বিদুষী তরুণী, প্রতিভাময়ী লেখিকা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রশক্তির একজন গুরুত্বপূর্ণ গুপ্তচর হিসেবে নূর ইনায়েত খানের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা ও নািসদের হাতে মাত্র ৩০ বছর বয়সে তার আত্মবলিদানের প্রসঙ্গটি সংগত কারণেই যুদ্ধ-ইতিহাস বিষয়ে আগ্রহীদের কাছে অচেনা নয়। কিন্তু টিপু সুলতানের বংশধর এ বিদুষী সাহসী গুপ্তচর রাজকন্যার সাহিত্যিক সত্তা সম্পর্কে অনেকেই খুব একটা অবহিত নন। বাবা সুফিসাধক ইনায়েত রহমত খান আর মা আমেনা বেগমের পরিচর্যায় নূর ইনায়েত খান বেড়ে উঠেছিলেন জ্ঞানার্জনের তৃষ্ণা এবং সৃজনচর্চার বৌদ্ধিক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। এরই প্রতিফলন দেখা যায় তার লেখালেখিতে।
জাতকের গল্প
নূর ইনায়েত খান প্রচলিত ভারতীয় নীতিকথা ‘জাতক’-এর অন্তর্ভুক্ত একাধিক আখ্যান ছোটদের উপযোগী করে পুনর্লিখন করেছিলেন যখন, তার বয়স তখনো ২৫ ছোঁয়নি। ১৯৩৯ সালে প্রথম প্রকাশ পায় তার ‘দ্য জাতক টেলস’ বইটি। এখানে একত্র হয়েছিল মোট ২০টি গল্প। বাংলা অনুবাদে কয়েকটি গল্পের শিরোনাম উপস্থাপন করলে ওয়াকিবহাল পাঠক নিশ্চয় মূল গল্পগুলো চিনে নিতে পারবেন: ‘তরুণ তোতা’, ‘গুরুর পরীক্ষা’, ‘বাচ্চা কোয়েলপাখি ও দাবানল’, ‘ধৈর্যশীল ষাঁড়’, ‘সোনার হাঁস’, ‘বানরসেতু’, ‘বটবৃক্ষ’ ইত্যাদি। উল্লেখ্য, বইটির অলংকরণ করেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত দিনেমার নারী অলংকরণশিল্পী হেনরিয়েটা উইলবেক লে মারিয়ে, যিনি কিনা নূর ইনায়েতের বাবার বন্ধুও ছিলেন। ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় একযোগে প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বইটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সমালোচকরা নূরের গদ্যের সহজ, সুন্দর ও সাদামাটা অথচ বলিষ্ঠ ভঙ্গিকে বেশ পছন্দ করেছিলেন। গল্পগুলো নূর ছোটদের জন্য পুনঃকথন করেছেন ঠিকই, কিন্তু তা নিছক শিশুতোষ হয়েই থাকেনি—বরং বড়দেরও পাঠ্য হয়ে উঠেছে বলে অনেকেই মনে করেন। নূর ইনায়েত নতুনভাবে বলবার জন্য জাতকের গল্পগুলোই বেছে নিলেন কেন? তার রচনাকর্ম নিয়ে গবেষণা করেছেন মার্কিন গবেষক লারা কার্টিস, এ বিষয়ে তার মন্তব্য এমন: সুফিবাদী সমন্বয়ধর্মী চেতনায় বৌদ্ধ ঐতিহ্যের জাতক-গল্পমালা থেকেও নূর সামনে এগোনোর দিশা খুঁজতে চেয়েছিলেন। এবং সম্ভবত তার জীবনসংগ্রামেও জাতকের গল্পগুলো তাকে লড়াই করার উৎসাহ ও রসদ জুগিয়েছিল। প্রসঙ্গত নূরের সহকর্মী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইংল্যান্ডের ‘স্পেশাল অপারেশনস এক্সিকিউটিভ’ বা ‘এসওএ’ বাহিনীর ক্রিপ্টোগ্রাফার লিও মার্কসের একটি অভিজ্ঞতা স্মরণে আনা যায়। নূরকে যখন তিনি ক্রিপ্টোগ্রাফি বা গোপন বার্তা প্রেরণের কলাকৌশল শেখাচ্ছিলেন, তখন নূর তাকে জাতক-গল্পমালার অন্তর্গত ‘বানরসেতু’ আখ্যানটি শোনান। ওই আখ্যানে একটি বুদ্ধিমান সৎ বানর কী করে নিজের দেহকে সেতু বানিয়ে দুর্বৃত্তদের পরাস্ত করে সেই রুদ্ধশ্বাস বিবরণ ছিল। লিওর তখন মনে হয়েছিল, নূর যেন জাতকের গল্পের ওই প্রজ্ঞাবান বানরটির মতোই নিজেকে প্রস্তুত করছেন দুর্বৃত্ত ফ্যাসিবাদী অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে লড়তে। বস্তুত, জাতকের গল্পমালা নূরকে সত্যিকার অর্থেই অশুভ শক্তি ও অসততার বিরুদ্ধে লড়ার জন্য নৈতিক-দার্শনিক প্রেরণা দিয়েছিল যেনবা। লিও মার্কসের নিজের কাছে জাতকের গল্পের বইটি এত আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল যে তিনি তা পরপর দুবার টানা পড়ে ফেলেছিলেন। পাঠান্তে লিও নাকি বলেছিলেন: ‘হায় নূর, তুমি এ লিখনপ্রতিভা নিয়ে স্পেশাল সার্ভিসে কী করতে এসেছ?’ মুগ্ধতা ও বিস্ময়ের পাশাপাশি তার অনুভূতিতে খানিকটা আক্ষেপ মিশে গিয়েছিল এবং তার সবটাই নূরের প্রতি।
বাদশাহ আকবরের কন্যা ও আরো কিছু কাহিনী
১৯৪৪ সালে নািস বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হওয়ার বহু পরে ২০১২-তে নূর ইনায়েত খানের কিছু অগ্রন্থিত ছোটদের গল্প নিয়ে প্রকাশ পায় ‘কিং আকবরস ডটার: স্টোরিজ ফর এভরিওয়ান’। বইটিও মুখ্যত চিরায়ত গল্প বা ঐতিহাসিক আখ্যানের পুনঃকথনের সংকলন। তবে এখানেও নূরের নিজস্ব দর্শন ও জীবনবোধের সূক্ষ্ম-সুন্দর প্রকাশ দেখা যায়। আরো যেটা খেয়াল করার, নূর গল্পগুলো বেছে নিয়েছেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য—দুই এলাকা থেকেই। এও তার সমন্বয়ধর্মী চেতনার বহিঃপ্রকাশ বটে। সব কয়টি গল্পের প্রকাশ সাল বইতে উল্লেখিত না হলেও ধারণা করা যায় যে অধিকাংশই তিরিশের দশক ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লেখা। কয়েকটি গল্পের মুসাবিদা নূর করেছিলেন ওয়্যারলেস যোগাযোগের ট্রেনিংয়ের জন্য ব্যবহূত নোটবুকেই, যান্ত্রিক হিসাব-নিকাশের পাশেই। কাজের নোটবইয়ে খসড়া করা দুটি গল্পের কথা এখানে বিশেষভাবে বলার মতো। একটির শিরোনাম, ‘রাজকন্যা ওয়ান্ডা’ আরেকটি ‘পোল্যান্ডের সাদা ঈগল’। দুটিই আদতে পোল্যান্ডে প্রচলিত প্রাচীন লোককথা। কিন্তু যখন জার্মানি পোল্যান্ড দখলে নিয়েছে, তখন যেন হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে নতুন তাত্পর্যে নূরের কাছে ধরা দিয়েছিল গল্প দুটি। তাই তিনি চেয়েছিলেন, একালের প্রজন্মের কাছে এ লড়াইয়ের গল্পগুলো নবরূপে পৌঁছে দিতে। ‘রাজকন্যা ওয়ান্ডা’ কাহিনীতে যেমন সেখানে এক রাজকন্যা তার রাজ্যকে দখল করে উদ্যত ভয়ানক হিংস্র শত্রুপক্ষকে একাই শায়েস্তা করে—বাঁচায় সেখানকার সাধারণ মানুষ। এ যেন হিটলারের থাবা থেকে লড়াই করে মুক্ত হওয়ার বাসনার কথাই নতুনভাবে তুলে ধরে।
কয়েকটি কবিতা, একটি নাটক
প্রকাশিত প্রথম বই গল্পের হলেও নূরের লেখালেখির শুরু হয়েছিল কবিতা দিয়ে। একবার অসুস্থ হয়ে এক বন্ধুর বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন, ওই সময় নূর তাকে উদ্দেশে করে লেখা একটি কবিতা ও তার একটি পেনসিল-স্কেচ পাঠান। মা’কে নিবেদিত কিশোর নূরের কবিতাটি এমন: ‘এমনকি যদি পুরো দুনিয়াই,/আমাদের দেখভাল করে চলে,/ তাও তা হবে না সমান/ তোমার কোমল মাতৃস্নেহের।’ মাঝে মাঝে মা রাগ করতেন, তখন মায়ের রাগ ভাঙানোর জন্য ক্ষমা চাওয়ার অছিলায়ও নূর একটি কবিতা লিখে ফেলেছিলেন: ‘ক্ষমা করবেন, প্রিয় আম্মাজান/আমরা তো মাঝে মাঝে হারাই পথ,/স্মরণ করি এই বিপুল বিশ্বে/কীভাবে আপনি ঠেকিয়ে রাখেন আমাদের গোল্লায় যাওয়া থেকে।’
পরে নূর আরো কবিতা লিখেছেন। ছোটবেলায় বাবা ইনায়েত খান তাকে কবিতা লেখার জন্য দারুণভাবে উৎসাহ দিতেন। তার ভাবনা ছিল এমন, কবিতায় শ্রেয়বোধের প্রকাশ থাকা চাই। ওই সময় লেখা নূরের একটি কবিতার অংশবিশেষের অনুবাদ এখানে তুলে ধরলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে: ‘...আচরণে নম্র হও, প্রকাশ ঘটাও শ্রদ্ধার—/যাতে কিনা মহাপৃথিবী কোনো ত্রুটি খুঁজে না পায়.../তোমার দৃষ্টিতে যেন থাকে এক দীপ্তি ঝলমলে/ নিশ্চিত থেকো সদয় পরীরা কাছে আছে নিশ্চয়।.../ মোহনীয় এক গোলক থেকে আসা পরীরা,/আমার কানে এসে বলে তোমার গোপন কথা...’। ১৪ বছর বয়সে লেখা নূরের আরেকটি কবিতা ‘আনন্দের আলো’ও অনুরূপ শুভবোধে উদ্ভাসিত: ‘এক মৎসকন্যা ঝড়তুফানের সাগরে/ভাসিয়েছিল যে তার জাহাজ,/যতই দূরেই সে যায়/আনন্দিত উত্থান ঘটে ঢেউদের।/কারণ সে জাহাজে টাঙিয়েছিল এক প্রদীপ,/যা কিনা ছড়াচ্ছিল আলো মিষ্টিমধুর/আর সেই আলো দেখেছিল যারা/প্রত্যেকেই মুখোমুখি হয়েছিল আনন্দের।’
নূর ইনায়েত খানের লেখা একমাত্র নাটক Aède of the Ocean and Land লেখা হয় সম্ভবত তিরিশের দশকেই, তার পিতার মৃত্যুর পর। হোমারের মহাকাব্য ওডিসির থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে লেখা সাত অংকে বিভক্ত এ নাটক কার্যত ছিল সুফিসাধক দার্শনিক পিতার প্রতি নূরের এক অনবদ্য শ্রদ্ধার্ঘ্য। ইউলিসিসের গৃহত্যাগ করতে বাধ্য হওয়া ও পরে ঘরে ফেরার আখ্যানের সঙ্গে নূর মিলিয়ে দেখতে চেয়েছিলেন তার পিতার পরিবারের থেকে দূরে থাকা ও পুনর্মিলনের ঘটনাকে। গ্রিক পুরাণের সঙ্গে তিনি সুফিতত্ত্ব মিশিয়ে এক অনবদ্য বয়ান সৃষ্টি করেন। প্রসঙ্গত, Aède অর্থ মহাকাব্যের রচয়িতা। নাটকের শিরোনামে ঠাঁই পাওয়া এ মহাকাব্যের রচয়িতার রূপেই নূর প্রিয় পিতাকে উপস্থাপন করেন। তবে হোমারের ওডিসি যেখানে ইউলিসিস ঘরে ফিরলেও শেষ বিচারে ইতিবাচক সমাপ্তির দিকে যায় না, সেখানে নূর তার পিতার আদলে গড়া মূল চরিত্রের গৃহে পদাপর্ণের মুহূর্তেই চূড়ান্তভাবে চারদিকে শান্তির নেমে এসেছে এমন দৃশ্য নির্মাণ করেন।
তাকে নতুনভাবে পড়া জরুরি
এক অর্থে নূর ইনায়েত খানের রচনা নিয়ে যতটা আলোচনা হওয়ার কথা ছিল, ততটা ঠিক হয়নি। মিত্রশক্তির গুপ্তচর হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তার অবদান ও বলিদান নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি তার কবিতা, নাটক ও ছোটদের জন্য নতুনভাবে বলা রূপকথা-গল্পগাছাগুলো বিশেষভাবে মনোযোগের দাবি করে। তবে আশার কথা হলো সম্প্রতি নূরের ‘দ্য জাতক টেলস’ ফের প্রকাশ পেয়েছে। তার ভ্রাতুষ্পুত্র পিরজাদা ইনায়েত খানের সম্পাদনায় বেরিয়েছে নূরের রচনাবলিও। এবার তাহলে তার রচনাগুলো সহজলভ্যতার সূত্রে নতুনভাবে পড়া যেতে পারে।
শাকের আনোয়ার: প্রাবন্ধিক





