বঙ্কিমোক্ত ‘বাবু’ এবং বাঙালি ভদ্রলোক মোটেই এক প্রকৃতির মানুষ নন— শিবনারায়ণ রায়
ভদ্রলোক কে? প্রশ্নটির উত্তরে সাধারণ যে চিত্রটি আমাদের চোখে ভেসে আসে, তাহলো ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত, ব্রিটিশ সরকারের অনুগত, কখনো পশ্চিমা সংস্কৃতি দিয়ে প্রভাবিত নগর কলকাতাকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা একটি সামাজিক বর্গ। এই বর্গের সদস্যরা শুরুতে ছিলেন মূলত উঁচু জাতের হিন্দু। বাংলাপিডিয়ায় সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন—
‘ভদ্রলোক ঔপনিবেশিক শাসনের অভিঘাতে সামাজিক বিবর্তন ধারায় নবোত্থিত ইংরেজি শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণী। প্রাক্-আধুনিক যুগে সংস্কৃত ভাষায় ভদ্র শব্দটি একাধিক অর্থে ব্যবহূত হতো, যথা— বসতভিটা ও ভূসম্পত্তির মালিক ইত্যাদি। নবাবি যুগে কেউ যখন তার বাস্তুভিটা জমিদারের কাছ থেকে নিষ্কর সুবিধা লাভ করত, তখন তার ওই বসতবাটি সমাজে পরিচিতি পেত ভদ্রাসন বলে। ভদ্রাসনের অধিকারী হলেন ভদ্র এবং তা থেকেই ‘ভদ্রলোক’ পরিভাষার উদ্ভব। আবার ভদ্রলোক শব্দটি বিশেষ ব্যক্তির সুরুচি ও সদাচরণও বোঝাত। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ভদ্রলোক একটি সামাজিক শ্রেণী হিসেবে বিকাশ লাভ করতে শুরু করে। তাদের বৈশিষ্ট্য হলো বিদেশীদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করে অর্জিত অর্থবলে ভূসম্পত্তি লাভ এবং ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে সরকারি চাকরি লাভ। উনিশ শতকের মধ্যভাগে এসে ভদ্রলোক একটি সামাজিক শ্রেণীতে পরিণত হয়। ভদ্রলোকের বৈশিষ্ট্য দাঁড়ায় ইংরেজি শিক্ষা, শহরে আবাস এবং সরকারি চাকরি।
প্রাতিষ্ঠানিক অর্থে ভদ্রলোক শব্দটির সঙ্গে আমাদের প্রথম পরিচয় ঘটে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৭৮৭-১৮৪৮) লেখায়। তিনি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র কাঠামোয় স্থাপিত নতুন দেশীয় কেরানি, ক্ষুদ্র আমলা, কর্মকর্তা-কর্মচারী, নব্য ব্যবসায়ী ও নব্য জমিদার, ঠিকাদার প্রভৃতি শ্রেণীকে ব্যঙ্গ করে সামষ্টিকভাবে ‘ভদ্রলোক’ বলে আখ্যায়িত করেন। তার ব্যঙ্গ রচনা কলিকাতা কমলালয় (১৮২৩), নববাবুবিলাস (১৮২৫), নববিবিবিলাস (১৮৩১) প্রভৃতি গ্রন্থের বিষয় হচ্ছে নব্য ভদ্রলোক। তার বর্ণনায় ‘ভদ্রলোক’ ইউরোপীয়দের সাহচর্যে এসে রাতারাতি প্রচুর ধন-সম্পদের অধিকারী হন। শ্বেতাঙ্গ প্রভুর প্রভাবে এ নব্য ভদ্রলোক শ্রেণী তাদের পিতৃপুরুষদের ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি বেশ অনীহ, এজন্য তারা সনাতন বনেদি সমাজের নিকট হাস্যাস্পদ ও সম্মানহীন।
ইতিহাসবিদ এবং সমাজবিজ্ঞানীদের অনেকে মনে করেন, বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণীটি একটি বিশেষ কারণে ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তারাই এশিয়ার প্রথম কোনো সামাজিক গোষ্ঠী, যাদের মানসিক জগৎ পশ্চিমাদের সঙ্গে মেলামেশার প্রেক্ষিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। অর্থাৎ ভদ্রলোকরা ছিলেন ঔপনিবেশিক শাসনের একটি ফসল। তবে ভদ্রলোক টার্মটিকে সংজ্ঞায়িত করা বা এ শ্রেণীর মানুষদের নির্দিষ্ট করা কঠিন। কারণ, ভদ্রলোক বর্গটির মধ্যে সামাজিক অবস্থান, সম্পর্ক, বাণিজ্য ও আমলাতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্ক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে অনেক পার্থক্য ছিল।
‘ভদ্র’ সংস্কৃত শব্দ, যার অর্থ মোটাদাগে মার্জিত রুচি, সদাচারসম্পন্ন, শুভ, মঙ্গলজনক। উনিশ শতকের বাংলায় শুদ্ধ, সমাজে মর্যাদাবান, সম্পত্তির অধিকারী ভদ্রলোকরা ছোটলোক বা নিম্নবর্গের মানুষের চেয়ে পৃথক ছিলেন। ভদ্রলোকরা আবার দুটি বিস্তৃত ভাগে বিভক্ত ছিলেন— একটি অংশ ছিলেন অভিজাত ভদ্রলোক, আরেকটি গৃহস্থ বা মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক। অভিজাত অংশটি আঠারো শতকের শেষভাগ এবং উনিশ শতকের শুরুর দিকে ব্রিটিশদের ব্যবসায়িক এজেন্ট হিসেবে অর্থসম্পদের মালিক হয়েছিলেন। অন্যদিকে মধ্যবিত্ত অংশটি ছিল ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত, পেশাজীবী, যারা মূলত বেতননির্ভর। তাদের মধ্যে মূলত এ মধ্যবিত্তরাই ভদ্রলোক টার্মটির মূল হকদার হয়ে ওঠেন। সুমিত সরকার বলেছেন, ‘এই মধ্যশ্রেণী বা মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকদের দুনিয়ার অবস্থান ছিল দিওয়ান ও বানিয়াদের আভিজাত্যের নিচে এবং শহর বা গ্রামে কায়িক পরিশ্রম করা নিম্নবর্ণ ও মুসলিমদের ওপরে।’
উনিশ শতকের মধ্যভাগ নাগাদ ভদ্রলোকদের বেশির ভাগই আমলা, বুদ্ধিবৃত্তি এবং বিভিন্ন পেশাজীবীতে পরিণত হয়েছিলেন। আর কিন্তু পুঁজির ব্যবস্থাপক বা উদ্যোক্তা হননি। তবে তাদের কারো কারো জমিজমা থেকে আয় আসত। ইংরেজি শেখাটা ছিল ভদ্রলোকের সমাজে যুক্ত হওয়ার প্রাথমিক শর্ত। কারণ, ভদ্রলোকের পেশা যেমন— আইন ব্যবসা, শিক্ষকতা, চিকিৎসা, সাংবাদিকতায় যুক্ত হতে ইংরেজি জানতেই হবে। সরকারি বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পিয়নের কাজ করতেও ইংরেজি জানাটা প্রয়োজন ছিল। হেয়ার কলেজের অবৈতনিক শিক্ষা এ সময় ভদ্রলোক হতে চাওয়াদের আরাধ্য ছিল। অন্যদিকে ভদ্রলোকরা নিজেরাও ইংরেজি শিক্ষার বিস্তারে অসংখ্য স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এই ভদ্রলোক শ্রেণী যে শুধু কর্মসংস্থানের জন্যই ইংরেজি শিক্ষাকে গ্রহণ করেছিল তা নয়, বরং এটি ছিল বাঙালির একটি আধুনিক পরিচয় গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা, যা ঔপনিবেশিক আবহাওয়ায় বিকশিত হয়েছিল।
তবে কয়েক দশকের মধ্যেই ভদ্রলোকরা কর্মসংস্থানের ব্যাপারে সংকটে পড়ে যান। শিক্ষিতদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ না বৃদ্ধি পাওয়ায় সংকট সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে ভারতীয়রা যত শিক্ষিতই হোক না কেন, বেশি উচ্চপদে তারা কখনই নিয়োগ পেতেন না। ১৮৮০ থেকে শিক্ষিত বেকার ভদ্রলোক তরুণদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে।
উনিশ শতকের বাংলার শিক্ষার বিস্তারে ভদ্রলোকদের ভূমিকা মূল্যায়ন করে পরমেশ আচার্য লিখেছেন, ‘হয়তো চার্লস গ্রান্ট, মেকলে এবং ট্রেভেলিন ঔপনিবেশিক আমলে ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থার আদর্শ প্রস্তাব করেছিলেন, কিন্তু মজার ব্যাপার হলো চার্লস গ্রান্টের পরিকল্পনা অনুসারে ইংরেজিকে নিম্নস্তরে শিক্ষার যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে চালু করার প্রকল্প বাতিল হয়ে গিয়েছিল। তখন এই ভদ্রলোকরাই ঔপনিবেশিক শাসকদের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে রাজি করিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, এই বাঙালি ভদ্রলোকরা ছিলেন ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রথম ফসল।’
এ সমালোচনামূলক মূল্যায়নের সঙ্গে এটাও জানিয়ে রাখা প্রয়োজন, এই ভদ্রলোকরাই এ উপমহাদেশের প্রথম আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দুনিয়ার দ্বিতীয় ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ ইনস্টিটিউট, ইংরেজি ভাষায় শিক্ষা প্রদানকারী প্রথম ভারতীয় কলেজও বাঙালিরা প্রতিষ্ঠা করেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মার্কাস ফ্রান্ডা বলেন, ‘উনিশ ও বিশ শতকে বাংলার মতো আর কোনো রাজ্য ভারতের জন্য এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ নেতা তৈরি করতে পারেনি।’
ভদ্রলোকদের ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ এবং চর্চা নিয়ে শিবনারায়ণ রায়ের একটি পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি লিখেছেন, “মুখ্যত ইংরেজি শিক্ষার ফলেই এ দেশের শিক্ষিত মনে পরাধীনতা বিষয়ে গ্লানিবোধ এবং রাষ্ট্রিক স্বাধীনতা অর্জনের অভীপ্সা ক্রমে প্রবল হয়ে ওঠে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও লক্ষণীয় যে শিক্ষিত বাঙালির কাছে লৌকিক জীবনে উত্কর্ষের মডেল ছিল শিক্ষিত ইংরেজ। যে সব গুণ অর্জনের ফলে নিতান্ত ক্ষুদ্র দ্বীপবাসী ইংরেজ বিরাট সাম্রাজ্যের অধিকারী হয়— বিজ্ঞান চর্চা এবং তার ব্যবহারিক প্রযুক্তি; ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং সুনিপুণ সংগঠন শক্তি, প্রাতিস্বিক উদ্যোগ এবং অদম্য কর্মশক্তি, সময়নিষ্ঠা এবং দায়িত্ববোধ ইত্যাদি— সেগুলির অর্জন ও অনুশীলন শিক্ষিত বাঙালির কাম্য হয়ে ওঠে। রামামোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, ব্রাহ্মসমাজের নেতৃবৃন্দ, রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এই মডেলের অতি সুফলপ্রসূ প্রভাব দেখতে পাই।... মোদ্দা কথা এই অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে বাঙালির জাতীয়তাবাদে ইংরেজ বিদ্বেষ এবং ইংরেজ প্রীতি প্রায় অচ্ছেদ্যভাবে মিশে যায়।”
পার্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা তিথী ভট্টাচার্য অবশ্য ভদ্রলোকের এ সহজ শ্রেণীকরণে আগ্রহী নন। তার কথায়, “নিও-ওয়েবারিয়ান এবং পোস্ট-কলোনিয়াল চিন্তা পদ্ধতিতে ভদ্রলোক টার্মটি স্বাধীনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছে যে ভদ্রলোক হচ্ছে বা ছিল একটি ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল, যারা সাংস্কৃতিক বা অর্থনৈতিকভাবে সমান না হলেও একই ধরনের সামাজিক অবস্থান ধারণ করত। পণ্ডিতদের করা ভদ্রলোকদের এই সমধর্মী, সরল শ্রেণীকরণের উৎস ‘ভদ্রলোক’ টার্মটি নিয়ে তাদের মৌলিক বিভ্রান্তি। ভদ্রলোক মূলত একটি এথিক বা একটি মনোবৃত্তি, যা বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ বিভিন্ন কারণে ধারণ করতেন, কিন্তু পণ্ডিতরা এদের একটি সামাজিক সমষ্টি, এমনকি একটি একক শ্রেণী হিসেবে গণ্য করেছেন। উনিশ শতকের ব্রিটিশ সমাজ ভাষ্যকাররাও ‘ভদ্রলোক’-এর শ্রেণীকরণ করতে গিয়ে একই ভুল করেছেন।”
প্রতিষ্ঠিত ধারণা অনুসারে ভদ্রলোক মানে সরকারি চাকুরে, গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, পেশাজীবী, ব্যাংকার, সরকারি বা বেসরকারি দপ্তরের কেরানি কিংবা শিক্ষক।
তিথী ভট্টাচার্য তার গবেষণার উপসংহারে বলেছেন, ‘ভদ্রলোকরা ছিলেন জমি থেকে খাজনা-ভাড়া পাওয়া একটি পরজীবী এবং পেটি বুর্জোয়াদের সমন্বিত শ্রেণী। এরা একত্রিত হয়েছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতির সাধারণ আদর্শকে সামনে রেখে। ভদ্রলোকদের কাছে শিক্ষার গুরুত্ব ছিল নানামুখী— উদ্দেশ্য এবং প্রয়োগে। জমির আয় থেকে আর্থিকভাবে সচ্ছল এই শ্রেণীটির জন্য শিক্ষা, লেখাপড়ায় যুক্ত হওয়াটা তাদের জন্য কোনো অবশ্য প্রয়োজনীয় বিষয় ছিল না। অন্যদিকে চাকরিজীবী শ্রেণীর জন্য শিক্ষা কেবল জীবিকা নির্বাহের উপায়ই ছিল না, একই সঙ্গে এটা ছিল তাদের আত্মপরিচয়। ভদ্রলোক বর্গটির উপরের স্তরে থাকা জমির মালিকরা তাদের জমি থেকে যে ভাড়া/খাজনা পেতেন, তা দিয়ে বিলাসী জীবনযাপন সম্ভব ছিল না, তবে শহরের নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ ছিল। ভদ্রলোকদের প্রথম দিককার প্রজন্মগুলোর জন্য সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্জনের দুয়ার ছিল হিন্দু কলেজ, কারণ এই কলেজ থেকে পাস করা মানে ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রে তার প্রবেশ করাটা প্রায় নিশ্চিত ছিল।’
তিথী ভট্টাচার্যের মতে, ‘ভদ্রলোক বা এই নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণীটি উনিশ শতকে শাসক শ্রেণী ছিল না আবার বিকাশমান বুর্জোয়াদের বৈশিষ্ট্যও তাদের ছিল না। ঔপনিবেশিক শাসকদের থেকে এরা দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষিতে ভিন্নতর ছিল। প্রথমটি ছিল ক্ষমতার ধরন। এই ভদ্রলোক বা মধ্যবিত্তরা কেবল হুকুম তামিল করত। নীতিনির্ধারকরা যে কাঠামো তৈরি করে দিয়েছিলেন, এরা তার মধ্যেই নড়াচড়া করতেন। সুপারিশ সংস্কৃতি এবং ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত কাজ— এই দুই শ্রেণীর ক্ষমতাবানদের পার্থক্য স্পষ্ট করে দেয়।’
কেরানি পুরান উপহাস করে জানাচ্ছে, চাকরির জন্য শিক্ষা বা মেধা কোনোটারই দরকার নেই; যা দরকার তা হলো সামান্য কিছুটা দক্ষতা, সালাম, তৈল মর্দন, জায়গামতো উপঢৌকন এবং সাহেবদের প্রসন্ন দৃষ্টি। এ অনুগ্রহের অর্থনীতিতে মধ্যবিত্তের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। যেমন— সুমিত সরকার বিদ্যাসাগরের চাকরি জুটিয়ে দেয়ার ক্ষমতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ১৮৪০ এবং ৫০-এর দশকে বিদ্যাসাগরের সুপারিশ অনেকের চাকরির বন্দোবস্ত করে দিয়েছে। একবার বিদ্যাসাগর অসুস্থ হয়ে দুই সপ্তাহ বাসায় ছিলেন। এ সময় দিনে চাকরির জন্য তার সুপারিশ প্রার্থনা করে গড়ে ২৫টি অনুরোধ আসত। এ শ্রেণীর অন্য প্রভাবশালীদেরও এ রকম চাকরির জন্য সুপারিশ করার ক্ষমতা ছিল। তবে এসব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাটি কিন্তু গোরা সাহেবদের হাতেই থাকত। যেই আমলাতন্ত্রের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক ছিল, তাদের নানা বিধিনিষেধের কারণেই বিদ্যাসাগর ১৮৫৭ সালে তার সব দাপ্তরিক পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। অর্থাৎ ভদ্রলোকরা প্রকৃত অর্থে শাসনক্ষমতা ধারণ করতেন না।
তিথী ভট্টাচার্য ভদ্রলোকদের দ্বিতীয় যে বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন, তা হলো এ শ্রেণীর মধ্যে বিকাশমান বুর্জোয়া তৈরি হওয়ার লক্ষণ অনুপস্থিত ছিল। এদের মধ্যে বুর্জোয়া হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুগত এবং মতাদর্শগত প্রত্যয়ের অভাব ছিল। এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন অমিয় বাগচী। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ঔপনিবেশিক শক্তি এমন একটি রাজনৈতিক অর্থনীতি নির্মাণ করেছিল, যার বাজার ও কাঠামো ভদ্রলোকদের বুর্জোয়া হয়ে উঠতে দেয়নি। রাজনৈতিক নিপীড়ন অর্থনীতির স্বাভাবিক বিকাশ রুদ্ধ করেছিল।
তিথী ভট্টাচার্যের আলোচনার শেষ অংশে তিনি ভদ্রলোকদের রাজনৈতিক প্রভাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টির কথা উল্লেখ করেছেন। তিথী ভট্টাচার্য সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়, তাতে তিনি বামপন্থী মতাদর্শের মানুষ বলেই প্রতিভাত হয়। ভদ্রলোক নিয়ে তার আলোচনাতেও তার মতাদর্শের ছাপ রয়েছে। তিনি যে ভদ্রলোকদের অর্থনৈতিক শ্রেণীকরণ নিয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন, সেটা হয়তো তার মতাদর্শের কারণেই। যাহোক তিথী মনে করেন, এই ভদ্রলোকরাই জাতীয়তাবাদের বিকাশে ভূমিকা রেখেছিলেন, আর জাতীয়তাবাদ হলো এমন এক মতাদর্শ, যার মাধ্যমে একদল মানুষের নানা ধরনের পার্থক্যকে চাপা দিয়ে রাখা যায়। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী ও সম্প্রদায়ের মানুষের অর্থনৈতিক-সামাজিক পার্থক্যগুলো জাতীয়তাবাদের ডামাডালে আড়ালে চলে যায়। সবাই কোনো জাতির সদস্য হিসেবে একই ধরনের লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ হন এবং এক ধরনের ‘কাল্পনিক সম্প্রদায়’-এর ধারণাকে ধারণ করেন। জাতীয়তাবাদকে শ্রেণীদ্বন্দ্বকে অস্বীকার করতে হয় না, এ আদর্শ বলে আপাতত শ্রেণীদ্বন্দ্ব ভুলে জাতি বা দেশের সভ্য হিসেবে যে সাধারণ আত্মপরিচয়, তার অধীন ঐক্যবদ্ধ হোন। ভারতবর্ষ তখন স্বাধীন নয়, তাই জাতীয়তাবাদ স্থানীয়দের দরকারি ঐক্য নির্মাণে ভূমিকা রেখেছিল।
ভদ্রলোক ধারণাটিও অনেকটা জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের মতো, নিজেদের মধ্যে নানা ধরনের পার্থক্য থাকলেও ভদ্রলোক একটি নৈতিক ও মতাদর্শিক ধারণা হিসেবে বিকশিত হয়েছিল। ১৯০৫ সালে এ ধারণা ফল বাস্তব হয়ে দেখা দিয়েছিল যখন জমিদার, পেটি বুর্জোয়া, ছাপাখানা-রেল শ্রমিক এবং কেরানিরা ‘বন্দে মাতরম’ স্লোগানের পেছনে রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। তিথী ভট্টাচার্য এই আলোচনার ফলাফল টেনেছেন দুই লাইনে, “The nation was brought into being, not in a private world of culture as Partha Chatterjee has argued, but in the ideological dissolution of class conflict.” তবে শিবনারায়ণ রায়ের পর্যবেক্ষণ ভিন্ন। তিনি মনে করেন, “তারা (ভদ্রলোক) পশ্চিমাগত ভাবনাচিন্তা, জ্ঞানবিজ্ঞানকে স্বাগত করলেও একই সঙ্গে দেশপ্রেমী।... বলাই বাহুল্য ভদ্রলোকদের চরিত্রেও ত্রুটির অভাব ছিল না। এবং সমাজের যারা নিম্নস্তরের অধিবাসী, প্রকৃতপক্ষে সমাজের যারা অধিজন, তাদের প্রতি তাদের দায়িত্ববোধের অভাব ছিল মারাত্মক রকমের ব্যাপক।... কিন্তু এ কথাও ভুলতে পারি না যে বিশ শতকের গোড়ায় যারা দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন, জীবনের বড় অংশ দ্বীপান্তরে বা কারাগারে কাটিয়ে ছিলেন, তারা বস্তুত সকলেই ছিলেন এই ভদ্রশ্রেণীর ছেলেমেয়ে।”
ভদ্রলোক এবং বাংলার নগরায়ণের বিকাশ কমবেশি সমান্তরাল। ভদ্রলোককে বুঝতে হলে এ নগরায়ণকেও আমলে নিতে হবে। ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছোট শহর এবং গ্রামাঞ্চলে বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রলোকরাও বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। বড় শহরে কর্মরত ভদ্রলোকদের সঙ্গে গ্রামের মানুষের সম্পর্ক ছিল। ঢাকা ও কলকাতার ভদ্রলোকদের প্রথম প্রজন্ম গ্রামের জমিজমা এবং পারিবারিক সংযোগের মাধ্যমে গ্রামের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। শহরে চাকরিজীবী পুরুষদের পরিবার এবং স্ত্রীরা গ্রামেই থাকতেন। শহর বা গ্রাম যেখানেই এই ভদ্রলোকদের স্ত্রীরা বাস করতেন, সেখানে তারা ভদ্রমহিলা হিসেবে পরিচিত হতেন। এ ভদ্রলোক শ্রেণীটি নারীশিক্ষার বিস্তার, বিধবা বিবাহ চালু, সতীদাহ প্রথা রোধ, বাল্যবিবাহ রোধ করা, পর্দার অবরোধ দূরা করা, কুলিনদের বহু বিবাহ রোধে অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখেন। শিবনারায়ণ রায় লিখেছেন, “এই নবোদ্ভূত ভদ্রশ্রেণীর প্রধান বৈশিষ্ট্য এটির সদস্যরা শিক্ষিত এবং রুচিবান; তারা স্ত্রীশিক্ষায় যথার্থই আগ্রহী এবং পরিবার ছাড়াও পরিবারের বাইরে বৃহত্তর সমাজ জীবনে স্ত্রীলোকের ভূমিকার প্রসারে উদ্যোগী।”
বিশ শতক শুরুর আগে বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণীতে মুসলিমদের অন্তর্ভুক্তি ছিল না। এ সময় শিক্ষিত মুসলিমরা ভদ্রলোক হিসেবে নাম লেখাতে শুরু করে। উনিশ শতকে মুসলিম অভিজাতরা ‘আশরাফ’ নামে পরিচিত হতেন। ভদ্রলোক হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় বাঙালি মুসলমান উত্তর ভারতীয় উর্দু ও ফার্সিতে শিক্ষা নেয়া থেকে বেরিয়ে এসে বাংলা ভাষাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। এটা এক ধরনের স্থানীয়করণ। মুসলিম নারীরা পরিচিত হতেন বেগম সাহেব বা বিবি সাহেবা নামে, এবার তার হলেন ভদ্রমহিলা। হিন্দু ভদ্রলোকদের মতো মুসলিমরাও ইংরেজি শিক্ষা নিয়ে প্রশাসন, শিক্ষা এবং বিচার বিভাগের চাকরিতে প্রবেশ করতে শুরু করেন। আলীগড় আন্দোলনের মাধ্যমে মুসলিম সমাজকে আধুনিক জীবনযাত্রায় যুক্ত করার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, তার প্রভাব বাংলাতেও পড়েছিল। এই আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল নারীর জীবনকে বাল্যবিবাহ, পর্দা প্রথার কঠোরতা, স্বামীদের একাধিক বিবাহের হাত থেকে রক্ষা করা। মুসলিম নারীদের মধ্যে এসব সামাজিক ও ধর্মীয় বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে যেমন লড়াই দেখা যায়, তেমনি তারা অনেকে সাহিত্যচর্চাতেও মনোনিবেশ করেছিলেন, যাদের মধ্যে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন এক বিরল ব্যক্তিত্ব। নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী প্রথম বাঙালি মুসলিম নারী হিসেবে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা করেন। ১৮৭৬ সালে তার ‘রূপজালাল’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। তিনি কুমিল্লায় মেয়েদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আশরাফ থেকে ভদ্রলোক/ভদ্রমহিলা হয়ে ওঠাটা একদিকে যেমন বাঙালি মুসলিমদের বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন নির্দেশ করছিল, তেমনি তাদের সামাজিক-অর্থনৈতিক শ্রেণী পরবর্তনও বাস্তব হয়ে উঠেছিল।
নীরদ সি. চৌধুরী লিখেছিলেন, ‘কেউ এটা অস্বীকার করতে পারবে না যে উনিশ শতকে বাঙালিরা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক একটি নতুন জীবনধারা তৈরি করেছিল, শুধু নিজেদের জন্য নয় বরং পুরো ভারতের মানুষের জন্য... তবে আজকের বাঙালির জন্য সেসবই অতীত...।’ আর শিবনারায়ণ রায় তার ব্যক্তিগত মেলামেশার অভিজ্ঞতা এবং পর্যবেক্ষণ থেকে লিখেছেন, “... পরবর্তীকালে শুভনাস্তিক মার্ক্সবাদীদের মৌখিক অপপ্রচার এবং বেহুদা কলমবাজির জোরে ‘ভদ্রলোক’ শব্দটির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে।”






