এটা তার অমর হওয়ার পথে আরেকটি ধাপ— এ বছর সাহিত্যে বব ডিলানের নোবেল প্রাপ্তির প্রতিক্রিয়ায় এটাই ছিল তার সাবেক প্রেমিকা এবং সংগীতশিল্পী জোন বায়েজের মন্তব্য। নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বায়েজ আরো লিখেছেন, ‘বিদ্রোহী, একাকী, অনুমান অসাধ্য এই শিল্পী-গীতিকার সাহিত্যে নোবেলের একেবারে উপযুক্ত পাওনাদার। শব্দ দিয়ে সে যা সৃষ্টি করেছে, তা অজেয়। আমার ৬০ বছরের ক্যারিয়ারে বব ছাড়া আর কারো গানকেই তাদের গভীরতা, আঁধার, ক্রোধ, রহস্য, সৌন্দর্য এবং কৌতুকরসে এতটা যোগ্য হয়ে উঠতে দেখিনি। আর কারো গান গাওয়াটা এত আনন্দের নয়। এ রকম আর কেউ আসবেও না।’
পশ্চিমে ‘ফোক মিউজিক’ বলতে অনেকের সামনেই নাকি প্রথমে দুটি মুখ ভেসে ওঠে— বব ডিলান ও জোন বায়েজ। তারা দুজন ষাটের দশকের ফোক ক্রেজের সবচেয়ে বড় দুই তারকা। ১৯৬১ সালের জানুয়ারিতে ডিলান যখন নিউইয়র্কের গ্রিনউইচ ভিলেজে পৌঁছান, তখন তার বয়স ১৯ বছর। জোন কিন্তু তখনই ‘কুইন অব ফোক’ নামে পরিচিত। দুই বছরের মধ্যেই ডিলান সংগীত সাম্রাজ্যে রাজা হয়ে সিংহাসনে বসেন। রাজ-রানীর ডুয়েটে তখন দুনিয়া যেন কাঁপছে!
২০০৪ সালে নিজের আত্মজীবনী ক্রনিকেলস-এর একমাত্র প্রকাশিত খণ্ডে ডিলান লিখেছেন, মিনেসোটায় ফিরে প্রথমবারের মতো তিনি বায়েজকে দেখেন টেলিভিশনে, ‘আমি তার ওপর থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না, চোখের পলক ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছিল না... তাকে দেখে কেবলই আমার দীর্ঘশ্বাস পড়ছিল। তখন সেখানে একমাত্র যা ছিল, তা হলো বায়েজের কণ্ঠ। এমন এক কণ্ঠ, যা খারাপ আত্মাদের তাড়িয়ে দেয়।’
অন্যদিকে বায়েজ ডিলানকে প্রথম গাইতে দেখেছিলেন গার্দেজ ফোক সিটিতে, সেটা ১৯৬১ সালের কথা। সেদিন ডিলানের গান শুনে হতবাক হয়ে পড়েছিলেন বায়েজ। এর পর ১৯৬৩ সালের এপ্রিলে বোস্টনের ক্লাব ফরটি সেভেনে প্রথমবারের মতো সাক্ষাত্ হয় তাদের। ডিলান তখন সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল গীতিকার এবং গায়ক হিসেবে দৃশ্যপটে আবির্ভূত আর বায়েজ যেন ডিলানে অভিভূত। কয়েক সপ্তাহ পর মন্টেরে ফোক ফেস্টিভ্যালের স্টেজে ডিলানের সঙ্গে ডুয়েট গাইতে ওঠেন বায়েজ, গানটা ছিল ‘উইদ গড অন আওয়ার সাইড’। এর মাধ্যমেই সংগীত দুনিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় ও কিংবদন্তি জুটির যাত্রা শুরু।
১৯৬৩ সালের জুলাইয়ে ডিলানের অভিষেক হলো নিউপোর্ট ফোক ফেস্টিভ্যালে, উত্সবের মঞ্চে গান গাইলেন একবারে স্বল্প পরিচিত তরুণ ডিলান। এখানে তিনি বায়েজের সঙ্গে দুটি ডুয়েট গেয়েছিলেন। এর পর আগস্টে বায়েজ তার নিজের ট্যুরে ডিলানকে আমন্ত্রণ জানালেন। সে সময়ের স্মৃতিচারণ করে বায়েজ বলেছেন, ‘সে সময় আমার শোতে হাজার দশেক দর্শকের সমাগম হতো। এবং সেখানে আমার এই হাঘরে তরুণকে স্টেজে ওঠানোটা ছিল একটা বিরাট পরীক্ষা... যারা আগে কখনো ববকে শোনেনি, তাদের অনেকেই ক্ষেপে গিয়েছিল এবং মাঝে মাঝে অনেকে ডিলানকে বিদ্রূপও করছিল।’ এককথায় তখন থেকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়া শিল্পী বায়েজ তরুণ ডিলানকে সব ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা করা শুরু করেন। এমনকি শুরুতে ডিলানের গলার স্বর পছন্দ না হওয়ায়, তাকে বিদ্রূপ করায় নিজের ভক্তদেরও ধমক দিয়েছিলেন বায়েজ।
ইতিহাস সাক্ষী যে, শুরুর দিনগুলোয় ডিলানের দ্রুত সাফল্যের পেছনে বিরাট ভূমিকা ছিল সেসময়কার ফোক কুইন বায়েজের। ডিলানের দ্বিতীয় অ্যালবাম দ্য ফ্রিহুইলইন বব ডিলান তার ক্যারিয়ার বদলে দেয়। বিপুল জনপ্রিয়তা পায় এটি। মনে হচ্ছিল তার মঞ্চের সঙ্গী এবং প্রেমিকা বায়েজের কাছ থেকে আগুন চুরি করেছিলেন তিনি, আর সেই আগুন যেন তার ক্যারিয়ারকে জ্বালানি সরবরাহ করছিল। শিগগিরই পরিস্থিতি পাল্টে গেল, এবার যেন বায়েজেরই প্রয়োজন হলো ডিলানের পৃষ্ঠপোষকতা।
১৯৬৫ সালে ডিলান বের হলেন ইউরোপ ভ্রমণে। এ সময় জোয়ান বায়েজের ক্যারিয়ারে চলছে খারাপ সময়। ডিলানের সঙ্গে গাওয়ার জন্য তিনি আমন্ত্রণ পেলেন। বায়েজ প্রতিশ্রুতি পেয়ে বিমানে উঠলেন। কিন্তু শেষমেশ সব উল্টে গেল। ডিলান ইংল্যান্ডে বায়েজকে তার সঙ্গে মঞ্চে উঠতে দিলেন না। সেসময় বায়েজকে বাড়তি বোঝার মতো মনে হচ্ছিল ডিলানের। বায়েজের মন ভাঙল। শেষ হলো সংগীতের সুরে এ দুজনের প্রেমের রোমাঞ্চ। ১৯৬৫ সালের বসন্তে অবসান হলো দুজনের প্রেমের সম্পর্কের।
ডিলানের সঙ্গে বিচ্ছেদের পরও ১৯৬৮ সালে বায়েজ তার অ্যালবাম এনি ডে নাউ প্রকাশ করেন। এ অ্যালবামের সবগুলো গান ডিলানেরই লেখা। জোন বায়েজ ১৯৭২ সালে ডিলানের জন্য গান লেখেন ‘টু ববি’, গানের কথায় স্পষ্টভাবেই বোঝা যায় যে সেগুলো বায়েজ তার সাবেক প্রেমিককে উদ্দেশ করেই লিখেছেন। তবে এ গানে যে তিনি শুধু তার প্রেমিক ববিকে দেখেছেন তাই নয় বরং সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতার মঞ্চেও তিনি ডিলানকে দেখতে চাইছিলেন, বায়েজের সেই আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে এ গানে। উল্লেখ্য যে, ১৯৬৪ সালের পর থেকেই ডিলান সমসাময়িক সমাজ-রাজনীতি নিয়ে গান লেখা বন্ধ করেন। তখন থেকে তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। তাই ‘টু ববি’ গানে ডিলানকে উদ্দেশ করে বায়েজ লিখলেন—
You left us marching on the road and said how heavy was the load
The years were young, the struggle barely had its star
Do you hear the voices in the night, Bobby?
They’re crying for you
See the children in the morning light
Bobby they’re dying.
এর পর ১৯৭৫ সালে আবারো গানে গানে ডিলানকে ডাকলেন বায়েজ। ‘ডায়মন্ড অ্যান্ড রাস্ট’ শিরোনামের রোমান্টিক স্মৃতিচারণে বায়েজ লেখেন—
Now you’re telling me
You’re not nostalgic
Well give me another word for it
You who’re so good with words
And at keeping things vague.
ডিলানের জন্য তখনো স্মৃতিকাতর বায়েজ আবার ডিলানের সঙ্গে স্টেজে ওঠার সুযোগ পেলেন ১৯৭৫-৭৬ সালের রোড শোতে। সেটা ছিল রোলিং থান্ডার রিভ্যু কনসার্ট। কনসার্টের শুরুর শোতে বায়েজ কয়েকটি গান গাওয়ার পর তার সঙ্গে গাইতে মঞ্চে ওঠেন ডিলান। দুজনে মিলে গাইলেন ‘ডার্ক অ্যাজ আ ডানজেন’ থেকে ‘দ্য ওয়াটার ইজ ওয়াইড’। রিভ্যু কনসার্টে অংশ নেয়ার পাশাপাশি ডিলানের পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘রেনাল্ডো অ্যান্ড ক্লারাতে’ও অভিনয় করেন বায়েজ। সিনেমাটিতে ডিলানও অভিনয় করেছিলেন। উইমেন ইন হোয়াইট চরিত্রে অভিনয় করেন বায়েজ। কবি অ্যালেন গিনসবার্গও সিনেমাটিতে অভিনয় করেছিলেন। নিউ ইংল্যান্ড এবং কানাডাজুড়ে অনুষ্ঠিত রিভ্যু কনসার্ট ট্যুরের ৩০টি শোজুড়ে সিনেমাটির শুটিং হয়েছিল।
১৯৮০ সালের ৬ জুন ডিলান এবং বায়েজ আবার একসঙ্গে মঞ্চে উঠলেন ক্যালিফোর্নিয়ায় ‘পিস সানডে’ কনসার্টে অংশ নিতে। এবার দুজন একসঙ্গে গাইলেন উইদ গড অন আওয়ার সাইড, আ পাইরেট লুকস অ্যাট ফোরটি, ব্লোইন ইন দ্য উইন্ড। এভাবে ভক্তদের জন্য ডিলান এবং বায়েজের যৌথ কনসার্ট সবসময়ই ছিল আকর্ষণীয়। বায়েজও এমন কনসার্টের জন্য বিভিন্ন সময় ডিলানকে অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু ডিলান খুব একটা আগ্রহ দেখাননি। ডিলানের এ মনোভাব বজায় ছিল ১৯৮৪ সালে পর্যন্ত। ধারণা করা হয়, এর পর টিকিট বিক্রির মন্দা দশা কাটাতে তিনি বায়েজকে একসঙ্গে ট্যুরে আমন্ত্রণ জানান। সেটা ছিল আগেই নির্দিষ্ট করা ডিলান-সান্টানা ইউরোপ ট্যুর।
বায়েজকে রাজি করাতে ট্যুরের প্রমোটার বিল গ্রাহাম অনেক অনেক প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু শেষে তিনি প্রতিশ্রুতির কিছুই রাখেননি। অন্যদিকে ডিলান-বায়েজের যৌথ কনসার্ট নিয়ে টিকিট কেটে অবশেষে হতাশ হতে হয়েছে। কারণ, আয়োজকদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের পরিপ্রেক্ষিতে বায়েজ পরবর্তীতে নিজেকে এ কনসার্ট থেকে সরিয়ে নেন।
বিল গ্রাহাম বায়েজকে কথা দিয়েছিলেন যে, পুরো ট্যুরে তিনি ডিলানের সমান গুরুত্ব পাবেন এবং প্রতিটি শোতে তাদের একটা করে ডুয়েট থাকবে। কিন্তু কনসার্টের পোস্টারে বায়েজকে কেবল ‘বিশেষ অতিথি’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো। মূল শিল্পী হিসেবে থাকল ডিলান আর সান্টানার নাম। তাকে ব্যবহার করা হয়েছে এটা বুঝতে পেরে ক্রুদ্ধ বায়েজ ট্যুরের অর্ধেক পথেই ফিরে যান। গ্রাহাম অনেক মিনতি জানালেও কোনো কাজ হয়নি। বায়েজের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল। ১৯৮৮ সালে নিজের আত্মজীবনী ‘অ্যান্ড আ ভয়েজ টু সিং উইদ’-এ বায়েজ লেখেন, ‘শেষমেশ আমাকে জরিমানা গুনতে হয়, আমি জানতাম এমনটা দিতে হবে। কিন্তু এক মাসের বেশি সময় ধরে আমার অহং এবং আত্মাকে যে আঘাত করা হয়েছে, তার তুলনায় এ জরিমানার অর্থ একেবারেই তুচ্ছ।’
জীবনজুড়ে বহুবার অম্ল-মধুর পরিস্থিতি তৈরি হওয়া এবং আত্মজীবনীতে নিজের উষ্মা প্রকাশ করলেও আজো ডিলান এবং বায়েজ দুজন একে অন্যের প্রতি আন্তরিক। ডিলানের নোবেল প্রাপ্তির পর বায়েজের মন্তব্যই তার প্রমাণ। অন্যদিকে সম্পর্ক ভাঙার ৪৪ বছর পর ২০০৯ সালে নিজের সে সময়ের আচরণের জন্য ডিলান প্রকাশ্যে বায়েজের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। জোন বায়েজকে নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র জোন বায়েজ: হাউ সুইট দ্য সাউন্ড-এর ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার অনুষ্ঠানে ডিলান বলেন, ‘সে ঘটনার জন্য নিজের কাছে অনেক খারাপ লাগে। আমাদের সম্পর্ক শেষ হতে দেখে আমার খুব কষ্ট লেগেছিল।’ টরন্টো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে এ প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়েছিল। স্বল্পভাষী ডিলান এ প্রামাণ্যচিত্রে দেয়া সাক্ষাৎকারে বায়েজকে ‘জোনি’ নামে সম্বোধন এবং তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। প্রামাণ্যচিত্রটি পরিচালনা করেছেন ম্যারি হোয়ারটন। সামাজিক সংকটে বায়েজের সাড়া দেয়া ও দায়বদ্ধতাকে ডিলান প্রশংসা করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি নাগরিক অধিকারের দাবিতে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের সঙ্গে বায়েজের মার্চ এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতা করে জেল খাটার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। অন্যদিকে বায়েজ বলেছেন, তিনি ডিলানকে কতটা ভালোবাসতেন, ‘আমি তার জন্য পাগল ছিলাম। আমরা দুজন মিলে এক প্রাণ ছিলাম এবং সময়গুলো দারুণ কেটে যাচ্ছিল।’ একই সঙ্গে বায়েজ এটাও বলেছেন যে, হয়তো তার কারণেই ডিলান দূরে সরে গেছেন, কারণ তিনি তার আগ্রহের সব সামাজিক ইস্যুতেই ডিলানকে জোর করে টেনে আনছিলেন। ‘আমি তাকে একটা নির্দিষ্ট আকৃতিতে আনতে চেষ্টা করছিলাম।’
ডিলান ১৯৬৫ সালে বায়েজের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর সে বছরের নভেম্বরেই বিয়ে করেন সারা লোন্ডসকে। সারা ছিলেন ফ্যাশন মডেল, তিনি প্লেবয় ম্যাগাজিনেরও মডেল ছিলেন। এছাড়া মঞ্চে অভিনয় করেছেন।
বব ডিলানের ট্যুর ম্যানেজার ভিক্টর মেমুডজ তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন তিনি জোন বায়েজকে বিয়ে করলেন না। ডিলানের জবাব ছিল, ‘কারণ, আমি যখন চাইব, তখনই সারাকে বাসায় পাব। তাকে যখন বলব, তখনই সে বাসায় থাকবে। আমি যা করতে বলব, সে তা-ই করবে। কিন্তু আমি চাইলেই জোন সে সময় বাসায় থাকবে না।’
মেমুডজ মনে করেন, ডিলান আসলে বায়েজের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আগ্রহী ছিলেন না। ‘বব যদি রাজা হয়, জোনও তাহলে রানী ছিল। এবং বব কোনো রানীকে চাননি। সে একেবারে সাধারণ কাউকে চাইছিল।’ কিন্তু সারার সঙ্গেও ডিলানের বৈবাহিক জীবন সুখের হয়নি। ১৯৭৭ সালের জুনে এ দম্পতির আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ ঘটে। বিয়ের পর সারা ধীরে ধীরে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিলেন। ববের জমকালো এবং আলোচিত উপস্থিতির পাশে সারা আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগছিলেন। আর সারার ওপর ডিলান এক রকমের আধিপত্যবাদী আচরণ করতেন, যা হয়তো সারাকে আরো বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। ভিক্টর মেমুডজ লিখেছেন, সারা লস অ্যাঞ্জেলেসে কারো সঙ্গে কথা বলতে পারতেন না, ‘কারণ বব মাফিয়ার মতো সারার আশপাশের সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইতেন। আমার মনে হয় শেষ পর্যন্ত এটা ববের নিজের জন্য পরাজয় নিয়ে এসেছে।’ ডিলান ও সারার সংসার যখন ভাঙল, তখন এই দম্পতির ঘরে এসেছে চার সন্তান, যার মধ্যে আছেন সংগীতশিল্পী জ্যাকব ডিলান। বিবাহ বিচ্ছেদের প্রেক্ষিতে সারা ডিলানের কাছ থেকে ৩৬ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ এবং তাদের বৈবাহিক জীবনে ডিলানের লেখা গানগুলোর অর্ধেক রয়ালটিও পেয়েছিলেন। তার পরও ভিক্টর মেমুডজ বলেছেন, ‘শেষমেশ সারা অনেক অর্থ পেয়েছেন, কিন্তু এজন্য তাকে কত বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে, তা কেবল আমিই জানি।’
ডিলান তার জীবনে বহু নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন। এসব সম্পর্কের কারণে তার বৈবাহিক জীবনে অনেক টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছিল বলে অভিযোগও রয়েছে। ডিলান তার অনেক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যাকআপ শিল্পীদের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। এদের মধ্যে ক্যারোলিন ডেনিসকে তিনি ১৯৮৬ সালে বিয়ে করেন। এছাড়া ক্লেডি কিংয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। ক্যারোলিনের সঙ্গে ডিলানের বিচ্ছেদ ঘটে ১৯৯২ সালে। অবশ্য এই বিয়ের কথা শুরুতে বেশ কয়েক বছর তারা প্রকাশ করেননি। বিয়ের ছয় মাস আগে এই দম্পতির এক কন্যাসন্তান ডেজিরি গ্যাব্রিয়েলে ডেনিস ডিলান ভূমিষ্ঠ হলেও তার পরিচয় ২০০১ সাল পর্যন্ত গোপন ছিল। ডিলান ও ক্যারোলিনের পারস্পরিক সম্মতিতেই তাদের এ সন্তানের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছিল। সন্তানের মঙ্গলের জন্যই তারা এমনটা করেছিলেন। এবং দুজনে আরো একমত হয়েছিলেন যে, তাদের সন্তান চাইলে তার ইচ্ছেমতো বাবা বা মায়ের নাম নিতে পারবে। ১৯৯৯ সালে তাদের কন্যা পিতার নাম গ্রহণ করেন। বিয়ের পর ডিলান ও ক্যারোলিন কখনো একসঙ্গে কোনো অনুষ্ঠানে ছবি তোলেননি এবং ক্যারোলিন লস অ্যাঞ্জেলেসের এক শহরতলিতে বসবাস শুরু করেন। ডিলান কালেভাদ্রে সেখানে যেতেন।
ডিলানের সম্পর্কের শুরুটা কিন্তু জোন বায়েজের সঙ্গে নয়, তিনি প্রথম সিরিয়াস সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন শিল্পী সুজে রোটোলোর সঙ্গে। তরুণ শিল্পী সুজে তখন তার পিতার সঙ্গে শিল্পীদের স্বর্গ বলে খ্যাত গ্রিনউইচ ভিলেজে থাকতেন। প্রথম দেখাতেই ডিলান সুজের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি তার আত্মজীবনীতে স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, ‘প্রথম দেখায় আমি তার ওপর থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না। সে আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে প্রেমময় নারী। মনে হলো হঠাত্ বাতাস যেন কলা পাতায় পূর্ণ হয়ে গেল। আমরা কথা বলতে শুরু করলাম এবং আমার মাথা ঘুরতে লাগল। কিউপিডের তীর এর আগে আমার কানে শীষ কেটে গেছে, কিন্তু এবার তা আমার বুকে বিদ্ধ হলো... তার সঙ্গে সাক্ষাত্ মানে আরব্য রজনীর গল্পে প্রবেশ করার মতো। তার হাসি জনাকীর্ণ রাস্তাকেও আলোকিত করে দিতে পারে।’ ১৯৬৩ সালের মে মাসে প্রকাশিত ডিলানের দ্বিতীয় অ্যালবামের কভারে ডিলান-সুজের একটি যুগল ছবি ব্যবহূত হয়েছিল। ১৯৬২ সালের শুরুর দিকে দুজনে একসঙ্গে বসবাস শুরু করেন। যদিও এতে সুজের পরিবারের সম্মতি ছিল না। কিন্তু ডিলান এক একটু করে বিখ্যাত হওয়া শুরু করলে সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু হয়। সুজ লিখেছেন, ‘বব ছিল ক্যারিশমাটিক, বাতিঘর, পথপ্রদর্শক। একই সঙ্গে সে একটা কৃষ্ণবিবরও। তার প্রয়োজন ছিল সমর্পিত ব্যাকআপ এবং প্রতিপালন, যা আমি নিরবচ্ছিন্নভাবে তাকে দিতে সক্ষম ছিলাম না। কারণ তখন তা আমারই দরকার ছিল। ববের সঙ্গে জড়িয়ে যে চাপ, রটনা, সত্য-মিথ্যা তৈরি হচ্ছিল, সেগুলোর সঙ্গে আমি আর মানিয়ে নিতে পারছিলাম না।’ ১৯৬২ সালে ডিলানের অমতেই সুজে পড়াশোনার জন্য ইতালি চলে যান। দুজনের সম্পর্কের মোটামুটি এখানেই ইতি ঘটে। এর পর ১৯৬৩ সালে ডিলানের জীবনে আসেন তার সবচেয়ে আলোচিত প্রেমিকা জোন বায়েজ।
সুজের কথা এবং পরবর্তীতে ডিলানের ক্যারিয়ার গড়তে বায়েজের সহযোগিতা থেকে একটা বিষয় হয়তো বলা যেতেই পারে যে, এ দুই প্রেমে ডিলান বৈষয়িক সুবিধাকেও গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সুজ যখন তাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করতে পারছিলেন না, তখন তাদের মধ্যে টানাপড়েন শুরু হয়। অন্যদিকে বায়েজের থেকে সব সুবিধা নিয়ে নিজের ক্যারিয়ারে উপরে উঠলেও একসময় ডিলান তার থেকে দূরে সরে যান। স্ত্রী হিসেবে তিনি চেয়েছিলেন একান্ত বাধ্যগত গৃহী কোনো নারীকে। নিজের এই ইচ্ছাকে তিনি ভিক্টর মেমুডজের কাছে ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে তার ক্যারিয়ারে প্রতিদ্বন্দ্বী বা সমকক্ষ হিসেবেও তিনি বায়েজকে সঙ্গে রাখতে চাননি। নিজের জীবনী নিয়ে ২০০৯ সালে আমেরিকার পাবলিক ব্রডকাস্টিং সার্ভিস প্রযোজিত প্রামাণ্যচিত্র ‘জোন বায়েজ: হাউ সুইট দ্য সাউন্ড’-এ বায়েজ বলেছেন তিনি ডিলানের জন্য পাগল ছিলেন। একই সঙ্গে এটাও বলেছেন যে, প্রকাশ্যে রাজনৈতিক অবস্থান নেয়ার যে আহ্বান তিনি ডিলানকে জানিয়েছিলেন, সেটা তিনি গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। রাজনীতি এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ছিল বায়েজের জীবনদর্শন। তাই ডিলানকেও তিনি সেদিকেই টানতে চাইছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশেষত ভিয়েতনাম যুদ্ধ পরিস্থিতি যখন ঘোলাটে হয়ে উঠছিল, ডিলান তখন তার ক্যারিয়ার গড়াকেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বেছে নেন।
১৯৭২ সালে ‘টু ববি’ গানের মাধ্যমে বায়েজ যখন ডিলানকে রাজনৈতিক বিষয়ে অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানালেন, সেটা ডিলানের পছন্দ হয়নি। এককথায় তিনি বিরক্ত হয়েছিলেন। ২০০৪ সালে নিজের আত্মজীবনীতে ডিলান লিখেছেন, ‘আমাকে সে আহ্বান জানাচ্ছিল যেন আমি দায়িত্ব নিই, মিছিলের নেতৃত্ব দিই, মানুষের জন্য ওকালতি করি, লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিই। গানটা যখন রেডিওতে বাজছিল, তখন মনে হচ্ছিল আমার প্রতি কোনো পাবলিক সার্ভিস ঘোষণা পাঠ করা হচ্ছে।’
এর তিন বছর পর ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক আহ্বান ছেড়ে বায়েজ তার ডিলানকে নিয়ে দারুণ রোমান্টিক এক গান গাইলেন। ডিলানের প্রতি তার বিরহ নিয়ে লেখা গানটি শ্রোতাদের মধ্যেও দারুণ সাড়া ফেলেছিল। ডিলানও কী কিছুটা কম্পন অনুভব করেছিলেন? কে জানে! কারণ, সে বছরই ডিলান তার রোলিং থান্ডার রিভ্যু ট্যুরে বায়েজকে আমন্ত্রণ জানান।
অ্যাবাউট এন্টারটেইনমেন্ট, রোলিং স্টোন, বিবিসি অবলম্বনে






