বব ডিলান সত্যিই আঁকেন।
আরো একজন বিশ্বসেরা গীতিকার বব ডিলানের ১০৩ বছর আগের নোবেল লরিয়েট রবীন্দ্রনাথও ছবি আঁকতেন। অন্তত অমৃতা শেরগিল প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবির প্রদর্শনী দেখে বলেছেন, এগুলো তাঁর কবিতার চেয়ে ভালো। এটাও সত্য অমৃতা তো আর মূল রবীন্দ্রনাথ পড়েননি, পড়েছেন কিঞ্চিত্ অনূদিত রবীন্দ্রনাথ।
বব ডিলান কেবল গীতিকার ও গায়ক নন, তিনি লেখক, চিত্রপরিচালক, অভিনেতা, ডিস্ক জকি ও চিত্রশিল্পী। তাঁরই একটি স্মরণীয় গান ‘যখন আমি আমার মাস্টারপিস আঁকি’:
হায় রোমের রাস্তা ভরে আছে ধ্বংসস্তূপে
প্রাচীন পদচিহ্ন চারদিকে
মত্ততায় মনে হবে সবকিছু দুটো করে দেখছ
শীতল অন্ধকার রাতে স্প্যানিশ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে
আমাকে হোটেল কক্ষে দ্রুত ফিরে যেতে হবে
বতিচেল্লির ভাগ্নির সঙ্গে আমার ডেটিং ঠিক করা আছে
ওখানে সে থাকবেই, আমার কাছে শপথ করেছে
যখন আমি আমার মাস্টারপিস আঁকি
হায় কলোসিয়ামের ভেতর যে সময়টা কাটিয়েছি
সিংহদের ধোঁকা দিয়ে সময়টা অপচয় হয়ে গেছে
ওইসব শক্তিমান অরণ্যের বাদশাহ, আমার দেখতে ইচ্ছে করেনি
হ্যাঁ এ তো দীর্ঘ কঠিন আরোহণ
আমার স্মৃতির পেছনে ট্রেনের চাকা ছুটছে
বুনো রাজহংসের পেছন ছুটে আমি পাহাড়ের চূড়ায় উঠি
কোনোদিন সুরের আবেশের মতো সব মসৃণ হয়ে যাবে
যখন আমি আমার মাস্টারপিস আঁকি
নোংরা গন্ডোলায় পাল তুলে পৃথিবী ঘুরে
কোকা-কোলার দেশে ফিরে আসি
রোম ছেড়ে এসে আমি ব্রাসেলসে নামি
উড়োজাহাজে এত ঝাঁকি, আমি প্রায় কেঁদেই ফেলেছি
ইউনিফর্ম পরা পুরোহিত এবং মাংসপেশির সংকোচন-আক্রান্ত তরুণীরা
যখন আমি নেমে আসি অভিবাদন জানাতে সবাই সেখানে
সংবাদপত্রের লোকজন ক্যান্ডি খাচ্ছে, তাদের
বড় পুলিশ আটকে রেখেছে
একদিন সবকিছু অন্য রকম হবে
যখন আমি আমার মাস্টারপিস আঁকি
বব ডিলান ১৯৭১ সালের শুরুর দিকে গানটি লিখেন এবং সে বছর মার্চে গানটি রেকর্ড করেন। আরো অনেক খ্যাতিমান শিল্পী গানটি গেয়েছেন।
বব ডিলান এক সময় সত্যিই কাগজ ও রঙতুলি, ক্যানভাস ও পেইন্টব্রাশ নিয়ে বসে গেলেন। তাঁর সব ছবিই জীবন থেকে নেয়া। ‘আমার আগ্রহ মানুষ, ইতিহাস, পুরাণ এবং পোর্ট্রেট— সব ধরনের মানুষ।’
পিকাসো স্প্যানিশ জিপসি মিউজিক পছন্দ করতেন, কিন্তু তিনি তো জনসমক্ষে, দর্শকপূর্ণ স্টেডিয়ামে বড় হলরুমে কখনো গাইতে যাননি। কিন্তু রকস্টার বব ডিলান পিকাসোর পথেও হাঁটলেন। তিনি রক’এন রোল-এর কবি কিটস, একই সঙ্গে পেইন্টিংয়ের লুসিয়ান ফ্রয়েডও।
তিনি কেবল শখের পেইন্টার হিসেবে থেমে রইলেন না। সিরিয়াস শিল্পী হয়ে উঠতে চাইলেন। তাঁর আঁকা ছবি কাঁচা হাতের এবং তাঁর জন্য বিব্রতকর মনে করার কোনো কারণ নেই। ১৯৬৪ সালে আঁকা সাইডট্র্যাক, ২০০৮-এ আঁকা ম্যান অন দ্য ব্রিজ এবং সবুজ ট্রেন ট্র্যাক, ২০০৯ সালের বিগ ব্রাদার, ২০১০-এর বারবার শপ, ২০১৪-তে আঁকা ওয়াগান মাস্টার, ব্রাজিল সিরিজের ছবি পাকা শিল্পী হিসেবেই বব ডিলানকে তুলে ধরে। বব ডিলানের ছবি নিয়ে বহু প্রদর্শনী হয়েছে, তাঁর আঁকা ছবি দেখতে, কিনতে তাঁর গানের ভক্তরা যেমন ভিড় করেছেন, তেমনি জড়ো হয়েছেন শিল্পবোদ্ধারাও।
বব ডিলান তার আঁকাআঁকি নিয়ে বলেছেন:
আমার অধিকাংশ ছবিই বাস্তব জীবন থেকে নেয়া। সত্যিকারের মানুষ, সত্যিকারের রাস্তাঘাট, পর্দার অন্তরালের ছবি, জীবন্ত মডেল, পেইন্টিং ফটোগ্রাফ, স্থাপত্য থেকে নিই। আমি জটিল দৃশ্য ল্যান্ডস্কেপ, ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব তুলে আনতে চাইছি— আমি বিভিন্নভাবে কাজগুলো করি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমার মনে কারণ এবং তার ফলাফল সক্রিয় থাকে। তবে স্পর্শগ্রাহ্য কিছু দিয়ে তো শুরু করতে হয়।
মিনেসোটার সেই দুর্দান্ত তরুণ রবার্ট জিমারম্যান (বব ডিলান নাম নিয়েছেন আরো পরে) জীবনে যা যা করতে চেয়েছেন সে তালিকা থেকে ছবি আঁকা বাদ পড়েনি। পরিণত বয়সে জলরঙ, অ্যাক্রিলিক, তেলরঙ দিয়ে তাঁর কৈশোর স্বপ্নগুলোকে আঁকতে শুরু করেন। কিছু স্মরণীয় কাজ করেছেন ব্রাজিল সিরিজ এবং এশিয়ান সিরিজের ছবিগুলোতে। রঙ একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে তাঁর গানেও। ১৯৬৮-তে প্রকাশিত অ্যালবাম ‘মিউজিক ফ্রম বিগ পিঙ্ক’। তাঁর শৈশব এবং ট্রেন লাইন ক্যানভাসে যেমন এসেছে, গানের অ্যালবামেও এসেছে ‘স্লো ট্রেন কামিং’। তারই আঁকা সেলফ পোর্ট্রেট অ্যালবামের প্রচ্ছদ হয়েছে।
ছবি এঁকে বব ডিলান ফ্রয়েড হয়ে উঠতে পারেননি সত্যি, যেটুকু পেরেছেন তা-ইবা কম কীসে!
তিনি বলেছেন, ‘গান গাওয়া ভিন্ন ব্যাপার। এটা একই সঙ্গে ঢিলে ও আঁটসাঁট দুই-ই হতে পারে। কিন্তু পেইন্টিং হচ্ছে কাঠামোতে তৈরি ছবি। তখন বিবেচ্য ছবি নিজগুণে চিত্তগ্রাহী কিনা, দেখাটা অর্থবহ হবে তো?’
বব ডিলান বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের মতোই অনুধাবন করেছেন, শিল্পীকে সজাগ থাকতে হবে যাতে নিজের কাজের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, যাতে শিল্পী একটি ধারায় একটি বৃত্তে বাঁধা পড়ে না যান।
১৯৬৬ সালে প্লেবয়কে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, আমার গানগুলোই ছবি, আর ব্যান্ড সেই ছবিতে শব্দ সংযোজন করে।






