প্রথম প্রকাশের পরই অত্যন্ত প্রভাবসঞ্চারী একটি বই এবং একটি উদ্ভাবন কুশলকাজ হিসেবে সমাদৃত হয়েছিল ট্রান্সলেটরস থ্রু হিস্ট্রি, যা একই সঙ্গে তথ্যপূর্ণ এবং খুবই পাঠযোগ্য। অনুবাদকরা যুগে যুগে, দেশে দেশে বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। উচ্চপ্রশংসিত এ গ্রন্থে বলা হয়েছে বিভিন্ন ভাষার বিকাশে, নানা সাহিত্যের আবির্ভাবে, জ্ঞান বিতরণে ও মূল্যবোধ বিস্তারে এ অনুবাদকদের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজনের অমলিন অবদানের কথা, যা হয়ে উঠেছে বিশ্বসংস্কৃতিরই একটি অনুপম কাহিনী। সে কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এই পাক্ষিক আয়োজনে পাঠকদের আমন্ত্রণ
ছেলেবেলা থেকেই আমি সিনেমাসক্ত। আব্বা তার জীবনের এক পর্যায়ে চলচ্চিত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, অর্থাত্ একটি সিনেমা হলে তার শেয়ার ছিল। সেই সুবাদে অল্প বয়সেই প্রচুর ছবি দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম বিনা পয়সায়। কখনো কখনো আব্বার অজ্ঞাতসারে সিনেমা হলে ঢুকে পড়তাম, ভয়ে বুক দুরু দুরু করত, পাছে আব্বার নজরে পড়ে যাই। গেট কিপারদের সহযোগিতা না পেলে আব্বার সতর্ক দৃষ্টি এড়ানো সম্ভব ছিল না। আবার কোনো কোনো দিন আব্বা স্বেচ্ছায় আমাদের নিয়ে যেতেন সিনেমা হলে। এমনকি কোনো কোনো রাত ভোর করে দিয়েছি ছবি দেখে। সেকালে রাতব্যাপী ফুল সিরিয়াল চালানো রেওয়াজ ছিল। কত ছবি যে দেখেছি, তার কোনো লেখাজোখা নেই। কোনো রকম বাছবিচারের বালাই ছিল না। ছবির ভালো-মন্দ বিচার করার মতো হিকমত তখন হাসিল করতে পারার প্রশ্নই ওঠে না। যা পেয়েছি তা-ই দেখেছি। কোনো কোনো ছবি সাত-আটবারও দেখা হয়ে যেত। এদিক থেকে বলা যায়, আব্বা ছিলেন খুবই উদার।
ছেলেবেলার অনেক কিছুই অস্তমিত হয়েছে আমার জীবন থেকে, কিন্তু সেই ফিল্মি শখ আজো অটুট রয়ে গেছে। এখন অবিশ্যি যেকোনো ছবি দেখার লোভে সিনেমা হলে ঢুকে পড়ি না, মুফতে দেখার সুযোগ থাকলেও নয়। এখন কিছুটা বাছবিচার করতে শিখেছি। যখন ঝাঁঝালো যুবক ছিলাম, তখনো সত্যিকারের ভালো ছবি শনাক্ত করতে পারতাম। আমার চলচ্চিত্র-বিষয়ক রুচি খানিক গড়ে দিয়েছিল অধুনালুপ্ত ব্রিটানিয়া সিনেমা হল। ব্রিটানিয়ায় প্রচুর উঁচু মানের বিদেশী ছবি দেখানো হতো। আজো কালেভদ্রে ব্রিটানিয়ার কথা স্মরণ করে দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করি। হায় ব্রিটানিয়া, সোনালি ডানার ব্রিটানিয়া।
পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ের একটি সন্ধ্যার কথা আজো মনে পড়ে। মন ভালো ছিল না সেদিন, হতাশা একটা কালো বেড়ালের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আমার ওপর। বেড়ালটাকে আমার অস্তিত্ব থেকে ঝেড়ে ফেলার জন্য একটা সিনেমা হলে (ব্রিটানিয়া নয়) ঢুকে পড়লাম। একটা বিদেশী ছবি চলছিল সেখানে। জাপানি ছবি। রশোমন। ছবিটা দেখে নেমে পড়লাম পথে, হেঁটে হেঁটে চলে গেলাম অনেক দূর। মন আশ্চর্য এক নান্দনিক আভায় উদ্ভাসিত। বৃষ্টিতে গেটের নিচে বসে থাকা একজন কাঠুরে ও একজন পুরোহিত; গহন অরণ্যে একটা কাঠুরে, চলমান কাঠুরের রৌদ্রঝলসিত কুড়ালের ক্লোজ-আপ; আলো আর অন্ধকারের খেলা, সুরের মূর্ছনা। গহন অরণ্যে একজন সামুরাই, তার স্ত্রী এবং একজন পাহাড়ি দস্যু। হত্যাকাণ্ড। পাঁচজনের জবানিতে একই ঘটনার পাঁচ ধরনের বিবরণ। পাঁচটি মনের ভিন্ন ভিন্ন অভিব্যক্তি, প্রত্যেকেই চাইছে নিজেকে ভালো প্রতিপন্ন করতে, এমনকি মৃত ব্যক্তিও এ ব্যাপারে অতিশয় যত্নশীল। চলচ্চিত্রকার কি গহন অরণ্যকে মানবমনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন সেলুলয়েডে? চলচ্চিত্রকারের নাম আকিরা কুরোসাওয়া, বারবার ভেসে উঠছিল আমার চোখের সামনে। আগে কখনো তার নাম শুনিনি। পড়েছি কি কোথাও তার বিষয়ে কোনো রচনা? না, মনে পড়ে না। আমাদের কোনো আড্ডায় কি উচ্চারিত হয়েছিল তার নাম? মনে পড়ে না। পরে অবশ্য তার বিষয়ে অনেক কিছু শুনেছি, দেখেছি তার আরো ছবি— সেভেন সামুরাই।
রশোমনে একজন প্রতিভাবান চলচ্চিত্রকারের অসামান্য সৃজনশীলতার পরিচয় তো ছিলই, আরো ছিল ক্যামেরার অসাধারণ কাজ। ক্যামেরাম্যানের নাম সেই সন্ধ্যায় মনে ছিল না, টাইটেল সিকোয়েন্স ভালো করে লক্ষ করিনি। অনেক দিন পর তার নাম শনাক্ত করেছিলাম। মিয়াগাওয়া। খোদ কুরোসাওয়া দিলখোলা প্রশংসা করেছেন মিয়াগাওয়ার। রশোমন প্রদর্শিত হওয়ার পর পরই আকিয়া কুরোসাওয়ার নাম ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র, তিনি নন্দিত হলেন বিশ্বের মুষ্টিমেয় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকারদের একজন হিসেবে। ১৯৫১ সালে রশোমন গ্রাঁ পি পুরস্কার পেল। এ পুরস্কার লাভের খবরটি কুরোসাওয়া পান তার গৃহিণীর কাছ থেকে। ছবিটি যে ভেনিসে পাঠানো হয়েছিল আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য, এটাই জানতেন না কুরোসাওয়া। তখন এক সাময়িক ব্যর্থতায় ভুগছিলেন তিনি, কীভাবে সংসার চালাবেন সেই উদ্বেগে ক্লান্ত, মনমরা। এক নিষ্প্রভ সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই জীবনসঙ্গিনী ছুটে এসে বললেন, ‘অভিনন্দন।’ ‘কেন? কিসের জন্য এই অভিনন্দন?’ প্রশ্ন করলেন চমকিত কুরোসাওয়া। কুরোসাওয়া গিন্নি হাসি ঝলসিত কণ্ঠে বললেন, ‘তুমি পুরস্কার পেয়েছ রশোমনের জন্য।’ আনন্দে কুরোসাওয়ার অস্তিত্বের প্রতিটি তন্ত্রী ঝংকৃত হয়ে উঠল। যাক, আর শুধু পান্তা ভাত খেয়ে দিন কাটাতে হবে না।
আরেকজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকার সত্যজিত্ রায় বলেছেন, ‘রশোমনই একমাত্র সিরিয়াস শিল্পগুণসম্মত বিদেশী ছবি, যা প্রায়ই রবিবারের মর্নিং শো-এ দেখানো হতো। আমার কাছে এই ছবির প্রভাব ছিল বিদ্যুত্ চমকের মতো। আমি পরপর তিনদিন তিনবার ছবিটা দেখলাম এবং প্রতিটি সময়ই অবাক হয়ে ভাবতাম আর কোথাও কোনো চলচ্চিত্রকারের চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতিটি বিভাগে এমন গভীর এবং উজ্জ্বল দখল আছি কিনা!’
এ রকম একজন সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের জীবনযাপনের কথা জানতে কার না ইচ্ছা করে? যারা চলচ্চিত্র সম্পর্কে আগ্রহী, তারা স্বাাভাবিকভাবেই জানতে চাইবেন কুরোসাওয়ার চিত্র নির্মাণের ইতিকথা। এ জীবনকথা আর ইতিকথা যদি রচনা করেন স্বয়ং কুরোসাওয়া, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। রশোমন, সেভেন সামুরাই, থ্রোন অব ব্লাড ও কাগেমুশার মতো ছবি যিনি সৃষ্টি করেছেন, সেই অসামান্য প্রতিভাধর শিল্পী মানুষের আত্মজীবনী পাঠ করা এক আশ্চর্য নান্দনিক অভিজ্ঞতা। সম্প্রতি কুরোসাওয়ার সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি বইটি পড়ে আমার সেই অভিজ্ঞতা হলো।
এই যে একটু আগে উল্লেখ করলাম, কুরোসাওয়ার আত্মকথা চলচ্চিত্রে আগ্রহী ব্যক্তিমাত্রই পড়তে চাইবেন, এর সঙ্গে আরেকটি কথা যোগ করতে চাই। শুধু চলচ্চিত্রমনস্ক পাঠকগোষ্ঠীই নয়, যেকোনো সংবেদনশীল পাঠকই এ আত্মজীবনী থেকে এমন কিছু আহরণ করতে পারবেন, যা জীবনের পক্ষে উদ্দীপক ও উপকারী। সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি শিল্প ও জীবনকে ভালোবাসতে শেখায়, শেখায় কী করে চরম হতাশার মধ্যেও মানুষ কাজ করে যায় একলব্য নিষ্ঠায়, দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে যায় অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে। আকিরা কুরোসাওয়া অনেক চিত্রনাট্য লিখেছেন কিন্তু তিনি কখনো কোনো উপন্যাস রচনা করেছেন বলে আমার জানা নেই। তবে তার আত্মকথা একটি উন্নত মানের উপন্যাসের মতোই উপভোগ্য এবং তৃপ্তিকর। এ বই পড়লে মনে হয়, লেখক কোনো বানোয়াট কথা বলেননি, তার মধ্যে কোনো ঢাকঢাক গুড়গুড় নেই, তিনি যা বলেছেন তা স্পষ্টভাবেই বলেছেন, কাউকেই খাতির করেননি, এমনকি নিজেকেও নয়। অন্যের দোষ সম্পর্কে তিনি যেমন সচেতন ছিলেন, তেমনি নিজের দোষ ও দুর্বলতার কথাও সাফ সাফ ব্যক্ত করেছেন। কুরোসাওয়ার আত্মজীবনীর ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে এক আপসহীন সততা।
যদিও এক প্রথাশাসিত পরিবারে জন্ম হয়েছিল কুরোসাওয়ার, তবু ছেলেবেলাতেই তিনি বহু ছবি দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। আর এ সুযোগ এসেছিল তার সামুরাই পিতার উদ্যোগে। পরিবারের সব সদস্যের সঙ্গে ছবি দেখতে ভালোবাসতেন তিনি। তার মতে, চলচ্চিত্র আনন্দ ও শিক্ষা দুটোকেই সঞ্চারিত করে মানুষের মনে। তিনি যে ঐতিহ্যে লালিত, তাতে ছোট ছেলেমেয়েদের ছবি দেখাতে উত্সাহিত করার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু কুরোসাওয়ার পিতা অন্যান্য প্রথা মানলেও, খাবার টেবিলের আদব-কায়দায় পান থেকে চুন খসলে সহধর্মিণীকে আহম্মক বলে গালমন্দ দিলেও ছবি দেখার বেলায় কোনো প্রথাকে আমল দেননি। এদিক থেকে বলতেই হয়, তিনি ছিলেন খোলা মনের মানুষ। ছেলেবেলা থেকেই চলচ্চিত্রের প্রতি তীব্র আকর্ষণ বোধ করতেন কুরোসাওয়া। বহু ইউরোপীয় ও আমেরিকান ছবি তিনি শৈশবে দেখেছেন, সেসব ছবির কোনো কোনো দৃশ্যের ছাপ এমন গভীরভাবে পড়েছিল তার মনে যে, সেগুলো কোনো দিন মুছে যায়নি। সেকালে জাপানি ছবি তাকে তেমন টানেনি। ছবির ভালো-মন্দ সম্পর্কে তাকে সচেতন করেন তার ভাই হেইগো। শুধু চলচ্চিত্র নয়, সাহিত্যসহ অন্যান্য বিষয়েও গোড়ার দিকে কুরোসাওয়া তার উজ্জ্বল অগ্রজের তালিম পেয়েছিলেন। এই তালিম ওপর থেকে জোর করে চাপানো কোনো ব্যাপার ছিল না। তার পক্ষে সূর্যের আলো কিংবা হাওয়ার মতোই ছিল অগ্রজের সাহচর্যের ফল। দুই ভাই একই স্কুলে পড়াশোনা করতেন। হেইগো ছিলেন কুরোসাওয়ার চার বছরের বড়। ছাত্র হিসেবে হেইগোর বেশ নামডাক ছিল। ঝলমলে বুদ্ধির অধিকারী হেইগোর মধ্যে ছিল আত্মপ্রত্যয়ের ঝলসানি। এ আত্মপ্রত্যয় ছোট ভাইয়ের মানসে সঞ্চারিত করতে তিনি যত্নশীল ছিলেন শৈশবেই। কুরোসাওয়া তার এই দীপ্তিমান অথচ ব্যর্থ অগ্রজের কথা গভীর শ্রদ্ধা ও সমবেদনার সঙ্গে লিপিবদ্ধ করেছেন আত্মকথায়।
কুরোসাওয়া অকুণ্ঠে কবুল করেছেন যে, ছাত্র হিসেবে তিনি কখনো কৃতিত্বের পরিচয় দেননি। সেরা ছাত্র বলতে যা বোঝায়, তার ত্রিসীমায় ছিলেন না তিনি, তার নির্বুুদ্ধিতা ও দুর্বলতা নিয়ে স্কুলের ছাত্ররা হরহামেশা হাসি-মশকরা করত। ছিচকাঁদুনে বলে পরিচিত এ ছেলেটিকে নাস্তানাবুদ করার জন্য সবাই উঠেপড়ে লেগেছিল। হেইগো ছোট ভাইকে এই বিপাক থেকে বাঁচানোর জন্য নানা তরকিবের আশ্রয় নিতেন, এমনকি কখনো কখনো তিনি ব্যঙ্গের ছলে অস্থির করে তুলতেন কুরোসাওয়াকে। ছোট ভাই যাতে এ পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে পারে, সেজন্যই তিনি এ রকম আচরণ করতেন তার সঙ্গে।
সে সময়ে আরো একজন অনুপ্রাণিত করেছিলেন কুরোসাওয়াকে। তিনি সেই স্কুলের শিল্প-শিক্ষক তাচিকাওয়া সেইজি। আগেই বলেছি, ছাত্র হিসেবে কুরোসাওয়া ছিলেন গৌরবহীন, ব্যাকবেঞ্চারদের একজন। কিন্তু তার মধ্যে যে একজন চিত্রকর ঘুমিয়েছিল, তাকে তাচিকাওয়া সেইজি জাগিয়ে তুলেছিলেন ছাত্রকে প্রচুর উত্সাহ জুগিয়ে। ছাত্রটি সবিস্ময়ে লক্ষ করল যে, সে বাস্তবিকই ছবি আঁকতে পারে আর এ ঘটনাই তাকে আত্মবিশ্বাসী হতে শেখাল। তাচিকাওয়া সেইজি এবং অন্য দু-একজন শিক্ষকের গুণাবলির কথা তিনি ঠোঁট চেপে বলেননি; তাদের ঋণ স্বীকার করেছেন দিলখোলা ভাষায়, যেমন করেছেন তার প্রিয় চলচ্চিত্রকার ইয়ামামোতো কাজিরোর বেলায়। ইয়ামামোতোর কাছে তিনি শিক্ষানবিশী করেছেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে, তরুণ শিক্ষার্থীর শ্রম ও প্রতিভা লক্ষ করে গুরু তার শিষ্যকে দিয়েছেন অকৃপণ উত্সাহ ও স্নেহ। কুরোসাওয়া ইয়ামামোতোর সহকারী হিসেবে বেশ কয়েকটি ছবিতে কাজ করেছেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ইয়ামামোতোর আস্থা অর্জন করতে পেরেছিলেন।
মনে হতে পারে যে, শৈশবের চলচ্চিত্র প্রীতিই কুরোসাওয়াকে চলচ্চিত্রজগতে টেনে এনেছে। আসলে তা নয়। সেলুলয়েড, ক্যামেরা ও আর্ক ল্যাম্পের দুনিয়ায় তিনি আকস্মিকভাবেই হাজির হয়েছিলেন। সহকারী পরিচালকের চাকরি পাওয়ার পরেই তা ছেড়ে দেয়ার কথা ভেবেছিলেন কাজ ভালো লাগেনি বলে। একজন সহকর্মীর পরামর্শে শেষ পর্যন্ত কুরোসাওয়া পদত্যাগ করেননি। সহূদয় সহকর্মীটি তাকে বলেছিলেন, সব চলচ্চিত্রকারই এক রকম নন, এমন কিছু চলচ্চিত্রকারও আছেন, যাদের সঙ্গে কাজ করার আনন্দ অপরিসীম। আর কী আশ্চর্য! কিছুদিনের মধ্যেই ইয়ামামোতোর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ ঘটে গেল কুরোসাওয়ার। ইয়ামামোতোর সাহচর্যে কুরোসাওয়ার জীবনে এক নতুন দিগন্ত উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
আকিরা কুরোসাওয়া জীবনের নানা পর্যায়ে বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। চিত্রনাট্য লিখে পয়সা রোজগার করেছেন প্রচুর। আবার কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা উড়িয়ে দিয়েছেন ইয়ারদের সঙ্গে মদ্যপান করে। বামপন্থী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছেন, প্রচুর ঝুঁকি নিয়েছেন সেজন্য। পুলিশের হাতে ধরা পড়তে পড়তে বেঁচে গেছেন শেষ পর্যন্ত। বহুদিন কপর্দকহীন অবস্থায় ঘুরে বেড়িয়েছেন এদিক-ওদিক, আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন হেইগোর ডেরায় এবং আত্মঘাতী অগ্রজের মতোই সচেষ্ট হয়েছিলেন আত্মহননে।
অসামান্য প্রতিভাবান চলচ্চিত্রকার হওয়া সত্ত্বেও তাকে বহু অন্তরায়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ছবি শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও সেই ছবি দীর্ঘকাল মুক্তিলাভ করেনি সেন্সর বোর্ডের নিষেধাজ্ঞার জন্য। তাকে বারবার অপদস্থ হতে হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়শাসিত সেন্সর বোর্ডের হাতে। কুরোসাওয়ার ছবিতে ইউরোপীয় ও মার্কিন ছবির প্রভাবের প্রসঙ্গ টেনে সেন্সর বোর্ডের অপদার্থ, বিদ্বেষপরায়ণ সদস্যরা কুরোসাওয়ার ছবি আটকে রেখেছেন। যৌনতার অভিযোগ এনেছেন তার কোনো কোনো ছবির বিরুদ্ধে, এমনকি সেন্সর বোর্ডের তথাকথিত বিজ্ঞ সদস্যরা তোরণকে যোনির প্রতীক ভেবে গোটা ছবি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেন্সর বোর্ডের নির্বুদ্ধিতা ও কাণ্ডজ্ঞানহীনতা সম্পর্কে ঠোঁটকাটা কুরোসাওয়া প্রচুর শাণিত উক্তি করেছেন তার আত্মজীবনীতে। সেন্সর বোর্ড তাকে যেভাবে ভুগিয়েছে, তাতে এটা খুবই স্বাভাবিক ও যুক্তিসঙ্গত মনে হয়েছে আমার। আমাদের দেশের সেন্সর বোর্ডও মাঝে মাঝে কাণ্ডজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়ে থাকে। ১৯৭৭ সালে তারা বিশ্বনন্দিত চলচ্চিত্রকার সত্যজিত্ রায়ের জন অরণ্য ছবির প্রদর্শনী নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। এ ধরনের ধৃষ্টতার কথা শুনলে আক্কেল গুড়ুম হয়ে যায় বৈকি, কারো কারো গা যদি রাগে রি-রি করে তাহলে তাকে দোষ দেয়া যাবে না। কিন্তু সুখের বিষয় সেন্সর বোর্ডের সবজান্তাদের বিরোধিতার জন্য কোনো কুরোসাওয়া কিংবা সত্যজিতের প্রতিভার বিপুল স্ফুরণ আটকে থাকে না, যেমন চিরদিন আটকে থাকে না সূর্যোদয়।
বহু বাধাবিপত্তি উজিয়ে কুরোসাওয়া সাফল্যের চূড়া স্পর্শ করেছেন। ব্যর্থতা তার মুখ ম্লান করে দিয়েছে বারবার, কিন্তু তার অন্বেষাকে স্তব্ধ করতে পারেনি; নিভিয়ে দিতে পারেনি তার অন্তর্গত শিক্ষাটিকে। ভুলে গেলে চলবে না যে, তার শিরায় বয়ে চলেছে সামুরাই শোনিত, যা তার মানসকে করেছে সংগ্রামজাগর, তরবারির মতো ঝলসে ওঠার ক্ষমতা। বাঁচার লড়াই ও শিল্পীর ক্রিয়েটিভ প্রসেস বিষয়ে যারা আগ্রহী, জীবনের জটিলতা সম্পর্কে যারা জিজ্ঞাসু, তাদের প্রত্যেকেরই এ বই অবশ্য পাঠ্য বলে মনে করি। বিশেষ করে তরুণ চলচ্চিত্র উত্সাহীদের তো বটেই।






