তারা টিপু
সুলতানের বংশধর।
ইনায়েত খানের
প্রপিতামহের পিতামহ
ছিলেন টিপু
সুলতান। অষ্টাদশ
শতাব্দীতে টিপু
সুলতান ব্রিটিশদের
বিরুদ্ধে দৃঢ়
প্রতিরোধ গড়ে
তুলেছিলেন। খানদের
ফ্যামিলি ট্রিতে
টিপুর থাকার
বিষয়টি যেন
ভিয়েতনামিদের হো
চি মিন
কিংবা আমেরিকানদের
প্যাট্রিক হেনরির
মতো। কৌতূহলোদ্দীপক
ব্যাপার হলো
টিপু ও
আমেরিকানরা প্রায়
একই সময়ে
ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে
লড়াই করেছেন;
আমেরিকানরা তাদের
স্বাধীনতা, টিপু
তার মুক্তির
জন্য। গোলার্ধের
দুই ভিন্ন
প্রান্তে অবস্থান
করলেও উভয়ই
উভয়কে মিত্ররূপে
গ্রহণ করেছিল।
আমেরিকার কন্টিনেন্টাল
কংগ্রেসকে কিছু
অর্থসহ একটি
চিঠি পাঠিয়েছিলেন
টিপু, যেখানে
তিনি লিখেছিলেন,
‘আমেরিকার
স্বাধীনতার জন্য
বিশ্বজুড়ে প্রত্যেকটি
আঘাতের জন্য...যতদিন
একজন দুর্বিনীত,
বর্বর স্বৈরাচার
থাকবে ততদিন
সংগ্রাম চলবে।’
টিপুর এ
চিঠি বেঞ্জামিন
ফ্যাংকলিনকে স্পর্শ
করেছিল, তিনি
টিপুকে স্বাধীনতার
একটি ঘোষণা
পাঠিয়েছিলেন। আমেরিকানরা
তাদের লড়াইয়ে
জিতেছিল, কিন্তু
টিপু হেরে
যান। সামরিক
মোকাবেলায় টিপু
ইংরেজদের সম্মান
আদায় করে
নিতে পারলেও
তাদের হারাতে
পারেননি।
ইনায়েত খানের
জন্ম ১৮৮২
সালে—এক
মুসলিম, ব্রাহ্মণ,
সন্ত ও
যোদ্ধা পরিবারে।
ইনায়েত শব্দের
অর্থ দয়া,
আর খান
মানে নেতা,
শাসক। ছোটবেলা
থেকেই তিনি
ঘুরে বেড়ানো
দরবেশদের দেখে
বিস্মিত হতেন।
একটু বড়
হয়েই তিনি
হিন্দু, বৌদ্ধ,
সুফি তত্ত্ব
নিয়ে বিস্তর
পড়াশোনা শুরু
করেন। যোগ,
ধ্যানও শুরু
করেন। পড়েন
মওলানা রুমির
কবিতা। ঘণ্টার
পর ঘণ্টা
নিমগ্ন হয়ে
থাকতেন ধর্মীয়
সংগীতে। একই
সঙ্গে শিখেছিলেন
ঐক্য, এককিত্ব
আর ক্ষমতার
পাঠ। একবার
নেপালে দেখেছিলেন
এক পাল
হাতি একটি
বাঘকে ঘিরে
ধরে কীভাবে
তাকে আত্মসমর্পণ
করিয়েছিল। সেদিন
ইনায়েত সিদ্ধান্তে
এসেছিলেন ‘ক্ষমতা
যত শক্তিশালী
হোক না
কেন ঐক্য
সেটিকে রুখে
দিতে পারে।’
আর সাধুদের
সঙ্গে ধ্যান
তাকে বুঝিয়েছিল
নীরব, শান্ত
মনের ক্ষমতা।
ধীরে ধীর
নয়, বেশ
দ্রুতই ইনায়েতকে
ঘিরে তৈরি
হলো মিথ—তিনি
সিদ্ধ পুরুষ,
সাধু, আলোকপ্রাপ্ত।
প্রকৃতপক্ষে তিনি
ছিলেন আর
দশজন জ্ঞানসাধকের
মতোই একজন।
২০ বছর
বয়সে নিজের
কাজিনকে বিয়ে
করেন ইনায়েত।
কিন্তু বিয়ের
কয়েকদিন পরই
তিনি মারা
যান। শোকে
ঘর ছেড়ে
বেরিয়ে পড়েন
ইনায়েত। দূরের
রাজ্যগুলোর মহারাজা
কিংবা প্রধানমন্ত্রীদের
জন্য গানের
আসরে যোগ
দেন। আবার
বিয়ে করলেন।
কিন্তু তার
দ্বিতীয় স্ত্রীও
বিয়ের এক
বছর পর
মারা গেলেন।
আবারো প্রবোধ
খুঁজতে শুরু
করলেন সংগীতের
সাধনা। তার
গানে মুগ্ধ
হায়দরাবাদের এক
শাহজাদা তাকে
দরবারে ডাকলেন।
সেখানে চার
বছর এক
সুফি গুরুর
কাছে শিক্ষা
নিলেন ইনায়েত।
১৯০৮ সালে
মৃত্যুর আগে
আগে সেই
সুফি গুরু
শিষ্য ইনায়েত
খানকে বলে
যান, ‘দুনিয়ার
কাছে যাও।
পূর্ব আর
পশ্চিমের মানুষের
মধ্যে সংগীত
দিয়ে ঐক্য
গড়ে তোলো।
সুফিবাদের প্রজ্ঞা
ছড়িয়ে দাও।
শিল্প এসেছে
করুণাময় ঈশ্বরের
কাছ থেকে।’
এর দুই
বছর পর
ইনায়েত, তার
দুই ভাই,
এক কাজিন
এবং অন্য
মিউজিশিয়ানরা নিউইয়র্কে
চলে এলেন।
ইনায়েতের মনে
হলো ভারতীয়
সংগীতের চেয়ে
পশ্চিমা সংগীত
অনেক বেশি
শৃঙ্খলাবদ্ধ, মর্যাদাপূর্ণ।
ভারতে ধনীদের
মনোরঞ্জনের জন্য
যে সংগীত
পরিবেশন করা
হয় সেই
শিল্পীরা সংগীতের
তত্ত্ব সম্পর্কে
সামান্যই জ্ঞান
রাখেন। এ
শিল্পীরা আতঙ্কে
থাকেন কখন
তার শিষ্য
তাকে ছাপিয়ে
যাবে।
আমেরিকায় হাজির
হলেও ইনায়েতের
পরিকল্পনা ছিল
ফিরে যাওয়া।
বিদেশী সংগীতকে
ভারতে পরিচয়
করিয়ে দেয়ার।
ইনায়েত কিছুদিন
কাজ করেন
আধুনিক নৃত্যশিল্পী
রুথ ডেনিসের
সঙ্গে।
আমেরিকা ও
ইউরোপে ইনায়েত
খানের নাম
পরিচিত হয়ে
ওঠে। ওরা
বেকার নামের
সোনালি চুলের
২০ বছরের
এক তরুণী
ইনায়েতের প্রেমে
পড়েন। ভাই
বার্নার্ডকে জানান
তিনি এই
ভারতীয় পণ্ডিতকে
বিয়ে করতে
চান। বার্নার্ড
ভীষণ রেগে
যান। একদিকে
ইনায়েতের তখন
কোনো কাজ
নেই, অন্যদিকে
নিজের পরিবারে
অশ্বেতাঙ্গ কোনো
মানুষকে যুক্ত
করতে আগ্রহী
ছিলেন না
তিনি। ইংল্যান্ডে
আগে থেকে
নির্দিষ্ট করা
কনসার্ট ও
লেকচারে অংশ
নিতে যুক্তরাষ্ট্র
ছাড়েন ইনায়েত।
বার্নার্ড বোনকে
যুক্তরাষ্ট্রেই থাকার
আদেশ দেন।
তাকে কোনো
চিঠি লিখতেও
নিষেধ করেন।
ভাইয়ের টেবিলে
ইনায়েতের ভারতের
ঠিকানা পেয়ে
তিনি সেখানে
চিঠি লেখেন
এবং অনুরোধ
করেন তার
চিঠি যেন
সেখান থেকে
ইংল্যান্ডে ইনায়েতের
কাছে পাঠিয়ে
দেয়া হয়।
১৯১৩ সালের
ফেব্রুয়ারিতে এক
কাপড়ে স্টিমারে
যাত্রা করেন।
অ্যান্টওয়ার্পে দুজনের
দেখা হয়।
২০ মার্চ
লন্ডনে ইনায়েত
ও ওরা
বেকারের বিয়ে
হয়। ওরা
আর কখনো
যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে
যাননি।
ছোটখাটো কনসার্ট
আর অনুষ্ঠান
করে কাটছিল
ইনায়েত ও
তার ভাইদের
জীবন। একসময়
মস্কো থেকে
একটি অনুষ্ঠানের
ডাক আসে।
এ সময়ই
মস্কোতে জন্ম
হয় ইনায়েত
ও ওরা
দম্পতির প্রথম
সন্তানের—নূর-উন-নিসা।
১৯১৪ সালের
প্রথম দিনে
জন্ম হয়
নূরের। পিতার
বংশ সূত্রে
নূর ছিলেন
শাহজাদী। টিপু
সুলতানের বংশধর।
নূরের প্রপিতামহ
ছিলেন মাওলা
বকশ, যাকে
‘ভারতের
বিটোভেন’ নামে
ডাকা হয়।
১৮৬০-এর
দশকে মহীসুরের
মহারাজা মওলা
বকশের সংগীতে
মুগ্ধ হয়ে
তাকে অরেক
রত্নপাথর উপহার
দিয়েছিলেন। জন্মের
সময় নূরের
ওজন ছিল
প্রায় আট
পাউন্ড। গায়ের
বর্ণ কিছুটা
তামাটে। মস্কোর
ঠিক কোথায়
নূরের জন্ম
হয়েছিল তা
নিশ্চিতভাবে জানা
যায়নি। কারণ
রুশ বিপ্লবের
আগে তখন
রাশিয়ায় জন্ম
সনদ দেয়ার
ঘটনা ছিল
দুর্লভ। প্রচলিত
আছে নূরের
জন্ম হয়েছিল
সের্গেই তলস্তয়ের
বাড়িতে। এ
সের্গেই ছিলেন
রুশ ঔপন্যাসিক
লিও তলস্তয়ের
বড় ছেলে।
তবে এটি
প্রমাণিত কোনো
তথ্য নয়।
জন্ম ছাড়াও
মস্কোতে নূর
একটি বিশেষ
নাম পেয়েছিলেন।
তাতার নার্স
তার নাম
দিয়েছিলেন ‘বাবুলি’—বাবার
মেয়ে। নূরের
পরিবার ঘরে
তাকে এ
নামেই ডাকত।
নূরের পরে
তার আরো
এক বোন
ও দুই
ভাই জন্মেছিল।
তবে নূরের
পরে জন্মানো
বিলায়েতের সঙ্গেই
ছিল তার
সবেচেয়ে ঘনিষ্ট
সম্পর্ক। দুজনই
সুফিবাদের আকৃষ্ট
ছিলেন। নূর
যেমন ব্রিটিশ
গুপ্তচর হিসেবে
নািসদের বিরুদ্ধে
লড়াইয়ে নেমেছিলেন
তেমনি বিলায়েতও। ডি-ডের
বিখ্যাত লড়াইয়ে
ভূমিকা ছিল
বিলায়েতের। ১৯৪৫
সালের শুরুর
দিকে জার্মানরা
যখন পরাজয়ের
মুখে, বিলায়েতের
সুযোগ হয়েছিল
ফ্রান্সে তাদের
বাড়িতে একবার
ঘুরে আসার।
দেখলেন তাদের
বাড়ি ফজল
মঞ্জিলের একটি
আসবাবও আর
সেখানে নেই।
সবই প্রতিবেশীদের
বাড়িতে ঠাঁই
নিয়েছে। নূর
নািসদের হাতে
নিহত। কিন্তু
এ খবর
তখনো বিলায়েত
বা তার
মা জানতেন
না। বিলায়েত
নানা উৎস
থেকে বোনের
খবর বের
করার চেষ্টা
করলেন। কিন্তু
কিছুই জানা
যাচ্ছিল না।
ভাই আর
মায়ের উদ্বেগ
বাড়ছিল। এর
মধ্যে একদিন
বিলায়েত স্বপ্ন
দেখলেন ইউনিফর্ম
পরিহিত নূর
তার দিকে
হেঁটে আসছে,
উজ্জ্বল নীল
রঙ তাকে
ঘিরে আছে।
নূর বলে
উঠলেন, ‘আমি
মুক্ত।’ বিলায়েত
নূরের এক
বন্ধুকে এ
স্বপ্নের কথা
জানালেন। বন্ধুটি
বলল, এর
অর্থ নূর
নিশ্চয়ই কোনো
কনসেনট্রেশন ক্যাম্প
থেকে মুক্তি
পেয়েছে, সে
এখন বাড়ির
পথে রয়েছে।
কিন্তু বিলায়েত
বলে উঠলেন,
‘না।
এর মানে
নূর আর
নেই।’ ১৯৪৬
সালের প্রথমদিকে
ব্রিটিশ সরকার
নূরের পরিবারের
কাছে আনুষ্ঠানিক
চিঠি দিয়ে
জানায়, পরিস্থিতি
বিবেচনায় মনে
হচ্ছে নূর
ইনায়েত খান
আর জীবিত
নেই। কিন্তু
সন্তানরা মাকে
এ খবর
জানালেন না।
১৯৪৮ সাল
পর্যন্ত নূরের
মৃত্যুর বিস্তারিত
বিবরণ প্রকাশিত
হয়নি। সে
বছর ওয়ার
অফিস থেকে
জানাল তারা
শিগগিরই নূরের
মৃত্যুর বিবরণী
পত্রিকায় প্রকাশ
করবে। বিলায়েত
পড়লেন দুশ্চিন্তায়।
তাদের মা
ওরা নিয়মিত
পত্রিকা পড়েন।
তাকে কিছুদিনের
জন্য বেড়াতে
নিয়ে যাওয়া
হলো, যেন
তিনি সে
সময়ের পত্রিকা
পড়তে না
পারেন। ১৯৪৯
সালের ১
মে নূরের
মৃত্যু সংবাদ
না জেনেই
শেষ নিঃশ্বাস
ত্যাগ করেন
ওরা বেকার।
এসএম রশিদ: লেখক





