ভোর হওয়েন আগে আগে নুরা মিয়ার ঠাওর হইলো, হের জাওনের টাইম হইছে। বহুত শীত লাগতাছিল। কদিন ধইরা শরীল খারাপ, দু-একবার মনে হইছিল, জাওনের টাইম হইছে। যহন দেখল, হের মরা বিবি সাহেব দুয়ারের কাছে আইসা হের দিকে তাকাইছে, হে ঠিকঠাক বুঝল। পোলাটারে সে তহল ডাক দিল, পোলাটার মাথায় বুদ্ধি কম, সহজ-সরল, সবকিছু বোঝে না। কাছে আইসা ঘুম ঘুম চোখ লইয়া বাপের দিকে কিচুু না বুইঝা তাকাই রইল।

‘হুন বাজান, আমারে যাইতে হইবো উপরে, তোর মাও আইছে সাথে লাইয়া যাইবে। হে তো আগেই গেছে, পথ-ঘাট ছেনা। তুই আমার কাছে ব। তোরে বুজাই দেই সব।’ পোলাডা বুইজা না বুইজা চোখের পানি ফালায়।

‘হুন, তোর জহন টাইম হইবো, আমরা দুজনে আইয়া তোরে লইয়া যামু। পোরথোমে গ্যাছে তোর মা, হের পর আমি যাইতাছি, তারপর তুই যাবি। সবকিছু লাইন মতো হয়। বাজান, সবকিছু বুইজা ল, যাতে আমি যাওনের পর কইরা খাইতে পারোস।’

‘হুন, ওই যে আচার বেচি, ওইডা তুই জুরাইন থন যে কাকু আহে হের থোন কেবল নিবি। এতে নিশা আছে। পোলাপান খাইতে চাইব। ওষুধ মিশা আছে, ড্রাইভার সাহেবরাও লইব, হেদের বেগম সাহেবরাও খাইব। দুই-একটার শরীর খারাপ হইব, মাঝে মধ্যে তোর আচার খাইয়া হেরা মইরতেও পারে। তুই কিছু কইবি না, জিগাইবি না। তুই শুধু আচার দিবি আর কামাইবি। কাকা ভালা মানুষ, তোরে ঠকাইবো না। এইডা খারাপ কিছু না, হগগোলে খায়। কিন্তু কোনো দিন ভুইল্লাও খাবি না। তোরে নেশা ধরলে রুজি যাইবো গা, বুঝলি?’ পোলা মাথা নাড়ে। ‘কসম খা।’ পোলায় কসম খায়।

‘আর হুন, স্কুল ছুটি হইলে পাড়ায় পাড়ায় আচার দিবি। কোনো এক পাড়ায় বেশি দিন দিবি না। অন্যরা বুইজা ফালাইবো। তুই শুধু আচার বেচবি, আর কিচ্ছু মাথায় নিবি না। তুই শুধু পয়সা নিবি, আর আচার দিবি।’ পোলায় মাথা নাড়ে। ‘এই নেশায় অনেক মানুষ খতম হইয়া যায়, হেইডা দেহন তোর কাম না। তুই ফেরিওয়ালা, ফেরেস্তা না।’

কথা কইতে কইতে নুরা মিয়ার গলা শুকায়া আহে। আওয়াজ কইমা আহে। ভোর হইতাছে, আজানের শব্দ আইতাছে। নেশার আচার লইয়া জুরাইন থন কাকু আইতাছে। সাহেব অফিসে যাইতাছে, পোলাপান স্কুল যাইতাছে, বিবি সাহেব শুইতে যাইতাছে, নুরা যাইতাছে আসমানে। সবাই যায়, চইলা যায়। শীতকালের রাইত আর দিনের মাঝখানের চিপা গলি দিয়া সবাই খালি যায় গা...