দিল্লিতে হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজারে আরো দুজনের সমাধি আছে। তাদের একজন নিজামউদ্দিন আউলিয়ার সরাসরি শিষ্য হজরত আমির খুসরো। অন্যজন মোগল সাম্রাজ্যের অন্যতম বিদুষী ও ক্ষমতাধর নারী জাহানারা বেগমের। শাহজাহানের কন্যা জাহানারা জীবদ্দশায় নিজের সমাধি তৈরি করেছিলেন। মোগল সাম্রাজ্যে তার পিতা শাহজাহান তৈরি করেছিলেন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মকবরা। জাহানারার মায়ের জন্য নির্মাণ হয়েছে সুদৃশ্য তাজমহল। জাহাঙ্গীর-পত্নী নূর জাহান তার পিতার জন্য নির্মাণ করেছিলেন আরেকটি সুদৃশ্য সমাধি। মোগল আমলে এ-ই ছিল রীতি। কিন্তু সেখান থেকে সরে গিয়ে শাহজাহানের শাসনামলের ‘পাদিশাহ বেগম’ (মমতাজ মহলের মৃত্যুর পর জাহানারাকেই মোগল জেনানার কর্তৃ হওয়ার পাশাপাশি এ উপাধি পান) নিজের জন্য নির্বাচন করেছিলেন একটি সাদাসিধা সমাধি, যার ওপরে আছে কেবল ঘাসের আস্তরণ। এর অন্যতম কারণ প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী হয়েও জাহানারা ছিলেন সুফিবাদের অনুসারী।
জাহানারা বেগমের জন্ম ১৬১৪ খ্রিস্টাব্দের ২৩ মার্চ। তিনি ছিলেন শাহজাহান-মমতাজের দ্বিতীয় সন্তান। তবে তাদের প্রথম সন্তানটি (হুর-উন-নিসা) তিন বছর বয়সে মারা যাওয়ায় জাহানারাই ছিলেন শাহজাহান-মমতাজের জ্যেষ্ঠ কন্যা। স্বভাবতই তার হওয়ার কথা ছিল বিলাসী ও ক্ষমতাধর এক মোগল শাহজাদি। কিন্তু তা তিনি হননি। জাহানারার ছিল একটি সূক্ষ্ম মন এবং তিনি সবকিছু সে মন দিয়ে বিচার করতেন। এছাড়া মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি দেখেছিলেন মায়ের মৃত্যু। মনের ওপর প্রভাব পড়েছিল তার। জাহানারা হয়ে উঠেছিলেন দায়িত্বশীল।
মোগল গৃহে কেবল শাহজাদাই নন, শাহজাদদিদের জন্যও থাকত উপযুক্ত শিক্ষার ব্যবস্থা। গৃহে সে শিক্ষাপর্ব জাহানারার মানস গঠন করেছিল। এক্ষেত্রে তার শিক্ষক হিসেবে সাতি-উন-নিসা খানমের নাম পাওয়া যায়। তার ভাই তালিব আমুলি ছিলেন জাহাঙ্গীরের দরবারের প্রধান কবি। এ দুই ভাইবোনের আদি নিবাস পারস্যে। সুফিবাদ তাদের মধ্যেও ছিল। এর বাইরে আপন ভাই দারা শুকোর সঙ্গে ছিল জাহানারার দারুণ বোঝাপড়া। আর কে না জানে, দারা শুকোহ ছিলেন সুফি তরিকার অনুরক্ত। নিজে তিনি সুফিদের সংস্পর্শে এসেছেন। ধর্ম বিষয়ে নানা পড়াশোনা করেছেন। রচনা করেছেন একাধিক বই। নিজের মধ্যেই কেবল এ জ্ঞান ধরে রাখেননি তিনি। ধর্ম, সুফিবাদ ও জ্ঞানের অন্যান্য বিষয় বিচরণে দারা শুকোহর সঙ্গী হয়েছিলেন তিনি। এর মধ্য দিয়েই তিনি পেয়েছিলেন সুফিবাদের খোঁজ। আকবরের রেখে যাওয়া ‘সুল-ই-কুল’ তখনো প্রভাব রাখছিল মোগল সাম্রাজ্যে। এর মধ্যে দারা শুকোহর ধর্মবিষয়ক অনুসন্ধান ও সুফিদের সঙ্গে আলোচনা জাহানারাকে টেনে এনেছিল সুফিবাদের কাছে।
দারা শুকোহ ছিলেন মিয়া মীরের ভক্ত। তবে মিয়া মীরের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল মিয়া মীরের শিষ্য মোল্লা শাহ বাদখশানীর মাধ্যমে। মিয়া মীর ছিলেন সুফিবাদের কাদিরিয়া তরিকার অন্যতম ‘পীর’। লাহোর ভ্রমণের সময় মিয়া মীরের সঙ্গে দেখা হয় দারা শুকোহর। ১৯৩৫ সালে মিয়া মীর মারা গেলে মোল্লা শাহ তার স্থলাভিষিক্ত হন। দারা শুকোহর সঙ্গে মোল্লা শাহ বাদখশানীর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। সুফিবাদের নানা বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হতো। মোল্লা শাহই জাহানারাকে সুফিবাদের দাওয়াত দেন। এরপর তাওয়াক্কুল বেগ ও দারা শুকোহর সহায়তায় সুফিবাদের সঙ্গে পরিচয় হয় জাহানারার।
জাহানারা বেগম ছিলেন বাদশাহ আকবর বা শাহজাদা দারা শুকোহর মতোই অনুসন্ধানী। মায়ের মৃত্যুর পর তার মধ্যে সে অনুসন্ধান আরো বাড়তে থাকে। মমতাজ মহলের মৃত্যুর পর শাহজাহানের জীবনে নানা ধরনের পরিবর্তন আসে। তিনি তার যাবতীয় রাজকার্য থেকে নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নেন। সে সময় জাহানারা নানা সিদ্ধান্ত নিতে শাহজাহানকে সাহায্য করেছেন। তিনি চাঁদনী চকের নকশা করেছেন। একাধিক মসজিদ তৈরি করেছেন। কিন্তু এরই মধ্যে ছিল সত্যের অনুসন্ধান। হারেম, বাদশাহী, রাজনীতির বাইরেও তিনি জীবনের পরম কোনো সত্যকে খুঁজছিলেন।
জাহানারার প্রয়োজন ছিল একজন সত্যিকারের পীরের (গুরু)। তিনি লিখেছেন, ‘আমি একজন গুরুর সন্ধানে ছিলাম, যিনি আমাকে সঠিক পথের সন্ধান দেবেন। আমি মূলত চিশতি তরিকার সাধকদের মধ্যে আমার গুরুর সন্ধান করেছি। যেখানেই আমি একজনের সম্বন্ধে শুনেছি, কাউকে না কাউকে তার সম্পর্কে অনুসন্ধানে প্রেরণ করতাম। আমি নানাজনের কাছ থেকেই নানা প্রার্থনার ধারা সম্পর্কে জেনেছি কিন্তু হজরত মিয়া মীরের নানা শিষ্যদের কাছ থেকে সংবাদ পাওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো ব্যাপারেই নিশ্চিত ছিলাম না।
আমি সবসময়ই কান খোলা রাখতাম, যেন এ ধরনের কোনো সন্তের সম্পর্কে সহজেই জানতে পারি। একজন সত্যিকারের সন্ত যদি তার শিষ্যের পোশাকের প্রান্ত স্পর্শ করেন (এভাবে শিষ্যত্ব দেয়া হতো বা আশীর্বাদের প্রথা ছিল) তাহলে তার পক্ষে সত্যের পথ খুঁজে না পাওয়া অসম্ভব। চিশতি তরিকার মধ্য থেকে কোনো গুরু লাভ করলে ভালো হতো কিন্তু তারা দুনিয়ার বিষয়-আশয়ও মানুষের থেকে দূরে থাকে বলে তাদের সন্ধান লাভ দুরূহ।’
সুফিবাদের ক্ষেত্রে জাহানারার প্রাথমিক আগ্রহ চিশতিয়া তরিকার দিকেই ছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি দারা শুকোহর সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করার মাধ্যমে কাদিরিয়া তরিকার দিকে ঝোঁকেন। তবে তার সঙ্গে মোল্লা শাহর খুব বেশি দেখা হয়নি। মাত্র দুবারই মোল্লা শাহর সান্নিধ্যে এসেছেন জাহানারা। প্রথমবার মোল্লা শাহকে দেখেছিলেন শাহজাহানের দরবারে। জাহানারার ভাষায়, ‘প্রথমবার আমি যখন গুরুকে দেখি তখন আমি ঝরোকার আড়ালে। তিনি আবার পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। তার বাণী শ্রবণ করে তার প্রতি আমার শ্রদ্ধার পরিমাণ আরো বেড়ে যায়।’
তবে কাদিরিয়া তরিকার প্রতি জাহানারার এ ভক্তির পেছনে কাজ করেছেন আরো একজন। তিনি মিয়া মীরের বোন বিবি জামাল খাতুন। এছাড়া রাবেয়া বসরীর (র.) জীবন ও জীবনের প্রভাব পড়েছিল জাহানারার ওপর। জাহানারা প্রথমে চিশতিয়া তরিকাই অনুসরণ করতেন কিন্তু পরে কাশ্মীরে মোল্লা শাহ বাদখশানীকে গুরু হিসেবে পেয়ে তিনি কাদিরিয়া তরিকাকেই বেছে নেন। জাহানারার ভাষায়, ‘আমি চিশতি তরিকার অনুসারী ছিলাম। সেখান থেকে কাদিরি তরিকায় যাওয়া উচিত হবে কিনা তা নিয়ে ছিল সংকোচ। এতে আমি কি আদৌ কিছু লাভ করব? ঠিক সে মুহূর্তে আমি নিদ্রা আর জাগরণের মধ্যম পর্যায়ে উপনীত হলাম। আমার মনে হলো সেখানে আল্লাহর নবী (সা.), তার অনুসারী ও আল্লাহর অলিদের আগমন ঘটেছে। নবীর (সা.) সঙ্গে ছিলেন তার চার সাহাবি। হজরত আখুন্দ সাহেব নবীর পায়ের কাছে মাথা রাখলেন। নবী বলে উঠলেন, ‘ও মোল্লা শাহ! তুমি তৈমুরিদের মধ্যে আলোর শিখা এনেছ।’
মোগল নারীদের মধ্যে অধ্যাত্মবাদের প্রতি আগ্রহ আরো আগে থেকেই দেখা যায়। হুমায়ূনের স্ত্রী হামিদা বানু বেগমের মধ্যে এর উপস্থিতি বেশি ছিল। তবে জাহানারা ও পররর্তী সময়ে আওরঙ্গজেবের কন্যা জেব-উন-নিসার মধ্যে কবিত্ব, অধ্যাত্ম ও সুফিবাদের প্রতি আগ্রহ স্পষ্ট। অনেক গবেষক এসব ক্ষেত্রে তাদের একাকিত্বের (কেননা আকবরের আদেশ অনুসারে তৈমুরি নারীদের বিয়ে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল) কথা বলেন, তবে জাহানারা ছিলেন সত্য অনুসন্ধানী। তিনি সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য পাওয়ারও চেষ্টা করতেন। মোল্লা শাহ তাকে ধ্যানের শিক্ষা দিয়েছিলেন।
সুফিবাদ অনুশীলন শুরুর পর থেকে জাহানারা এর মধ্যেই নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। নিজে সুফিমতের অনুসরণ করার পাশাপাশি মানুষের মধ্যেও সুফি মত ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। লিখেছেন দুটি গ্রন্থ—খাজা মুইনউদ্দিন চিশতির জীবনী ‘মুনিস-উল-আরওয়া’ ও মোল্লা শাহর জীবনী ‘রিসালা-ই-সাহিবিয়া’। তার দুটি গ্রন্থই পরবর্তী সময়ে সুফিবাদ চর্চাকারী ও ইতিহাসবিদদের নজরে আসে। ‘মুনিস-উল-আরওয়া’ তিনি লিখেছিলেন ভাই দারার ‘সফিনাত-উল-আউলিয়া’সহ আরো বেশকিছু বই থেকে তথ্য নিয়ে। আজকের দিনে মইনউদ্দিন চিশতির বহু জীবনী পাওয়া গেলেও জাহানারার সময়ে তা ছিল না। সেদিক থেকে নির্দ্বিধায় বলা যায়, বড় একটা কাজ করেছিলেন এ শাহজাদি। মূলত জাহানারা বেশকিছু ‘রিসালা’ লিখেছিলেন। সহজ করে বললে, রিসালা হলো সুফি বা অধ্যাত্মবাদের বার্তাবহ কবিতা। তার এ রিসালাগুলো সাহিত্যমানের জন্যও প্রশংসিত। এসব রিসালায় সুফি মতের বহু গভীর বার্তা আছে, পাশাপাশি আছে জাহানারার নিজের দর্শন। অর্থাৎ, তিনি সুফি মত ও নিজের জীবনে অধ্যাত্মবাদ কোন দৃষ্টিতে দেখতেন তার প্রমাণ রেখেছেন রচিত রিসালায়। এর মধ্যেই নিজেকে একজন ‘ফকির’ বলে উল্লেখ করেছেন জাহানারা।
সুফিবাদে ‘ফকিরা’ আর বাংলায় আজকে ব্যবহারিকভাবে পরিচিত ‘ফকির’ এক নয়। তবে ফকিরা বা ফকির বলতে তাকেই বোঝায়, যিনি দুনিয়াবি সব চিন্তা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। ধ্যান ও সুফিবাদ নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে তিনি ‘ফানা’র প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারেন। ‘রিসালা-ই-সাহিবিয়া’য় তিনি স্পষ্ট করে লিখেছেন, ‘যখন আমি বেঁচে থাকার সত্য বুঝলাম, জানলাম অস্তিত্বের জন্য ‘ফানা’ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সুফিবাদ বলে: মরণের আগে মরো। মৃত্যুকে সুযোগ দিয়ো না তোমাকে থামিয়ে দেয়ার। শাশ্বতের সঙ্গে লীন হতে, মৃত্যুর আগেই মরো। আমি এ পথই গ্রহণ করলাম।’
জাহানারা তার রিসালায় ধ্যান, স্রষ্টার সান্নিধ্য, পীরের প্রতি নিষ্ঠাসহ বহু বিষয় নিয়ে লিখেছেন। কথিত আছে সুফিবাদে তিনি এতটাই উঁচু মাকামে পৌঁছেছিলেন যে মোল্লা শাহ জাহানারাকেই তার উত্তরসূরি মনোনীত করার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু সুফিবাদের নীতি অনুসারে তা সম্ভব হয়নি। জাহানারার রেখে যাওয়া জুমা মসজিদ, চাঁদনী চওক, ক্যারাভানসরাই নিয়ে আলোচনা হলেও তার সুফিবাদ তুলনামূলক কম আলোচিত। ‘মুনিস-উল-আরওয়া’ পড়ে থাকে ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে। আর সাধারণভাবে জাহানারার সমাধিটিই সাক্ষ্য দেয় তার সুফিবাদের। সাদামাটা কবরে লেখা আছে,
তৃণ ছাড়া আমার কবরে কিছু রেখ না ক’ কেউ
এ ফকিরের সমাধিতে যথেষ্ট, সবুজের আচ্ছাদন।
মাহমুদুর রহমান: লেখক






