সুফিদের (সুফিয়া বা আউলিয়া) খানকাহ ও দরগাগুলো দোয়া এবং আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য বহুকাল ধরেই নারীদের জন্য উন্মুক্ত। সমাজে পুরুষতান্ত্রিক বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও অনেক নারী তাদের ক্যারিশমা ও ক্ষমতা দিয়ে নিজেদের আলাদা প্রমাণ করেছেন এবং সেগুলো তারা ব্যবহার করেছেন মানুষের কল্যাণে। মধ্যযুগের সুফি সাহিত্যে অন্যান্য ধারার পাশাপাশি মালফুজাত ও তাজকিরাতে নারীদের সম্মাননীয় হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে। এসব সাহিত্যের মধ্যে আছে হিকায়াত ও কারামাত, যা পবিত্র নারীদের সম্মানে রচিত। এর মাধ্যমে এ নারীরা জনপ্রিয় চিন্তা ও সুফি ভ্রাতৃসংঘে স্বীকৃতি পেয়েছেন। এ সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে দিল্লি সালতানাতের এমন কয়েকজন ক্যারিশম্যাটিক চরিত্রের জীবনের কিছু অধ্যায় উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হবে, যার মাধ্যমে দেখা যাবে তাদের সময়ে তাদের কীভাবে সম্মান দেয়া হতো এবং উত্তরসূরিরা কীভাবে তাদের জীবনকে উদযাপন করতেন, আহ্বান করতেন। তাদের অনেকের দরগা নশ্বর দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার শত শত বছর পরেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। সুফি ঐতিহ্যে বিশ্বাস করা হয় তাদের পীররা কখনো মৃত্যুবরণ করেন না। তারা তাদের মাজারে (কবর) শায়িত হওয়ার পরও সাধারণ মানুষের উপকারে কাজ করে যান। এ কারণেই তাদের সমাধিগুলো বিপুলসংখ্যক মানুষকে আকর্ষণ করে, বিশেষত বৃহস্পতিবার (জুমা রাত) রাতে এবং ওরসের সময়। ওরস মানে বুজুর্গ বা পীরদের মৃত্যুবার্ষিকী।
বিবি ফাতেমা শামের দরগা
নিজামউদ্দিন আউলিয়া ও চিশতি সিলসিলায় তার উত্তরসূরিদের সংশ্লিষ্ট সুফি সাহিত্যে তেরো শতকের বিবি ফাতেমা শামের আধ্যাত্মিক কেরামতির বিষয়ে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে মোগল যুগে শেখ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভি তার আখবার-উল-আখইয়ারে বিবি ফাতেমা শামের জীবনের বিশদ বিবরণী তুলে আনেন। এটি সুলতানি আমল ও তার পরবর্তী সময়ের ভারতীয় সুফিদের জীবনীভিত্তিক সেরা কাজ।
বিবি ফাতেমা শাম ছিলেন শেখ ফরিদউদ্দিন গঞ্জেশকরের (পাঞ্জাবের পাক পাতানের বাবা ফরিদ, বর্তমানে পাকিস্তানে) বোনের মতো আর তার ভাই ছিলেন দিল্লিবাসী শেখ নাজিবুদ্দিন মুতাওয়াক্কিল। আবদুল হক মুহাদ্দিস নিজামউদ্দিন আউলিয়াকে উদ্ধৃত করে বলেছেন, বিবি ফাতিমা শামের কাছে সব পুণ্যকাজের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিল গরিবদের খাওয়ানো। বিবি ফাতেমার মতে, আল্লাহর নামে কাউকে এক টুকরো রুটি আর এক গ্লাস পানি দিলে আল্লাহ যে নেকি দেবেন তা লাখ লাখ দিন রোজা রেখে, প্রার্থনা করে অর্জন করা যায় না।
বিবি ফাতেমার মাজারের অবস্থান দিল্লির লোধি সড়কে, মাজারটি আকারে ছোট কিন্তু প্রসিদ্ধ। তিনি তার আমলে (তেরো শতকে) সুফি ঘরানায় যথেষ্ট সম্মানিত ছিলেন। তার দান-খয়রাত, খ্যাতি ছিল এমন কারো মতো, যিনি মক্কায় গিয়ে হজ করেছেন, সারা জীবন ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষা করেছেন এবং একই সঙ্গে যিনি উপস্থিতভাবে কবিতা শুনিয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। তিনি নিশ্চিতভাবে ঈশ্বর প্রেমের ভণিতা করেন, একই সঙ্গে বৈষয়িক আনন্দও খুঁজে বেড়ান এমন ভণ্ডদের ঝেড়ে ফেলতে পারেন। এমন স্ববিরোধীদের কর্মকাণ্ড তিনি নিচের আলংকারিক ভাষায় প্রকাশ করেছেন—
হাম ইশক তালাব কুনি ওয়া হাম জান খোয়াহি
হার দো তালাবি ওয়ালি মুয়াসসার না-শাওয়াদ!
তুমি প্রেম খোঁজো আবার জীবনও
দুই ইচ্ছা কখনো একসঙ্গে পূরণ হবার নয়!
নিজামউদ্দিন আউলিয়া, যিনি আধ্যাত্মিকতাকে পুরুষের কাজ বলে মনে করতেন, মানে পুরুষত্বের অনুশীলন। এহেন নিজামউদ্দিন তার ব্যক্তিত্বে মোহিত হয়ে মন্তব্য করেন যে একটি সিংহ যখন তার আস্তানা থেকে বেরিয়ে আসে তখন কেউ তাকে জিজ্ঞেস করে না সে সিংহ না সিংহী!
বাবা ফরিদের মায়ের কেরামতি
ফরিদউদ্দিন গঞ্জেশকর তার শিষ্যদের জানিয়েছিলেন যে তার আধ্যাত্মিক বিদ্যার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। একবার তাদের ঘরে এক চোর ঢুকেছিল, সবাই তখন ঘুমে। শুধু তার মা জায়নামাজে ছিলেন। চোর ঘরে ঢোকামাত্র তার দৃষ্টিশক্তি চলে যায়। সে চোর ঘর থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিল না। সে হঠাৎ চিৎকার করে বলে ওঠে ঘরের সদস্যরা সবাই তার পরিবারের সদস্যের মতো। এ ঘরের কারো উপস্থিতি আমাকে অন্ধ করে দিয়েছে। আমার জন্য প্রার্থনা করুন যেন আমি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাই। আমি অনুশোচনা করছি এবং কসম কেটে বলছি জীবনে আর কখনো চুরি করব না। চোরের এ অনুশোচনা শুনে শেখের মা তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসার জন্য প্রার্থনা করলেন। দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়ে চোর গৃহত্যাগ করল। শেখের মা পুরো ঘটনার বিষয়ে নীরব থাকলেন। পরদিন সকালে সে চোর তার পুরো পরিবার নিয়ে হাজির হলো, গতরাতের ঘটনা সবার সামনে সবিস্তারে বর্ণনা করল এবং শেখের মায়ের কাছে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হলো।
বিবি জোলায়খার দোয়া
হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া মাঝে মাঝেই তার মা বিবি জোলায়খার কথা বলতেন। এ সাধু নারী তার পুরো জীবন আল্লাহর প্রার্থনায় কাটিয়েছেন। অভাবের ঘরে অনেক সময় রান্না করার মতো কিছু থাকত না। তিনি সন্তানদের বলতেন আমরা আল্লাহর মেহমান, কখনো কিছু রান্নার মিছামিছি অভিনয়ও করতেন। সে শিশু বয়সেই নিজামউদ্দিনের কাছে আল্লাহর মেহমান হওয়ার বিষয়টি ছিল বড় আনন্দ আর সন্তুষ্টির ঘটনা।
পরবর্তী জীবনে যখনই নিজামউদ্দিন কোনো বিপদে পড়েছেন, তখনই দক্ষিণ দিল্লিতে তার মায়ের সমাধিতে ছুটে গেছেন। তার দোয়ার প্রার্থনা করেছেন। সুলতান কুতুবউদ্দিন মুবারক-শাহ খিলজি বিভিন্নভাবে নিজামউদ্দিনকে হেনস্তা করেছেন। সে পরিস্থিতিতেও নিজামউদ্দিন মায়ের সমাধিতে গিয়ে তার দোয়া চেয়েছেন। সুলতানের নিকটজন খুসরো খান তাকে হত্যা করলেও নিজামউদ্দিনের বিশ্বাস ছিল এমনটা ঘটেছিল তার মায়ের অভিশাপে। সুলতানের শত্রুতার বিষয় নিয়ে যখন নিজামউদ্দিন মায়ের সমাধিতে গিয়েছিলেন, তখন তিনি সেই নিপীড়ক শাসকের হাতে নিহত হওয়ার ঝুঁকিতে ছিলেন, আর কখনো মায়ের কবরে আসা হবে কিনা তা নিয়ে তিনি শঙ্কায় ছিলেন।
বিবি আউলিয়া ও তার আধ্যাত্মিক সাধনা
আবদুল হক মুহাদ্দিস আখবার-উল-আখইয়ার গ্রন্থের যে অংশে নারী সুফিদের নিয়ে আলোচনা করেছেন সেখানে স্থান পেয়েছে দিল্লির বিবি আউলিয়ার কথাও। স্বৈরাচারী সুলতান মোহাম্মদ তুঘলক তার ভক্ত ছিলেন। তিনি তার আধ্যাত্ম সাধনার পথে যত যন্ত্রণা, সেগুলো নীরবে সয়ে গেছেন, যেমনটা করেছেন বড় বড় সুফি সাধক। গ্রন্থমতে, তিনি ৪০ দিন (চিল্লা) ভেতরের কামরায় (হুজরা) ধ্যানমগ্ন থাকতেন। এ সময় তিনি সঙ্গে ৪০টি লবঙ্গ রাখতেন। তিনি যখন ৪০ দিনের চিল্লা শেষ করে বের হতেন তখন সবাই দেখতেন তিনি অল্প কয়েকটা লবঙ্গ নিয়ে বের হয়েছেন আর বাকিগুলো তার কামরাতেই পড়ে আছে। খুব সামান্য খাওয়া বা একেবারে উপবাস সুফি তত্ত্বে উৎসাহিত করা হয়। বিবি আউলিয়া এমনটা যে সম্ভব সেটা দেখিয়ে গেছেন এবং আরো দেখিয়েছেন যে ক্ষুধাকে জয় করাটাও জরুরি।
রাবেয়া বসরি
যুগে যুগে সুফি ব্যক্তিত্বরা, তা সে পুরুষ হন কিংবা নারী—ইরাকের রাবেয়া বসরির স্মরণীয় চরিত্র দিয়ে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। আল্লাহর প্রতি তার প্রেম (ইশক-ই ইলাহি) এখনো স্মরণ করা হয়, যা সুফি পথের মৌলিক আবেশ। রাবেয়া ছিলেন সুফিদের প্রাথমিক সময়ের একজন। আল্লাহপ্রেমী সুফি কেমন হবেন তার উদাহরণ তৈরি করতে চেয়েছেন রাবেয়া। তার জীবন ঘিরে বহু কাহিনী পাওয়া যায়। মূর্তি পূজার বিরোধিতার জন্য তাকে অনেকে সম্মান করতেন আবার অনেকে ভয়ও পেতেন। তার জীবনের কাহিনীর মধ্যে একটি বিশেষভাবে জ্ঞানগর্ভ। তার জীবন নিয়ে একটা ঘটনা বেশ পরিচিত—যেখানে তিনি এক হাতে পানিভর্তি বালতি আরেক হাতে আগুন ভরা পাত্র নিয়ে ছুটছেন। পথে মানুষরা তাকে থামিয়ে যখন বিস্তারিত জানতে চাইল, তখন তিনি জবাবে বললেন, একদিকে তিনি জান্নাতে আগুন লাগিয়ে দেবেন আরেকদিকে জাহান্নামের আগুন নিভিয়ে দেবেন। তার কথা ছিল মানুষ আল্লাহর প্রার্থনা করেন হয় জাহান্নামের ভয়ে নয়তো স্বর্গের লোভে। খুব অল্প মানুষই আল্লাহকে ভালোবেসে তার প্রার্থনা করে!
রাবেয়ার এহেন কাজে রক্ষণশীল মহল নিঃসন্দেহে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন এবং তা দেখে রাবেয়ার অনেক শিষ্যের মনে ভয় ঢুকেছিল যে ইসলামের নির্দিষ্ট রীতিনীতি অবজ্ঞার জন্য আল্লাহ রাবেয়াকে শাস্তি দেবেন। কিন্তু তাদের এ আশঙ্কা শিগিগরই দূর হয়ে যায়। এক শিষ্য স্বপ্ন দেখেন যা তার ও সুফি ঘরানার অন্যদের মনে স্বস্তি নিয়ে এসেছিল। স্বপ্নটি ছিল এমন যে আল্লাহ রাবেয়ার সব ভুল, গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন শুধু একটি ঘটনার কারণে—প্রতি রাতে রাবেয়া পথের একটি কুকুরকে খেতে দিতেন।
উপসংহারে বলা যায়, এ সুফি নারীরা তাদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন সুফি আধ্যাত্মিক তরিকায় নৈতিক ও ধর্মীয় সাধনায়, যা তাদের আল্লাহর নিকটবর্তী করেছিল। তারা অনেকে বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন, পেয়েছিলেন অলৌকিক কিছু ঘটানোর ক্ষমতা, কেরামতি—এসব কারণে তারা নিজেদের কালে এবং পরবর্তী সময়ে জনপ্রিয় হয়েছেন। সুফি দরগার ধর্মীয় আবেশ মানুষকে আরো ভালো মানুষ হওয়ার পথ দেখায়, সাহায্য করে আধ্যাত্মিক ও বৈষয়িক সমস্যা সমাধান—শেখায় দয়া ও উদারতা। ধর্মের নামে যখন মানুষ অসহিষ্ণুতা, ঘৃণা আর সহিংসতা ছড়ায় তখন বিশেষত এমন শিক্ষা খুব প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ঈশ্বর সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। নারী হিসেবে কাউকে সৃষ্টি করে তিনি নিশ্চয়ই কোনো ভুল করেননি।
(লেখকের Hikaayaat-i Sufiya : Grace and Charisma in the Lives of Female Saintly Figures in the Delhi Sultanate শীর্ষক রচনার অনুবাদ)
রাজিউদ্দিন আকিল: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়। ডেইজ ইন দ্য লাইফ অব আ সুফি: হান্ড্রেড অ্যান্ড ওয়ান এনচান্টিং স্টোরিজ অব উইজডমসহ (নিউ দিল্লি, প্যান ম্যাকমিলান, ২০২০) বেশ কয়েকটি গ্রন্থের প্রণেতা






