ইউরোপীয় বণিকরা বাণিজ্যের সুবিধার জন্যই ক্রমে এ দেশের স্থানীয় রাজনীতি ও শাসনকাজে হস্তক্ষেপ শুরু করে। ২৩ জুন ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলায় ইংরেজ শাসনের সূচনা হয়। তার আগের বছর ১৭৫৬ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে বাংলার নবাব হন সিরাজউদ্দৌলা। নবাব হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। সিরাজের বড় খালা ঘসেটি বেগম, প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খানের মতো ঘনিষ্ঠজনেরা ছিলেন পলাশীর যুদ্ধের মূল চক্রান্তকারী। এ সময় নানা কারণে নবাবের সঙ্গে ইংরেজ বণিকদের বিরোধ দেখা দেয়। ইংরেজদের সঙ্গে নবাববিরোধী শক্তিগুলো একজোট হয়ে ষড়যন্ত্রে যোগ দেয়। ফলে ২৩ জুন ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে নবাবের সৈন্যদের সঙ্গে ইংরেজদের যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে প্রধান সেনাপতি মীর জাফর, ঘসেটি বেগমসহ বিশ্বস্ত মানুষের বিশ্বাসঘাতকতায় নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত ও নিহত হন।

সে সময়কার ঘটনাপ্রবাহ খুব গুরুত্বসহকারে ইউরোপজুড়ে বিভিন্ন পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হতো। তবে আজকের মতো তখন যেহেতু প্রযুক্তিগত উন্নতি ঘটেনি, তাই সংবাদের জন্য নির্ভর করতে হতো এখানকার ব্যবসায়ী বা যাত্রীবাহী জাহাজ ইউরোপে যাওয়া পর্যন্ত। বিশেষ করে ভারতবর্ষে সে সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চলমান ব্যবসার ফলে তাদের প্রচু্র জাহাজ আসা-যাওয়া করত নিয়মিত সাগরপথে। সেসব জাহাজের মাধ্যমেই ব্রিটিশ উপকূলের অধিবাসীরা জানতে পারত বিশ্বজুড়ে ব্রিটিশ শাসনের হালচাল। তবে এ সংবাদগুলোয় স্বাভাবিকভাবেই কোম্পানির প্রতি পক্ষপাতিত্ব থাকত, কেননা তাদের পাঠানো খবরগুলোই তখন বেশির ভাগ ব্রিটেন ও ইউরোপজুড়ে প্রচারিত হতো।

‘‌স্কটস ম্যাগাজিন’-এর ১৭৫৭ সালের মে মাসের একটি সংখ্যায় এ রকমই একটি ঘটনা ছাপা হয়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজ পোর্টফিল্ড, এডকট এবং চেস্টারফিল্ড মালাবার ও করমন্ডল উপকূল থেকে ১৭৫৭ সালের মে মাসের শেষ দিকে লিমেরিক, আয়ারল্যান্ডে পৌঁছেছিল। সেখান থেকে তারা ভারতবর্ষের তৎকালীন বঙ্গ অঞ্চলের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্গ ও বসতিগুলোর পতনের খবর পায়। একটি চিঠিতে এ ঘটনা এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে:

১৭৫৬ সালের মে মাসের শেষ দিকে সাবেক নবাব (আলীবর্দী খাঁ) মারা যান এবং তার নাতি (সিরাজউদ্দৌলা) নবাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। ক্ষমতা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি কোনো কারণ ছাড়াই কাশিমবাজার আক্রমণ করেন। তার অজুহাত ছিল তিনি গভর্নর ড্রেকের কাছে অনেকবার অপমানিত হয়েছেন। আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুর্গ না ছাড়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হওয়ায় নবাব একটি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব করেন এবং আমাদের প্রধান কর্মকর্তা মিস্টার ওয়াটসকে বিষয়টি সমাধানের অজুহাতে তার তাঁবুতে আমন্ত্রণ জানান। যখন মিস্টার ওয়াটস নবাবের তাঁবুতে যান, তখন তাকে একটি কাগজে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়, যে কাগজে উল্লেখ ছিল তিনি নবাবের কাছে অনেক টাকা দেনা রয়েছেন। এরপর তাকে কাউন্সিলের দুই সদস্য মিস্টার কলেট ও মিস্টার ব্যাটসনকে নবাবের তাঁবুতে ডাকার জন্য বলা হয়।

যখন তারা নবাবের তাঁবুতে উপস্থিত হন, তখন নবাব মিস্টার ব্যাটসনকে বন্দি করে মিস্টার কলেটকে ফেরত পাঠান। তাকে বলা হয় দুর্গের কামান, গোলাবারুদ ইত্যাদি রেখে সরে যাওয়ার জন্য। ৪ জুন কাশিমবাজার দুর্গ সমর্পণ করা হয়, যদিও অনেকেই জোরালোভাবে এর বিরোধিতা করেছিলেন। এ অভিযান সফলভাবে শেষ হওয়ার পর নবাব তার ৭০ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে রাজধানীর উদ্দেশে ফিরে যান এবং ইংরেজদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেন।

১৫ জুন নবাব সিরাজউদ্দৌলা কলকাতা শহরের প্রবেশদ্বারে একটি দুর্গ আক্রমণ করেন, কিন্তু তার ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং তিনি পরাজিত হন। পরদিন নবাব আমাদের বাহিনীর অগ্রবর্তী অবস্থানগুলোয় আক্রমণ করেন, যেমন জেলখানা বা আদালতের কাছের অংশে। সেখানে নবাবের সৈন্যরা তীব্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হন। তবু ১৮ জুন নবাব আরেকটি আক্রমণ চালালে বাহিনী তাদের অবস্থান থেকে পিছু হটে এবং নবাবের বাহিনীকে শহরের মধ্যে প্রবেশের সুযোগ দেয়।

পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে একটি মিটিং ডাকা হয়, যেখানে ট্রেনের ক্যাপ্টেন জানিয়ে দেন, দুর্গে মাত্র তিনদিনের গোলাবারুদ আছে। এ কারণে নারীদের নিরাপদে জাহাজে করে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়। গভর্নর ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা দুর্গে ২৫০ জন সৈন্য রেখে জাহাজে করে পালিয়ে যান। ২০ জুন সন্ধ্যায় গোলাবারুদ প্রায় শেষ হয়ে গেলে শান্তি পতাকা উত্তোলন করা হয়। শান্তি আলোচনা চলার সময় পেছনের দরজায় পাহারারত ডাচ রক্ষী বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং আমরা নবাবের শক্তিশালী বাহিনীর সামনে বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হই। সেদিন রাতেই ৫০ জন আঁটবে এমন একটি ছোট গর্তে আমাদের প্রায় ১৭০ জনকে জোর করে আটকে রাখা হয়, পরের দিন সকালে সেখানে আমরা শুধু ১৬ জন বেঁচে ছিলাম, বাকিরা দম বন্ধ হয়ে মারা গিয়েছিল।

পুরো চিঠি থেকে প্রাপ্ত ঘটনাটিতেই নবাব সিরাজউদ্দৌলার নির্মম পরিচয় ফুটে ওঠে, যা আজকের যুগের অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ঠেকতে পারে।

১৭৫৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর পূর্ব ইন্ডিজ থেকে পাঠানো অন্য একটি চিঠিতে কিছু সারাংশ পাওয়া যায়, যা অক্টোবরে গভর্নর ও কাউন্সিলের কাছে পৌঁছেছিল। একই পত্রিকায় সে চিঠিটিও প্রকাশিত হয়েছিল। সে চিঠির বক্তব্য ছিল এমন:

‘‌সম্ভবত বেঙ্গলে গভর্নর ও কাউন্সিল একজন পদচ্যুত নবাবকে (কিছু চিঠির মতে, এ লোক ছিলেন পদচ্যুত প্রধান কর্মকর্তা বা প্রধানমন্ত্রী) তার উত্তরসূরি তরুণ নবাবের প্রতিশোধের হাত থেকে রক্ষা করে আশ্রয় দিয়েছিলেন। নতুন নবাব ওই পুরনো নবাবকে ফেরত চাইলে ইংরেজরা তাকে হস্তান্তর করতে অস্বীকার করে। ফলে নবাব ৩০ হাজার ঘোড়সওয়ার, একই সংখ্যক পদাতিক সৈন্য এবং প্রায় ৩০০-৪০০ হস্তীবাহিনী নিয়ে একটি বাহিনী গঠন করেন। ইংরেজরা তাদের সংখ্যা জানার জন্য গুপ্তচর পাঠালেও সঠিক তথ্য শত্রু তাদের কাছে চলে আসার আগে জানতে পারেনি। নবাব নিজেই দুর্গে এসেছিলেন পদচ্যুত পুরনো নবাবকে (বা পদচ্যুত মন্ত্রীকে) নিয়ে যাওয়ার জন্য আর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে শর্ত পূরণ হলে তাৎক্ষণিক নবাবের সেনাবাহিনী ফিরে যাবে। কিন্তু পরে এ প্রতিশ্রুতি অস্বীকার করা হয়। নবাবের সেনারা দুর্গের বিপরীতে একটি ছোট রক্ষাকবচ তৈরি করে এবং সেখানে দুটি ১২ পাউন্ডের কামান স্থাপন করে। তারা প্রতি ঘণ্টায় দুই-তিনটি করে গোলা ছুড়ছিল। কিন্তু কেয়ামত পর্যন্ত গুলি চালালেও দুর্গে কোনো ফাটল তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। তবে চূড়ান্ত আক্রমণ হওয়ার আগেই গভর্নর পরের দিন সকালে একটি জাহাজে পালিয়ে যান এবং কাউন্সিলর ও তাদের স্ত্রীরা বিকালে মিস্টার হলওয়েলকে একা ফেলে পালিয়ে যান। মিস্টার হলওয়েল বলেছিলেন, তিনি এখানে রয়ে যাবেন এবং শেষ পর্যন্ত ইংরেজদের দুর্গ রক্ষা করবেন।

অবশিষ্ট সেনাদের নিয়ে মিস্টার হলওয়েল জরুরি কাউন্সিল গঠন করেন। সেনারা পালানোর অনুমতি না পাওয়ায় অসন্তুষ্ট হলে তিনি তাদের মাঝে দুর্গে থাকা ধনসম্পদ ভাগ করে দেন এবং গেটের চাবি নিজের কাছে নিরাপদে রেখে দেন। সম্ভবত যুদ্ধের তৃতীয় দিন আমাদের অধিকাংশ সৈন্য মারা যায় এবং বাকি সবাই আহত হয়। মাত্র ২ ঘণ্টার গোলাবারুদ অবশিষ্ট থাকায় মিস্টার হলওয়েল সম্মানজনকভাবে পিছু হটার পরিকল্পনা করেন ও শত্রুকে বিভ্রান্ত করতে শান্তি পতাকা ওড়ান। কিন্তু নদীতে থাকা পলায়নরত জাহাজগুলো দুর্গ থেকে কয়েক মাইল দূরে চলে গিয়েছিল এবং অন্যদের পালানোর জন্য একটি নৌকাও তারা রেখে যায়নি। চাবি মিস্টার হলওয়েলের কাছে থাকায় সেদিন রাতে সৈন্যরা ছোট গেটের তালা ভেঙে ফেলে এবং মোগলদের (পত্রিকায় ‘মোগল’ লেখা হয়েছিল) ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়। মোগলরা সঙ্গে সঙ্গেই সেনাদের লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে একটা ব্ল্যাকহোল নামের গর্তে আটকে রাখে। কিন্তু পরের দিন গর্তে আটকে রাখা ১৭০ জনের মাঝে মিস্টার হলওয়েল ও বারডেট নামের একজন লেখকসহ মাত্র ১৬ জন জীবিত বের হয়ে আসেন।

ঘটনাগুলোর বিবরণ থেকে একটা জিনিস স্পষ্ট বোঝা যায়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত গভর্নর ও সরকারি চাকরিজীবীদের বেশির ভাগই ছিলেন ভিতু, যারা বিপদের মুখে সাধারণ সৈন্যদের ফেলে নিজেরা পালিয়ে বাঁচার ক্ষেত্রে বেশি সচেষ্ট থাকতেন। চিঠির মাধ্যমে পাওয়া সংবাদ প্রকাশের সময়ও বিষয়গুলো লুকানোর চেষ্টা করেননি সাংবাদিক বা সে আমলের খবর সংগ্রাহকরা। উল্লিখিত দুটি চিঠির বরাতে ঘটনাগুলো ভিন্ন কিছু স্কটিশ পত্রিকায়ও জায়গা পেয়েছিল।

প্রকাশিত সংবাদগুলো থেকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নবাবকে সহায়তা করার ব্যাপারে ফরাসিদের যুক্ত থাকার প্রমাণ এমনকি ফ্রেঞ্চদের সঙ্গে বড়সড় কিছু যুদ্ধও হয়েছিল ইংরেজদের। ১৭৫৭ সালের ৬ অক্টোবর ‘‌এডিনবার্গ ইভনিং ক্যুরন্ট’ পত্রিকায় একটি চিঠি প্রকাশিত হয়, যা রাজকীয় জাহাজ কেন্টে অবস্থান করা একজন নাবিক লিখেছিলেন তার ঊর্ধ্বতনদের উদ্দেশে। চিঠির তারিখ ছিল ৮ এপ্রিল ১৭৫৭; তখন জাহাজটি কলকাতায় অবস্থান করছিল। চিঠির ভাষ্য ছিল এমন—

স্যার, আমরা চন্দননগরের একটি ফরাসি বসতি দখল করেছি, যেখানে আমাদের ২৫ জন সৈন্য নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ৬০ জন আহত হয়েছেন। টাইগার জাহাজও প্রায় সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কেন্ট জাহাজের গায়ে ১৩৮টি গোলার আঘাত লেগেছে। তার সব মাস্তুল ক্ষতিগ্রস্ত এবং জাহাজের দড়ি অনেকটাই কাটা পড়েছে। আমাদের কোয়ার্টার ডেক প্রায় শূন্য হয়ে গেছে। সেখানে অবস্থানরত অনেক লেফটেন্যান্ট নিহত হয়েছেন। তবে পুরোটা সময় অ্যাডমিরাল ওয়াটসন খুব শান্ত ও অবিচল ছিলেন। এমনকি একবার ফ্রেঞ্চ একজন অফিসার টার্গেট করলে তাকে যখন সাবধান করা হয় তিনি স্থির দাঁড়িয়ে হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘‌ওরা অন্তত একজনকে তাহলে সৎভাবে মারতে সক্ষম হবে।’ টাইগার জাহাজের অ্যাডমিরাল পোকক সামান্য আহত হলেও জাহাজের মাস্টার ও বাবুর্চি নিহত হয়েছিলেন।

আমরা পলাশীর যুদ্ধকে একদিনের বা একটি যুদ্ধ হিসেবে আজকাল অনেকে ভাবলেও মূলত এ যুদ্ধ ছিল দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সংঘর্ষের ফলাফল। সে সময়কার চিঠি ও সংবাদপত্র থেকে যার অনেকখানি চিত্রই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ফাহাদ হৃদয়: প্রতিবেদক, বণিক বার্তা