রাজিয়া সুলতানের
পাশের রহস্যময়
কবরটি কার?
ইতিহাসবিদ থেকে
শুরু করে
দর্শনার্থীরা পর্যন্ত
বিভিন্ন সময়
নানা রকম
অনুমান করেছেন।
‘ওল্ড-দিল্লি-টেন
ইজি ওয়াকস’
বইটি গেনর
যৌথভাবে লিখেছেন
আরেক ইংলিশ
লেখিকা লরেন
ম্যালনকে সঙ্গে
নিয়ে; এই
গেনর বার্টনের
মতে, একটি
গাছের নিচে
বিশ্রামকালীন সময়ে
দস্যুদল কর্তৃক
নিহত হয়েছিলেন
রাজিয়া, জায়গাটি
সম্ভবত বর্তমান
হরিয়ানায়। তবে
খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ
ড. ঈশ্বরী
প্রসাদের বিবৃতি
অনুসারে, রাজিয়ার
হন্তারকরা দস্যু
ছিল না,
বরং তারা
ছিল সাধারণ
গ্রামবাসী, যারা
তার প্রতিদ্বন্দ্বী
ভাইদের অনুগ্রহ
পেতে রাজিয়া
ও তার
প্রেমিক আলতুনিয়াকে
হত্যা করে।
সেক্ষেত্রে রাজিয়া
কীভাবে হযরত
তুর্কমান বিয়াবানির
সমাধিস্তম্ভের পেছনে
করবস্থ হলেন?
কারা তার
মৃতদেহ এখানে
নিয়ে এসেছিল
আর আলতুনিয়ার
মরদেহের ক্ষেত্রেই
বা কী
ঘটেছিল?
রাজিয়াকে আসলে
মেহরুলিতে তার
পিতা সুলতান
শামসুদ্দিন ইলতুতমিশের
কবরের কাছে
সমাধিস্থ করা
উচিত ছিল।
কিন্তু গেনর
জানিয়েছেন যে
রাজিয়াকে পিতার
পাশে সমাহিত
না করার
পেছনে রয়েছে
তার প্রতিপক্ষ,
মানে তার
ভাইয়েরা, যারা
রাজিয়ার মৃত্যুর
পরও তাকে
রাজবংশের গৌরবের
ভাগ দিতে
এবং উচ্চ
ও পরাক্রমশালী
নারী হিসেবে
তিনি সাধারণ
মানুষের হূদয়ে
আসীন হয়ে
তাদের অনুভূতি
দখল করে
থাকুন, তা
তারা চাননি।
তাহলে রাজিয়ার
পাশে থাকা
অন্য কবরটি
কার? প্রচলিতভাবে
বিশ্বাস করা
হয় যে
কবরটি তার
বোন সাজিয়ার।
সেক্ষেত্রে তিনি
কীভাবে মারা
গেছেন এবং
কীভাবে তার
মৃতদেহ এখানে
নিয়ে আসা
হয়েছিল?
অনুমান করা
যায় যে
রাজিয়া ও
সাজিয়ায় সম্পর্কটি
ছিল গাঢ়
ও ঘনিষ্ঠ,
বোনদের মধ্যে
যা সহজাত।
যেহেতু বড়
বোনের প্রতি
সহানুভূতিশীল ছিলেন,
তাই সম্ভবত
তিনি ইচ্ছা
পোষণ করেছিলেন
যে তার
চিরনিদ্রার স্থানটি
যেন বোনের
পাশেই হয়।
তবে অন্য
কারণটি হতে
পারে যে
তাদের বেঁচে
যাওয়া অন্য
ভাই বাহরাম
শাহ, যিনি
কিনা পরবর্তী
সময়ে সুলতান
হয়েছিলেন, রাজিয়ার
মতোই তার
অন্য বোনটিকেও
রাজবংশের গৌরবময়
ইতিহাস থেকে
মুছে দিতে
চেয়েছিলেন, যাতে
সাধারণ জনগণ
রাজিয়ার বেদনার
কাহিনীকে একসময়
ভুলে যায়।
একটা সময়ে
যখন তুর্কমান
গেট ছিল
না কিংবা
শাহজাহানবাদের কোনো
অস্তিত্ব ছিল
না, জনহীন
প্রান্তরে একমাত্র
আবাসস্থল বলতে
হযরত বিয়াবানির
বাসস্থান, যিনি
কিনা ১২৪০
সালে রাজিয়া
যখন নিহত
হন ওই
একই বছর
মৃত্যুবরণ করেন।
রাজিয়ার পিতা
ইলতুতমিশ ওই
দরবেশের মুরিদ
ছিলেন। তাই
হয়তো রাজিয়ার
পাশাপাশি সাজিয়াকেও
এখানে সমাহিত
করা হয়।
কিন্তু সমাধি
দুটিতে কেন
কোনো শিলালিপি
নেই? এক্ষেত্রেও
সম্ভবত বাহরামের
বৈরী মনোভাব
কাজ করেছে।
কেননা তিনি
রাজিয়াকে ক্ষমতাচ্যুত
করেছিলেন অথবা
সমাধিক্ষেত্রে নারীদের
নাম না
প্রকাশের ধর্মীয়
বিধিনিষেধও এর
কারণ হতে
পারে।
এছাড়া আরো
কিছু কাল্পনিক
চিন্তাভাবনার মধ্যে
এমনও মনে
করা হয়
যে দ্বিতীয়
কবরটি সাজিয়ার
নয়, বরং
রাজিয়ার বিশ্বস্ত
কোনো সেবাদাসীর,
যিনি তার
মালকিনের জন্য
জীবন উৎসর্গ
করেছেন। তবে
আরেকটা ধারণা
হচ্ছে কবরটি
সম্ভবত তার
প্রেমিক আলতুনিয়ার,
যেহেতু তাদের
একসঙ্গে মৃত্যু
হয়, তাই
তখন তাদের
বেনামে পাশাপাশি
সমাধিস্থ করা
হয়েছিল। কিন্তু
উল্লিখিত যুক্তিগুলো
ঠিক জুতসই
নয়। প্রথানুসারে
সবচেয়ে জোরালো
যুক্তিটি হচ্ছে
অন্য সমাধিটিতে
চিরনিদ্রায় তার
বোন সাজিয়াই
শায়িত রয়েছেন,
রাজিয়ার নামের
সঙ্গেই তার
নাম উচ্চারিত
হয়।
১৯৮৮ সালে
ব্রিটিশ কূটনৈতিক
বলয়ের সঙ্গে
যুক্ত থাকাকালীন
সময়ে গেনর
বার্টন ও
লরেন ম্যালন
যখন তাদের
গ্রন্থটি প্রকাশ
করেন তারও
আগে অর্থাৎ
আজ থেকে
প্রায় ৬২
বছর আগে
ঘটনাক্রমে লেখক
যখন দিল্লিতে
এসেছিলেন তখন
তিনি কবর
দুটি সম্পর্কে
লিখেছিলেন যে
বাবা তুর্কমান
বিয়াবানির পবিত্র
মাজারের পেছনে
রয়েছে বুলবুলি
খানা, যেখানে
সুলতান ইলতুতমিশের
কন্যা প্রতাপশালী
রাজিয়া সুলতান
ও তার
ছোট বোন
সাজিয়া চিরনিদ্রায়
শায়িত রয়েছেন।
পুরাকাল ও
কিংবদন্তি রাজিয়াকে
অল্প কয়েকজন
রানীর মধ্যে
শক্তি ও
সৌন্দর্যের এমন
এক দীপ্তি
হিসেবে তুলে
ধরেছে যে
ভারতীয় ইতিহাস
তা নিয়ে
গর্ব করতে
পারে। তিনি
ছিলেন ব্রিটেনের
উপজাতীয় রানী
বোয়াডিসিয়ার মতো।
তার মতোই
রাজিয়া নিজের
সৈন্যদের নেতৃত্ব
দিয়েছেন। হাতে
তলোয়ার তুলে
নিয়েছেন। রথে
চড়েননি, বরং
ঘোড়ার পিঠে
বসে যুদ্ধ
করেছেন। পরে
১৮৫৭ সালে
‘ঝাঁসি কি
রানী’ তাকে
অনুসরণ করে
এভাবে যুদ্ধের
ময়দানে লড়েছিলেন।
এখানে বুলবুলেরা বিশ্রাম নিচ্ছে
রাজিয়া
‘সুলতানা’ হিসেবে
নয়, বরং
পরিচিত ছিলেন
‘সুলতান’ নামে।
তখকার দিনে
তার পিতার
গোঁড়া দরবারিরা
স্বেচ্ছায় এমন
একজনকে অনুসরণ
করতেন না,
যিনি পুরুষালি
আদলে নারীত্বের
প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন।
তবে রাজিয়া
তার শত্রুদের
কোনো রকম
দয়া দেখাননি,
এমনকি তার
বখে যাওয়া
সৎ ভাই
রুকনউদ্দিন ফিরোজকেও
না। মার্ক
অ্যান্টোনি যেমন
সিজারের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার
মুহূর্তের ভাষণ
প্রদানের মাধ্যমে
এ মহান
বীরের ষড়যন্ত্রকারীদের
বিরুদ্ধে রোমানদের
উসকে দিয়েছিলেন,
রাজিয়াও তেমন
দিল্লির বাসিন্দাদের
উদ্দেশ করে
তার ছোট
ভাই মুইজউদ্দিন
বাহরামের মৃত্যুর
প্রতিশোধ নেয়ার
আহ্বান জানিয়েছিলেন।
যেমনটা ঘটার
কথা ছিল
ক্রোধে উন্মত্ত
জনতা ঠিক
তা-ই
করেছিল। ফলে
রাজিয়া সিংহাসনে
অধিষ্ঠিত হন।
কিন্তু তার
তিন বছরের
রাজত্বকাল ছিল
সংক্ষিপ্ত আর
মর্মান্তিক। যদিও
তিনি তার
বিরুদ্ধে লাহোরের
শক্তিশালী গভর্নরের
বিদ্রোহে পিছু
হটে পরে
শক্ত হাতে
দমন করে
তা জয়ে
পরিণত করেছিলেন।
এর আগে
তিনি আবিসিনীয়
ইয়াকুতের সমর্থন
অর্জন করেছিলেন,
রাজিয়া তাকে
তার ব্যক্তিগত
কর্মকর্তা হিসেবে
নিয়োগ দেন।
কিন্তু ১২৪০
সালে তিনি
ও তুর্কি
আলতুনিয়া উভয়ই
পরাজিত হন
এবং একদল
বৈরীভাবাপন্ন জনতার
হাতে নিহত
হন। এটাই
জীর্ণ সমাধির
নিচে পড়ে
থাকা এক
নারীর সংক্ষিপ্ত
জীবনেতিহাস। এখানে
বসবাসরত বাসিন্দাদের
মধ্যে খুব
কমসংখ্যকই বিষয়টি
সম্পর্কে ওয়াকিবহল,
যদিও বলা
হয়ে থাকে
করনালে যে
কবরটি রয়েছে
সেটিও রাজিয়ার।
সুতরাং পুরনো
দিল্লির আড়ম্বরহীন
বুলবুলিখানায় অবরুদ্ধ
হয়ে আছেন
দুই বোন
রাজিয়া ও
সাজিয়া। ধারণা
করা হয়,
বুলবুলিখানা নামকরণটি
হয়েছে স্থানীয়ভাবেই,
মধ্যযুগীয় কোনো
রাজার পছন্দের
বুলবুলি পাখিগুলোকে
এখানে রাখা
হতো বলেই
এমন নাম।
তবে জায়গাটি
সম্পর্কে আরো
অনেক তত্ত্ব
প্রচলিত, এমনকি
কেউ কেউ
বিশ্বাসও করে
যে বুলবুলিগুলো
মূলত কোনো
পাখি ছিল
না, বরং
তারা ছিল
হারেমের বেগম।
তবে যা-ই
হোক না
কেন, বিতর্ক
সবসময় ছায়ার
মতো রাজিয়ার
সঙ্গী হয়ে
থেকেছে, জীবত্কালে
যেমন তেমনি
তার চিরপ্রশান্তির
এ জায়গাটিও
বিতর্কের দায়মুক্ত
নয়।
তাই আপনি
যদি কখনো
দিল্লির তুর্কমান
গেটের পাশ
দিয়ে হেঁটে
যান, তাহলে
পেছন দিকে
সমাহিত দুটি
বুলবুলের জন্য
দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলতে
ভুলবেন না।
কেননা এখানে
শায়িত বীরত্বপূর্ণ
আত্মাদের একজন
হলেন রাজিয়া,
অন্যজন তার
দুঃখপীড়িত বোন
সাজিয়া।
আরভি স্মিথের রচনা অবলম্বনে
রুহিনা ফেরদৌস: সাংবাদিক ও লেখক





