যদিও সুলতানা রাজিয়া কিংবা রাজিয়া সুলতানা নামেই টেক্সট বই ৮০০ বছর আগের প্রথম ভারতীয় মুসলিম নারী সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে তিনি কখনো সুলতানা নন এবং হতেও চাননি। ঐতিহাসিকদের ভাষ্য, রাজিয়া মনে করতেন এবং সঠিকভাবেই তা মনে করতেন যে সুলতানা হচ্ছেন সুলতানের স্ত্রী কিংবা হেরেমের সুলতান-পছন্দ নারীদের উত্তম একজন। তিনি তা নন, তিনিই সুলতান। তার নামে বাজারে চালু মুদ্রায় লেখা হয়েছে রাজিয়া, আল-সুলতান আল-মোয়াজ্জেম অর্থাৎ রাজিয়া, মহান সুলতান। কোনো কোনো মুদ্রায় নিজের নামের উপরে বাবার নামও খোদিত হয়েছে। সেখানে ইলতুতমিশকে বলা হয়েছে আল-সুলতান আল-আজম অর্থাৎ মহত্তম সুলতান। রাজিয়া নিজের নাম ও খেতাবের সাথে বিনতে সুলতান যোগ করতেন, অর্থাৎ সুলতানের কন্যা।

রাজিয়া নিহত হওয়ার প্রায় ৭৫ বছর পর বিখ্যাত কবি ও ঐতিহাসিক আমির খুসরো লিখেছেন:

মাসের পর মাস ধরে তার মুখ অবগুণ্ঠনে

ঢাকা পড়েছিল

পর্দার আড়ালে যে বিদ্যুচ্চমক তরবারি থেকে

সে তরবারি তার

যেহেতু তরবারি তখন খাপে আবদ্ধ

বিদ্রোহীদের অনেকের ওপর তার নজর ছিল না।

রাজকীয় এক হেঁচকা টানে ঘোমটা ও নেকাব

তিনি ছিঁড়ে ফেললেন

পর্দার পেছন থেকে দেখলেন তার মুখ-সূর্য

সিংহী দেখল তার শৌর্য

আর সাহসী পুরুষেরা সব তার সামনে

মাথা নোয়াল।

 

ভারতে দাস রাজবংশ ১২০৬-৯০

ভারত শাসক মোহাম্মদ ঘোরি ১২০৬ সালে নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে তার বিশ্বস্ত সেনাপতিরা তার সাম্রাজ্য ভাগাভাগি করে নিজেদের অধিকারে নিয়ে নেন। ক্রীতদাস থেকে মুক্ত হয়ে সেনাপতি পর্যন্ত উত্তীর্ণ হওয়া তুর্কি মামলুক বংশোদ্ভূত কুতুবুদ্দিন আইবেক মোহাম্মদ ঘোরির প্রিয়ভাজন ছিলেন। কুতুবুদ্দিন আইবেকই দিল্লি সালতানাতে মামলুক রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা, ১২০৬-১০ পর্যন্ত তিনি ক্ষমতাসীন ছিলেন। ১২১০ সালে পলো খেলার সময় ঘোড়ার ওপর থেকে পড়ে গিয়ে তার মৃত্যু হলে তার অযোগ্য পুত্র আরাম খান ক্ষমতাসীন হলেও তা ধরে রাখতে পারলেন না। কুতুবুদ্দিন আইবেকের নিজের কেনা দাস শামসুদ্দিন ইলতুতমিশ নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আরাম খানকে ক্ষমতাচ্যুত করেন এবং ১২১১-৩৬ পর্যন্ত অত্যন্ত সাফল্যের সাথে দিল্লি সালতানাতে রাজত্ব করেন। কুতুব মিনার তার শাসনামলেই নির্মিত। কুতুবুদ্দিন আইবেকের কন্যাই ইলতুতমিশের স্ত্রী। এ দম্পতির কন্যা রাজিয়া ভারতের প্রথম মুসলিম নারী শাসক, তার শাসনকাল ১২৩৬-৪০। দাস রাজবংশের শেষ সফল শাসক গিয়াসউদ্দিন বলবন ১২৬৬-৮৬ পর্যন্ত শাসন করেন, তার পরই দাসরা দুর্বল হয়ে পড়ে, ১২৯০ সালে জালালউদ্দিন খিলজি রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন।

এ নিবন্ধে কেবল রাজিয়ার ক্ষমতারোহণ ও পতন আলোচিত হয়েছে।

রাজিয়ার জন্ম ও শৈশব

গঙ্গা নদীর ধারে উত্তর প্রদেশের বুদাউন শহর ১২১০-১৪ সাল পর্যন্ত সুলতান ইলতুতমিশের শাসনামলে দিল্লি সালতানাতের রাজধানী ছিল। সুলতান ইলতুতমিশের ক্ষমতাসীন হওয়ার ছয় বছর আগে ১২০৫ সালে এখানেই রাজিয়া আল-দিন জন্মগ্রহণ করেন।

ইলতুতমিশের পুত্র তিনজন। সুলতান তার মেয়ে ও ছেলেদের একই ধরনের প্রশাসনিক ও সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। আর দশজন নারীর মতো সুলতানা কখনো হেরেমমুখী হননি, ফলে সেখানকার বিষণ্ন সংস্কৃতির সাথে পরিচয় ঘটেনি; বরং সুলতান রাজকার্যে সহায়তা করার জন্য তাকে নিজের সাথেই রাখতেন। মেয়ের আগ্রহ, সমস্যা সমাধানে পারঙ্গমতা এবং নারীসুলভ জড়তা থেকে মুক্তি তাকে আকৃষ্ট করে এবং তিনি মেয়েকে নিজের মতো করে শেখার সুযোগ দেন।

সুলতান ইলতুতমিশের প্রথম পুত্র নাসিরউদ্দিন মাহমুদের অকালমৃত্যু হওয়ায় তিনি রাজিয়াকেই তার উত্তরাধিকারী মনোনীত করায় সৃষ্ট অসন্তোষ মোকাবেলা করতে ইলতুতমিশ বলেছিলেন, ‘নিজামুল মুলক, আপনি ভুলে গেছেন যে আপনিও নারীর গর্ভজাত। ইসলামে নারীর অবস্থান এতই উপরে যে আমাদের মহানবী (সা.) বলেছেন নারীর পায়ের তলায় বেহেশত।’ কাজেই ইসলামের দোহাই দিয়ে যারা তার মনোনয়ন খারিজ করাতে চেয়েছেন তারা কিছুটা বেকায়দায় পড়লেন।

তিনি আরো বলেছিলেন: আমি নারী বিবেচনায় তাকে মনোনীত করছি না। তাকে পছন্দ করার কারণ সে একাই রাষ্ট্রের সব বিষয় সামাল দিতে পারবে এবং সাম্রাজ্যকে ধরে রাখতে পারবে। আমার দুই পুত্রের মতো সে তার জীবন স্বচ্ছন্দ ও আরামে ডুবিয়ে দেয়নি। তার চরিত্র নিষ্কলঙ্ক, তার আচরণ অনুকরণীয়; কথনে ও লিখনে সে গৗরবময় কৃতিত্বের অধিকারী: আরবি ভাষার ওপর তার দখল রয়েছে। কোরআন এবং মহানবী (সা.)-এর শিক্ষায় সে শিক্ষিত...রাজিয়া আমার চোখের জ্যোতি। আমি চাই সে আমার সাম্রাজ্যের আলো হয়ে জ্বলুক।’

কিন্তু রাজিয়ার নারী হওয়াটাই প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রক্ষমতায় বসার মূল নির্ধারক লিঙ্গ। যখন কোনো বিকল্প না থাকে কেবল তখনই নারীকে সাময়িকভাবে বসানো যায়। একজন আমির সুলতানকে বলেন, ‘আপনার রাজিয়া পুরুষ হলে আমাদের কোনো আপত্তি থাকত না; আমরা জানি তার সব যোগ্যতাই আছে, কিন্তু সে সঠিক লিঙ্গের মানুষ নয়; শাসন কেবল পুরুষের বিষয়।’

রাজিয়া কিংবা যেকোনো নারীর বেলায় লিঙ্গ হয়ে দাঁড়াল প্রাকৃতিক বাধা। নিজামুল মুলক সুলতানকে বললেন:

আপনার কন্যা অত্যন্ত জ্ঞানবতী শাসক হিসেবে হয়তো আবির্ভূত হতে পারেন, কিন্তু এই বিদেশে (শাসকরা বহিরাগত) আমরা বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্য মেনে বেড়ে উঠছি। নারীর ইচ্ছের কাছে আমাদের সমর্পিত হতে সমস্যা হবে...রাষ্ট্রের বিষয় ভিন্ন ধরনের। আমি বিনীতভাবে বলছি একজন নারীর পক্ষে এ ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়, নারী গৃহের জন্য। নারীর অনেক ধরনের প্রতিবন্ধকতা থাকে—আমাদের নিয়ন্ত্রণ করা তার পক্ষে সম্ভব হবে না।’

রাজিয়ার সিংহাসন

জয় হলো আমিরদের। ৩০ এপ্রিল ১২৩৬ দূরদর্শী বিচক্ষণ ও সুশাসক সুলতান সামসুদ্দিন ইলতুতমিশের মৃত্যু হলে তারা সুলতানের পুত্র রুকনুদ্দিন ফিরোজকে নতুন সুলতান হিসেবে অভিষিক্ত করলেন।

অযোগ্য সুরাসক্ত খামখেয়ালিপূর্ণ সুলতান মজে রইলেন তার নিজস্ব ভোগে। ক্ষমতা খাটালেন তার মা, রাজিয়ার সৎ মা শাহ তুরকান। তিনি স্বৈরাচারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন, আমিররা ও সুলতান ইলতুতমিশের সময়কার সম্মানিত বিশিষ্টজন তার নির্দেশে অপদস্ত হতে থাকলেন। ফলে বিদ্রোহ শুরু হলো। এমনকি এক ধর্মীয় প্রার্থনা সভায় রাজিয়া বিদ্রোহে যোগ দিতে জনগণকে আহ্বান জানালেন। শাহ তুরকান রাজিয়াকে হত্যার পরিকল্পনা করলেন। রাজিয়াকে ক্ষমতাসীন করার ঘোর বিরোধী আমিরুল মুলক নিজেও যোগ দিলেন বিদ্রোহীদের দলে। জনতা রাজপ্রাসাদ আক্রামণ করল, ক্ষমতাধর শাহ তুরকান ও তার অযোগ্য পুত্রকে গ্রেফতার করা হলো। নভেম্বর ১২৩৬ তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

রাজিয়া ক্ষমতাসীন হন। তিনি সুলতানা হতে চাননি, চেয়েছেন সুলতান হতে। তাই হয়েছেন।

তার শাসনকাল ভারতবর্ষের জন্য গৌরবের, যেকোনো নারীর জন্য গৌরবের। তার প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়ে পৃথক প্রবন্ধ রচিত হতে পারে। শাসক হিসেবে তিনি গণমানুষের কাছে পৌঁছেছেন, রণাঙ্গনের নেতৃত্ব দিয়েছেন দক্ষ সেনাপতির মতোই। তার নামে মুদ্রা প্রচলিত হয়েছে। জনগণের কল্যাণ হয়েছে, সমৃদ্ধি ঘটেছে। কস্তাসীন হয়ে তিনি জনতার উদ্দেশে বলেন:

আমি আল্লাহর নামে আপনাদের সামনে কসম করে বলছি, আমি আপনাদের বিশ্বাসের যোগ্য হয়ে উঠব। যেহেতু আমি নারী হয়ে জন্মেছি, আমি আমার সব আমির, সৈন্যসামন্ত ও জনগণের সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হচ্ছি, আমি যদি পুরুষের চেয়ে অধিকতর যোগ্য হই তবেই কেবল আমি আমার পূর্বপুরুষের এ সিংহাসন ধরে রাখার যোগ্য হব, যদি ব্যর্থ হই শপথ নিয়ে বলছি, আমার মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবেন এবং যাকে এ সিংহাসনে সম্মানিত আসনে বসার উপযুক্ত মনে করবেন, তাকেই বসাবেন।

রাজিয়ার শেষ অধ্যায়

দিল্লি সালতানাতের যারা অভিজাত এমনিতেই তারা দ্বিধাবিভক্ত, নারীর জন্য হোক কি পুরুষের জন্য রাষ্ট্রক্ষমতায় নিঃস্বার্থভাবে কাউকে দেখতে তারা তৈরি নন। দিল্লিবাসীকে সঙ্গে নিয়ে রাজিয়ার অভ্যুত্থান যারা সমর্থন করেছিলেন তাদের প্রত্যাশা ছিল এই নারী তাদের কথা শুনবেন, তাদের যথেষ্ট গুরুত্ব দেবেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি প্রকৃত সুলতানের কর্তৃত্ব জাহির করে স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হলেন। তিনি যে নারী এবং নারী বলেই তাকে অভিজাতদের পরামর্শ মানতে হবে, তিনি তা শুনতেও চাইলেন না। এই বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অধিকাংশেরই তার বাবা সুলতান ইলতুতমিশের সাথে ওঠাবসা ছিল। তারা চাইলেন না মুদ্রায় রাজিয়ার নাম মুদ্রিত হোক, তিনি মুদ্রায় তার নাম খোদাই করার নির্দেশ দিলেন এবং এ মুদ্রা নিত্যকার কাজে তাদের হাতে যতই আসছে তারা ক্ষিপ্ত হচ্ছেন। ঐতিহাসিক ইসামি লিখেছেন, প্রথম দিকে তার সিংহাসন পর্দা দিয়ে সভাষদ ও জনগণের কাছ থেকে পৃথক রাখা হতো এবং তিনি নারী দেহরক্ষী পরিবেষ্টিত অবস্থায় থাকতেন। কিন্তু তিনি পরে পর্দা তুলে দেন। ঐতিহ্যবাহী পুরুষ-পোশাক পরতে শুরু করেন, মাথায় শিরস্ত্রাণ স্থাপন করেন, হাতিতে চড়ে নগর প্রদক্ষিণ করেন এবং নেকাববিহীন অবস্থায় নাগরিকদের সাথে আলোচনা করতে শুরু করেন। তার বিরুদ্ধে অমুসলিম নারীসুলভ আচরণের প্রচারণা চালাতে থাকে তার বিরোধী মহল।

তিনি তার বিবেচনায় ভারসাম্য সৃষ্টি করার জন্য অতুর্কি ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসালে তুর্কি অভিজাতরা বিক্ষুব্ধ হন। বিশেষ করে আবিসিনিয় দাস বংশোদ্ভূত জামালউদ্দিন ইয়াকুতকে কাছে টানা এবং সম্মানজনক পদে বসানোতে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হলো। রাষ্ট্রীয় আস্তাবল প্রধানের এ পদটি আগে তুর্কি কর্মকর্তার অধিকারে ছিল। ফলে এ নিয়োগ নিয়ে তুর্কিদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিল। রাজিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্কের অবৈধতাও আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠল। ইসামি, বাদায়ুনি, ফিরিশতা, নিজামউদ্দিন ও সিরহিন্দি সকল ঐতিহাসিক রাজিয়ায় পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে হাবসি ইয়াকুতের সাথে সম্পর্ককে জড়িয়েছেন।

ঐতিহাসিক ইসামির লেখা যদিও কিছুটা নারীবিদ্বেষী, তবুও উদ্ধৃত করা প্রাসঙ্গিক হবে। তিনি বললেন, চতুর্থ বছরে এসেই সবকিছুর বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটল।

‘আমাকে বলা হলো তিনি হঠাৎ পর্দার বাইরে চলে এলেন বিসর্জন দিলেন সম্ভ্রম, আনন্দে মাতোয়ারা হলেন। একদিন তিনি পুরুষের পোশাক পরলেন, মাথায় রাজপুরুষের টুপি, দরবারের সম্মানজনক স্থান ছেড়ে বাইরে এলেন। এপর তিনি হাতির পিঠে চড়ে জনতার মাঝে চলে গেলেন। আমি শুনেছি তিনি তারপর আরো ছয় মাস দরবার চালিয়েছেন। বিখ্যাত বাদশার কন্যার মুখমণ্ডল উঁচু-নিচু সব ধরনের মানুষ দেখেছে। এক-দুই মাস পর থেকে তাদের সঙ্গ দিতেন রাষ্ট্রের কর্মকর্তারা। এভাবে ছয় মাস চলার পর উচ্চতম ব্যক্তি থেকে শুরু করে নিম্নতম সবাই তার ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে ওঠেন।

আমি জেনেছি যখন তিনি হাতির পিঠে চড়তেন ইথিওউপীয় বংশোদ্ভূত এক ক্রীতদাস তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকত। সে এক হাতে তার বাহু আঁকড়ে ধরে রেখে তাকে হাতির পিঠে চড়তে সাহায্য করত।

যখন রাষ্ট্র ও বয়স্ক বিশিষ্টজন দেখলেন এই ক্রীতদাস জনসমক্ষে দেশের সুলতানকে স্পর্শ করার স্বাধীনতা ভোগ করছে এতে কলঙ্কের সৃষ্টি হলো এবেং একজন অন্যজনকে একান্তে বলতে শুরু করল, এভাবেই শয়তানটা অন্যান্য নফরদের তুলনায় নিজেকে অধিকতর ক্ষমতাশালী করে তুলেছে। যদি সে একসময় রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে নেয় অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

কবি আমির খসরু তার কবিতার চারটি পঙিক্ততে রাজিয়ার শাসনকালের একটি উপমা টেনেছেন:

তিন বছর যখন তার হাত শক্ত ছিল

কেউ একজন তার আদেশে আঙুল তোলেনি

চতুর্থ বছর যখন তার বিষয় থেকে পাতা উল্টায়

নিয়তির কলম তার ওপর একটি রেখা টেনে দেয়।

লাহোরের গভর্নর মালিক ইজ্জাউদ্দিন তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলেন। তিনি সসৈন্যে লাহোরে যাত্রা করেন। আতঙ্কিত গভর্নর লাহোর ছেড়ে মোঙ্গলদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় পালিয়ে যান। ক্ষুব্ধ ও দৃঢ়চেতা রাজিয়া তাকে অনুসরণ করতে থাকেন এবং এক পর্যায়ে তাকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেন এবং গভর্নর পদ থেকে তাকে অপসারণ করেন।

ইলতুতমিশের কেনা তুর্কি গোলাম ইখতিয়ারুদ্দিনকে রাজিয়া ‘আমির-ই-হাজিব’ পদে নিযোগ দেন। তার পছন্দের তালিকায় আরো একজন ছিলেন ইখতিয়ারুদ্দিন আলতুনিয়া। এ দুজনই তুর্কি কর্মকর্তাদের সাথে রাজিয়াকে হটানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে পড়লেন। তার শাসনের ৩ বছর ৬ মাস ৬ দিন পার না হতেই প্রিয়জন আলতুনিয়া বিদ্রোহ করলে তিনি বিদ্রোহ দমন করতে যান। কিন্তু বুঝতে পারেননি পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেছে। তার নিকটজন যাদের মনে করেছিলেন তাদের প্রায় সবাই আলতুনিয়ার সাথে যোগ দিয়েছে। ৩ এপ্রিল ১২৪০ সেখানে তিনি অবরুদ্ধ হন। বিদ্রোহীরা তাদের অন্যতম লক্ষ্য জালালউদ্দিন ইয়াকুতকে হত্যা করে এবং রাজিয়াকে বন্দি করে আবেরহিন্দিয়া দুর্গের কারাগারে আটকে রাকে। রাজিয়ার পতন ও বন্দিত্বের সংবাদ দিল্লি পৌঁছতেই সেখানকার ক্ষমতাধর বিশিষ্টজন ইলতুতমিশের পুত্র মুইজউদ্দিন বাহরামকে সুলতান হিসেবে অভিষিক্ত করেন। একই সঙ্গে তারা নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য সুলতানের প্রায় সমপর্যায়ের ‘নায়েবে মামলাকাত’ পদ সৃষ্টি করে তাতে ইখতিয়ারুদ্দিনকে বসান। অন্যান্য পদ তারা নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নেন। কিন্তু যে আলতুনিয়ার কারণে রাজিয়ার পতন হলো এবং রাজিয়াকে কারাজীবন যাপনে বাধ্য করালেন। তারা সেই আলতুনিয়াকে কোনোভোবেই পুরস্কৃত করলেন না। এদিকে ইখতিয়ারুদ্দিনের অবাধ্যতা ও সন্দেহজনক গতিবিধি লক্ষ করে নতুন সুলতান তাকে হত্যা করেন।

বঞ্চিত আলতুনিয়া এবার কারাবন্দি রাজিয়ার সাথে আবার সন্ধি স্থাপন করে তাকে মুক্তি দেন এবং যৌথভাবে দিল্লির সুলতানাত দখল করার পরিকল্পনা করেন। ১২৪০ সালের সেপ্টেম্বরে দুজন বিয়েও করেন। দুজন আমির বঞ্চিত কিছু তুর্কি অভিজাতের সহায়তায় ও রাজপুত সৈন্য সমন্বয়ে একটি সেনাবাহিনী গঠন করে প্রতিশোধ গ্রহণ ও দিল্লি অবরোধের প্রস্তুতি নেন।

সুলতান মুইজউদ্দিন বাহরামও ত্বরিত পদক্ষেপ নিয়ে বিপুল বাহিনীসহ অগ্রসহর হন।

পর্যটক ইবনে বতুতা ঘটনার ১০০ বছর পর নারী সুলতানের বাহিনী তার ভ্রমণ বিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করার সময় অধিকতর সহানুভূতিশীল হলেও তাতে যথেষ্ট নাকটীয়তা যোগ করেন—পরবর্তীকালের ঐতিহাসিকদের মতে, অনৈতিক সম্পর্কের কথা সজোরে না বললেও ইঙ্গিত দেন। তিনি লেখেন: তীর-ধনুকে সজ্জিত হয়ে তিনি পুরুষ মানুষের মতো অশ্বারোহণ করতেন। নিজের আবিসিনীয় দাসের সাথে যোগাযোগের কারণে তিনি অভিযুক্ত হন। সেনাবাহিনী তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে বিয়ে করতে বাধ্য করাতে সক্ষম হয়। রাজিয়া শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা হারান এবং একজন আত্মীয়কে বিয়ে করেন। তিনি রাজিয়ার করুণ পরিণতির কথাও লিপিবদ্ধ করেন।

১৩ অক্টোবর ১২৪০ সুলতানের বাহিনীর কাছে রাজিয়া ও আলতুনিয়ার বাহিনী পরাজিত হয়। তারা কাইল নামক স্থানে পশ্চাদপসরণ করেন। তাদের দেহরক্ষী ও বিশ্বস্ত সৈন্যরা শিগগিরই তাদের ফেলে পালিয়ে যায়। পরদিন তারা দুজন হিন্দু জাঠ দস্যুদের হাতে নিহত হন।

আলতুনিয়াকে বিশিষ্টজন তাদের দলভুক্ত না করার কারণটি স্পষ্ট, রাজিয়ার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার সময় আলতুনিয়া তাদের বিরুদ্ধে রাজিয়াকে ক্ষমতাসীন হতে সাহায্য করেছেন।

ইবনে বতুতার বর্ণনা নিয়ে সন্দিহান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবুও তিনি যা বলছেন উদ্ধৃত করা যায়: সৈন্যরা পালিয়ে যাওয়ার পর ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত একজন চাষীর কাছে সুলতানা কিছু খাবার চাইলেন, পুরুষ বেশধারী সুলতানকে চাষী একটি রুটি দিল। রুটি খেয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লে চাষী বুঝতে পারলেন তার পোশাকের নিচে মূল্যবান অলংকার রয়েছে এবং প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন নারী। সে তার অলংকার লুট করল, তার ঘোড়া তাড়িয়ে দিল এবং হত্যা করে তাকে সেই মাঠেই সমাহিত করল। সে যখন এসব অলংকার বিক্রি করতে নিয়ে গেল, জেরার মুখে সত্য বলতে বাধ্য হলো এবং কবরটি দেখিয়ে দিল, সেখানেই তার গুণমুগ্ধ মানুষজন সমাধি নির্মাণ করল।

কিন্তু দিল্লিতে তুর্কম্যান গেটে বুলবুলিখানায় জোড়া কবরের একটি রাজিয়ার এবং একটি তার অখ্যাত বোন সাজিয়ার বলে দাবি করা হয়। কেউ মনে করেন একটি রাজিয়ার অন্যটি আলতুনিয়ার। কিন্তু কেমন করে তাদের মৃতদেহ এখানে সমাহিত হলো, তা অজ্ঞাত। অন্তত পাঁচটি স্থানের পাঁচটি কবরকে রাজিয়ার বলে দাবি করা হয়।

 

এম এ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা