পর্দা হ্যায় পর্দা, পর্দা হ্যায় পর্দা
পর্দে কে পিছে পর্দানশী হ্যায়...
মনমোহন দেশাই পরিচালিত ১৯৭৭ সালের সিনেমা ‘অমর আকবর অ্যান্থনি’ সিনেমার গানটি অনেকের কাছেই পরিচিত। এক গানের জলসায় আকবর এলাহাবাদি চরিত্রে ঋষি কাপুরের ঠোঁটে মোহম্মদ রফি গেয়েছিলেন এ গান। স্টেজে যখন ঋষি গান গাইছেন, দর্শক আসনে বোরখা পরিহিতা ও মুখ নেকাবে ঢাকা সালমা আলী চরিত্রে অভিনয় করা নীতু কাপুর। তৈয়ব আলীর কন্যা সালমা আলীর সঙ্গে উপস্থিত আরো দুজন বোরকা নেকাবধারী। মোগল আমলে নারীদের পর্দা সম্পর্কিত আলোচনায় এ সিনেমা বা গানের প্রসঙ্গ তোলার কারণ সাধারণভাবে জনমানসে পর্দা বলতে বোরকা-নেকাবের কথাই প্রথমে মনে আসে। কিন্তু পর্দার এ ধারণা তুলনামূলক নতুন। মোগল নারীদের পর্দাপ্রথা বোরকা-নেকাবের বাইরে একটি ‘ব্যবস্থা’র মধ্যে ছিল।
পর্দা মূলত ইসলামী শরিয়তের বিধান। সে বিধান অনুসারে নারী ও পুরুষ উভয়েরই পর্দা করা প্রয়োজন। কিন্তু পর্দার প্রচলিত ধারণায় নারীদের ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার ও প্রয়োগ বেশি। আর ভারতে এর সূচনা হয়েছিল মুসলিম শাসনের শুরুতে। মুহম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয় থেকে অবশ্য শুরু হয়নি, হয়েছিল আরো পরে এবং দিল্লি সালতানাতের সময় থেকে তা আরো বিস্তৃত পরিসরে কাজ করতে শুরু করে। মোগল শাসনামলে নারীর পর্দা বিশেষ হয়ে ওঠে। মূলত মোগল জেনানা, মোগল অন্দরমহল ও নানা সামাজিক কারণে পর্দার ব্যবহার বিস্তৃতি পেয়েছিল। কিন্তু বিস্তৃত বলতে, পর্দা ব্যবস্থাটি কখনো সর্বব্যাপী হয়নি। সীমাবদ্ধ ছিল নির্দিষ্ট শ্রেণীর মধ্যে।
আজকের দিনে এসে পর্দা বলতে শরীর ঢাকা (বোরকা), মাথা ঢাকা (স্কার্ফ পরা), মুখ ঢাকা (নেকাবের ব্যবহার) ইত্যাদি বোঝানো হয়। অর্থাৎ পর্দা বিষয়টি কিছু নির্দিষ্ট পোশাকের মধ্যে এসে ঢুকেছে। কিন্তু ইসলামী শরিয়ত অনুসারে পর্দা মূলত জীবনাচরণের কিছু নিয়ম মেনে চলা, যেখানে পোশাকের পাশাপাশি ‘লাইফস্টাইল’ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মোগল আমলেও পর্দা এ রকম একটি ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। কেবল পোশাক নয়, নারীদের সমগ্র জীবনাচরণের মধ্যেই ছিল পর্দা। তবে এ নারী সাধারণ নারী নয়। মূলত অভিজাত নারীরাই ছিলেন পর্দার অধীন বা তারা পর্দা করতেন। সাধারণ নারীদের ক্ষেত্রে পর্দার বিষয়টি অভিজাতদের মতো ছিল না, তবে তারাও কিছুটা পর্দা করতেন। কিন্তু খেটে খাওয়া মানুষ অর্থাৎ কৃষক কিংবা দিনমজুর পরিবারের নারীরা পর্দা করার সুযোগ পেতেন না।
মোগল আমলের দরবারি ওয়াকিয়ানবিশরা (ঘটনাবলি লেখক) প্রশাসনের সঙ্গে জড়িত বিষয়াদিই বেশি লিখেছেন। এর বাইরে আকবরের সভাসদ আবুল ফজল অনেক ক্ষেত্রে মোগল আমলের মানুষ ও সংস্কৃতির কিছু বিষয় উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তার বর্ণনায় মোগল নারীর পর্দা সম্পর্কে ততটা জানা যায় না। অবশ্য আবুল ফজল মোগল জেনানার (হারেম) যে বর্ণনা দিয়েছেন তা থেকে মোগল নারীর পর্দার একটি চিত্র পাওয়া যায়। আবুল ফজল জানিয়েছেন, মোগল প্রাসাদে নারীদের জন্য নির্দিষ্ট প্রাসাদ ছিল। প্রতিটি প্রাসাদে বাদশাহর স্ত্রী, কন্যা, উপপত্নীদের জন্য ছিল আলাদা মহল। এগুলো এক একটি আজকের দিনের অ্যাপার্টমেন্টের মতো। প্রাসাদসংলগ্ন থাকত বিস্তৃত বাগান। প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই ওই প্রাসাদের মধ্যে করে দেয়া থাকত। অতি প্রয়োজন ছাড়া মোগল নারীরা এ অঙ্গনের বাইরে আসতেন না। পুরো ব্যবস্থাটির নাম ছিল ‘শাবিস্তান-ই-খাস’।১
বাইরে আসতেন মূলত বাদশাহর প্রধান স্ত্রীরা। আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান সবার ক্ষেত্রেই দেখা গেছে প্রধান স্ত্রী, বিদুষী কন্যারা দরবার-ই-আমেও হাজির থাকতেন। ঠিক এ জায়গাটিতে মোগল আমলে পর্দা সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। সম্রাটের স্ত্রীরা সাধারণত ঝরোকা (জাফরি কাটা দেয়াল) বা চিকের (সূক্ষ্ম পর্দা) আড়াল থেকে দরবার পর্যবেক্ষণ করতেন। নূরজাহান নিজে দরবারের বহু কাজ সমালেছেন, আকবরের স্ত্রী সালিমা সুলতান বেগম, শাহজাহান কন্যা জাহানারা ব্যবসাও করেছেন কিন্তু এক্ষেত্রে রীতি ছিল দরবারের অমাত্যরা তাদের মুখ যেন স্পষ্ট দেখতে না পারেন। সে কারণেই মুখের ওপর একটি আবরণ ব্যবহার করতেন তারা। মোগল জেনানায় বাদশাহ ভিন্ন কোনো পুরুষের প্রবেশাধিকার ছিল না কিন্তু খুব প্রয়োজনে বিশ্বস্ত অমাত্যরা যেতে পারতেন, তবে সেক্ষেত্রেও একটি পর্দার দুই পাশ থেকে হতো কথোপকথন।
মোগল নারীরা যুদ্ধের সময়ও বাদশাহর সঙ্গী হতেন। এছাড়া তারা শিকারসহ ভিন্ন নগরে যাত্রাও করতেন। এসব ক্ষেত্রে তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকত। এসব ক্ষেত্রে তাদের জন্য মূলত হাতির হাওদার ব্যবস্থা ছিল। হাতির পিঠে হাওদার চারপাশে মশারির জালের মতো পর্দা দেয়া হতো। মোগল আমলে আঁকা চিত্রে এর প্রমাণ দেখা যায়। তবে রাজকীয় নারীদের পর্দার এ বিষয়গুলো আর্থিক অবস্থান ওপর নির্ভর করত। রাজ্যহারা হুমায়ুন যে সময় পথে পথে ঘুরছিলেন সে সময় হামিদা বানুর পর্দার সঙ্গে বাদশাহ জাহাঙ্গীরের স্ত্রী হিসেবে নূরজাহানের পর্দার ধরন ছিল আলাদা।
মোগল অভিজাত অর্থাৎ দরবারের অমাত্য, সেনাপতিদের বাড়ির নারীরাও একই ধারায় পর্দা করতেন। বড় ব্যবসায়ী পরিবারের নারীরাও থাকতেন অন্দরে। তারা খুব একটা বাইরে বের হতেন না। বের হলে তারা বোরকা পরতেন। বোরকা বলতে আজ যা বুঝি তা না হলেও দীর্ঘ ও ঢোলা পোশাক তারা পরতেন এবং অবশ্যই মাথা ও চুল ঢাকতেন মুসলিম নারীরা। মোগল আমলের নারীদের জীবনাচরণ ও পোশাক সম্পর্কে লিখেছেন ইউরোপীয় বণিক ও ভ্রমণকারীরা। এর মধ্যে সুরাট ভ্রমণ প্রসঙ্গে মানুচ্চি লিখেছেন২, ‘এখানে হিন্দু নারীরা পারস্য বা তুর্কি নারীদের মতো মুখ ঢেকে বাইরে যায় না। কিন্তু মুসলিম নারীদের ক্ষেত্রে মুখ না ঢেকে বাইরে বের হওয়াকে অসম্মানের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।’
মোগল আমলে নারী ও তাদের জীবনযাপন নিয়ে লিখেছেন আকবরের সভাসদ আবদুল কাদির বাদায়ুনিও। তার মতে, ‘রাস্তায় বা বাজারে কোনো অল্পবয়স্ক নারীকে তার ঘোমটা ছাড়া দেখা যায় না। এ কাজ কোনো সতী নারী করতে পারে না। তবে যেসব নারী তার স্বামীর সঙ্গে অসদ্ব্যবহার করে কিংবা যার সতিত্বের ঠিক নেই তারাই এভাবে পর্দাহীনভাবে বাইরে বের হতে পারে।’৩ বাদায়ুনির কথার প্রমাণ পাওয়া যায় মানুচ্চির লেখাতেও। তিনি বলেছেন, ‘একজন মুসলিম নারী কখনো বাড়ির বাইরে তার মুখ অনবৃত রাখতে পারে না, কেননা তাদের ধর্মীয় বিধান এর অনুমতি দেয় না।’
ফরাসি পর্যটক জ্যঁ দ্যু থেভেনটও একই কথা বলেছেন। তার মতে, মূর্তি পূজারি ব্যতীত কোনো নারী তার মুখ খোলা রেখে বাড়ির বাইরে যায় না। তারা মাথায় ঘোমটা ব্যবহার করে এবং ঘোমটার বাইরে কয়েকটি মাত্র চুল দেখা যেতে পারে। মোগল আমলে মুসলিম নারীদের পাশাপাশি কোনো কোনো অঞ্চলে হিন্দু নারীরাও পর্দার মধ্যে থাকত। বলা বাহুল্য তারাও মূলত উচ্চবিত্ত নারী। এর মধ্যে রাজপুত নারীরা সবচেয়ে বেশি পর্দার মধ্যে থাকতেন। তাদেরও ছিল অন্দরমহল এবং বাইরে বের হলে পালকি বা হাতির হাওদায় চড়ার সময় তাদের মুখের ওপর দীর্ঘ ঘোমটা থাকত। আজও এ ঘোমটা ‘ঘুঙ্গট’ বা ‘ঘুঁঘট’ নামে পরিচিত। এছাড়া ডক্টর পি এন ওঝা জানিয়েছেন, উড়িষ্যার উচ্চবিত্ত ও অভিজাত নারীদের মধ্যে পর্দার প্রচলন ছিল।৪
দিল্লি সালতানাত থেকে ভারতে নারীর পর্দা প্রচলিত হয়। মোগল আমলে এসে তা একটি ‘সিস্টেমে’ পরিণত হয়েছিল। তবে এ পর্দার বিষয়টি ছিল যতটা ধর্মীয় ততটাই ছিল সামাজিক। সে কারণেই পর্দা নির্ভর করত আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর। দিল্লি সালতানাত, মোগল আমলে দিল্লি-আগ্রার প্রাসাদের পর্দা মোগল আমলেই ভারতের কোণে কোণে প্রচলিত হয়নি। কেননা বাংলায় তখনো শাড়িরই প্রচলন ছিল নারীদের প্রধান পোশাক হিসেবে। পরবর্তী সময়ে দিল্লি আগ্রার পাশাপাশি দোয়াব পার করে পর্দা প্রচলিত হয়। উত্তর ভারতে মোগল, মুসলিম অভিজাত প্রথার পাশাপাশি পর্দা গ্রহণ করেছিল লখনৌ, বাংলা এমনকি পৌঁছেছিল দক্ষিণেও। এরপর পর্দা চলে আসে পপুলার কালচারে। পরিবর্তিত হয় এর ধরন। সে কারণেই আকবর এলাহাবাদি চরিত্রের মুখে পর্দা নিয়ে গান বসিয়েছিলেন মনমোহন দেশাই। তবে পর্দার সংজ্ঞা ততদিনে বদলে গেছে।
তথ্যসূত্র
১. আইন-ই-আকবরী: আবুল ফজল
২. স্টোরিয়া দে মোগল: নিকোলাও মানুচ্চি
৩. মুন্তাখাব-উত-তাওয়ারিখ: আবদুল কাদির বাদায়ুনি
৪. নর্থ ইন্ডিয়ান সোশ্যাল লাইফ: ড. পি এন ওঝা
মাহমুদুর রহমান: লেখক





