, আমলা ও ধর্মীয় গোষ্ঠীকে যথেষ্ট ছাড় দিতে হয়েছে।

সিক্রেট লাইভস অব দ্য জার

মাইকেল ফারকাহারের সিক্রেট লাইভস অব দ্য জার গ্রন্থ থেকে কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো:

পিটার দ্য গ্রেট জল্লাদের ওপর নির্ভর করতেন না। তিনি নিজেই শত্রুর মাথা বিচ্ছিন্ন করতেন। দ্বিতীয় রোমানভ জার আলেক্সিস ভদ্র, শান্ত মেজাজের দয়ালু মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার রাজত্বে ১৬৭০ সালের একটি কৃষক বিদ্রোহ সামাল দিতে তিনি বিপ্লবী কৃষকদের ধরে গরম লোহার ছ্যাঁকা দিয়েছেন, চাবকেছেন এবং জ্যান্ত অবস্থায় তাদের চার টুকরো করেছেন। পিটার দ্য গ্রেট বিদ্যানুরাগী জারদের অন্যতম। তিনি নিজেই শেখাতে শুরু করতেন। মানুষের শরীরবিদ্যা বোঝাতে গিয়ে তিনি তার মিসট্রেস ম্যারি হ্যামিল্টনের মাথা দেহবিচ্ছিন্ন করে দেখিয়েছেন কোনটা শ্বাসনালি, কোনটা মেরুদণ্ড আর কোনটা ক্যারোটিড ধমনি।

রোমানভরা ক্ষমতায় আসার আগে প্রথম জার আইভান দ্য টেরিবল শক্ত হাতে রাশিয়া শাসন করেছেন। তিনি যাকে শত্রু মনে করতেন, তার গায়ের চামড়া তুলতেন, সেদ্ধ করতেন, পুড়াতেন এবং হাড় ভাঙতেন। তিনিই ছিলেন জোসেফ স্ট্যালিনের প্রিয় জার।

জার আলেক্সিসের জারিনা নাতালিয়া অত্যন্ত সাহসী ছিলেন। জানালা-বন্ধ এমন ঘোড়াটানা ক্যারিজে অন্য কেউ জানালায় হাত দেয়ার সাহস পায়নি, কিন্তু নাতালিয়া এক চিলতে জানালা খোলার সাহস দেখিয়েছেন। তরুণ দুই ভাই ইভান দ্য ফোর এবং পিটার দ্য ফার্স্ব যখন ক্ষমতায়, ১৬৮২ সালের গণবিদ্রোহ হয়। তাদের বড় বোন সোভিয়া বাস্তবিকই তাদের সিংহাসনের পেছনে বসে বিভিন্ন সমস্যার করণীয় তাদের ফিসফিস করে জানাতেন, দুই ভাই কান খাড়া করে শুনতেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন। জারিনা-সম্রাজ্ঞী আনা আগ্নেয়াস্ত্রের খুব ভক্ত ছিলেন। তাকে খুশি রাখার জন্য বিভিন্ন স্থান থেকে জন্তু-জানোয়ার ধরে এনে তার দেয়ালঘেরা বাগানে ঢুকিয়ে দেয়া হতো, তিনি সানন্দে সেগুলোকে গুলি করতেন। সম্রাজ্ঞী এলিজাবেথ পুরুষের পোশাক পছন্দ করতেন, তার নির্দেশে বিভিন্ন সময় তিনি পুরুষদের নারীর পোশাক এবং নারীদের পুরুষের পোশাক পরতে আদেশ দিতেন, তা মান্য করা হতো। সম্রাজ্ঞীর আদেশ অমান্য করার সুযোগ নেই। এলিজাবেথ কখনো কখনো নিজের মাথা ন্যাড়া করতেন, সে সময় তার নির্দেশে রাজবাড়ির সব নারীকে মাথা ন্যাড়া করতে হতো। ক্যাথরিন দ্য গ্রেট এমনকি ৬০ বছর বয়সেও তার অর্ধেক বয়সী বেশ ক’জন প্রেমিক পোষণ করতেন। ক্যাথরিনের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রেমিক ছিলেন গ্রেগরি পটেমকিন। তিনি তাকে ‘জঙ্গলের সিংহ’ বলে ডাকতেন।

জার পরিবারের সদস্যমাত্রই ক্ষমতার জন্য লালায়িত মনে করার কারণ নেই, জার রোমানভ নিকোলাস ক্ষমতা গ্রহণে উৎসাহী ছিলেন না। যখন তাকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে অনুরোধ করা হতো, তিনি বলতেন, আমার মাকে জিজ্ঞেস করুন। জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার দাস প্রথা বিরোধী ছিলেন। ফলে ক্ষমতাসীন এলিট ও বণিক গোষ্ঠী তার বিরোধিতা করে। তিনি ভূমিদাসদের মুক্তির ঘোষণা দেয়ার পর তাকে হত্যা করার জন্য সাতটি উদ্যোগ নেয়া হয়। শেষবার তিনি নিহত হন। জার প্রথম নিকোলাস রাষ্ট্রীয় থার্ড ডিপার্টমেন্টের (গোয়েন্দা পুলিশ) ওপর পুরোপুরি আস্থাশীল ছিলেন না। কখনো তিনি নিজেই তদন্ত করতে বেরিয়ে পড়তেন।

প্রথম মাইকেল, আলেক্সিস এবং তৃতীয় ফিওদর ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সে জারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জারদের মধ্যে সবচেয়ে শান্ত ও নিশ্চুপ হিসেবে পরিচিত আলেক্সিসের একটি কী দুটি কাজ সাম্রাজ্যকে অস্থিতিশীল করে তোলে—এমন ভালো মানুষটির বিরুদ্ধে দুটি বিদ্রোহ নয়। লবণের ওপর কর বাড়ানোর কারণে ১৬৪৮ সালে লবণ বিদ্রোহ হয়; আবার তামার মুদ্রার জায়গায় সিলভার মুদ্রায় প্রচলনের সিদ্ধান্তে ১৬৬২ সালে ভয়ংকর কপার রিভল্ট শুরু হয়।

সবচেয়ে অসুস্থ জার তৃতীয় ফিওদর বিজ্ঞান একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। তার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সিভিল ও মিলিটারি রিফর্মস। আগে বড় পদে অভিজাতরাই যেত, কিন্তু তিনি বললেন, সমস্যা নেই, তারাও যাবে যদি মেধার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। তিনি অভিজাতদের অসন্তোষের শিকার হলেও রাষ্ট্রের জন্য এটা ছিল তার অসাধারণ অবদান।

জার প্রথম পিটার ঠিক করলেন তার পদবি ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। ১৭২১ সালে তিনি হলেন এম্পেরর আর তার দেশ হলো রাশান এম্পায়ার। তিনিই ইতিহাসে পিটার দ্য গ্রেট নামে পরিচিত। তার মৃত্যুর পর ফার্স্টলেডি প্রথম ক্যাথেরিন রাশিয়ার সম্রাজ্ঞী হলেন। তারই রাজসভার একজন সদস্য পিয়তর তলস্তয় হচ্ছেন লেভ তলস্তয়ের পূর্বপুরুষ।

জার প্রথম নিকোলাস ইহুদিদের জন্য ১৮ বছর বয়সে সেনাবাহিনীতে যোগদান এবং ২৫ বছর চাকরি বাধ্যতামূলক করে দেন। জার প্রথম পিটার ছিলেন ৬ ফুট ৮ ইঞ্চি লম্বা এবং বিশালদেহী; সে তুলনায় তার হাত, পায়ের পাতা এবং মাথা ছিল ছোট। প্রকৃতই মহান (কিন্তু তার নামের সঙ্গে দ্য গ্রেট ব্যবহার করা হয় না) জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার আব্রাহাম লিঙ্কনেরও দুই বছর আগে ইমানসিপেশন এডিক্ট জারি করে ভূমিদাসদের মুক্তি দেন, লিঙ্কন দুই বছর পর জারি করেন ইমানসিপেশন প্রোক্লেমেশন।

জার দ্বিতীয় আলেক্সান্ডার আততায়ীর হাতে নিহত হন। তার পুত্র জার তৃতীয় আলেক্সান্ডারকেও হত্যা করার উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে ষড়যন্ত্রকারীরা ধরা পড়ে যায় এবং তাদের ফাঁসি হয়। ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া বিদ্রোহীদের একজন আলেক্সান্ডার উলিয়ানভ হচ্ছেন ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের আপন বড় ভাই।

জারতন্ত্রের নির্মম বিদায়

১ নভেম্বর ১৮৯৪ জার দ্বিতীয় নিকোলাস রুশ সিংহাসনে আরোহন করেন। তখন তার বয়স ২৬ বছর। ১৫ মার্চ ১৯১৭ নিজ থেকে রাজত্ব ত্যাগ (অ্যাবডিকেশন) করা পর্যন্ত ২৩ বছর তিনিই কার্যত রুশ সম্রাট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পরিণতি নিকোলাস রোমানভের বিদায়। তিনি অসুস্থ পুত্রের অনুকূলে ক্ষমতা ত্যাগ করবে সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু স্পষ্ট হয়ে ওঠে অসুস্থ অ্যালেক্সেইকে রেখে তিনি যদি নির্বাসিত হন, তাহলে ছেলেটির মৃত্যু অনিবার্য। অতপর তিনি ভাই মাইকেলের অনুকূলে সিংহাসন ছাড়লেন। কিন্তু বিপ্লব পরিস্থিতি কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে, মাইকেল স্পষ্টই বুঝতে পেরে সিংহাসন প্রত্যাখ্যান করেন।

২২ মার্চ ১৯১৭ নিকোলাস রোমানভ যখন আলোকজান্ডার প্যালেসে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মিলিত হলেন, তিনি তখন আর জার নন। সপরিবার তাকে সেখানে গৃহবন্দি করা হলো। ১৯১৭-এর আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান আলেকজান্ডার কেরেনস্কির নির্দেশে টবলস্কে গভর্নরের প্রাসাদে পাঠিয়ে দেয়া হলো। উদ্দেশ্য তাদের বিপ্লবীদের ক্ষোভ থেকে রক্ষা করা। এমন ধারণাই দেয়া হলো। সেখানে ধীরে ধীরে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা বেড়েই চলল। নিকোলাস রোমানভ রাজকীয় পোশাক পরতে পারবেন না। এ পরিবারের হাতে জারের ক্ষমতা ৩০৫ বছর ধরে। ১৯১৩ সালে বিপুল শানশওকতের মধ্য দিয়ে তিন শতবর্ষ পূর্তি উদযাপন করেছেন জার দ্বিতীয় নিকোলাস রোমানভ। ১ মার্চ, ১৯১৮ থেকে আয়েশী খাবার প্রত্যাহার করে তাদের জন্য বরাদ্দ হয়েছে সৈনিকের রেশন। আগের বছর অক্টোবরে বলশোভিকরা ক্ষমতা নিয়ে নেয়। ২৯ জুন ১৯১৮, বিপ্লবীরা রোমানভ পরিবারের সবাইকে হত্যা করার ব্যাপারে একমত হয়। এ সিদ্ধান্তের অনুমোদনের জন্য মস্কোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে পাঠানো হয়। লেনিনসহ তিনজন জ্যেষ্ঠ সদস্য আঞ্চলিক কমিটিকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষমতা প্রদান করেন। পরিবারের সদস্যদের দুটি পৃথক স্থানে রাখা হয়েছিল। তাদের সদ্যনির্মিত ইপাটিয়েভ হাউজে তখন পরিবারের সব সদস্য একত্রিত—জার নিকোলাস রোমানভ, তার স্ত্রী জারিনা আলোকজান্দ্রা, তাদের চার কন্যা ওলগা, তাতিয়ানা, মারিয়া আনাস্তাসিয়া এবং একমাত্র পুত্র হিমোাফিলিয়া রোগগ্রস্থ আলেক্সিস ১৬ জুলাই মধ্যরাতে পেরোনোর পর ভবনের বেজমেন্টে জমায়েত করা হয়। ভবনের বাইরে তখন ৩০০ সশস্ত্র প্রহরী। তাদের ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করা হবে, না দূরে জঙ্গলে নিয়ে গুলি করা হবে এ নিয়েও বিতর্ক হয়। জার ও জারিনা এবং পাঁচ সন্তান মোট সাতজনের সঙ্গে আরো চারজন তাদের একজন চিকিৎসক, তিনি অসুস্থ আলেক্সিসকে ফেলে যেতে চাননি। এবার তাদের ধারণা দেয়া হয়েছে বিপ্লবীরা কাছাকাছি এসে গেছে। সুতরাং তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যেতে হবে। বেজমেন্টের কক্ষটির দৈর্ঘ্য ২০ ফুট, প্রস্থ ২৬ ফুট। এতক্ষণে ১৭ জুলাই শুরু হয়ে গেছে। এখনকার সৈনিকদের কমান্ডার ইয়াকভ ইয়োরোভস্কি। জার নিকোলাস তাকে বললেন, দুটো চেয়ার আনা যাবে—জারিনা আলোকজান্দ্রা এবং আলেক্সিস বসতে পারলে ভালো হতো। ইয়োরোভস্কির সহকারী গ্রিগরি নিকুলিন ঠাট্টা করে বলল, সিংহাসনের উত্তরাধিকারী চেয়ারে বসে মরতে চায়। বন্দিদের অপেক্ষা করতে বলা হয়। কয়েক মিনিট পর পুলিশের এক্সিকিউশন স্কোয়াড ভেতরে ঢুকতেই ইয়োরোভস্কি মৃত্যুদণ্ডের পরোয়ানা পাঠ করে শোনাল।


নিকোলাস তার পরিবারের সদস্যদের মুখোমুখি ছিলেন। তিনি ঘাড় ফিরিয়ে বললেন, কী? কী বললে?

ইয়োরোভস্কি আর একবার পরোয়ানা পড়ে শোনাতেই সবাই অস্ত্রসহ প্রস্তুত হলো। ইয়োরোভস্কির পিস্তল নিকোলাসের বুক বরাবর। ক্রমাগত গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি পড়ে গেলেন, পিটার এরমাসক গুলি করল জারিনা আলেকজান্দ্রার মাথায়। তারপর মারিয়া। এক এক করে সবাই পড়ে গেল। সন্তানদের মধ্যে সবার আগে মৃত্যুবরণ করে আলেক্সিস। মেয়েদের গায়ে ভারী অলংকার ছিল। জারিনা তার শরীরে হীরা লুকিয়ে রাখতে পারেন এ অজুহাতে তার মরদেহ তছনছ করা হলো। নাবালিকা কন্যাদের বাদ দেয়া হলো না। ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের অফিসে টেলিগ্রাম—নিকোলাস রোমানভের পরিবারের সবাই একই পরিণতি ভোগ করেছে। পরিবার প্রধানের যা ঘটেছে, স্ত্রীও সন্তানদেরও তাই। জার আক্রমণের নির্মমতা ও বিপ্লবীদের নির্মমতার মধ্যে কোনো তফাৎ রইল না। বিপ্লবীদের হাতে জার দ্বিতীয় নিকোলাস ও তার পরিবারদের এ হত্যাকাণ্ডের কথা সোভিয়েত সরকার ১৯২৬ পর্যন্ত স্বীকারই করেনি।

১৯৮৯ সালে মিখালইল গর্বাচেভের গ্লাসনস্ত আর পেরেস্ত্রোইকা চলার সময় শখের খেয়ালে তার পরিবারকে মাটি চাপা দিয়ে রাখা স্থানটি আবিষ্কার করেন। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মরদেহগুলো জার নিকোলাস ও জার পরিবারের সদস্যদের বলেই নিশ্চিত করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার জার পরিবারকে হত্যা করেনি। লেনিন এক সময় নিকোলাস রোমানভ পরিবারের সঙ্গে সুসম্পর্কিত ছিলেন। এ পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের লাভও তিনি আদায় করেছেন। যারা জার এবং লেনিন উভয়কেই জানেন, তাদের কারো কারো দাবি হত্যার অনুমোদন লেনিনই দিয়েছেন, তিনি অন্তত শিশুদের বাঁচাতে পারতেন। তার পরও বহু বছর ধরে তার নামের আগে বিশেষণ ব্যবহার করে বলা হয়েছে ‘মহামতি’ লেনিন। রুশ প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলেিসন জার ও তার পরিবারের হত্যাকাণ্ডের পৌনে ১০০ বছর পর অন্তত এটা তো বলেছেন: এটি রুশ ইতিহাসের লজ্জাজনক পৃষ্ঠা!

 

এমএ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা