প্রথম প্রকাশের পরই অত্যন্ত প্রভাবসঞ্চারী একটি বই এবং একটি উদ্ভাবন কুশলকাজ হিসেবে সমাদৃত হয়েছিল ট্রান্সলেটরস থ্রু হিস্ট্রি, যা একই সঙ্গে তথ্যপূর্ণ এবং খুবই পাঠযোগ্য। অনুবাদকরা যুগে যুগে, দেশে দেশে বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। উচ্চ প্রশংসিত এ গ্রন্থে বলা হয়েছে বিভিন্ন ভাষার বিকাশে, নানা সাহিত্যের আবির্ভাবে, জ্ঞান বিতরণে ও মূল্যবোধ বিস্তারে এ অনুবাদকদের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজনের অমলিন অবদানের কথা, যা হয়ে উঠেছে বিশ্বসংস্কৃতিরই একটি অনুপম কাহিনী। সে কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এ পাক্ষিক আয়োজনে পাঠকদের আমন্ত্রণ
দ্বিতীয় অধ্যায়
‘অনুবাদকরা ও জাতীয় ভাষাগুলোর বিকাশ’
(সপ্তমাংশ)
ফরাসি ভাষার বন্ধনমুক্তি (২য় পর্ব)
প্রিয় জনের পর তাঁর পুত্র পঞ্চম চার্লস বা জ্ঞানী চার্লস সিংহাসনে আরোহণ করলেন। অনুবাদকে তিনি একটি ‘রাজকীয় সাংস্কৃতিক নীতি’র অবলম্বন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেন। ‘লুভ’-এ তিনি প্রায় এক হাজার পাণ্ডুলিপিবিশিষ্ট একটি গ্রন্থাগার নির্মাণ করেন। তারপর তিনি সেগুলো অনুবাদ করার জন্য ১০ জন অনুবাদককে নিযুক্ত করেন। তাঁরা তাঁদের কাজের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে পারিতোষিক পেতেন। এ অনুবাদকদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত নিকোলাস (Nicolas, Nicole বা Nicholas) অরিসমে (আনুমানিক ১৩২০-৮২ খ্রি., Oresme) রাজার ব্যক্তিগত শিক্ষক ছিলেন। অগাধ জ্ঞানের অধিকারী অরিসমে অ্যারিস্টটল ও টলেমির রচনা অনুবাদ করেন। সেই সঙ্গে লাতিন ও ফরাসি ভাষায় বেশকিছু গবেষণা-প্রবন্ধ রচনা করেন, বিশেষ করে মুদ্রাসংক্রান্ত বিদ্যা আর জ্যোতির্বিদ্যা-বিষয়ক। গ্রিকদের জ্ঞান-বিজ্ঞান স্থানান্তরে রোমক অনুবাদকদের ভূমিকার কথা এবং এই জ্ঞান ফরাসি ভাষায় অধিগম্য করার উপকারিতার কথা তিনি তাঁর লেখায় তুলে ধরেন। কিন্তু ফরাসিকে একটি বৈজ্ঞানিক ভাষায় রূপান্তর করতে হবে। আর সেজন্য অনুবাদে টেকনিক্যাল প্রতিশব্দ ব্যবহার করতে হবে, তা সেসব বেশির ভাগ মানুষ সহজে বুঝতে না পারলেও। প্রায় সময়ে অরিসমে নিজেই এসব টেকনিক্যাল প্রতিশব্দ তৈরি করতেন। তাঁর তৈরি করা প্রায় ৪৫০ নতুন শব্দ আধুনিক ফরাসিতে এখনো বিদ্যমান, যার মাত্র কয়েকটি এখানে দেয়া হলো: aristocratie, démagogue, législation, politique, sédition এবং এমনকি langue maternelle.
অনুবাদকরা যেসব নতুন শব্দ তৈরি করেছিলেন, সেগুলোর সঙ্গে তাঁরা সেসবের ব্যাখ্যাও জুড়ে দিয়েছিলেন। কিছু লাতিন ও গ্রিক শব্দের সম্পূর্ণ অর্থ পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য তাঁরা কখনো কখনো জোড়া শব্দও ব্যবহার করেছেন। সেসবের উদাহরণ হচ্ছে: ‘le pris et la somme de rachat’ (the purchase price and cost) এবং ‘selon la manière et coustume du pays’ (according to the ways and customs of the land)। অনুবাদকরা এমনকি লেখকরাও এ কৌশলটি বহুল পরিমাণে ব্যবহার করেছেন, ষোড়শ শতকের শেষাব্দি। ফরাসি ভাষায় এখনো এটির চিহ্ন রয়ে গেছে, এমনকি ইংরেজিতেও, এই যেমন sain et sauf (safe and sound)— এ ধরনের অভিব্যক্তিতে। অনুবাদকরা কেবল শব্দেরই উদ্ভাবক ছিলেন না, তাঁরা জ্ঞানকে জনপ্রিয় করার এবং তা ফরাসি পাঠকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার কাজেও যথেষ্ট সহায়তা করেছেন।
কিন্তু একটি ভাষা কেবল সেটার শব্দভাণ্ডারেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রাচীন গ্রিক ও লাতিন লেখকদেরকে ফরাসি কণ্ঠ দান করার প্রচেষ্টায় মধ্যযুগীয় অনুবাদকরা বেশ খানিকটা আগেই তুলনামূলক ভাষাতাত্ত্বিকদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। মূল যে ভাষা থেকে অনুবাদ করা হচ্ছিল এবং যে ভাষায় তা করা হচ্ছিল, এই দুই ভাষার শৈলীগত সংস্থান তুলনা করে তাঁরা স্বদেশী ভাষার নানা ঘাটতি আবিষ্কার করলেন। আর তারপর সেসব ঘাটতি দূর করতে কোমর বেঁধে নেমে পড়লেন। তবে তাঁদের অনুবাদকর্মের সঙ্গে জুড়ে দেয়া ভূমিকায় তাঁরা কাজটির দুরূহতা নিয়ে আক্ষেপ করতেও ভোলেননি। লাতিন ভাষায় লেখা মূল রচনা থেকে স্বদেশী ভাষায় পরিষ্কার, বোধগম্য অনুবাদ তৈরির প্রধান বাধাটি ছিল শব্দভাণ্ডার সম্পৃক্ত ও আলঙ্কারিক, বাক্যগঠন-সংক্রান্ত (syntactical) নয়। চৌদ্দ শতকের অনুবাদকদের নিয়ে তাঁর গবেষণায় সের্জা লুসিগনান (Serge Lusignan) যেমনটি বলেছেন, যাঁরা লাতিন নমুনাগুলো থেকে কাজ করেছিলেন, তাঁরা অনুবাদের চেয়েও বেশি কিছু করেছেন: ফরাসি বিদ্বজ্জনোচিত লেখালেখির একটি মান তৈরি করে দিয়ে গেছেন তাঁরা। কেবল মূল পাঠ-সংক্রান্ত স্তরেই নয়, খোদ ভাষার স্তরে কাজ করতে গিয়ে নতুন নতুন কাঠামো তৈরিতে সাহায্য করেছেন তাঁরা। আর এভাবেই স্বদেশী ভাষা সেসব ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে এমন একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছিল, আগে যেটা লাতিনের জন্য সংরক্ষিত ছিল।
পঞ্চদশ শতকে আবারো অনুবাদের অবক্ষয় ঘটে। গুটিকতেক লেখা কেবল অনূদিত হয়েছিল তখন ধ্রুপদী ও মধ্যযুগীয় লাতিন থেকে। মুদ্রণযন্ত্র উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে মধ্যযুগের অবসান ঘটে, আর সেই উদ্ভাবনের ফলে এর পরের শতকে অনুবাদ অত্যন্ত লাভবান হয়। মধ্যযুগীয় অনুবাদকরা যেখানে ‘ঈশ্বরের মহিমা’ ও ‘সর্বসাধারণের মঙ্গলের’ জন্য অনুবাদকর্মে রত হয়েছিলেন, রেনেসাঁর কালে তাঁদের উত্তরসূরিদের ব্রত ছিল— দু বেলের দাবি অনুযায়ী (du Bellay)— ফরাসিকে অন্যান্য প্রসিদ্ধ ভাষার সমস্তরে উন্নীত করা।
ষোড়শ শতক ছিল প্রাণোচ্ছলতার এক কাল, যা দুটো মহৎ আন্দোলনের কারণে বিশিষ্ট হয়ে আছে: মানবতাবাদ ও রিফরমেশন বা ধর্মসংস্কার আন্দোলন। তত্ত্বজ্ঞান-অভিমানী (স্কলাস্টিক) ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে মানবতাবাদের প্রতিক্রিয়ার কারণে প্রাচীন সব ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি নতুন করে আগ্রহের সৃষ্টি হয়। আর ধর্মসংস্কার আন্দোলনও উেসর কাছে ফিরে যাওয়ার কথা বলেছে এবং এক্ষেত্রে সেটা ছিল গ্রিক ও হিব্রু ভাষায় লেখা মূল বাইবেল। তো নিত্যনতুন ধ্যান-ধারণা ও ধর্মীয় দ্বন্দ্ব-সংঘাত, আবিষ্কার ও উদ্ভাবনা আবির্ভাবের এই কালে অনুবাদ এক নতুন স্বর্ণযুগে প্রবেশ করল। কিন্তু একটি জাতীয় ভাষা ও সাহিত্যের উদ্ভবের মধ্যে দিয়েই অনুবাদ তার অপরিহার্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো। অনুবাদ আরো একবার রাজক্ষমতার সমর্থন লাভ করল। ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম ফ্রাঁসোয়া (লাতিন, গ্রিক আর হিব্রুর জন্য) Collège royal প্রতিষ্ঠা করলেন; সেটাকে Collège des Trois Langues-ও বলা হতো। ১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি বিখ্যাত ‘ভিই কোতেরে’র ফরমান (Edict of Villers Cotterêts) জারি করলেন, আর তার বলেই দাপ্তরিক নথিপত্রে ফরাসির পক্ষে লাতিনের স্থলাভিষিক্ত হওয়া সম্ভব হলো।
ক্লদ দি সিসেল (Claude de Seyssel) নামের এক অনুবাদক ১৫০৯ খ্রিস্টাব্দের দিকে রাজা দ্বাদশ লুইকে অনুরোধ করলেন যেন তিনি ফরাসি সাহিত্যের একটি সংস্থা তৈরি করেন; সেই সঙ্গে তিনি ফরাসি ভাষার সমৃদ্ধিসাধন ও প্রসারের একটি উপায় হিসেবে অনুবাদের পক্ষেও মত প্রকাশ করেন। কিন্তু কী করে সে উদ্দেশ্য সাধন করা যাবে— তা নিয়ে গোটা শতকজুড়েই দুটো বিরুদ্ধ চিন্তা-ঘরানা সক্রিয় ছিল। ক্লিমা মারোর (Clément Marot) অনুসারী রাজদরবারের কিছু কবি ও অনুবাদকের একটি দল তাঁদের ভাষার সমৃদ্ধি সাধনের পক্ষে অনুবাদকে একটি চমত্কার শৈলীগত চর্চা বলে মনে করতেন। থমাস সিবিয়ে (Thomas Sebillet) নামের এক হেলেনিস্ট পণ্ডিত ১৫৪৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত তাঁর L’Art poétique গ্রন্থে এ অবস্থান গ্রহণ করেন। হোরেস তাঁর Ars poetica-তে যেমন বলেছিলেন, তিনিও সে রকম version বা অনুবাদকে একটি সাহিত্যিক genre বা ধরন এবং অলঙ্কারশাস্ত্রের একটি শাখা বলে গণ্য করতেন। রনসার্ডের (Ronsard) নেতৃত্বাধীন মানবতাবাদী কিছু কবির একটি দল ‘প্লেয়াদি’ (Pléiade) তাঁদের এ মতের অনুসারী ছিল না। দলটি মনে করত সাহিত্য ও ভাষা দুটোর জন্যই অনুবাদ বিপজ্জনক। দলটি জোয়াকিম দু বেলের (Joachim du Bellay, ১৫২২-৬০) কাছে অনুরোধ করলেন, তিনি যেন সিবিয়েকে একটা জবাব দেন। আর তারই ফল ১৫৪৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত তাঁর গ্রন্থ La Deffence et illustration de la Langue Francoyse, যা ছিল ‘অনুবাদের বিরুদ্ধে যাবতীয় যুক্তির সংকলন’। দু বেলে বললেন, সেরা গ্রিক ও লাতিন লেখকদের অনুবাদের পরিবর্তে তাঁদের ‘অনুকরণের’ মাধ্যমে ভাষাকে উন্নত করতে হবে। তিনি বললেন, গ্রেকো-লাতিন মূলকে ভিত্তি করে নতুন নতুন শব্দ তৈরি করতে হবে। এছাড়া আঞ্চলিক উপভাষা থেকে, কারুশিল্পীদের শব্দভাণ্ডার থেকে শব্দ নিয়ে আসতে হবে। তিনি মনে করতেন না যে, শৈলী ও বাকপটুতা অনুবাদ থেকে শেখা যায়। বিদ্যাবত্তার দোহাই দিয়ে বিদেশী ভাষা থেকে অত্যধিক শব্দ গ্রহণ এরই মধ্যে নিন্দনীয় বলে মনে করা হচ্ছিল। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, র্যাবেলে (Rabelais) এরই মধ্যে ‘বহুল ব্যবহূত এবং সেকেলে লাতিন শব্দের ফেরিওয়ালাদের’ নিয়ে বেশ ঠাট্টা-মশকরা করেছিলেন। এদিকে এতিন দোলে (Étienne Dolet, ১৫০৮-৪৬) অনুবাদ নিয়ে রচিত তাঁর গবেষণা প্রবন্ধের চতুর্থ বিধিতে অনুবাদকদের এই বলে সতর্ক করে দিলেন যে, তাঁরা যেন সেই সব শব্দ ব্যবহার না করেন, যেগুলোর সঙ্গে লাতিনের সাদৃশ্য খুব বেশি বা যেসব শব্দ অতীতে তেমন একটা ব্যবহার হয়নি। ষোড়শ শতকের শেষ দিকে ভাষাতাত্ত্বিক, মানবতাবাদী ও মুদ্রক অঁরি এ(স)তিয়েন (Henri Estienne, ১৫৩১-৯৮) ‘নব্য, ইতালীয়কৃত ফরাসি ভাষার’ বিরুদ্ধে একটি অভিযোগপত্র প্রকাশ করেন।
ক্রমশ...






