মাতাহারির পর সবচেয়ে আলোচিত গোয়েন্দা নারী নূর-উন-নিসা ইনায়েত খান। দুজন অবশ্যই ভিন্ন ধাঁচের।
মৃত্যুর আগ মুহূর্তে নূরের মুখ নিঃসৃত শব্দটি ছিল ফরাসি লিবার্তে। মানে মুক্তি। মৃত্যু তাকে মুক্তি দিতে যাচ্ছে। ১৯৩৯ সালে ২৯ বছর বয়সী নূর ফরাসি ভাষায় যা বলেছেন তার মানে এমন: আমি চাই ভারতীয়রা যুদ্ধে খুব ভালো করে, দু-একজন যদি খুব প্রশংসনীয় কিছু করতে পারে, তাহলে ইংরেজদের সাথে ভারতের সেতুটি শক্ত হবে—তিনি বুঝতে পারেননি তখন যে এ দায়িত্বটি সবার আগে তার ওপরই পড়বে।
জার্মান পুলিশপ্রধান হেইনরিখ হিমলারের আদেশ ছিল, গুপ্তচরদের অবশ্যই মেরে ফেলতে হবে—কিন্তু অত্যাচার, অসম্মান আর জেরার মাধ্যমে তার কাছে লুকানো সর্বশেষ তথ্যটুকু বের করার আগে নয়।
দুর্ভাগ্য জার্মান এসএসদের! তারা নূর-ইনায়েত খানের কাছ থেকে কিছুই বের করতে পারেনি। নূর ইনায়েতকে ডাখাও গ্যাস চেম্বারে পাঠানো হয়নি, সর্বোচ্চ অত্যাচারের পর মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
তার মৃত্যু-পরবর্তী একটি দৃশ্য:
মার্কিন সৈন্যরা প্রায় এসে গেছে। ছয়-সাত হাজার কয়েদি বের করে তাদের দিয়ে মার্চ পাস্ট করিয়ে ইউরাসবার্গ নেয়া হচ্ছে। এর নাম ডেথ মার্চ। ছয়দিনের মার্চে অন্তত ১ হাজার ৭৯ জন রাস্তায় মৃত্যুবরণ করেছে। আর সাড়ে চার হাজার কয়েদির শেষ দলটি যখন আনা হয়, ট্রেনে মারা যায় ৩০০ জন। তাদের টেনে বের করে নদীতে নিক্ষেপের জন্য মোতায়েন করা হয় আরো ৫২৪ জন। নদীর পাড়ে আট শতাধিক মানুষের যে গণকবর, তা এ মানুষগুলোরই।
এ পরিবেশই নূর ইনায়েতকে মেনে নিতে হয়েছে।
ডাখাও কনসেনট্রেশন ক্যাম্প
মিউনিখ থেকে ১৬ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে ব্যাভারিয়া রাজ্যে একটি মধ্যযুগীয় শহর ডাখাওয়ের একটি পরিত্যক্ত গোলাবারুদ কারখানায় জার্মানির সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পটি স্থাপিত হয়। ভাইমার রিপারলিকের ফ্রি স্টেট অব ব্যাভারিয়া সাধারণ নির্বাচনে হিটলারের নািস পার্টিকে ৫০ শতাংশেরও কম ভোট দেয়ায় ক্ষুব্ধ ছিল তার বাহিনী। ৯ মার্চ ১৯৩৩ তারা পুরো রাজ্য দখল করে নেয় এবং শুরুতে রাজনৈতিক কয়েদিদের আবাসনের জন্য দখল করা কারখানটি উদ্বোধন করে ২২ মার্চ। ক্রমান্বয়ে এটি স্মরণকালে ভয়াবহ জীবন্ত নরকের একটিতে পরিণত হয়। ক্যাম্প কর্মকর্তা গ্যাস চেম্বারে পাঠানোসহ এই ডাখাওতে ৩২ হাজার মৃত্যু রেকর্ড করতে পারে। বহুসংখ্যক নিহত মানুষ রয়ে যায় তালিকার বাইরে। অসুখ-বিসুখ, অপুষ্টি, আত্মহত্যা এবং অস্ত্রাঘাত ও নির্যাতনে মৃত্যু তো রয়েছেই। ১৯৪৪ সালে টাইফাস মহামারীতে মৃত্যু ঘটে কমপক্ষে ১৫ হাজার কারাবন্দির। ২৯ এপ্রিল ১৯৪৫ মার্কিন বাহিনী দখলে নেয়ার আগে অধিকাংশকেই গ্যাস চেম্বারে পাঠিয়ে দেয়া হয়, অথবা অন্যত্র।
এই ডাখাও কনসেনট্রেনশন ক্যাম্পেই দিলেন একজন মুসলমান নারী গুপ্তচর, টিপু সুলতানের বংশধর, নূর ইনায়েত খান। এখানে নািস গার্ড তার মাথায় নির্মমভাবে গুলি করে। ডাখাওয়ের অমসৃণ মেঝেতে পড়ে ছিলেন ভারতের অন্যতম সুন্দরী এই শাহজাদী।
অবশ্য জার্মানরা তাকে চেনে ব্রিটিশ স্পাই নোরা বেকার নামে। যুদ্ধকালীন গোয়েন্দাগিরির ইতিহাসে এমনকি পুরুষদের মধ্যে তার মতো নিবেদিত একজন খুঁজে পাওয়া কঠিন। তিনি তথ্য ফাঁস না করার যে শপথ নিয়েছিলেন, নিজের জীবন দিয়ে তা রক্ষা করেছেন। ব্রিটেন ও ফ্রান্স তাকে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান প্রদান করেছে।
নূর ইনায়েতের মা ও বাবার কথা
নূর ইনায়েত খানের জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯১৪, জার নিকোলাসের সাম্রাজ্যে মস্কোর ক্রেমলিনের বাইরে একটি গ্রামে। তার বাবা সুফি মতবাদ প্রচারক হজরত ইনায়েত খান ও মা মার্কিন কবি ওরা বেকার। তার পুরো নাম নূর-উন-নিসা ইনায়েত খান।
ইনায়েত রহমত খান পাঠান (জন্ম ৫ জুলাই ১৮৮২, মৃত্যু ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯২৭) ১৪১৪ সালে ইউরোপে সুফিবাদ প্রচার করতে শুরু করেন। তিনি মূলত উত্তর ভারতীয় ক্ল্যাসিক্যাল গানের শিল্পী, হায়দরাবাদের নিজামের দরবার থেকে ‘তানসেন’ খেতাব পাওয়া স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব। তার বাবা উস্তাদ মাওলা বকশ খানকে বলা হতো ‘ভারতবর্ষের বিতোফেন’। আর মাওলা বকশ ছিলেন টিপু সুলতানের দৌহিত্র। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, ব্রিটেন ও জার্মানিতে ইনায়েত খান সুফিবাদের কেন্দ্র গড়তে সক্ষম হন। তিনি সংগীতকে সব যন্ত্রণা প্রশমনের মাধ্যম বলে প্রচার করেছেন এবং সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যলাভে সংগীতের কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করতেন। সুতরাং সংস্কৃতিমনা অনেকেই সংগীত ও ঈশ্বর দ্বৈত প্রাপ্তির আশায় ইনায়েত খানের অনুসারী হয়ে যান।
কিন্তু তার কন্যা নূর ইনায়েত খান তাকে কী মনে করতেন? এ নিয়ে বিতর্ক আছে। তিনি মনে করতেন, তাদের ওপর বাবার ঋণাত্মক প্রভাব পড়েছে এবং তিনি বাবার কার্যক্রম ও দর্শনের সাথে কখনো সহমত নন।
নূরের মা পিরানি আমেনা বেগমের জন্ম ৮ মে ১৮৯২, মৃত্যু ১ মে ১৯৪৯, জন্মকালীন নাম ওরা রে বেকার। তার বাবা পিয়েরে বার্নার্ড মেয়েকে ভারতীয় সংগীতশিক্ষা দেয়ার জন্য ইনায়েত খানকে নিয়োগ করেন। কিন্তু মেয়ে তার সংগীত শিক্ষকের প্রতি প্রণয়যুক্ত হয়ে পড়লে বিয়েতে বাধা দেন; খান জাহাজে চড়ে লন্ডন চলে আসেন। তাদের প্রথম সাক্ষাৎ ১৯১১ সালে। ১৯১৩ সালে তিনি ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম নারী আমিনা বেগম হলেন, তাদের বিয়ে হলো। লন্ডন ও প্যারিসের জীবন কাটিয়ে তারা মস্কো এলেন। এখানেই প্রথম সন্তান নূর জন্মগ্রহণ করেন। তাদের চার সন্তান নূর (১৯১৪), বেলায়েত (১৯১৬), হেদায়েত (১৯১৭) ও খাইরুন-নিসা (১৯১৯)। আমিনা কবিতা লিখতেন। তিনি ১০১ কবিতার একটি ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ লিখেছেন। ইনায়েত খান লিখেছেন: আমিনা বেগমের সাহায্য ছাড়া তিনি কখনো তার বার্তা পশ্চিমে পৌঁছাতে পারতেন না।
তাদের পুত্র হেদায়েত খান ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম’ স্মৃতিকথায় বাবা-মায়ের কথা লিখেছেন, তিনিও বাবা ও মায়ের ধর্মীয় পথ অনুসরণ করায় বিরূপ কোনো মন্তব্য করেননি।
পীর পরিবারের কন্যা
নূর যখন ছয় বছর বয়সী, পরিবারটি প্যারিসের শহরতলিতে একটি বড় বাড়িতে বসবাস করতে থাকে। বাড়ির নাম দেয়া হয় ‘ফজল মনজিল’, আশীর্বাদ গৃহ। সারা বছর এ বাড়িতে সুফিবাদের আলোচনা ও সংগীতচর্চা হয়। দিনটা মেঘাচ্ছান্ন না থাকলে এ বাড়ি থেকে আইফেল টাওয়ার দেখা যায়। ভাইবোন চারজন মিলেই সংগীতের একটি ব্যান্ড। ইনায়েত খান ১৯২৭ সালে ভারতের টানে ফিরে গেলেন। আমিনার মন বলছিল তার স্বামীর আর ফেরা হবে না—তা-ই হলো। ইনায়েত খানের মৃত্যু সংবাদ এল। নূর তখন মাত্র ১৩ বছরের। কিন্তু ভাইবোনদের মধ্যে সবচেয়ে বড়। পর্দা ঢাকা জীবনে কাজ জোটানো মুশকিল। নূরই মাকে তার পুরনো ইউরোপীয় পোশাকে ফিরিয়ে নিলেন। নিজে লিখতে শুরু করলেন কবিতা ও গল্প। সারাবনে শিশু মনস্তত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা আর ইকোল নরমালে সংগীতশিক্ষা চালিয়ে গেলেন। সংগীত বিদ্যালয়ে ইহুদি সহপাঠী ছেলের প্রেমে পড়লেন, কিন্তু পরিবারের সম্মতি পেলেন না। প্রেমিক না পরিবার—তিনি দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়লেন।
১৯৩৯ সালে প্যারিসের বিখ্যাত লা ফিগারো পাত্রিকায় নূর অনূদিত জাতকের গল্প প্রকাশিত হতে শুরু করল। পরে ইংল্যান্ড থেকে তার ‘টোয়েন্টি জাতক টেলস’ প্রকাশিত হয়েছে। ততদিনে মহাযুদ্ধের ঘন কালো ছায়া নেমে এসেছে। ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে। গোটা ইউরোপ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে।
রণাঙ্গনের অগ্রগামী নারী
নূর তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্তে রেড ক্রস ভলান্টিয়ার হিসেবে যোগ দিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেছেন। ফজল মনজিলে বাবার ওরিয়েন্টাল রুমে বসে নূর ও তার ভাই বেলায়েত সিদ্ধান্ত নিলেন ফ্যাসিস্টদের রুখতেই হবে। সহিংসতা সুফিবাদের পথ নয়, তবু তারা সিদ্ধান্ত নিলেন ইংল্যান্ড যাবেন এবং সরাসরি যুদ্ধে নাম লেখাবেন।
লন্ডনে তখন নািস বোমা পড়ছে, আতঙ্ক ও ধ্বংসের শহর লন্ডন। বেলায়েত পছন্দ করলেন রয়াল এয়ারফোর্স আর নূর বেছে নিলেন ওমেনস অক্সিলিয়ারি এয়ারফোর্স। নারীদের প্রথম ব্যাচে তিনি নিলেন সিগন্যালস প্রশিক্ষণ, তিনি রেডিও অপারেটর হতে যাচ্ছেন। নূর যখন মোর্স কোড ব্যবহার করে বার্তা আদান-প্রদান করতে শুরু করেছেন, তাকে পর্যবেক্ষণ করেছে স্পেশাল অপারেশন এক্সিকিউটিভ ব্রাঞ্চ, তাদের দরকার বহুভাষী কর্মী। এটা চার্চিলের তৈরি বিশেষ বাহিনী, এদের কাজ শত্রুর সাথে মিশে নাশকতামূলক কাজ করা, খোঁজখবর নিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থে অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করা। ততদিনে নূর প্রশিক্ষিত দক্ষ ওয়্যারলেস অপারেটর, বাজারে এ পদের চাহিদা অনেক বেশি। ফ্রান্সের সব তার চেনা, ফরাসি ভাষায়ও দক্ষ, কিন্তু যে কাজের জন্য তাকে পছন্দ করা হচ্ছে সেটাই যুদ্ধকালে সবচেয়ে ঝুঁকির চাকরি।
ভিক্টোরিয়া হোটেলে সেলভিন জেপসনের ছোট্ট অফিসে তাকে সাক্ষাত্কারের জন্য ডাকা হলো। তারা ফরাসিতে কথোপকথন চালালেন। তাকে বলা হলো প্রশিক্ষণের পর ফ্রান্সে নািস অধিকৃত একটি অঞ্চলে একজন এজেন্ট হিসেবে তাকে পাঠানো হবে। তার প্রতিরক্ষার কোনো ব্যবস্থা থাকবে না, তার কোনো ইউনিফর্ম থাকবে না, ধরা পড়লে গুলি করে হত্যা করা হবে। আবার বিশ্বাসঘাতকতা করলে নিজের লোকেরাই হত্যা করবে। একই শাস্তি। নির্দ্বিধায় তিনি জবাব দিলেন—এই চাকরিটাই তার চাই।
এক সকালে ওমেনস অক্সিলিয়ারি এয়ারফোর্সের সদস্যরা, যাদের সঙ্গে তার এক মেসে খাওয়া ও থাকা, দেখলেন নূর নেই। কোনো চিঠিপত্র নেই, কোনো ঠিকানা নেই, কেবল পরিপাটি করে বিছানাটা গুটানো। কারোই জানা নেই কোথায় নিরুদ্দিষ্ট হলেন সুন্দরী সেই প্রিন্সেস।
শুরু হলো নতুন প্রশিক্ষণ, তাকে নিরুদ্দিষ্টই থাকতে হবে ভুয়া পরিচয়ে, সংবাদ আদান-প্রদান করতে হবে চোরাই পথে—ইংল্যান্ডের বিভিন্ন গ্রামীণ ঠিকানায় প্রশিক্ষণ চলছে, বন্দুক ব্যবহার শিখলেন, বিস্ফোরক বহন ও বিস্ফোরণের কায়দা শিখলেন, তালা ভেঙে প্রবেশ করা, নিঃশব্দে হত্যা করা শিখলেন। অধিকৃত ফ্রান্সে জীবন কেমন হবে জানলেন, শত্রু সম্পর্কে পড়ালেখা করলেন। জার্মান আবওয়েব, গেস্টাপো শনাক্ত করতে শিখলেন।
ম্যাডেলিন
প্রশিক্ষিত এ নতুন নারীর নাম ম্যাডেলিন। নতুন নামে সই দেয়া চর্চা করলেন।
এবার তিনি নতুন ও মৃত্যুঝুঁকির জীবন শুরু করতে প্রস্তুত। তার ডিপারচার আদেশ হলো। ১৬ জুন রাতে তার প্রথম ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ভেরা এটকিনস তাকে লন্ডনের অরচার্ড কোর্ট অ্যাপার্টমেন্ট থেকে তুলে নিয়ে ট্যাঙ্গমেয়ার এয়ারফিল্ডের দিকে রওনা হলেন। শেষ মুহূর্তের একটি তল্লাশি করা হলো, যাতে তার কাছে কোনো ধরনের ইংলিশ দ্রব্য, এমনকি সিগারেট বা ট্রেনের টিকিটও না পাওয়া যায়, তাকে পুরো ফ্রেঞ্চ তরুণীই হতে হবে। তার হাতে ফলস পাসপোর্ট, কিছু ফ্রাঙ্ক, পিস্তল আর চারটি সায়ানাইড বড়ি। যদি অনিবার্য হয়ে পড়ে, তাহলে এ পথেই মৃত্যু বেছে নিতে হবে।
ভেরা এটকিনস তার পোশাকে একটি সিলভারের পাখি লাগিয়ে ছিলেন, এটা সৌভাগ্য বয়ে আনবে। পরিষ্কার আকাশের নিচে তাকে বহন করতে উড়োজাহাজ লাইসেন্ডার অপেক্ষা করছে। তিনি এয়ারফিল্ডের দিকে পা বাড়ালেন। ইংল্যান্ডে ভাইকে নিয়ে আসার সময় ফ্রান্সকে বলেছিলেন আবার ফিরে আসবেন, তিনি কথা রাখতে যাচ্ছেন। কিন্তু ইংল্যান্ডে আর ফিরবেন কিনা তা তো বললেন না।
এজেন্টদের আলোকিত রাতেই পৌঁছ দেয়া হয়, যাতে চারদিকটা ভালো করে দেখা ও চেনা হয়ে যায়। বিশেষ মোর্স কোডে লন্ডন জেনে গেল লাইসেন্ডার নিরাপদে অবতরণ করেছে। নূর এখন ম্যাডেলিন। ম্যাডেলিন এখন প্যারিসের পথে। লন্ডনের বাইরে এসওইর সবচেয়ে বড় অফিসটি প্যারিসেই, ইংল্যান্ডের ব্যারিস্টার ফ্রান্সিস সুটিল অফিসপ্রধান আর ম্যাডেলিনের বস স্থানীয় ফরাসি নাগরিক অঁরি গ্যারি। ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই তিনি সম্প্রচারের কাজ শুরু করে দিলেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্য, প্রথম সপ্তাহেই তাদের সার্কিট গেস্টাপোদের হাতে ধরা পড়ে গেল, ওয়্যারলেস উঠিয়ে নিল। বসদের পরামর্শমতো নূর আরেক এজেন্ট ফ্রাঁস আঁতেলমেকে নিয়ে পালিয়ে গেলেন। কিন্তু তিনি তার গোয়েন্দা তত্পরতা অব্যাহত রাখলেন। আরো বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা ঘটল, আরো গ্রেফতারের সংবাদ এল। লন্ডন অফিস তাকে ফিরে আসার নির্দেশ দিল। কারণ পরিস্থিতি খুব বিপজ্জনক। প্যারিস অফিস ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। তাকে সহায়তা করার মতো আর শক্তি অবশিষ্ট নেই। তিনি লন্ডনে ফিরে যেতে অস্বীকার করলেন এবং একাই সুবিধামতো জায়গা থেকে অফিস চালাতে পারবেন বলে জানালেন। আগস্টের মধ্যভাগ থেকে নূর ছাড়া আর কেউ নেই।
ছয়জন রেডিও অপারেটরের কাজ একাই করছেন। আজ এ ঠিকানায় কাল ও ঠিকানায়—হয় জীবন নয় মৃত্যু, এ ঝুঁকি নিয়ে তিনি এগোতে থাকলেন। ১৯৪৩-এর ভয়ংকর গ্রীষ্মে ধরা পড়তে পড়তে দুবার বেঁচে গেছেন। একবার তো ওয়্যারলেসসহ। লন্ডনে তার সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিস্মিত, ম্যাডেলিন একা কেমন করে প্যারিস-লন্ডন সম্পর্ক এখনো টিকিয়ে রেখেছে। তার বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট ও যথার্থ। সিগন্যালস মাস্টার লিও মার্কস তাকে নিয়ে গর্ব করেন। তার বার্তা প্রেরণ গেস্টাপো সিগন্যাল নেটওয়ার্কে ধরা পড়ছে, কিন্তু তারা তাকে ধরতে পারছেন না। এর মধ্যে এক লাখ ফ্রাঙ্ক ঘুষ নিয়ে তারই সার্কিট লিডার অঁরি গ্যারির বোন রেনি গ্যারি তার ঠিকানা ফাঁস করে দিল। গেস্টাপোরা এসে যন্ত্রপাতিসহ তাকে তুলে নিয়ে গেল। দুবার পলায়নের চেষ্টা ব্যর্থ হলো।
নূর-উন-নিসা ম্যাডেলিন চিহ্নিত হলেন ভয়ংকর বিপজ্জনক কয়েদি হিসেবে। বার্লিন থেকে কোনো নারীর ব্যাপারে এই প্রথম আদেশ এল—তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দাও।
১১ সেপ্টেম্বর রাতে তাকে তার কারা প্রকোষ্ঠ থেকে বেরোনোর নির্দেশ দেয়া হলো। সে লিখল ‘আমি চললাম।’ হ্যান্ডকাফ বাঁধা অবস্থায় তাকে কার্লসের প্রিজনে আনা হলো। সেখানে তার আরো তিন সহকর্মী ছিলেন। একত্রে তাদের রেলস্টেশনে আনা হলো, ট্রেনে মিউনিখ। তাদের বলা হলো, এখন থেকে তারা বন্দি, কৃষি শ্রমিক হিসেবে কাজ করবে। কেউ সামান্যও ভাবেননি যে অফিসার তাদের নিয়ে যাচ্ছেন তিনি সাথে তাদের মৃত্যু পরোয়ানাও বহন করছেন।
মধ্যরাতে তারা ডাখাও কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পৌঁছলেন। নিজ স্যুটকেস টেনে তাকে সেল পর্যন্ত যেতে হলো। অন্যদের বাদ দিয়ে আবার তাকে ডাকা হলো। তার গায়ের রঙও অন্যদের চেয়ে ভিন্ন। তথ্যের জন্য তার ওপর অমানসিক নির্যাতন চালানো হলো। বলা হলো এই নারী ‘ডেঞ্জারাস প্রিজনার’। মার খাওয়া শরীরে তাকে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসতে বলা হলো, এসএস গার্ড ভিলেম রুপার্ট তার মাথার পেছন দিক থেকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক গুলি করলেন। রক্তাক্ত হয়ে উঠল ডাখাও কারাগারের মেঝে। হত্যা করা হলো অন্য তিনজনকেও। তার জীবনের শেষ মূহূর্তে একটি শব্দই উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন: লিবার্টি। স্বাধীনতা, মুক্তি।
(এ নিবন্ধের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শ্রাবণী বসুর ‘স্পাই প্রিন্সেস: দ্য লাইফ অব নূর ইনায়েত খান’ থেকে অনুসৃত)
এম এ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা





