সুফিবাদের একটি অন্যতম অংশ আত্মনিবেদন। এ নিবেদন নানা প্রকার হতে পারে। মূলত স্রষ্টার প্রতি নিজেকে উৎসর্গ করা হয়। কখনো ‘গুরু’, ‘মুর্শিদ’ বা ‘পীর’-এর প্রতিও হতে পারে। নিজেকে উৎসর্গ করার এ ধারণা সুফিবাদে দীক্ষিত সবার ভেতরেই গড়ে ওঠে। সুফিবাদ অনুসারে নিজেকে উৎসর্গ করার মধ্যেই থাকে সর্বোচ্চ আনন্দ। মুক্তি, নির্বাণ, ফানাহ—এ বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করা কঠিন কিন্তু তারই এক সহজ উদাহরণ দেখিয়ে গেছেন এক রাজকুমারী। একাধারে কবি, সংগীতজ্ঞ, গল্পকার এ নারী বিশ্বব্যাপী সিক্রেট এজেন্ট হিসেবে সমধিক পরিচিত। তিনি নূর ইনায়েত খান।
শরীরে রাজরক্ত নিয়ে জন্মেছিলেন নূর। পিতা ইনায়েত খান ছিলেন পুরোদস্তুর একজন সুফি ও সংগীতজ্ঞ। নিজের পরিবারে নূর কখনো ধর্মীয় ভেদাভেদ দেখেননি। কেননা ইনায়েত খানের স্ত্রী অর্থাৎ নূরের মা ওরা বেকার ছিলেন একজন আমেরিকান। নূর এক সময় বৌদ্ধদের ‘জাতক কাহিনী’ সংকলন করে নিজের গদ্যে লিখেছিলেন, যা ফ্রান্সের শিশুতোষ ম্যাগাজিনে ছাপা হতো। তখনো নূর হয়তো জানতেন না তিনি একটা বিশ্বযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। আর তিনি তা পালন করবেন নিবিষ্ট মনে, পূর্ণ সমর্পণের মধ্য দিয়ে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নূর বদলে গিয়েছিলেন। যুদ্ধবিদ্ধস্ত পৃথিবীতে নূর শিখেছিলেন প্রতিটি জীবনের জন্য আমাদের আরেকটি জীবন দিতে হয়। জীবন রক্ষা করার জন্য অনেককে জীবন উৎসর্গ করতে হয়। আর নিজের জীবনের শিক্ষা থেকে নূর জানতেন জীবন উৎসর্গ করার এ ইচ্ছা আসতে হয় নিজের ভেতর থেকে। তা যদি না আসে তাহলে এ উৎসর্গের কোনো অর্থ হয় না এবং যখনই একজন মানুষ মানবতার কল্যাণে, অন্যের মুক্তির জন্য স্বেচ্ছায় নিজেকে উৎসর্গ করে, তখন সে উৎসর্গে স্বর্গীয় তৃপ্তি লাভ করা যায়।
১৯১৪ সালে নূরের জন্ম হয় মস্কো শহরে। তার পরিবার যখন ফ্রান্সে থিতু হয়, তখন নূরের বয়স আট বছর। ফ্রান্সেই বেড়ে ওঠেন তিনি। নূরের পিতা ইনায়েত খান ছিলেন মহীশুরের বিখ্যাত শাসক টিপু সুলতানের সরাসরি বংশধর। সুফিবাদে দীক্ষিত হয়ে ভারতবর্ষের গন্ধ গায়ে মেখে ইনায়েত চলে গিয়েছিলেন পশ্চিমে আর সেখানেই তিনি সুফিবাদ প্রচার করেন। এর মাঝেই ওরা বেকারের সঙ্গে পরিচয়, প্রেম ও পরিণয়। তাদের প্রথম সন্তানের জন্ম হলে নাম রাখা হয় নূর-উন-নিসা। নূর ইনায়েত খান নামে পরিচিত হলেও জীবনে তাকে আরো নাম ধারণ করতে হয়েছে। ম্যাডেলিন এর মধ্যে অন্যতম।
সুফিবাদের মধ্যে বেড়ে ওঠা নূর কখনই যুদ্ধ এবং সহিংসতা পছন্দ করতেন না। মানবতাবাদী হওয়াই তার জন্য স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু যুদ্ধ সবসময় মানুষকে বদলে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ফ্রান্স এক সময় জার্মানির দখলে চলে যায়। এ সময় নূর ও তার পরিবার বাধ্য হয়ে ফ্রান্স ছেড়ে ইংল্যান্ডে বসবাস শুরু করেন। তখন ভারতবর্ষ মূলত ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল। নাৎসি জার্মানির অত্যাচার দেখে নূর ও তার ছোট ভাই বিলায়েত সিদ্ধান্ত নেন তাদের কিছু একটা করা প্রয়োজন এবং সেক্ষেত্রে ব্রিটিশ বাহিনীর হয়ে কাজ করাই স্বাভাবিক। এ ভাবনা থেকেই নূর ‘উইম্যান অক্সিলারি এয়ারফোর্স’-এ যোগদান করেন।
যে নূর ইনায়েত খানকে আজকের পৃথিবী চেনে, তার যাত্রা মূলত এখান থেকেই শুরু। প্রথমে বিমান বাহিনীতে কাজ শুরু করার পর তাকে বেতার প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়। এ সময়ে ব্রিটিশরা একটি দল গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন, যেন তারা বেতার সংকেতের মাধ্যমে যুদ্ধের খবর পাঠাতে পারে। দলটি তৈরি করা এবং SOE (Special Operations Executive)-এর এফ সেকশনের (ফ্রান্স সেকশন) প্রধান মরিস বাকমাস্টারকে এ কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়। ঠিক এ সময় চার্চিল সিদ্ধান্ত নেন ফ্রান্সে বেশ কিছুসংখ্যক নারী বেতার চালক নিয়োগ করা হবে, যারা ফ্রান্স থেকে মোর্স কোডের মাধ্যমে সংকেত প্রেরণ করবে। বেতারের কাজ শেখার পর নূরকে এ কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়। নূর ছিলেন যুদ্ধের সময়ে প্রথম ব্রিটিশ নারী বেতার অপারেটর।
চল্লিশের দশকের শুরুর দিকে সংকেত প্রেরণে ব্যবহূত এ বেতারযন্ত্রগুলোর ওজন ছিল প্রায় ৩০ পাউন্ড। একটি ব্রিফকেসে করে তা বহন করা হতো। নূর এমনই একটি ব্রিফকেস নিয়ে প্যারিসে ঘুরে বেড়াতেন। বেশির ভাগ সময়েই তিনি সাইকেল চালিয়ে শহরে চলতেন। কথিত আছে এ সময়ে শহরে চলাচলের ক্ষেত্রে বাইকারদের প্রতি ১০ মিনিট অন্তর থামানো হতো। নূরকেও এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। একবার তাকে যখন পুলিশ জিজ্ঞাসা করে, ‘এটা কি মাদাম?’ নূর কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে জবাব দেন, ‘এটি একটি ফিল্ম প্রজেক্টর’। পরবর্তী সময় কখনো কখনো বেতার ভর্তি ব্রিফকেস সম্পর্কে তার বক্তব্য হতো, ‘এটা পোর্টেবল এক্স-রে মেশিন’। মজার ব্যপার হলো পুলিশ সদস্যরা ফিল্ম প্রজেক্টর বা এক্স-রে মেশিন কোনোটাই চেনার ক্ষমতা রাখত না।
ফ্রান্সে এসে নূরের প্রথম সমস্যা ছিল একটি উপযুক্ত বাসস্থান খুঁজে বের করা। নূর সে চেষ্টা করে চলছিলেন কিন্তু এমন বাসা সহজে খুঁজে পাননি, যেখান থেকে তার কাজ করতে সুবিধা হয়। বেতার সংকেত প্রেরণের জন্য নিরাপত্তার পাশাপাশি তার প্রয়োজন ছিল একটি খোলা স্থান এবং উঁচু গাছ, যেখানে অ্যান্টেনা সেট করে সংকেত পাঠানো যায়। নূরের প্যারিস-বাসের সময় এক্ষেত্রে একটি মজার ঘটনা ঘটে। নূর তখন ৩-রিচার্ড ওয়ালেস বুলভার্দে একটি অ্যাপার্টমেন্টে বসবাস করছিলেন, যেখানে বেশির ভাগ অধিবাসী ছিল নাৎসি জার্মানির গেস্টাপো বা এসএস বাহিনীর সদস্য। একদিন একটি জরুরি বার্তা প্রেরণের সময় নূর যখন অ্যান্টেনা সেট করার চেষ্টা করছিলেন, একজন এসএস সদস্য এসে তাকে সাহায্য করেন।
সহকর্মী রেমন্ডকে নূর এ কথা বললে রেমন্ড স্বভাবতই অবাক হয় এবং নূরকে জিজ্ঞেস করে, ‘সে কেন তোমাকে সাহায্য করবে? বরং তোমাকে গ্রেফতার করার কথা ছিল!’ নূরের বক্তব্য ছিল যে লোকটি আসলে ভেবেছিল নূর হয়তো রেডিও শুনতে চেয়েছিল। যদিও তখন রেডিও ব্যবহারই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তবু নূরের এ ব্যাখ্যা শুনে রেমন্ড তাকে ওই এলাকা ছাড়ার পরামর্শ দেন।
যুদ্ধের এমন সময়ে, এমন গুরুত্বপূর্ণ এবং যুগপৎ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার সময়েও নূরের এহেন আচরণ কিছুটা অবাক করে। একে ঠিক ‘গোয়েন্দাসুলভ’ বলা চলে না। এমনকি আমরা যদি নূরের ট্রেনিং সম্পর্কিত নথির দিকে নজর দিই, সেখানেও দেখা যাবে তাকে ‘অস্থিতিশীল ও আবেগী’ চরিত্রের মানুষ বলা হয়েছে। নূর সম্পর্কে লেখা হয়েছে, ‘খুব বেশি বুদ্ধিমান না কিন্তু যথেষ্ট উদ্যমী ও পরিশ্রমী’। বেতারের মাধ্যমে সংকেত পাঠানোর ক্ষেত্রে নূর মাঝে মধ্যেই ভুল করতেন। কথা হলো এমন একজনকে কেন এ কাজে পাঠানো হলো?
প্রথমত ওই সময়ে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য ছিল জার্মানির পরিকল্পনা নস্যাৎ করা। ক্ষেত্র বিশেষে ভুল পথে চালিত করা। ফ্রান্সে তাই এমন কিছু মানুষ প্রেরণ করা প্রয়োজন ছিল, যারা ফ্রান্সকে ভালোমতো চেনে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, নূর বেড়ে উঠেছিলেন ফ্রান্সে। দেশটাকে তিনি ভালো করেই চিনতেন। পাশাপাশি নূরের চেহারায় এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল যে তাকে দেখে ঠিক ‘গুপ্তচর’ মনে হতো না। তাই মরিসের সহকারী ভেরা অ্যাটকিন্সের অন্যতম পছন্দ ছিলেন নূর ইনায়েত। যদিও ততদিনে তিনি নোরা বেকার নামে পরিচিত হয়েছেন। আর ফ্রান্সে যাওয়ার সময় তার সাংকেতিক নাম হয় ম্যাডেলিন।
শত্রু অধিকৃত অঞ্চলে এ রকম একজন এজেন্টের জীবনকাল ছিল সর্বোচ্চ ছয় সপ্তাহ। সেখানে ম্যাডেলিন ১২ সপ্তাহ পার করেছিলেন। সাধারণত ইন্টেলিজেন্সে যাদের নেয়া হয়, তাদের প্রশিক্ষণ ভিন্ন ধরনের ও দীর্ঘমেয়াদি। কিন্তু যুদ্ধকালীন তা পূর্ণ করা সবক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। ম্যাডেলিন তথা নূর ইনায়েত প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন কিন্তু মনে রাখতে হবে তিনি পেশাদার গুপ্তচর ছিলেন না। সে হিসেবে এ ১২ সপ্তাহ টিকে থেকে চালানো নূরের কার্যক্রম, প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু প্রশ্ন হলো নূর এ সামর্থ্য কোথা থেকে অর্জন করলেন?
নূরের প্রশিক্ষণ রিপোর্টে আমরা দেখি যে তিনি কিছুটা ভাবপ্রবণ হলেও তার চেষ্টা ছিল সব সময়েই। মূলত এ ঐকান্তিক চেষ্টাই তাকে টিকে থাকতে সহায়তা করেছিল। পাশাপাশি ফ্রান্স তার চেনা অঞ্চল। এখানেই বাবার তৈরি ‘ফজল মঞ্জিল’ নামের বাড়িতে তার ছেলেবেলা কেটেছে। বাবা ইনায়েত খান নূরকে শিখিয়েছিলেন অধ্যবসায়, অভিনিবেশ। পাশাপাশি নূর মন থেকেই চাইতেন নাৎসি জার্মানির এ অত্যাচার, অবমাননা থেকে যেন মানুষ দ্রুত মুক্তি পায়। তাই তিনি নিজের কাজে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন।
ফ্রান্সে প্রেরণের ক্ষেত্রে ভেরা অ্যাটকিন্স নূরের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। মরিস বাকমাস্টারকে তিনি বলেছিলেন, ‘দক্ষতা কিংবা কৌশলের দিক থেকে পিছিয়ে থাকলেও কাজের প্রতি নোরার সততা ও প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে কোনো সন্দেহ নেই। যুদ্ধে তাকে এমন কোনো দায়িত্ব দেয়া দরকার, যেখানে আরো বেশি নিবেদিতপ্রাণ কর্মী প্রয়োজন।’ অর্থাৎ ভেরার বয়ান থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, যে কাজটি নূর করতে যাচ্ছিলেন সে সম্পর্কে তার স্পষ্ট জ্ঞান ছিল এবং এখানে যে তার জীবন বিপন্ন হবে তিনি তাও জানতেন। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে নূর এক মুহূর্তেই রাজি হয়ে যান। এমনকি কাজ চলাকালীন নূরকে ফিরে আসার প্রস্তাব দেয়া হলেও তিনি তা নাকচ করেন। শত্রুর মাঝেই তখন তার বসবাস।
ইনায়েত খানের সুফিবাদ নূরকে মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব পালন, মানুষকে ভালোবাসা শিখিয়েছিল। তাই শত্রুর মাঝে থেকে নিজের জীবন বিপন্ন হবে জেনেও নূর তার পিতার শিক্ষার কথাই মনে রেখেছিলেন। ইনায়েত বলতেন, ‘‘ভালোবাসার মানুষের জন্য জীবন উৎসর্গ করা তোমাকে সাধারণ মানুষের চেয়ে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। মানুষ তখন এক ‘জাগ্রত সত্তা’য় পরিণত হয়। মানুষকে মানুষের চোখে দেখতে হয়। ভাবার প্রয়োজন নেই তারা জার্মান, ইংরেজ না ফ্রেঞ্চ। জাগ্রত সত্ত্বা কেবল ক্ষমা করতে জানে।”
পিতার এ শিক্ষা নূরের মর্মমূলে গেঁথে ছিল। তিনি জানতেন যেকোনো দিনই তার মৃত্যু হতে পারে। এ সত্য মেনে নিয়ে তিনি কাজ করে গেছেন। নিয়মিত বিরতিতে ইংল্যান্ডে খবর পাঠিয়েছেন। ফ্রান্সে ঘুরে বেড়িয়েছেন খবরের সন্ধানে। আরেকটি দায়িত্ব ছিল ফ্রান্সে থাকা অন্যান্য এজেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কখনো কখনো বাসস্থানের ব্যবস্থা করা। এসবের কারণে নূরকে অন্যান্য ফরাসির সঙ্গেও মিশতে হয়েছে। আর যখন এমন বেশি মানুষের সঙ্গে মেশা হয়, তখনই কোনো না কোনো ভুল মানুষের মাধ্যমে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে।
এজেন্টদের মধ্যে একটি প্রচলিত বিষয় হচ্ছে ডবল এজেন্ট, যারা দুই পক্ষের জন্য কাজ করে। SOE-তেও এমন ডবল এজেন্ট ছিল। হেনরি ডেরিকো নামে এক ডবল এজেন্ট নূরের খবর জার্মানদের কাছে পাচার করলে তিনি ধরা পড়ে যান। নূর একটা বড় ভুল করেছিলেন। তার কাছে কিছু বার্তা এবং কিছু কোড লেখা ছিল, যা মোটেও এজেন্টসুলভ না। এ কোড দ্বারা জার্মানরা সহজেই তার বেতার ব্যবহার করে নোরা সেজে লন্ডনে বার্তা পাঠাতে শুরু করে, কেননা ধরা পড়ার পর তিনি একটি কথাও বলেননি।
১৯৪৩ সালের ১৩ অক্টোবর ফ্রান্সে এসডির (জার্মান ইন্টেলিজেন্স) প্রধান কার্যালয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গেস্টাপো ও নাৎসি বাহিনীর অত্যাচারের বিস্তারিত না জানলেও যুদ্ধাবস্থায় একজন গুপ্তচরের প্রতি কেমন আচরণ হতে পারে, তা সবাই আন্দাজ করতে পারি। নূর সেসব অত্যাচারের মধ্য দিয়েই গিয়েছিলেন। কিন্তু জার্মান বাহিনী তার কাছ থেকে কোনো তথ্যই বের করতে পারেনি। ফ্রান্সে এসএস ফোর্সের প্রধান হ্যান্সকিফার, যুদ্ধের পরে বলেছিলেন যে নূরের কাছ থেকে শত চেষ্টায়ও কোনো তথ্য বের করা যায়নি।
নূর তার সততায় অটল ছিলেন কিন্তু তার একটা ভুলের বিপরীতে SOE আরো ভুল করে। জার্মান বাহিনীর পাঠানো সংকেতের জবাব দিয়ে বসেন মরিস বাকমাস্টার, যদিও এজেন্সির একজন জুনিয়র অফিসার জানিয়েছিলেন যে নোরার কোড কখনো এত নির্ভুল হয় না। কিন্তু বাকমাস্টার ভেবেছিলেন এটা নোরার দক্ষতার পরিচয়। ফলে নোরার পাঠানো (জার্মান বাহিনীর) স্থানাংক অনুসারে তিনজন এজেন্ট পাঠানো মাত্র তারা জার্মান বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে।
কিন্তু নূর তখন চেষ্টা করছিলেন পালিয়ে যাওয়ার। যেকোনো উপায়ে তিনি পালিয়ে যেতে চাইছিলেন। প্রথমবার গ্রেফতার হওয়ার পর ফ্রান্সে এসডি হেডকোয়ার্টার থেকে দুবার পালাতে চেষ্টা করেন। পরবর্তী সময়েও নূর তার সঙ্গী এজেন্টকে নিয়ে ২৫ নভেম্বর ফের পালানোর চেষ্টা করলে তাকে আলাদা করে কাস্টডিতে রাখা হয়। ‘বিপজ্জনক’ তকমা দিয়ে নূরকে শিকলে বেঁধে রাখা হয়। পরবর্তী সময় ডাখাও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয় এবং আরো তিনজন এজেন্টের সঙ্গে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরবর্তী সময় ছাড়া পাওয়া প্রত্যক্ষদর্শী একজন বন্দি জানান, ভিলহেম রুপার্ট নামে একজন এসএস অফিসার নূরের মাথার পেছনে গুলি করে। হত্যার আগ মুহূর্তেও তাকে উপর্যুপরি প্রহার করা হয়।
প্রশিক্ষণের সময় ‘শিশুসুলভ’ বলে আখ্যায়িত এ ‘স্পাই প্রিন্সেস’ একদিকে যেমন ইংল্যান্ডের হয়ে বার্তা সরবরাহ করেছেন, তেমনি যোগাযোগ রেখেছিলেন ফ্রান্সের ‘প্রতিরোধ’ বাহিনীর সঙ্গে। জার্মান বাহিনীর বিরুদ্ধে যতটা সম্ভব কাজ করার চেষ্টা তিনি করেছেন। যে সময়ে SOE তাকে ফ্রান্সে প্রেরণ করে, সে সময় একজন নারী অপারেটরকে প্রেরণ করার কথা না কিন্তু দিনদিন নিজেকে যোগ্য করে নূর প্রমাণ করেছিলেন আত্মনিবেদন। নূর বলতেন, ‘এটা আমার কাছে বীণা বাদনের মতো।’
ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে সর্বশেষ শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন টিপু সুলতান। তারই রক্ত ধারণ করতেন নূর ইনায়েত খান। সেই রক্তের তেজের সঙ্গে সুফি দর্শন মিশে গিয়েছিল। পাশাপাশি সংগীত, জাতক কাহিনী, ভারতের পুরাণ সম্পর্কেও জানতেন নূর। সেখান থেকেই মানুষকে ভালোবাসতে শিখেছিলেন, আত্মনিবেদন শিখেছিলেন। মরিস বাকমাস্টার কিংবা সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে নূরকে দুর্বল মনে হতে পারে কিন্তু মানসিক দিক থেকে তিনি ছিলেন দৃঢ় এবং তা প্রমাণ হয়েছিল এসওইর সঙ্গে নূরের সাক্ষাত্কারে।
নূর যখন ব্রিটিশদের হয়ে কাজ করতে যাচ্ছেন, সে সময় ভারতে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন চলছে। এ প্রসঙ্গেই নূরকে প্রশ্ন করা হয়, তিনি ভারতের নেতাদের সমর্থন করেন কিনা। নূরের জীবনীকার শ্রাবণী বসুর ভাষ্য অনুসারে নূর বলেছিলেন, ‘অবশ্যই করি। কিন্তু এখন যখন ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হচ্ছে, আমি ব্রিটিশদের পক্ষে কাজ করতে চাই। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে আমি ভারতের নীতি সমর্থন করব।’ ব্রিটিশ এজেন্সি নূরের এ সরাসরি উত্তর পছন্দ করেছিল।
গুপ্তচরের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ না থাকা সত্ত্বেও নূর নিজেকে ধরে রেখেছিলেন তার মানসিক শক্তির মাধ্যমে। কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের অত্যাচার সহ্য করেও তিনি অটল ছিলেন, কেননা তার মন থেকে জানতেন তিনি স্বাধীনতা চান। সে স্বাধীনতার জন্যেই নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন নূর। সুফিবাদের মধ্য দিয়েই তিনি শিখেছিলেন মানুষের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে পরিপূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যায়। সম্ভবত এ সময়ে নূর সে উপলব্ধিকে ছুঁতে পেরেছিলেন। তার জন্য এখানেই ছিল নির্বাণ কিংবা ফানাহ। নূরের ভাগ্নে পীর জিয়া ইনায়েত খান বলেন, ‘মৃত্যুকে তিনিও ভয় পেতেন। কিন্তু বিশ্বাসের বলে বলীয়ান হয়েছিলেন।’
নূর নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন মানবতার জন্য। তিনি বিশ্বাস করতেন, তিনি মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করেছেন। তাই মৃত্যুর আগে তিনি শেষ যে শব্দটি উচ্চারণ করেছিলেন, তা ছিল Liberte, স্বাধীনতা।
মাহমুদুর রহমান: লেখক





